Skip to main content

Full text of "Kabir Bouthan Ed.1st"

See other formats


কবির বউঠান 
মল্লিকা সেনগুপ্ত 


পরিবেশক | 
৮ তগরদনি) 


২৭, বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা-৭০০ ০০৯ ৪১ ২২৪১-৬৯৮৯ 


প্রথম সংস্করণ : নভেম্বর, ২০০০ 


প্রকাশক : সরস্বতী ভট্টাচার্য ও রাজর্ষি ভট্টাচার্য 
১৪/২, পি. সি. ব্যানাজী লেন 
দক্ষিণেম্বর, কলকাতা-৭০০ ০৭৬ 


| প্রচ্ছদ : দি সরস্বতী প্রিন্টিং ওয়ার্কস 
২, গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেন, কলকাতা-৭০০ ০০৬, দূরভাব : ২৩৫০-০৮১৬ 


মুদ্রক : শ্যামল সাউ, দি সরন্বতী প্রিন্টিং ওয়ার্কস, 
২, গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেন, কলকাতা-৭০০ ০০৬, দূরভাষ : ২৩৫০-০৮১৬ 


রোগশয্যার বন্ধুদের 


১ 


জ্ঞানদানন্দিনী 


সন ১৮৬৬। ঠাকুরবাড়ির দেউড়ির সামনে একটি ঘোড়ার গাড়ি এসে 
থামল। গাড়ির দরজা খুলে মাটিতে নেমে এল বিলিতি জুতো মোজা পরা 
সুললিত একটি পা, পরে আর-একটি। পায়ের ওপর লুটিয়ে আছে নকশি- 
পাড় মরচেরঙা শাড়ির কুঁচি। তারপর মাটিতে নেমে দাড়ালেন শাড়ি পরা 
এক ষোড়শী বিদ্যুৎলতা। গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে হেটে তিনি পা বাড়ালেন 
বাড়ির অন্দরের দিকে। প্রকাশ্য আঙিনায় চাকর-বেহারাদের চোখের সামনে 
মেজোবউ জ্ঞানদানন্দিনীর এই অকুষ্ঠ অলজ্জ আবির্ভাবে জোড়ার্সাকোর 
অন্দরমহলে সেদিন যেন ভূমিকম্প ঘটে গেল। পুরনো চাকরবাকরেরা এই 
অনাসৃষ্টি কাণ্ড দেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। মানদা দাসী অন্দর থেকে উঁকিঝুকি 
দিয়ে এমন দৃশ্য দেখে কর্তামাকে খবর দেবার জন্য পড়িমরি ছুট লাগাল। 
বেজার মুখে নায়েব গোমস্ত পুরুষেরা দাড়িয়ে রইলেন। এতদিন পর বোম্বাই 
থেকে ফিরে মেজোবাবু স্বয়ং যখন বউমাকে পাশে নিয়ে এইভাবে অন্দরে 
ঢুকলেন, তখন কারও কিছু বলার থাকতে পারে না, বিশেষত কতা দেবেন্দ্রনাথ 
যখন বাড়ি নেই। কিন্তু এহেন সৃষ্টিছাড়া কাহিনির জল যে অনেকদূর গড়াবে 
তাতে কোনও সন্দেহ রইল না কারওরই। 

ঠাকুরবাড়ির মেজোছেলে সত্যেন্দ্রনাথ বেশ কৃতি ও মেধাবী। ভারতীয়দের 
মধ্যে তিনিই প্রথম ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীণ আই সি এস। 
নারীপ্রগতির বিষয়েও তিনি অতি সক্ক্রিয় চিন্তাভাবনা করতেন। বিয়ের সময় 
তখনকার নিয়ম অনুসারে সত্যেন্দ্রর নববধূ জ্ঞানদার বয়স ছিল সাত। তীর 
গৌরীদান হয়েছিল। বাপের বাড়িতে সবে তীর অক্ষর পরিচয় হয়েছে। 
নোলক পরা, ঘোমটা টানা সদ্য সাক্ষর সেই বালিকাবধূকে নিয়েই শুরু হল 


সত্রীশ্বাধীনতার জন্য সত্যেন্দ্রর লড়াই। উনিশ শতকের বউ-মেয়েদের বাড়ির 
চার দেওয়ালের মধ্যে যেভাবে বন্দি করে রাখা হত, সত্যেন্দ্র তরুণ বয়স 
থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। মা সারদাদেবীকেও তিনি প্রায়ই 
বলতেন ঘরে বন্দি হয়ে না থেকে বাইরে বেরোতে। রক্ষণশীল সারদা অবশ্য 
মেজোছেলের এ-সব কথায় গুরুত্ব দেননি, বরং ধমক দিয়ে বলতেন, তুই 

কী বা এমন দোষ হয় মেয়েরা গড়ের মাঠে গেলে? সত্যন্দ্র জানতে চান। 

ঘরের শুচিতা নষ্ট হয়। জানিস না, বাড়ির পুরুষেরাও রাতে শোবার 
সময়ে ছাড়া যখন-তখন অন্দরে ঢুকতে পারেন না! আর সেই বাড়ির মেয়েরা 
বেটাছেলের সঙ্গে বাইরে গিয়ে হাওয়া খাবে, এমন কাণ্ড কেউ কখনও 
শুনেছে? লোকে ছি ছি করবে যে! 

মা ছেলের এই কথোপকথনের পর অনেকদিন পেরিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে 
মা আরও কট্টর হয়েছেন, ছেলে আরও প্রগতিশীল। সেদিনের সেই 
লজ্জাবতী মেজোবউ বহু বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বেপরোয়া আই সি এস স্বামীর 
সঙ্গে দু'বছর বোম্বাইতে কাটিয়ে এখন রীতিমতো আলোকিত নারী। কিন্তু 
সারদাদেবীর গম্ভীর মুখ জ্ঞানদার এই আধা-মেম মুর্তিতে আবির্ভাব দেখে 
আরও অন্ধকার হল। মেজোছেলে ও মেজোবউ অন্দরে পৌছে কর্তামা 
অখুশি মুখে তাদের বরণ করতে এলেন। তাকে ঘিরে ঠাকুরবাড়ির চোদ্দো- 
পনেরো জন নানা বয়সের মেয়ে-বউ কিশোরাঁ বালিকা। তারা গভীর বিস্ময়ে 
বোম্বাইয়ের জাহাজে-চড়া বউ দেখতে থাকে। জ্ঞানদার মনেও হিল্লোল ওঠে 
তাদের জবুথবু ভাবভঙ্গি সাজপোশাকের দিকে তাকিয়ে। এই রূপসি মেয়ে- 
বউদের ব্যক্তিত্ব যেন শাড়ি-গয়নার স্তূপে চাপা পড়ে আছে। কোনও কিশোরীর 
পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে যেমন তেমন করে পরা ভারী বেনারসি, কোনও বধূর 
সোনার অঙ্গ ঢেকে গেছে সোনার গয়নার নির্লজ্জ ঝমঝমানিতে। কিন্তু শাড়ি- 
গয়্যঙ্লার সম্ভারে তাদের উপচে পড়া যৌবন বাধ মানছে না। এই পোশাকে 
পুরুষের চেখের সামনে সত্যিই বেরনো যায় না। 

জ্ঞানদার মনে হল, এজন্যই বোধহয় বাড়ির পুরুষদেরও যখন-তখন 
অন্দরে আসা বারণ। সারদাসুন্দরীদেবী আগের মতোই বিরাট চৌকির ওপর 
তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসেছেন, চন্দনরঙের মিহি মসলিন শাড়ি যেন তার 
গায়ের রঙে মিশে গেছে। শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কষামিঠে 


৮ 


স্মৃতি জ্ঞানদার মনে পড়ে যায়। মনের মতো পোষমানা বউ হতে পারেননি 
বলে তাঁকে শাশুড়ির কাছে নাজেহাল হতে হয়েছে বহুবার। বালিকাবয়সে বউ 
হয়ে আসার পর শাশুড়ি নিজে সামনে বসে তার পরিচধ্ধা করাতেন। সারদা 
রূপটান মাখাত। শ্যামরঙা জ্ঞানদার রোগা চেহারা সারদার পছন্দ হয়নি, 
তাই তীকে রংরূপে ঠাকুরবাড়ির উপযুক্ত করে তোলায় মন দিয়েছিলেন। 
একবার অন্যবাড়ির ক'জন মেয়ে-বউ দেখা করতে এল। তাদের রসেবশে 
চেহারা দেখে সারদা আক্ষেপ করে বললেন, এরা কেমন হষ্টপুষ্ট দেখ দেখি, 
আর তোরা সব যেন বৃষকাষ্ঠ। তারপর কিছুদিন ধরে শুরু হল জ্ঞানদাকে 
মোটা করার চেষ্টা। নিজ হাতে ভাত মেখে খাইয়ে দিতে লাগলেন। একমাথা 
ঘোমটা পরা বালিকাবধূ না পারতেন গিলতে, না ফেলতে। ভাতের দলা 
নিয়ে সুন্দর টাপার কলির মতো কর্তামার আঙুলগুলি এগিয়ে আসত জ্ঞানদার 
মুখের দিকে আর বালিকার কেবল মনে হত কখন মা উঠে যাবেন আর তিনি 
দালানে গিয়ে বমি করবেন। 

এ তো গেল তার আদরযত্তের পালা। কিন্তু সত্যেন্্রর আই সি এস পরীক্ষা 
দিতে বিলেত যাওয়াটা বোধহয় মায়ের পছন্দ হয়নি। মেজোছেলে চলে গেলে 
কর্তামা কী এক অজানা রাগে মেজোবউ জ্ঞানদার গয়না নিয়ে দুই মেয়েকে 
বিয়ের উপহার দেন। নিয়ে নেওয়া সেইসব গয়নার জন্য অবশ্য জ্ঞানদা শোক 
করেন না। কিন্তু বাবামশায় যখন শুনলেন, তিনি মায়ের ওপর খুব রাগ 
করেন আর জ্ঞানদার জন্য একটি হিরের কণ্ঠি পাঠিয়ে দেন। আসলে চিরদিন 
অন্তঃপুরবাসিনী সারদা সেখানকার কোনও পরিবর্তন মানতে পারতেন না। 
জ্ঞানদা যেভাবে অন্দরমহলের রীতিনীতি না মেনে আধুনিকতার আমদানি 
করছিলেন তা সারদাকে রাগিয়ে তুলত। আর ঘরের বউয়ের জাহাজে পাড়ি 
দিয়ে বোম্বাইযাত্রা এবং সেই বিদেশবিভুইতে দু'বছর কাটিয়ে আসা যে তিন 
কোনওমতেই হজম করতে পারবেন না সে তো জ্ঞানদা বুঝতেই পারছেন, 
এবার মায়ের সঙ্গে বসবাস আরও কঠিন হবে। 

কিন্তু বোম্বাই যাওয়ার অনুমতি পেতেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল 
তাঁকে। সত্যেন বিলেত যাওয়ার পর থেকেই স্ত্রীকে ঘরের বাইরে বিশ্বের 
আলোকিত নারীদের মাঝখানে নিয়ে যেতে চাইতেন। সে যুগে পুরুষেরা 
কার্যসূত্রে বা ভ্রমণে বাইরে গেলেও স্ত্রীদের সঙ্গে নেওয়ার চল ছিল না। 


৯ 


কিন্তু সত্যেন কোনও দিনই জ্ঞানদাকে ঘরে বন্দি রেখে নিজে প্রবাসে থাকতে 
চাননি। চিঠির পর চিঠিতে তিনি জ্ঞানদাকে ডাক পাঠাতেন। একবার লিখলেন, 
“এখানে জনসমাজে যাহা কিছু সৌভাগ্য, যাহা কিছু উন্নতি, যাহা কিছু সাধু 
সুন্দর, প্রশংসনীয় স্ত্রীলোকদের সৌভাগ্যই তাহার মুল।... আমার ইচ্ছা 
তুমি আমাদের স্ত্রীলোকের দৃষ্টান্তন্বরূপ হইবে কিন্তু তোমার আপনার উপরই 
তাহার অনেক নির্ভর।, 

এ সব চিঠি পড়ে মনে মনে নিজেকে সেই আলোকযাত্রার জন্য প্রস্তুত 
করছিলেন কিশোরী জ্ঞানদা। কিন্তু শেষপর্ধস্ত বাবামশায়ের অনুমতি পাওয়া 
গেল না। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে বোম্বাইয়ের কর্মস্থলে প্রবাসী হলেন সত্যেন 
আর জ্ঞানদা নিজেকে তৈরি করতে লাগলেন আরেকভাবে। সেজোদেওর 
হেমেন্দ্রনাথের কাছে বাড়ির মেয়ে-বউরা তখন বাংলা শিখতে শুরু করেছে। 
সেজোজা নীপময়ী আর ননদ সুকুমারী, স্বর্ণকুমারী, বর্ণকুমারীদের সঙ্গে 
জ্ঞানদাও যোগ দিলেন সেই পাঠশালায়। শাশুড়ি অবশ্য মাঝেমাঝেই রাগ 
করে কথা বন্ধ করে দিতেন “অবাধ্য মেজোবউয়ের সঙ্গে, কখনও শাস্তি 
দিতেন অন্য মেয়েদের তার সঙ্গে মিশতে না দিয়ে। তাই নিয়ে দূর থেকে 
উদ্িগ্র হতেন সত্যেন্দ্র। জানতে পারলে রাগ করতেন দেবেন্দ্রনাথ। হয়তো 
এ-কারণেই দ্বিতীয়বার সত্যেন্দ্রর আবেদনে সম্মতি দিতে দেরি করেননি 
মহষি। সেই সম্মতি বাঙালি মেয়ের জন্য বিশ্বের দরজা খুলে দিয়েছিল। 

এর জেরে শাশুড়ির মনে জমা যত তিক্ততা অবশ্য সামলাতে হল 
জ্ঞানদাকেই। তবু সংস্কারের সীমায় বাধা সারদাকে বুঝতে পারেন বলেই 
শাশুড়ির ওপর রাগ করেন না, ধমক খেতে হবে জেনেও একটু ঝুঁকে তাকে 
প্রণাম করেন জ্ঞানদা। 
জানতে চান, এ আবার কী ছিরির শাড়ি পরা হয়েছে? 

জ্বানদা উত্তর করেন, মা এ হল বোম্বাই দস্তূর শাড়ি-পরা। এভাবে পরলে 
বাইরের লোকের সামনে বেরনো যায়। 

আর গায়ে ওটা কী পরেছ? মেমেদের মতো জ্যাকেট? 

জ্ঞানদার মুখ একটু অপ্রতিভ হয়ে যায়। সত্যেন্দ্র উত্তর দেন, কেন মা 
তোমার ভাল লাগছে না দেখতে? এখন অভিজাত ভদ্র স্ত্রীলোকেরা এভাবেই 
শাড়ি পরে পশ্চিমে । এবার আমাদের মেয়ে-বউরাও পরবে। 


১০ 


সারদা মুখঝামটা দেন, থাক নিজের বউকে সঙ সাজাচ্ছ, আবার আমার 
ভালমানুষ বউ-মেয়েদের নিয়ে টানাটানি করতে হবে না। চিরকাল যেভাবে 
চলে এসেছে তাই চলবে। অন্দরের শুচিতা নষ্ট করতে আমি দেব না। মা 
ছেলের তরজা শুনতে শুনতে মেয়েরা মন দিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে 
মেজোবউয়ের সাজ। মেমেদের মতো ভারী না হলেও জ্যাকেটটি বেশ লেস 
বসানো কায়দাকানুন করা। কোমরে জ্যাকেট যেখানে শেষ আর শাড়ির বাধন 
শুরু সেখানে উকি মারলে পাতলা কাপড়ের সেমিজ দেখা যাচ্ছে। মরচেরং 
রেশমের শাড়ির ওপর কালো-সোনালিতে পারশি কাজ করা পাড় বসানো। 
সামনে এনে আঁচলটি বাঁ কাধের ওপর ব্রোচ দিয়ে আটকানো, পায়ে মোজা 
ও বিলিতি জুতো। কারও কারও বেশ ভালই লাগল। সনাতনপস্থী কেউ কেউ 
মনে মনে সারদার পক্ষ নিলেন। 

সারদা আবার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন, জানি না কী অলুক্ষুনে কাণ্ড 
রাখলি। নিন্দায় কান পাতা যাবে না। যত জ্বালা তো আমাকেই সইতে হবে। 

হঠাৎ উঠোন থেকে দালানে ছুটে এসে জ্ঞানদাকে জড়িয়ে ধরে হইচই করে 
ওঠে এক পসারিণী। ওঃ মেজোবউঠান তুমি আজ যে কাণ্ড করে দেখালে, 
ইতিহাস হয়ে গেল গো। বাঙালি মেয়েরা একশো বছর পরেও তোমায় ধন্য 
ধন্য করবে। 

জ্ঞানদা চমকে উঠে বলেন, ওমা, বই-মালিনী। তুই কখন এলি? 

সারদা রাগে লাল হয়ে হাতপাখা ছুড়ে মারেন বইওলিকে। যাঃ ভাগ, তোর 
আর নাটক করতে হবে না। ও সব আদিখ্যেতা করলে দুর দূর করে তাড়িয়ে 
দেব। ইতিহাস! ওফ্‌ কী আমার ইতিহাসের ব্যাখ্যাতা এলেন রে! যা ভাগ। 

সত্যেন মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলেন, মাগো অত রাগ করছ কেন? 
সত্যিই তো এটা ইতিহাস। বাইরে বেরলে দেখতে মরাঠি মেয়েরা হাবভাব 
চালচলনে বাঙালিনীদের চেয়ে কত এগিয়ে গেছে, তাদের দেখলে তুমিও 
বুঝতে কোমলেকঠিনে গড়া সেই ব্যক্তিত্বই বাঙালি নারীর আদর্শ হওয়া 
উচিত। মায়ের পাশটিতে চুপ করে বসে থাকা শাড়ি জড়ানো এক বালিকার 
ঝুঁটি নেড়ে দিয়ে সত্যেন বলেন, হ্যারে বর্ণ, তুই সত্যি করে বল তো 
মেজোবউঠানের মতো করে সাজতে চাস কি চাস না? 


৯১ 


ছোটবোন বর্ণকুমারী চুপ করে থাকে, তার আশেপাশের বালিকা 
কিশোরীরা উসখুস করেও সারদার ভয়ে কিছু বলতে পারে না। তবে প্রাথমিক 
ধাক্কা কাটিয়ে উঠে তারা একজন দু'জন করে জ্ঞানদার কাছে গিয়ে কথাবার্তা 
শুরু করল। এই মেজোবউঠান অন্যরকম বলে চিরদিনই তাদের আকর্ধণের 
কেন্দ্র, তা ছাড়া তিনি সবাইকে নিয়ে চলতে জানেন। নতুনের প্রতি গোপন 
টান উসকে দিতে জানেন। বই-মালিনী জ্ঞানদার হাত ধরে গোমড়া মুখে চুপ 
করে দাড়িয়ে আছে। 

দু'বছর আগে মেজোবউয়ের বোস্বাইযাত্রা উপলক্ষে সাড়া পড়ে গিয়েছিল 
ঠাকুরবাড়িতে। নানা প্রশ্ন, উদ্বেগ, উৎসাহ। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল কী 
পোশাক পরে যাবেন তিনি! অনেক ভেবেচিস্তে ফরাসি দরজির দোকানে 
অর্ডার দিয়ে তাঁর জন্য করানো হল অত্যাশ্চঘ এক “ওরিয়েন্টাল ড্রেস”। 
সে-ড্রেস অনভ্যস্ত বাঙালিনীর পক্ষে এমনই জটিল যে তিনি নিজে পরতে 
পারেননি, বাড়ির মেয়েরাও যখন সেই অন্ভুত পোশাকে সাহায্য করতে 
পারল না, স্বয়ং সত্যেন হাত লাগালেন। 

তখনই জ্ঞানদার মনে হয়েছিল যে, নারীমুক্তির জন্য সবার আগে দরকার 
বাঙালি নারীর পোশাকের সংস্কারমুক্তি। পশ্চিমি ড্রেসের দ্বারস্থ না হয়ে 
শাড়ি-পরার কেতাদুরস্ত ভঙ্গি খুঁজে বার করার কথা তখন থেকেই তার মাথায় 
থেকেই তিনি পেয়ে গেলেন বাঙালিনির শাড়ির ধারণা। 

ঠাকুরবাড়ির চার দেওয়ালে বন্দি মেয়েদের কাছে এখন তো তিনিই দুনিয়া 
দেখার জানালা। কত কী শেখার আছে, শোনার আছে তাঁর কাছে। একদিকে 
কর্তামার রক্তচক্ষুর ভয় আর অন্যদিকে জ্ঞানদার দুর্নিবার আকর্ষণ। গল্প করতে 
করতে তারা জ্ঞানদাকে তার জন্য প্রস্তুত শোওয়ার ঘরের দিকে নিয়ে যায়। 
বই-মালিনীও তাদের সঙ্গ নিল। জ্ঞানদা নতুন বই দেখবেন। 

সেদিকে তাকিয়ে সারদা বলেন, দেখ সত্যেন, তোর বাবামশায় ধন 
তুই আর স্ত্রীস্বাধীনতার ধুয়ো তুলে আমার মাথা খাস না। 

ঠাকুরবাড়ি আদতে ছিল ঘোর বৈষ্ণব। লক্ষ্মীজনার্দন তাদের গৃহদেবতা। 
বাড়ির বউ-ছেলেরা বংশানুক্রমে পূজাপাবণ পালন করে এসেছেন। 
দিদিশাশুড়ি অলকাসুন্দরী ও শাশুড়ি দিগম্বরীর কাছে নিষ্ঠাভরে পৃজাপাঠের 


৯ 


নিয়মকানুন শিখছিলেন সারদা। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ যখন হিদুয়ানির সব 
পৌত্তলিকতা বর্জন করে ব্রাহ্মধন্মে দীক্ষা নিলেন তখন শুরু হল সারদার 
আত্মিক সংকট। না পারলেন স্বামীর ধর্মকে অস্বীকার করতে, না পারলেন 
হিদুয়ানির সংস্কার বর্জন করতে। অথচ এই টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত হলেন 
সারাজীবন। সত্যেন বুঝতে পারেন, মা. সেই কথাই বলছেন। কিন্তু তিনি যেন 
পণ করেছেন জননীকে সংস্কারমুক্ত করার। 

মা তুমি কেন বুঝতে চাও না, না পালটালে, সভ্যতা এগোয় না। তা সে 
ধর্মেই হোক আর সমাজজীবনে। যে দেশের মেয়েরা ঘরের চার দেওয়ালে 
বন্দি, সে দেশ অন্ধকারে ডুবে থাকে। আর যদি শুধু পোশাক সংস্কারের কথা 
বলো, সে তো বাবামশায় নিজেই বোনেদের পোশাক নিয়ে কত পরীক্ষা 
নিরীক্ষা করেছেন, আজ পেশোয়াজ তো কাল দিশি গাউন। মুসলমান দরজির 
তৈরি সে-সব পোশাক তুমিও তো তোমার মেয়েদের পরিয়েছ। 

সারদা বলেন, সে তো বাধ্য হয়ে, ঢাকা পোশাক না হলে আদুল গায়ে 
বসতে পারবে না। 

ঠিক সেরকম মা, ঢাকা পোশাক না পরলে তোমার মেজোবউ কী করে 
সমাজে মিশবে? আমাদের স্ত্রীলোকেরা যেরকম কাপড় পরে তা না পরার 
মতোই। ওই পোশাকে ভদ্রসমাজে যাওয়া চলে না। আমার চাকরিসূত্রে কত বড় 
বড় লোকদের সঙ্গে মেলামেশা করতে হবে ওকে। সত্যেন উৎসাহে বলেন। 

সারদা মুখ গোমড়া করে বলেন, মেয়েমানুষের এত মেশামেশির দরকার 
কী বাপু বুঝি না। আমরা তো কোনওদিন বাড়ির বাইরে পা ফেলিনি, অনেক 
বলেকয়ে গঙ্গাচানে যাবার অনুমতি পেলে যেতে হয়েছে ঘেরাটোপে ঢাকা 
পালকি চেপে। ছোটবেলায় দু'-চারবার তুই তো আমার সঙ্গে গিয়েছিস। 
দেখেছিস তো, বেহারারা পালকি সুদ্ধু গঙ্গায় চুবিয়ে দিত দু'-চারবার, সেই 
আমার গঙ্গান্নান। আর সেই বাড়ির বউকে তুই কিনা নিয়ে এলি গাড়ি চাপিয়ে, 
তারপর চাকরবাকরের চোখের সামনে দিয়ে বেহায়া বেপরদা বউমানুষ হেঁটে 
হেঁটে বাড়িতে ঢুকল! এই অনাছিষ্টি দেখার জন্য আমি বেঁচে রইলাম কেন? 

ওহ মা, আমাদের বাড়িতে মুসলমানি পরদাপ্রথা থাকারই বা কী দরকার 
বলো তো? আমাদের মেয়েরা আর কতকাল নবাবি কয়েদখানায় বন্দি 
থাকবে? 


১৩ 


সারদা বিরক্ত হন। যা তো এখন, আমাকে আর জ্বালাস না। ঘরে গিয়ে 
হাত মুখ ধুয়ে একটু কিছু মুখে দে। এত পথ পেরিয়ে যাত্রা করে এসে কোথায় 
মায়ের সঙ্গে দুটো ভালমন্দ কথা কইবি তা না, তর্ক জুড়েছিস। যা ঘরে যা। ও 
মানদা, ওদের ঘরে খাবার পাঠানো হয়েছে কি না দেখ তো। 

মানদা দাসী জানায় খাবার যাচ্ছে কর্তামা। সত্যেন ঘরের দিকে পা বাড়ালে 
তাঁর চোগা-চাপকান পরা দীর্ঘ অবয়বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে 
মানদার কাছে সারদা জানতে চান, কী রে, যেভাবে বলেছি তাই পাঠানো 
হল£ 
হ্যা মা, মানদা জানায়, রূপোর রেকাবিতে নারকেলের মিষ্টি, আনন্দনাডু, 
লুচি, বেগুনভাজা সাজিয়ে লেসের ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে 
পাঠানো হয়েছে রপোর গেলাসে বরফ দেওয়া তরমুজের শরবত। 

ঈষৎ চিন্তিত মুখে রুপোর মকরমুখী পানবাটা থেকে পান মুখে দিয়ে 
তাকিয়ায় হেলান দেন সারদা। মানদা দাসী তার পা টিপতে থাকে। 

ওদিকে সত্যেন ঘরে পৌছে দেখেন পালক্কের পাশে কাঠের ছোট জলচৌকির 
ওপর রুপোর রেকাবি ভরা খাবার ও শরবতের বিপুল আয়োজন। ওদিকে 
দল। থাক ওরা, একটু প্রাণ খুলে গল্পগাছা করুক। সত্যেন হাতমুখ ধুয়ে খাবারে 
হাত ঠেকান। তার মনে পড়ে যায় জ্ঞানদাকে এই দালান থেকে বার করতে 
কী বেগ পেতে হয়েছিল তাকে। প্রথম যেবার আই সি এস পরীক্ষা দিতে 
লন্ডন গেলেন, সেখানকার স্বাধীন বিদেশিনিদের দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। 
তার মনে হয় এই তো আদর্শ সমাজ। মেয়েরা যে এত সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে 
বেড়াচ্ছে ঘরে বাইরে তাতে তো কই সংসারের ছন্দে বিন্দুমাত্র ঘা লাগছে না, 
বরং শিক্ষিত রুচিশীল সব কাজে পটু এই বিলিতি মেয়েরা যেন পুরুষের যোগ্য 
সঙ্গিনী হয়ে উঠেছে। আমাদের বাঙালি মেয়েরাই বা কেন এমন হবে না! তখন 
থেকেই তার মাথায় চিন্তা শুরু হল কী করে জ্ঞানদাকে বিলেতে আনা যায়। সে 
যখন এখানে এসে এইসব বিলিতি মেয়েদের স্বাধীনতার আনন্দ নিজের চোখে 
দেখবে তখন সেও নিজেকে পালটাতে চাইবে। 

ইংরেজ মেয়েদের দেখে মুগ্ধ হলেও সত্যেন এক মুহূর্তের জন্যও নিজের 
তেরো বছর বয়সি স্ত্রীকে ভোলেননি। দাদামশায় দ্বারকানাথও লন্ডনে 1গয়ে 
বিলিতি মেয়েদের দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। রানি ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে মিষ্টিমধুর 


১৪ 


মেলামেশায় বা টেমসের বুকে বিলাসনৌকো ভাসিয়ে মেমদের সঙ্গে 
নৌকোবিহারে তিনি জীবনের স্বাদ উপভোগ করেছেন। সে ছিল তার নিজের 
মুক্তি। লেচ্ছ সংসর্গে ধর্ননাশের আশঙ্কায় স্ত্রী দিগম্বরী তাকে প্রায় ত্যাগ 
করেছিলেন। বহু ধনসম্পদ কীর্তি ও মানমধাদা সত্বেও স্ত্রীকে তিনি নিজের 
মতে আনতে পারেননি। রাজকীয় মেজাজের দ্বারকানাথের বেলগাছিয়া 
ভিলার পার্টিতে সুরা ও মাংসের ফোয়ারা আর মেমসাহেবদের কোমর 
জড়িয়ে বল ডান্স নিয়ে সেকালে কেচ্ছা কেলেঙ্কারি ছড়া প্রশস্তির বন্যা বয়ে 
যেত। রূপষাদ পক্ষী মশাই ব্যঙ্গ করে ছড়া বেঁধেছিলেন, 


“কি মজা আছে রে লাল জলে জানেন ঠাকুর কোম্পানি 
মদের গুণাগুণ আমরা কি জানি, জানেন ঠাকুর কোম্পানি।' 


তবু দ্বারকানাথের থেকেও সত্যেনকে মুগ্ধ করেন দিগম্বরী। জগদ্ধাত্রীর 
মতো রূপ ছিল তার কিন্তু সত্যেন জানেন দিদিঠাকুরানির তেজও কম ছিল 
না। তিনি লোকের কথায় আস্থা না রেখে একদিন রাতে পার্টি চলাকালীন 
ঘেরাটোপের পালকি চেপে সদলবলে হানা দেন বেলগাছিয়া ভিলায়। 
সেদিনের এক অভিজাত পরদানশিন মহিলার পক্ষে কাজটা ছিল যথেষ্ট 
বেপরোয়া। অথচ শুরুতে তাদের সম্পর্কটা যথেষ্ট মধুর ছিল। তখন বৈষ্ণব 
দ্বারকানাথ নিজ হাতে বাড়ির লক্ষ্মী জনার্দনের পূজা করতেন আর তার যোগ্য 
সহধন্ত্িণী ছিলেন রাইকিশোরী দিগন্থরী। ধৃপধুনোর আঁচে তাঁর দুধেআলতা 
মুখে যে অপরূপ ভক্তি ও লাবণ্য ফুটে উঠত সেদিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হতেন 
রূপের পৃজারি দ্বারকানাথ। সেসময় তারা এত গোঁড়া ছিলেন যে বাড়িতে 
পেঁয়াজ রসুন মাছ মাংস কিছুই ঢুকত না। ব্যাবসায় অভাবনীয় সাফল্য আসা 
শুরু হতে সাহেবমেমদের সঙ্গে মেলামেশার প্রয়োজন বাড়ল দ্বারকানাথের, 
নবযুগের চিস্তার ছোঁয়ায় আর বাবুয়ানির আকর্ণে সেই গোঁড়া হিন্দুয়ানির 
প্রতি আস্থা ক্রমশ টলে গেল। বামুন পণ্ডিতেরা জানিয়ে দিলেন দ্বারকার নিজে 
হাতে পুজো করা আর চলবে না, সাহেবদের সংস্পর্শে তিনি অশুচি হয়েছেন। 
তারপর দিগম্বরী যা যা করেছেন, সবই ইতিহাস। 

বিলেত যাবার আগে সত্যেন একদিন কিশোরী জ্ঞানদাকে উসকানি 
দেওয়ার.জন্য দিগম্ববীর সেই আশ্চর্য কাণ্ডের কথা বলছিলেন, আমার 
দিদিঠাকরুন কী দস্যি মেয়ে ছিলেন সে তোমরা ভাবতেও পারবে না জ্ঞেনু। 


১৫ 


কিছুদিন ধরেই তার কানে আসছিল দাদামশায় নাকি ইদানীং বেলগাছিয়া 
ভিলায় সাহেবমেমদের সঙ্গে পানাহার করেন, মুসলমান বাবুচির রান্না মাংস 
খান। ঠানদিদি প্রথমে বিশ্বাস করেননি। শুনতে শুনতে উত্যক্ত হয়ে একদিন 
ঠিক করলেন স্বচক্ষে দেখবেন কী হয় সেখানো তখনকার পরদানশিন গৃহবধূর 
পক্ষে কী দুঃসাহসিক কাণ্ড ভাবো! 

ওরে বাবা, আমার তো শুনেই বুক টিবটিব করছে। জ্ঞানদা জানতে চান, 
ঠানদিদি একা একাই গেলেন সেখানে? 

না, সঙ্গে নিলেন আমার মা আর অন্তঃপুরের দু'-একজন মহিলাকে। হলুদ 
পাড় লাল সাটিনের ঘেরাটোপ দেওয়া ঠাকুরবাড়ির তিনটি পালকি গিয়ে 
থামল বেলগাছিয়া ভিলায়। মা তো তখন খুব ছোট। পরে মায়ের কাছে 
শুনেছি সেদিন নাকি ভয়ে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। 

তারপর কী হল? কী দেখলেন সেখানে? 

পালকির ঘেরাটোপ ভেঙে বেরিয়ে যা দেখলেন তা জীবনে দেখেননি 
বেচারি ঠানদিদি। আলোয় আলোয় রাতকে দিন করে ফেলা হয়েছে 
বেলগাছিয়া ভিলায়। ফোয়ারা আর নগ্নিকা নারীমৃতি দিয়ে সাজানো বাগান, 
বিশাল স্তস্ত ও বিরাট দালানের অসাধারণ কারুকাধ ভেদ করে দিদিঠাকরুন 
যখন সদলবলে ঢুকে পড়লেন হলঘরে, সে এক দৃশ্য। কাচের গেলাসের 
চুংঠাং শব্দ, বেলোয়ারি ঝাড়ের ঝলকানি ও মহার্ঘ বিদেশি আসবাবের 
মাঝখানে নৃত্যরত নারীপুরুষেরা হঠাৎ থেমে গেল। ঠানদিদি দেখলেন, সত্যিই 
মুসলমান বাবুচিরা টেবিলে টেবিলে মাছ মাংসের নানা পদ পরিবেশন করছে 
আর সাদা সাহেবগুলো বেহায়া মেমসাহেবদের কোমর জড়িয়ে নাচছে। 
আর স্বয়ং দ্বারকানাথকে দেখে তার চক্ষুস্থির হয়ে গেল। একহাতে মদের 
গেলাস আর অন্য হাত এক গোরি মেমের কোমরে রেখে ইংরেজি গানের 
সঙ্গে সঙ্গে পা মিলিয়ে তিনি নাচছেন। এই অভাবনীয় দৃশ্যের সামনে স্তস্ভিত 
দাড়িয়ে থাকতে থাকতে দিদিঠাকরুনের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। বালুচরী 
ঘোমটার আড়াল থেকেও ঠানদিদির রণচস্তী মেজাজ বোধহয় টের পেলেন 
দাদামশায়, একমুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলেন। তারপর এগিয়ে এসে ক্রুদ্ধ 
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন দিদিঠাকরুন। 

তা হলে ঠানদিদিই এই বাড়ির সবচেয়ে সাহসী স্ত্রীলোক, জ্ঞানদা বলেন, 


৯৬ 


আমি তার মতো হতে চাই। তুমি একচুল বেচাল কিছু করলেই সংসর্গ ত্যাগ 
করব, সাবধান থেকো। 

সত্যেন হেসে বলেন, আমি ভুল করলে সত্যিই কি তুমি তার মতো 
কঠোরহদয়া হতে পারবে? তিনি এরপরেও কী করেছিলেন জানো? 
দাদামশায় যখন নিত্যপূজার অধিকার হারালেন তখন দিদিঠাকুরানির মনে 
প্রশ্ন এল, স্বামী সংসর্গ করলে তিনিও কি ধর্মচ্যুত হবেন না? তখন তিনি 
স্নান করে শুদ্ধ হবেন, কিস্তুরাতে স্বামীসংস্গ করবেন না। 

ওমা সে কী গো? তোমাদের গোঁড়া সংসারে দিদিঠাকুরানি এমন কাজ 
করলেন কী সাহসে? জ্ঞানদা অবাক হন। 

সত্যেন জ্ঞানদার মাথা নিজের বুকে টেনে নিয়ে বলেন, তার যা সাহস 
ছিল সে তোমাদের নেই জ্ঞেনু। তিনি ক্রমশ দাদামশায়ের অন্দরে প্রবেশ বন্ধ 
করে দিলেন, তার জন্য নিদিষ্ট হল বৈঠকখানাঘরের একটি শয্যা। আলাদা 
রান্নার ব্যবস্থা হল তার জন্য। ঠানদিদি আর দাদামশায়ের সংসারের হাড়ি ভিন্ন 
হয়ে গেল। 

বারো বছরের জ্ঞানদা অবাক হয়ে বলেছিলেন, এমা, স্বামীকে আলাদা করে 
দেওয়া কি ভাল? মেয়েমানুষের এমন অধন্মের কাজ করতে বাধল না? 

দেখো জ্ঞেনু, ধর্ম অধন্মের বিচার করা বড় কঠিন, সত্যেন সেদিন 
বলেছিলেন, আমার দিদিঠাকরানি ভোর চারটে থেকে পুজো শুরু করতেন। 
স্বপাক নিরামিষ আহার করতেন। এক বামুন ঠাকুর তার পুজোর ও রান্নার 
উপকরণ গুছিয়ে দিত। একাদশীতে ফলমূল খেয়ে কাটাতেন, উপোসও 
করতেন কোনও কোনও একাদশীতে। তার সাত্বিক জীবনের সঙ্গে দাদামশায়ের 
ভূমিকা মেলাতে পারেননি বলেই স্বামীসহবাসের সুখ থেকে নিজেকে সরিয়ে 
নিয়েছিলেন। স্বামীর চেয়েও তার কাছে বড় ছিল ধর্ম। 

সধবার আবার একাদশী কী? জ্ঞানদা আরও অবাক হয়ে সেদিন বলেছিলেন। 

শুনেছি দিদিঠাকরুন বিশ্বাস করতেন তার উপোসে স্বামীর অমঙ্গলের 
চেয়ে মঙ্গলই বেশি হবে, কারণ স্বামীর কল্যাণের জন্যই তো তার ব্রতপালন। 
সেই অনুরক্ত পত্বী কেন এত কঠোর হয়ে উঠলেন সেটাও তো ভেবে দেখতে 
হবে জ্ঞানদা। 

এ-সব পুরনো কথা ভাবতে ভাবতেই ক্লান্তিতে একটু চোখ বুজে এসেছিল 


১৯৭ 


সত্যেনের। ঘুমের চটকা ভাঙল জ্ঞানদার কোমল করম্পশে। অন্য মেয়েরা 
কখন চলে গেছে। স্নান সেরে মিহি তাতের নীলাম্বরী শাড়ি পরেছেন জ্ঞানদা। 
খোপার বকুলফুলের মালা থেকে আসা গন্ধ সদ্য প্রবাসফেরত সত্যেনকে 
যেন বাংলামাটির পক্ষ নিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে। ঘরের নিভৃতে আর জ্যাকেট 
গায়ে দেননি জ্ঞানদা, কিন্তু আদুল গায়েও তিনি আর থাকতে পারেন না। 
তাতে নিজেকে কেমন গ্রামীণ মনে হয়। পাতলা মলমলের সেমিজের ওপর 
আরও মোহময় করেছে। যাকে তিনি এই প্রাসাদের চৌহদ্দি থেকে বার করে 
বোম্বাই নিয়ে গিয়েছিলেন এ মেয়ে সে মেয়ে নয়। জ্ঞানদার কোমর জড়িয়ে 
ধরে সত্যেন বলেন, মনে পড়ে জ্ঞেনু, বোম্বাইতে আমাদের সেই প্রথম ডিনার 
পার্টিতে তুমি কী করেছিলে? 

আহা, তখন আমি সবে চৌকাঠ পেরোনো চোদ্দো বছরের এক বাঙালি 
বউ, আমি কী করে গোরা সাহেবদের কায়দাকানুন বুঝব? আমি প্রথম 
থেকেই ঠিক করেছিলুম টেবিলে খাবার দাবার সব সাজিয়ে দেব অতিথিদের 
জন্য, কিন্তু আমি টেবিলে বসব না। ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে একসঙ্গে খানাপিনার 
কথা ভাবতেই পারিনি। আর সেই গোরা সাহেবটা যেই আমার হাত তার 
হাতের মধ্যে নিয়ে টেবিলের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইল, আমি ভাবলাম 
এ কী অসভ্য লোক রে বাবা! হাত ছাড়িয়ে দিক্লেম ছুট। 

তারপর সেই বন্ধ দরোজা খোলানোর জন্য আমাকে কম সাধ্যসাধনা করতে 
হয়নি! সত্যেন হা হা করে হেসে ওঠেন, সেদিনের জন্য আমি তোমাকে দোষ 
দিই না, কিন্তু পরে তুমি যে ক্রমশ আদবকায়দা শিখে নিয়ে প্রথম ভারতীয় 
সিভিলিয়ানের যোগ্য স্ত্রী হয়ে উঠেছ সেজন্য আমার গৰ হয়। 

ন্সেদিনের সেই লজ্জাবতী ভীরু বালিকার মধ্যে এখন সত্যেন উদিত সূর্ের 
মতো এক নতুন নারীকে আবিষ্কার করেন। প্রবল আশ্লেষে ষোড়শী পত্রী 
জ্ঞানদাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করেন তিনি। 

আঃ, ছাড়ো না, তুমি কি ছেলেমানুষ হয়ে গেলে? জানলা দরোজা সব 
খোলা, এখনই যে কেউ এসে পড়বে, জ্ঞানদা লজ্জা পান। 

সত্যেন বলেন, কী বলেছিলাম মনে নেই বউ? 

কত কী বলেছ, কোন কথাটা বলছ কী করে বুঝব এখন? জ্ঞানদা কটাক্ষ 
করেন। 


১৮ 


সেই যে বিলেত থেকে চিঠিতে লিখেছিলাম, “তুমি যে পর্ষস্ত বয়স্ক, 
শিক্ষিত ও সকল বিষয়ে উন্নত না হইবে, সে পর্ধস্ত আমরা স্বামী-স্ত্রী সম্বন্ধে 
প্রবেশ করিব না।' 
ছাতে নিরালা জ্যোৎস্সায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে তিনি স্বামীর এইসব 
কথার মানে খুঁজেছেন। বালিকার মনে অজানা ভয়, স্বামী কেন তাকে 
পুরোপুরি গ্রহণ করছেন না! কেন শুধু ওপর ওপর আদর করে দূরে সরে 
যান? কেন লেখেন, “আমরা স্বাধীনতাপূৰক বিবাহ করিতে পারি নাই। 
আমাদের পিতামাতারা বিবাহ দিয়াছিলেন।” তবে কি এখন সেই পরমলগ্ন 
এসেছে? 

জ্ঞানদা নববধূর মতো রাঙা হয়ে ওঠেন। বলেন, সে-কথা এখন কেন£ 

বউ, এখনই তো সময় সে-কথা বলার। সত্যেনের গলা আবেগে কেঁপে 
ওঠে, এই সেই দাম্পত্যের নির্জন ঘর, এই সেই পুরাতন প্রণয়প্রাণী, এই সেই 
স্থগিত ফুলশয্যার পালক্ক। আজ আর তুমি নিছক গৃহবধূ নও। হে স্বাধীনা, 
আজ আমি মিলনপ্রার্থী, আমার আবেদন কি মঞ্জুর করবেন দেবী? 

এই অভাবিত মুহূর্তে কী করবেন ভেবে না পেয়ে জ্ঞানদা সত্যেনের বুকে 
ঢলে পড়ে বলেন, যাও আর নাটক করতে হবে না। 

সত্যেন তীব্র কামনায় তার কোমর জড়িয়ে ধরেন। লঙজ্জানত মুখ তুলে 
ঠোটে প্রগাট চুম্বন করেন: বহু প্রতীক্ষিত সেই মুহূর্তে দুজনের থরোথরো 
শরীর তীব্র আবেগে দলিত মথিত ঘধিত হতে থাকে। গরম বোধ করায় 
সত্যেন গায়ের ফতুয়া খুলে মেঝেতে ছুড়ে দেন। জ্ঞানদার শাড়ি ধুলোয় 
লুটোয়। সত্যেনের অধীর আঙুলগুলি যেন নীড় খুঁজে পায় সেমিজ ঢাকা 
জ্ঞানদার উত্তিন্ন স্তনে। তখন দু'জনের শরীরের মাঝখানে একটি সুতোর 
ব্যবধানও যেন বাহুল্য মনে হয়। 

সত্যেন বলে ওঠেন, বউ তোমার এই সেমিজ বস্তুটি বিবাহিতাদের পক্ষে 
খুব সুবিধের হবে না। এ নিয়ে তোমাকে একটু ভাবনাচিস্তা করতে হবে মনে 
হচ্ছে। 

সত্যেনের দুষ্টবুদ্ধিতে ছন্মরোষে ঘুষি দেখান জ্ঞানদা। সত্যেন তা দেখে 
বলেন, সেকী বউ, স্বাধীন হয়ে প্রথমেই স্বামীপ্রহার করবে নাকি? গোঁড়া 
হিন্দুরা তো সে ভয়েই স্ত্রীলোকদের চারদেয়ালে বন্দি করে রাখে! 


১৯ 


এবার দেখো না কী করি তোমায়, বলে অনেকটা ধাতস্থ জ্ঞানদা হাটুর 
ওপর ভর দিয়ে সত্যেনের দিকে এগিয়ে এসে তার পুরুষালি ঠোটের ওপর 
নিজের কোমল ঠোটজোড়া স্থাপন করেন। 

বুঝলেন স্বামী, এই শুরু হল স্বাধীনা নারীর স্বাধীন অভিসার। দীর্ঘ চুন্ধনের 
পর ঠোট তুলে ঘোষণা করেন জ্ঞানদা। 


২০ 


২ 


সারদাসুন্দরীর সংসার 


ঠাকুরবাড়িতে সদর ও অন্দর সম্পূর্ণ আলাদা। সামনের দিকে লোহার ফটক 
পেরিয়ে পাশাপাশি দুটি বাড়ি। আদতে দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলির এই একটি 
বাড়ির দুটি ভাগ ছিল, বসতবাড়ি আর বৈঠকখানা বাড়ি। কিন্তু কিছুদিন আগে 
দেবেন আর গিরীন দুই ভাইয়ে বাড়ি ভাগাভাগি হয়ে গেছে। এখন দেবেন- 
সারদার সংসার দোতলা বসতবাড়িতে। তার মধ্যেও সদর অন্দরে কড়া 
বিভাজন। বারবাড়িতে কর্তাদের মহল, ছেলেদের মহল, চাকরদের মহল। 
ভেতরমহল গিন্নিদের। সেই উঠোনের একধারে গোলাবাড়ি, সেখানে 
সারাবছরের ধান, ডাল মজুত থাকে। কিন্তু ঘি নুন তেল মশলার ভাণ্ডার 
বারবাড়িতে, সরকারদের হা'তে। তারাই প্রতিদিনের মাপ অনুযায়ী বামুনদের 
হাতে বার করে দেয়। বিশাল রান্নাঘরে দশ-বারোজন বামুনঠাকুর ভোর থেকে 
রান্না চাপায়। রসুইঘরের দু"দিকে পরিষ্কার সাদা কাপড় পেতে পাহাড়প্রমাণ 
ভাত রাখা হয়। সেই পরিমাণ ডাল, তরকারি, মাছের ঝোল রান্না করে পাথরের 
থালাবাটিতে সাজিয়ে লোক গুনে মহলে মহলে দিয়ে আসে বামুনরা। রাত্রে 
অবশ্য লুচি তরকারি খাওয়া হয়। এই ঢালাও রান্নার স্বাদ সবসময় পছন্দ 
হত না দেবেন্দ্রনাথের, তিনি বহুদিন প্রবাসে প্রবাসে কাটিয়ে ঘরে ফেরেন 
প্রিয় মানুষ আর প্রিয় রান্নার টানে। শুধু বামুনের হাতের রান্না খেলে তিনিও 
খাবারের স্বাদ ভুলে যাবেন আর ঘরের বউ-ঝিরাও রান্না ভুলে যাবে। তিনি 
সারদাসুন্দরীকে হুকুম দিলেন বউদের রান্না শেখাও। কত্তামশায় বাড়ি থাকলে 
সারদা তার গোলগাল চেহারা নিয়েও কষ্ট করে রান্নাঘরে গিয়ে বসতেন 
তদারকির জন্য। এবার কন্তার নির্দেশে অন্দরে বউমহলে মহা উৎসাহে শুরু 


২.১ 


হল রান্না নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা। সরকারি রসুইঘরের ঢালাও ডালঝোলের 
সঙ্গে বউদের সযত্তে রীধা ব্যঞ্জনের স্বাদে আকাশপাতাল তফাত। ঠাকুরবাড়ির 
রান্নার বিশিষ্ট ঘরানা গড়ে উঠছিল এইসব বিশেষ যত্বের রান্নাতেই। 

সকালে উঠে সব মেয়ে-বউদের নিয়ম হল চান সেরে পট্টবন্ত্র পরে 
উপাসনাগৃহে জড়ো হওয়া। সমবেত উপাসনার শেষে যে যার ঘরে গিয়ে 
চেলি খুলে রেখে ধোয়া তাতের শাড়ি পরে এসে বসবেন ভীড়ারঘরের 
দাওয়ায়। সেই ভীড়ারঘরের বৈঠকটাই মেয়েমহলের প্রাণের আড্ডা। কত্তামা 
তক্তপোশে বসে নিদেশ দেবেন আর গিন্নিরা বউরা মেয়েরা সব রান্নার জন্য 
তরকারি গুছিয়ে দেবেন। বৈষ্ণব আমল থেকেই “তরকারি কাটা; কথাটা 
নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, কাটা বললে পাছে হিংস্রতা প্রকাশ হয়! তাই বলা 
বড়ি তিলকুটা সন্দেশের ভাড়ার। বউরা তো বটেই, বিবাহিতা ও অবিবাহিতা 
কন্যারাও এই আসরের তৎপর সদস্যা। সৌদামিনী, শরৎকুমারী, বর্ণকুমারীরা 
মায়ের তত্বাবধানে কাজ শেখেন। 

শরৎকুমারীর সবে বিয়ে হয়েছে, স্বামীসহ এখানেই থাকছেন। ইতিমধ্যেই 
রাধুনি হিসেবে তার খুব নাম হয়েছে। তিনি আন্তাদ করে বলেন, মা একটা 
নতুন সুপ রান্না শিখেছি, ডিম দিয়ে মুলিগাতানি সুপ। আজ বাবামশায়ের 
জন্য সেই সুপ করে দেব ভাবছি। 

দেখ বাছা, সারদা বলেন, কত্তাকে এই দু" নিলা 
খুশি করতে পার কিনা। ও সুপ কোথেকে শিখলি ? 

সেই যে সেদিন ও বাড়ির মেজোকাকিমা, রেসিপি লিখে পাঠিয়েছেন, 
উনিই কোথা থেকে শিখে এসেছেন। সত্যি মা, মেজোকাকিরা চলে গিয়ে 
বাড়িট। কেমন খালি খালি লাগে। 

সারদাও বিমধ গলায় বলেন, হ্যা রে ওদেশ্ব কথা ভাবলে কষ্ট হয়। এক 
বাড়িতে হেসে-খেলে একসঙ্গে কাটিয়েছি, ছোটবেলায় শ্বশুরবাড়ি এসে ওই 
তো সঙ্গী ছিল আমার। ধনম্মো ধম্মো করে কী গোল শুরু করলেন কত্তা, 
লক্ষ্মীজনার্দনকে বিদেয় করতে চাইলেন বলেই তো এত গোল বাধল! আর 
এতদিনের অধিষ্ঠিত দেবতাকে উঠিয়ে নিয়ে ওরা ও-বাড়ি চলে গেল। 

আগে যেটা ছিল দ্বারকানাথের সন্তৃতিদের একান্নবত্তী বসতবাড়ি, সেখানেই 
দেওয়াল উঠল। ৫ নং আর ৬ নং বাড়ি আলাদা হয়ে গেল। বাগান ভাগ 


২ 


হল, পুকুরের ঘাট আলাদা হল। দ্বারকানাথের সময় থেকেই ঠাকুরপরিবারে 
ব্রাহ্মধন্নের আনাগোনা শুরু হয়েছিল। রামমোহন বিলেত গেলে দ্বারকানাথের 
অর্থসাহায্যেই ব্রাহ্মসমাজের কাজকর্ম চলছিল। ইতিমধ্যে লন্ডনে বিপুল সমাদর 
পেয়ে দ্বারকানাথ ক্রমশ কলকাতার জীবনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন এবং 
বিলেতে গিয়ে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। দেবেন তখন থেকে ব্রাহ্মসমাজের ভার 
নিলেন। ১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ ভাই গিরীন ও আরও কয়েকজন বন্ধুবান্ধব 
নিয়ে দেবেন্দ্র ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নিলেন। কিন্তু দেবেন যতটা ধম্ম ধর্ম করে মেতে 
উঠলেন শিরীন্দ্রনাথ কোনও দিনই ততটা জড়িয়ে পড়েননি। বাড়ির হিদুয়ানির 
ধারা তখনও পুরোমাত্রায় চালু ছিল। প্রথম ধর্সসংকট বাধল লন্ডন থেকে 
দ্বারকানাথের মৃত্যুসংবাদ এলে। দেবেন ব্রাহ্মমতে বাবামশায়ের শেনসংস্কার 
করলেন, শালগ্রাম শিলা এনে পৌত্তলিকতার চগা করতে তার মন সায় 
দিল না। তাই নিয়ে সমাজে দারুণ শোরগোল শুরু হল, আত্মীয়স্বজন এবং 
হিন্দুসমাজের মাথারা অনেকেই দেবেনবাবুকে সামাজিকভাবে বর্জন করলেন। 
গিরীন্দ্রনাথ অবশ্য ব্রান্ম হয়েও হিন্দ্রশান্ত্রমতে শ্রাদ্ধ না করে পারেননি। অন্দরে 
তার স্ত্রী যোগমায়া কিছুতেই স্বামীকে অধন্ন করতে দেবেন না, তেজস্ষিনী 
পত্বীকে অগ্রাহ্য করার সাহস গিরীন্দ্রর ছিল না। 

কুটনো বানানো তদারকি করতে করতে সারদা একটু মুখ ঝামটা দিয়ে 
বলেন, তবে মেয়েমানুষের যোগমায়ার মতো অত তেজ বাপু ভাল না। 
গৃহদেবতাকে উঠিয়ে দেওয়ার কথা শুনে আমিও তো ভয়ে মরছিলাম, তা 
বলে কি ঘর ভেঙে আলাদা হয়ে যাবি? 

বড়মেয়ে সৌদামিনী জানতে চান, মেজোকাকি তো চলে গেলেন, তুমিও 
মনে মনে বাবামশায়ের মতো বেম্ম হয়ে গেলে নাকি মা? 

সারদা ঈষৎ বিব্রত হন। তোর বোন সুকুমারীর বিয়ে নিয়েই তো কী কাণ্ড! 
কত্তা জেদ ধরে বেম্মো-বিয়েদিলেন। অগ্নিসংস্কার হল না, শালগ্রামসাক্ষী হল 
না। সেই তো শেষে অকালে মরে গেল মেয়েটা! 

সে নিয়ে আমরা সকলেই দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু মা ব্রান্ম-বিয়ের দোষ 
দিচ্ছেন কেন? ব্রাহ্মমন্ত্রে বিয়ে হলেও অগ্নি-নারায়ণ সাক্ষী ছাড়া আর সব 
হিদুপাবণ তো হয়েছিল মা, সেজোবউ নীপময়ী বলে ওঠেন। এদিক ওদিক 
দুই ছিল। সুকু মারা গেল বাচ্চা হতে গিয়ে, অমন তো কত হয়, আপনি মনে 
খুঁতখুত করবেন না মা। 


৩ 


আমার জ্বালা তোরা বুঝবি না সেজোবউ, সারদা বিরক্ত হন। দেখ, আমার 
তো উভয়সংকট। তোদের বাবামশায় কত পড়াশোনা করা মান্যিগন্যি লোক, 
তিনি যা বলছেন তা তো খারাপ হতে পারে না। আবার ছোটবেলায় বিয়ে 
হয়ে এসে ইস্তক পঁয়ত্রিশ বছর বয়স পর্স্ত শাশুড়ি, দিদিশাশুড়ির কাছে যে 
পূজাপাঠ শিখেছি সে শিক্ষেও তো ফেলে দিতে পারি না। কী যে করি! 
আমার হয়েছে যত মরণ। 

ঈষৎ বাঁকা চোখে নীপময়ীকে দেখেন সারদা, আর সেজোবউ, তুই এত 
কথা বলছিস, তোর বিয়েতে যে হাঙ্গামা হয়েছিল তা তো আমি জন্মে দেখিনি। 
বিয়ের রাতে আমার ছেলেকে মারতে গৌড়া হিদুরা লেঠেল পাঠিয়েছিল। 
শেষে পুলিশ ডেকে এনে বে দিতে হল। কন্তা আর বেয়াইমশায় দুজনের 
জেদ ছিল বলেই অত বাধাবিপত্তির মধ্যেই তোদের বে হল। কিংবা আমার 
ঠাকুরপূজার জোরে, সে-কথা বললে কত্তা যতই রাগ করুন! 

প্রিয় বন্ধু হরদেব চট্টোপাধ্যায়ের দুই মেয়ে নীপময়ী আর প্রফুল্লময়ীর সঙ্গে 
হেমেন্দ্র আর বীরেন্দ্র বিয়ে দিয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। কিন্তু কুলীন ব্রান্গণ 
হরদেব যখন ব্বান্মমতে পিরালি বামুনের ঘরে মেয়ের বিয়ে দেবেন ঠিক 
করলেন, জ্ঞাতিরা খেপে লাল। উঠেপড়ে তারা লাগল বিয়ে বন্ধ করতে, 
হলে যে তারাও জাতিচ্যুত হবে। এমনকী তাদের চাপে হরদেবের বড় ছেলে 
পরিবার নিয়ে আলাদা হয়ে গেল। তবু তার সংকল্প ভাঙল না, দেবেনের 
মতো জ্ঞানী, সচ্চরিত্র, সমৃদ্ধ বন্ধুকে কথা দিয়ে আত্মীয়দের অন্যায় আবদারে 
তিনি পিছিয়ে আসতে পারেন না। বড়ছেলে তার পাশে না দীড়ালেও তিনি 
আদরশত্যাগ করবেন না। বিরোধীপক্ষ জোট বেধে বিয়ে আটকানোর ফন্দি 
করতে লাগল। নীপময়ীর জন্য এক বুড়ো কুলীন পাত্রও বেছে রাখল তারা। 
ঠিক হল যে বিয়ের রাতে একশো লেঠেল পাঠিয়ে বর হেমেন্দ্রের মাথায় 
লাঠির বাড়ি মেরে কনে নীপময়ীকে তুলে "মনা হবে, বিয়ে দেওয়া হবে 
ওই বুড়ো বরের সঙ্গেই। জানতে পেরে দেবেন্দ্রনাথ পুলিশে খবর পাঠালেন, 
তাদের পাহারাদারিতে বিয়ে নিবিদ্বে সম্পন্ন হল। 

ব্রাহ্ম বিয়ে হলেও সপ্তপদীতে কোনও বাধা দেননি মহধি। বরণডালা 
সাজিয়ে বরণ করার অনুষ্ঠান ও ব্রন্মোপাসনা সেরে বাসরঘরে ঢুকলেন 
বরবউ। কিন্তু অন্রান্ম নারীপুরুষেরা কেউ বিয়েতে যোগ দেননি। হেমেন্তর 
গান্তীর প্রকৃতির যুবক কিন্তু রূপ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। বেনারসি জোড়ের 
২৪ 


সঙ্গে নানা অলংকার পরে তাঁকে যেন দেবরাজ ইন্দ্রের মতো লাগছিল। 
ছোটবোন প্রফুল্লময়ী অবশ্য দিদির বরকে সাক্ষাৎ শিব ভেবে বসেছিলেন। 
পরে অন্য বালিকারা তাঁকে বোঝাল, শিব তো সর্বত্যাগী, তিনি কেন হিরের 
কণ্ঠি, মুক্তোর মালা, পান্নার আংটি পরবেন? ঠাকুরবাড়ি থেকে আসা এই 
জামাইবাবু আসলে ছদ্মবেশী ইন্দ্র। দিদির রূপে মুগ্ধ হয়ে বিয়ে করতে 
এসেছেন। 
হেমেন আগে থেকেই একটা উপায় ভেবে রেখেছিলেন। ঘরোয়া মেয়েদের 
টুল ঠাট্রাইয়ারকির ওষুধ হিসেবে তিনি স্ত্রীশিক্ষার বিষয়ে আলোচনা শুরু 
করলেন। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা শুধু বাংলাই পড়ে না, অনেকেই সংস্কৃত ও 
ইংরেজি পড়তে পারে শুনে উপস্থিত কমশিক্ষিত ব্রাহ্মিকারাও অবাক। 

হেমেন লজ্জায় জড়সড় কনে নীপময়ীকে বললেন, তোমাকেও শিখতে 
হবে। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত সাহিত্য। 

নীপময়ী সেদিন লজ্জায় উত্তর দেননি। সকলের সামনে নববিবাহিত 
স্বামীর সঙ্গে কথা বলা যায় নাকি! তবে এ স্বামী তার দেখা অন্যান্য বরেদের 
মতো নয়, প্রথম থেকেই আলাদা। বাসরের মেয়েদের অনুরোধে গান গাইতে 
গাইতে হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে নীপময়ীকে হেমেন বললেন, তোমার গলায় যদি 
সুর থাকে, বাবামশায়ের অনুমতি নিয়ে গানও শেখাব। 

এবার সত্যি শিউরে ওঠেন মেয়েরা। পাগল নাকি এ ছেলে? বলে কী, 
ঘরের বউ গান গাইবে? তা হলে বউ আর বাইজিতে তফাত থাকবে কী 
করেঃ 

ক্রমশ কিন্তু হেমেন তার কথা কাজে পরিণত করছেন। নীপময়ী ও 
অন্তঃপুরের অন্য মেয়ে-বউদের নিয়ে জোড়ার্সাকোর অন্দরে তিনি নিজেই 
শুরু করেছেন ঘরোয়া পাঠশালা । সেখানে সৌদামিনী, শরৎকুমারী, 
জ্ঞানদানন্দিনী, স্বর্ণকুমারী, বর্ণকৃমারী সবাই নিয়মিত ছাত্রী। হেমেনের কড়া 
শাসনে তাদের পড়া এগোচ্ছে তরতরিয়ে। 

নীপময়ীকে গান শেখানোর অসম্ভবকেও তিনি সম্ভব করেছেন। বাবামশায় 
প্রথমে ইতস্তত করলেও পরে সম্মতি দিয়েছেন। বহু সমালোচনা উপেক্ষা 
করে বাড়ির গায়ক বিষ চক্রবতীকে নীপময়ীর গানের শিক্ষক নিয়োগ করলেন 
দুর্জয় সত্য্দ্রনাথের দুঃসাহসী ভাই হেমেন্দ্রনাথ। সেই কবে ঘরের মেয়েদের 

২৫ 


গলা থেকে গান কেড়ে নিয়েছিলেন অওরংজেব, এতদিন পরে সেই গানকেই 
যেন নীপময়ীর কণ্ঠে ফিরিয়ে আনলেন হেমেন। 

ঠাকুরবাড়িতে জন্ম এবং বিবাহ অবশ্য লেগেই থাকে। এই সেদিন ধুমধাম 
করে বিয়ে হয়েছে দেবেন্দ্রের প্রিয়কন্যা স্বণকুমারীর। সুদর্শন, সমাজ-সংস্কারক 
জানকীনাথকে কৃষ্ণনগর থেকে খুঁজে এনেছেন দেবেন্দ্র। ঠাকুরদের সঙ্গে কেউ 
ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে চায় না, তাই ভাল”ছেলে দেখলেই কন্যাদের সঙ্গে 
বিয়ে দিয়ে তাদের আপন করতে চান তিনি। এই বিয়ের জন্য জানকীনাথ 
পিতা জয়চন্দ্র ঘোষালের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত ও ত্যাজ্যপুত্র হলেন। কিন্তু 
বাবামশায়ের ক্রোধ উপেক্ষা করেও ঠাকুরবাড়ির আলোর হাতছানিতে সুন্দরী, 
বিদুষী স্ব্ণকুমারীর আকধণে বাঁধা পড়লেন জানকীনাথ। 

স্বণর বিয়ে হল তেরো বছর বয়সে। সে তুলনায় ঠাকুরবাড়ির বউরা সবাই 
অনেক কমবয়সে এসেছে। বিয়ের আগে মাকে জড়িয়ে ধরে স্বণ জানতে 
চেয়েছিলেন সারদার বিয়ের গল্প। 

নিজের বিয়ের প্রায় ভুলে যাওয়া বেত্তান্ত মনে করে সারদা বলেন, আমি 
ছিলাম যশোরের পাড়ার্গায়ের মেয়ে। আমার এক কাকা কলকেতা থেকে 
শুনে গেলেন কত্তার জন্য সুন্দরী মেয়ে খোঁজা হচ্ছে। ব্যস ওঠ ছুঁড়ি তোর 
বিয়ে। 

সে কী গো? তার মানে আমাদের বাড়ির*রউ-মেয়েরা কেউ তোমাকে 
দেখতে যায়নি? স্বণন অবাক হন। ঠাকুরদের চিরদিনের রীতি ছিল প্রথমে 
দাসী পুতুল নিয়ে মেয়ে দেখতে যাবে, পছন্দ হলে সুযোগসুবিধে মতো যাবে 
বাড়ির মেয়েরা। 

শোন, আমার কাকার বোধহয় ভয় ছিল পাত্র হাতছাড়া হয়ে যাবে। 
তিনি বাড়িতে ঢুকেই দেখলেন আমি দাওয়ায় বসে রান্নাবাটি খেলছি। টেনে 
তুলে কোনওরকমে একটা পরিষ্কার কাপড়স্পরিয়ে তৎক্ষণাৎ নিয়ে চললেন 
কলকেতায়। আমার মা তখন নদীতে নাইতে গেছিলেন। আমার মাত্র ছ'বছর 
বয়স। কেঁদেকেটে বললাম, মা আসুক তবে যাব। কাকা কোনও কিছু না 
শুনে আমাকে নিয়ে এলেন। মায়ের সঙ্গে শেষ দেখাটাও হল না। শুনেছি 
মা আমার ফিরে এসে মেয়ের শোকে উঠোনের গাছতলায় গড়াগড়ি দিয়ে 
কাদতে কাদতেই মরে গেলেন। এই তো আমাদের কালের মেয়েদের জীবন। 
তোরা অনেক ভাগ্য করে এই বাটিতে জন্মেছিস মা, অমন দেবতার মতো 


৬ 


বাবামশায় পেয়েছিস, তাই লেখাপড়া শিখলি, বাইরের হাওয়াবাতাস গায়ে 
মাখতে পারলি। 

এখনও সারদা ভাবছিলেন, কত্তা অমন দেবতার মতো মানুষ বলেই ওর 
ধম্ন মানি আবার আমারটাও। মেয়ে-বউরা কি তা বোঝে না! 

বর্নকুমারী বালিকা, বেশি কিছু না বুঝেই সে বলে ওঠে, মা তুমি তো 
সেদিন মেজোকাকির কাছে লক্ষ্মীজনার্দনের জন্য পুজো দিয়ে পাঠালে । আমিই 
তো নিয়ে গেলাম মা, বাবামশায় কি তাতে রাগ করবেন? 

ছোটকন্যার কথায় বিরক্ত হন সারদা, আঃ বন্নো, অত কথায় তোর কী 
কাজ, যা বলব, করবি ব্যস। যা তো এখেন থেকে। 

সত্যিই লক্ষ্মীজনার্দনের চলে যাওয়ার দুঃখ ভুলতে পারেননি সারদাসুন্দরী। 
গোপনে ওবাড়িতে গৃহদেবতার জন্য পুজো পাঠান আবার স্বামীর বেন্মো 
উপাসনাতেও যোগ দেন। কেন, গিরীন তো বেম্মো হয়েছে আবার 
দেবপূজাও করে। তাতে দোষ হয় না? প্রথম প্রথম পুজা তুলে দেওয়ার কথা 
ভাবেননি কন্তা, কেবল দুগ্নাপুজোর সময়ে বাড়ি থাকতেন না, বাইরে ভ্রমণে 
চলে যেতেন। সেই দুঃখে সারদা পুজোর আনন্দে অংশ নিতে পারতেন না, 
সবাই যখন আনন্দে মাতোয়ারা, তিনি ঘরের কোণে বন্দি করে রাখতেন 
নিজেকে। যোগমায়া এসে টানাটানি করত পুজোর দালানে যাওয়ার জন্য। 
একবার কত্তামশায় পশ্চিমে বেড়াতে গেছেন আর তখন শুরু হয়ে গেল 
সেপাই বিদ্রোহ। কোনও চিঠি নেই, খবর নেই, চিন্তায় নাওয়া খাওয়া ছেড়ে 
দিয়েছিলেন সারদা। কত্তা হিমালয়ে বেম্মোচিন্তা করছেন আর আমি এদিকে 
হেদিয়ে মরি। তবু সে একরকম ছিল, পুজো হত, উনি পুজোয় থাকতেন না। 
তাই বলে পুজো উঠিয়ে দিতে হবে£ এমন কথা বললেন বলেই তো গিরীন 
আর যোগমায়া লক্ষমীজনার্দনের মুর্তি নিয়ে আলাদা হলেন। তাই তো আমি 
বেম্মো উপাসনার বেদিতে বসেও নিজের ইষ্টমন্ত্র জপ করি আবার কত্তার 
ধন্মোকথাও শুনি। আকবরের হারেমে বসে যোধাবাই যেমন শিবপুজো 
করতেন। 

এর জন্য স্বামীর প্রতি সারদার প্রেম অবশ্য কমেনি। এখনও কতা বাড়ি 
থাকলে সারদা উদগ্রীব হয়ে থাকেন তার রাতের ডাকের জন্য। ছেলেরা 
ঘুমিয়ে পড়লে সেই ডাক আসে। সারদা গা ধুয়ে উজ্জ্বল রঙের একটি নরম 
তাতের শাড়ি পরেন, কানে গলায় একটু আতর মাখেন। কখনও চুলে একটা 


২৭. 


বেলবুঁড়ির মালা জড়ান, কখনও না হলেও চলে। এটুকুই তার সাজ। বাড়ির 
বউদের মতো এক গা গয়না পরে, খোঁপায় গোরেমালা, আলতা সিঁদুরে 
পরিপাটি সাজ তার দরকার নেই। কত্তাও সাদাসিধে সাজই পছন্দ করেন। সারা 
টানে। প্রথম যেবার দেবেন ঠাকুর বিষয়বৈরাগ্যে গঙ্গাবক্ষে দিন কাটাবেন স্থির 
করলেন, সারদা কেঁদেকেটে তার সঙ্গে যাওয়ার বায়না জুড়লেন। দেবেন্দ্র তার 
জন্য গঙ্গার বুকে পিনিস ভাড়া করলেন, তিন শিশুপুত্রকে নিয়ে কন্তার পিছু 
পিছু সেই পিনিসে গিয়ে উঠলেন অসূর্ধম্পশ্যা সারদা। সেই তার অবারিত 
গঙ্গাদর্শন। সাস্ত্বনা এই যে বেম্মোজ্ঞান কত্তাকে বিবাগী করেনি। বরং বছর 
বছর সারদার কোলজুড়ে সন্তান এসেছে। সবাই বাঁচেনি, সবার দিকে সমান 
নজর দিতেও পারেন না সারদা। কর্তার সেবা করে আর সোহাগ পেয়েই খুশি 
থাকেন স্বামীসোহাগিনী। 

১৮৪০ থেকে পরবর্তী তেইশ বছরে নয় ছেলে ও ছয় মেয়ের জন্ম দিয়েছেন 
সারদা, তাদের মধ্যে বেঁচে আছেন মাত্র দশজন। দ্বিজেন্দ্রর জন্মর দু'বছর পরে 
সত্যেন এল, তার দু'বছর পরে হেমেন, একবছর দশমাসের মাথায় বীরেন, 
আরও দু'বছর পরে কন্যা সৌদামিনী, তারপর জ্যোতিরিন্দ্র। দ্বিতীয় কন্যা 
সুকুমারী মাত্র চোদ্দো বছর বয়সেই মারা যায়। তার পরের ছেলে পৃণোন্দ্ 
জলে ডুবে মারা গেল মাত্র ছ' বছরে। এরপর তিনটি কন্যা শরৎকুমারী, 
স্ব্ণকুমারী ও বর্ণকুমারী। সোমেন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের পরেও জন্মেছিল বুধেন্দ্, 
কিন্তু সেও শৈশবে মারা যায়। এতগুলি ছেলেমেয়ের দেখাশোনার দায়িত্ব 
ছিল দাসী ও চাকরদের হাতে। সেকালের ধনীঘরের নিয়ম ছিল জন্ম 
থেকেই শিশুরা ধাইয়ের স্তন্যদুদ্ধে লালিত হত। প্রত্যেক শিশুর জন্য একটি 
স্তন্যদাত্রী ধাই ও একটি পালিকা দাসী নিযুক্ত হত, জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে 
শিশুদের বিশেষ সম্পর্ক থাকত না। সারদাধ ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই 
হয়ে আসছে। তবে যতদিন যোগমায়া একসঙ্গে ছিলেন, তার সান্লিধ্যই ছিল 
ছোটদের আশ্রয়, তার কাছেই ছিল তাদের যত আবদার আন্রাদ। এখনও 
তাঁরা তাই মেজোকাকির অভাব বোধ করেন। যদিও পরে জন্মানোর জন্য 
বর্ণ, সোম ও রবি মেজোকাকির স্নেহের ভাগ থেকে একেবারেই বঞ্চিত। 
তাঁদের কোনও অভাব বোধ নেই কারণ তাঁরা জানেনই না মাতৃন্সেহের ঘনিষ্ঠ 
রূপ কীরকম। 


২৮ 


ইতিমধ্যে সারদার কুটনোর আসরে এসে উপস্থিত হয়েছেন সদ্যবিবাহিতা 
স্বর্ণকুমারী। ঠাকুরবাড়ির অন্য বিবাহিতা মেয়েদের মতো তিনি পিতৃগৃহে 
থাকেন না। ঠাকুররা একে পিরালি তায় ব্রান্ম। এঘরে বিয়ে হলে বাপের ঘরে 
ত্যাজ্য হতে হয়। মেয়ে-জামাইরা তাই বিয়ের পর এখানেই থাকেন। ছেলের 
বউ এলে তার বাপের বাড়ির লোকদেরও ঠাই দিতে হয়। স্ব্ণর স্বাধীনচেতা 
বর জানকীনাথ ঘোষালকেও তার বাবা ত্যাগ করেছিলেন কিন্তু প্রথম 
থেকেই জানকীর শর্ত ছিল যে তিনি ব্রাহ্ম হবেন না, ঘরজামাইও থাকবেন 
না। দুটি শর্তই সসম্মানে মঞ্জুর করেন দেবেন্দ্রনাথ। কিন্ত স্বর্ণ নিজের আলাদা 
সংসার থেকে প্রায় রোজ জোড়ার্সাকোয় ঘুরে যান। আজ তিনি পরেছেন 
পেস্তা রঙের ক্রেপ শাড়ি, তাতে পারশি এমব্রয়ডারি করা পাড়। গায়ে লেস 
লাগানো জ্যাকেট। স্বণন নিজেও বোম্বাই-ধাচের শাড়ি পরা আয়ত্ত করেছেন। 
এ-ব্যাপারে জ্ঞানদার সহযোদ্ধা তিনি। ব্রোচ লাগানো ছোট আঁচলে ঘোমটা 
টানতে অসুবিধে বলে মাথায় একটি কারুকাজ করা টুপি পরা চালু করেছেন, 
এটা তার নিজস্ব উদ্তাবন। স্বণ এসে একটি জলচৌকিতে বসে গল্প করেন। 
সবাই কৌতুহল নিয়ে তাঁকে দেখতে. থাকে। 

স্বর্ণ এসেছেন শুনে দোতলার ঘর থেকে জ্ঞানদাও নেমে আসেন। ওঁদের 
দুটিতে খুব ভাব। স্বর্ণ তার দিকে প্রীতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, কী গো 
মেজোবউঠান, শুনেছ আমাদের সাজপোশাক নিয়ে কত রগড় লেখা হচ্ছে? 

হ্যা স্বর্ণ, সেদিন নতুনঠাকুরপো বলছিল, কয়েকটি কলেজের ছোকরা 
নাকি বলাবলি করছে ঠাকুরবাড়ির “বউবিবি” আরও কত কী! 

তবু তোদের হাওয়া খেতে যেতে হবে? সারদা বিরক্তি চেপে রাখেন না। 
ঠাকুরবাড়ির এত বদনাম আমার প্রাণে সয় না বাপু। 

কেন মা, পত্রিকায় মেজোবউঠানের দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখে কত ব্রাঙ্গিকা 
শাড়ি-পরা শিখতে আসছেন দেখছ তো! আগে এঁরা গাউন পরে বাইরে 
বেরনোর কথা ভাবছিলেন। কেউ কেউ তো গাউনের ওপর আঁচল জুড়ে 
কিন্তৃত পোশাক তৈরি করে ফেলেছেন। তার চেয়ে বোম্বাই কায়দায় শাড়ি 
পরার দিশি ঢং অনেক ভাল। 

বছর আটেকের একটি বালিকা কোথা থেকে হঠাৎ দৌড়ে এসে সারদাকে 
জড়িয়ে ধরে কাদতে থাকে। মেয়ে-বউরা সব সচকিত হয়, কে এই মেয়েটা? 

সারদা ওর হাত ছাড়িয়ে মুক্ত হতে চেষ্টা করেন, এই, কে রে তুই? 

২৯ 


কোথেকে এসে আমার গায়ে উঠে পড়লি? আমার এ-সব একদম ভাল্লাগে 
না, তোরা জানিস নাঃ সর, সরে যা বলছি। 

মেয়েটি মুখ তুলে বলে, আমাকে ওরা ধরে নিয়ে যেতে আসচে, তুমি 
বাঁচাও কর্তামা। আমি তোমার কাছে থাকব। 

এই মানদা, এটা কে রে? ওপাশের কুটুমদের কারও মেয়ে নিশ্চয়? 
দাসীদের কাছে জানতে চান সারদা। সরিয়ে নিয়ে যা ওকে। 

মানদা টেনে মেয়েটিকে সারদার কাছ থেকে সরিয়ে আনে। ঠাস করে 
থাপ্পড় দিয়ে বকে ওঠে, এই বেহায়া মেয়ে, কে রে তুই? 

বালিকা ফুঁপিয়ে উঠে বলে, আমি তো রূপা, আমি এখেনে এসে রোজ 
বসে থাকি তোমাদের পেছুনে, দেকনি আমাকে? 

বালিকার মুখটি ভারী মিষ্টি, মায়াময়। সারদা জানতে চান, তুই কোথায় 
থাকিস, মা কে রে তোর? 

তুমিই আমার মা। সরিয়ে দিচ্ছ কেন, আমি আর ওখেনে যাব না। ওরা 
আমায় ভালবাসে না কেউ। ূ 

ঘোমটায় জড়সড় একটি বউ ছুটে এসে মেয়েটাকে টানতে যায়। সারদা 
গম্ভীর গলায় বলেন, দাড়াও, কে তুমি? আর মেয়েটাই বা কেগ তোমার 
মেয়ে? 

হাত জোড় করে বউটি জানায়, অপরাধ-নেবেন না কন্তামা, আমরা 
আপনার আশ্রিত, কুটুমদের মহলে থাকি। এটি আমার সোয়ামির আগের 
পক্ষের মা-মরা মেয়ে। এমন দজ্জাল, কোনও কথা শোনে নাকো। মারতে 
মারতে আমার শাখা ভেঙে যায়, ওর শিক্ষে হয় না। 

সারদা হুকুম দেন, খবরদার ওকে মারবে না বলছি। সতীনের মেয়ে বলে 
মেরে হাতের সুখ করছ? আমার এখানে থাকতে হলে এ-সব চলবে না। 
মানদা তুই নজর রাখ তো কুটুম মহলে। শুষ্টির লোক আমাদের খাচ্ছেদাচ্ছে 
আর বাড়ির নিয়ম মানছে না, এ আমি সইব না। আমার ছাতের নীচে কোনও 
মেয়ের গায়ে কেউ হাত তুলনে না। 

রূপা সৎমায়ের হাত ছাড়িয়ে সারদার দিকে ছুটে আসতে চায় আবার। 
দুর থকে দেখে দেখে সে বুঝেছে এই মহিলার দয়া পেলে সে বেঁচে যাবে। 
এখানকার আলো-হাওয়া, হাসি-গল্প আনন্দের জগৎ ছেড়ে সে আর ওই 
কুটম মহলে অন্ধকার, কলহ, ঝগড়াঝাটির মধ্যে ফিরে যেতে চায় না। 


৩০ 


তবু যেতে হয়। যাওয়ার আগে তার করুণ দৃষ্টি দেখে একটু মায়া হয় 
সারদার। তিনি বলেন, তুই রোজ সকালে এখানে এসে আমাকে প্রণাম করে 
যাস রূপা। এই একটি কথায় বালিকার জীবন যেন বদলে যায়। সে বোঝে, 
আর তাকে মার খেতে হবে না। 

আসর সেদিন ক্রমশই জমে উঠছিল। ইতিমধ্যে বই-মালিনী এসে হাজির 
হতে সোনায় সোহাগা। ধনী ঘরের মেয়েদের বই বিক্রি করে বেড়ায় সে। 
অন্দরে বাইরে অবাধ গতি। সে এলেই ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা যেন নেচে ওঠে, 
মতো। শুধু বই নয়, মেয়েরা মালিনীকে ঘিরে ধরে কারণ তার কাছে রাজ্যের 
গল্পের ঝাপি। বাবুবিবিদের কেচ্ছা থেকে বামাবোধিনীর নতুন কিস্যা। 

তাকে দেখে জ্ঞানদা এগিয়ে এসে হাত ধরেন, এসো এসো, কতদিন 
পরে আমাদের কথা মনে পড়ল বই-মালিনী। গল্পগাছা করতেও তো আসতে 
পারো মাঝে মাঝে। 

আমার কি আর গল্প করার ফুরসত আছে বউঠান, এ-বাড়ি থেকে সে-বাড়ি, 
বটতলা থেকে বইপাড়া, একাল থেকে ব্রিকাল ছুটে বেড়াই। আগামীদিনে যে 
বই লেখা হবে তাও আমি শুনিয়ে দিতে পারি, তবে সে গুহ্যকথা, সবাইকে 
জানানো যায় না। মালিনী কৌতুক করে। 

জ্ঞানদা হেসে উঠে বলেন, তুমি বেশ কথা বলো বই-মালিনী, কেমন 
রহস্যের গন্ধ! যেন আমাদের জগৎ থেকে বহুদুরের কোন জাদুলোকে তোমার 
বাস। কথা বললে মনে হয় আমিও সেই জাদুর জগতে ঢুকে পড়েছি। তোমার 
বইয়ের চেয়েও তোমার কথা শোনার লোভে ডেকে পাঠাই। 

যাবে নাকি একদিন আমার জাদুলোকে মেজোবউঠান? চাও তো তোমাকে 
বেড়াতে নিয়ে যেতে পারি। মালিনী হেসে হেসে বলে, তুমি তো যে-সে 
লোক নও, তোমার কথা এখন শহরের লোকের মুখে মুখে ফিরছে, যেখানে 
যাই লোকে তোমার কথা শুধোয়। তুমি সেই গবনর হাউসের পার্টিতে গিয়ে 
সন্কলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছ। অনেকে নাকি তোমাকে দেখে বিশ্বেস করতে 
পারেনি, ভেবেছিল ভোপালের বেগম। বড়ঘরের এদেশি মেয়েদের মধ্যে 
তিনি একাই তো এতদিন বাইরে বেরোতেন। 

সারদা রাগ করে বলেন, তুই আর ধুনো দিস না মালিনী । সেখেনে একদল 
গোরা সাহেবমেমের মধ্যে মেজোবউমাকে দেখে লজ্জায় ছ্যা ছ্যা করে 


৩১ 


আমাদের জ্ঞাতির লোকেরা পালিয়ে এসেছেন সেদিন। প্রসন্ন ঠাকুর কত্তার 
কাছে কত রাগ করেছেন। 

সে যাই বল মা, স্বণ বলেন, মেজোবউঠানকে দেখে সেদিন এমন গব 
হচ্ছিল, আমি তো নিজে হাতে সাজিয়ে দিয়েছিলাম। মাথায় সিঁথি পরালাম, 
গয়না পরালাম। আশমানি বেনারসি শাড়িতে, অলংকারে, খজু ভঙ্গিতে 
তাকে ঠিক রাজরানি মনে হচ্ছিল। মেজদা যেতে পারলেন না বলে এক 
মেমসাহেবের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন। সে কী মহাব্যাপার, শত শত ইংরেজ 
মহিলার মধ্যে একজন বঙ্গরমণী। মেজদাদা কত গর্ব করছিলেন সেজন্য। 

বই-মালিনী একটি পত্রিকা খুলে ধরে, এই দেখো, সোমপ্রকাশের পৌষ 
সংখ্যায় কী লিখেছে পড়ে শোনাই, “গত বৃহস্পতিবার গবর্ণর জেনেরলের 
বাটীতে রাত্রিকালে যে মজলিস হয়, তাহাতে বাবু সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী 
আমাদিগের জাতীয় বস্ত্র পরিধান করিয়া উপস্থিত ছিলেন। ইতিপূবের্ব কোন 
হিন্দু রমণী রাজ প্রতিনিধির বাটীতে গমন করেন নাই।' 

সে যদি গেলেই বাছা, স্বামীর সঙ্গে গেলেই কি ভাল হত না! সারদা বলে 
ওঠেন। জ্ঞানদা মনে মনে ভাবেন সংস্কার তা হলে ভাঙছে; এই সেদিন গাড়ি 
চেপে বাড়ি আসার জন্য যে কত্তামায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল সেই 
তিনিই এখন মৃদু আপত্তি জানাচ্ছেন স্বামী সঙ্গে না থাকায়, যেন যাওয়াটা 
তিনি বাধ্য হয়ে মেনে নিলেন। জ্ঞানদা জান্নে বাঙালি মেয়েদের মন থেকে 
এইভাবে এক এক করে অনেক অন্ধকার কাটাতে হবে। এই তো সবে শুরু! 

ইতিমধ্যে মালিনীর ঝাপি থেকে অনেক বই বেরিয়ে পড়েছে। জ্ঞানদা একটা 
একটা করে উলটে পালটে দেখতে থাকেন। বটতলার একগাদা নতুন বই, 
উপন্যাস, কাব্য, আষাঢে গল্প এনেছে। মানভঞ্জন, রতিবিলাপ, কোকিলদৃত, 
বন্ত্রহরণের সঙ্গেই আছে গীতগোবিন্দ, আরব্য রজনী, পারস্যোপন্যাস, লায়লা 
মজনু, বাসবদত্তা। 

একটি বই হাতে নিয়ে ত্বরণ অবাক হন, ওমা এ যে রবিনসন ক্রুশো। 
মালিনী তুমি বিলিতি বইয়ের বঙ্গানুবাদ এনেছ, কী মজা! আবার সচিত্র বই, 
ছবিগুলো কিন্তু ভালই এঁকেছে। 

কই দেখি দেখি, বালিকা বর্ণ এসে টানাটানি করে ছবি দেখতে চান। 
লাইব্রেরি করে ফেলেছেন, সেখান থেকেই ছোট মেয়েদের গল্প উপন্যাস 
৩২ 


পড়া শুরু হয়। বাড়ির বালকেরা এই রসভাগ্ারের খোঁজ পায় দেরিতে কারণ 
শিশুবয়সে বাইরের চাকরদের মহলেই তাদের থাকার নিয়ম। বিশেষ কোনও 
মাসিমা মামিমা বউঠানদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে না পারলে অন্দরে ঢোকা 
যায় না। নিয়মমতো বিয়ের পর ছেলে-বউয়ের জন্য একটি ঘর নির্দিষ্ট হলে 
তবেই ভেতরমহলে ছেলেরা ঢুকতে পারে। বিয়ের পর থেকে সত্যেন এই 
লাইব্রেরির নিয়মিত পাঠক। সত্য আর রবি কোনও ছুতোয় ভেতরে ঢুকতে 
পারলেই মেয়েদের পাঠাগারের বই নাড়াচাড়া করেন। যে-সব বই তাঁদের 
পড়তে বারণ করা হয় সেগুলো লুকিয়ে পড়ার জন্য নানারকম উপায় খোঁজেন। 
সারদা নিজে পড়েন কম, প্রায়ই ছেলেদের ডেকে রামায়ণ বা চাণক্যশ্লোক 
সঙ্গে পরিচয়। 

ছ"'বছরের রবি ক'দিন আগেই বইয়ের লোভে এক দুঃসাহসিক কাণ্ড 
ঘটাল। দুর সম্পর্কের এক মাসিমা দীনবন্ধু মিত্রের “জামাইবারিক' পড়ছিলেন, 
রবি সে-বই পড়তে চাইলে বয়স হয়নি বলে তাকে নিষেধ করা হল, চাবি 
দেওয়া আলমারিতে বই তুলে রেখে চাবি আঁচলে বেঁধে পিঠে ফেললেন 
মাসিমা। বালক রবি সেই চাবি চুরি করতে গিয়ে ধরাও পড়লেন। মাসিমা 
কোলের ওপর চাবি রেখে মেয়েদের সঙ্গে গোল হয়ে বসে তাস খেলতে 
লাগলেন। এবার কী হবে, বইটা তো পড়তেই হবে রবিকে! কিন্তু কী উপায়ে? 
বাধ্য হয়েই বালককে কুটিল কৌশল নিতে হল। 

মাসিমার হাতের কাছে পানদোক্তার পাত্র এনে রাখলেন রবি। পানের 
নেশায় অন্যমনস্ক মাসিমা ঝুঁকে পিক ফেলতেই কোল থেকে চাবিটি মাটিতে 
পড়ল, মাসিমা চাবি মেঝে থেকে কুড়িয়ে অভ্যাসমতো আবার আঁচলে বেঁধে 
পিঠে ফেললেন। এবার আর রবির চাবি চুরি করতে কোনও অসুবিধে হল 
না। চাবি নিয়ে আলমারি খুলে বই বার করে পড়া হল এবং চোর ধরা পড়ল 
না। পরে রবি নিজে ধরা দিতে সবাই টেঁচামেচি শুরু করল কিন্তু শাস্তি কিছু 
হল না। 
বলেন, ওরে শুধু তোরাই দেখবি, না আমাকে কিছু পড়ে শোনাবি? স্বন্নো 
এদিকে আয়, আমাকে চাণক্যশ্লোকের ক'পাতা পড়ে শোনা দেখি। 

মালিনী বলে, চাণক্যশ্লশোক তো রোজ শোন কত্তামা, আজ তোমাকে নতুন 


৩৩ 


একটা কাহিনি শোনাব। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত সীতার বনবাস। শুনলে 
তোমার চোখে জল আসবে গো মা। কিংবা যদি চাও বামাবোধিনীতে একটা 
মজার লেখা বেরিয়েছে, সেটা শোনাই... 

স্বর্ণ বিরক্ত হয়ে বলেন, আবার তুই সেই বামাবোধিনীর গা জ্বালানো 
লেখাগুলো এনেছিস! বলেছি না ও-সব স্ত্রীর প্রতি স্বামীর উপদেশমার্কা 
লেখা আনবি না, হাজার বছর ধরে ও-সব শুনে শুনে কান পচে গেছে। যেন 
মনে হয় মেয়েদের শিক্ষা দেবার একমাত্র উদ্দেশ্য সুমাতা, সুভার্ষা, সুগৃহিণী 
তৈরি করা। ও-সব আর শুনতে চাই না। 

স্ব্নদিদি, তোমাদের নতুন মেয়েদের নতুন যুগের ধরন ধারণ দেখে 
যাঁদের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে তারাই ও-সব লেখাচ্ছেন। তারা ভয় পাচ্ছেন 
লেখাপড়া শিখে একে মেয়েরা মাথায় উঠেছে, এখন বাইরে বেরতে শুরু 
করলে তাদের আর দাবিয়ে রাখা যাবে না। মেয়েরা আর ঘরের কাজ করবে 
না, ছেলে মানুষ করবে না, পতিভক্তি উঠে যাবে, শাশুড়ি সেবা পাবেন 
না। দেখো না, বঙ্কিমবাবু কেমন দেবী চৌধুরানীকে প্রথমে শক্তিরূপা করে 
এঁকেও আবার স্বামীর পদতলে নামিয়ে দিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছেন, 
পশ্চিমের মেয়েরা প্রধানত পত্রী, এদেশের মেয়েরা মূলত মা।” লিখেছেন, 
“মায়েদের কর্তব্য স্বাস্থ্যবান, সিন দেশপ্রেমিক, আধজনোচিত 
সুসন্তান গঠন।, : 

ঞটলযি নবি ননিগ্রর না যা 
কাজে সারা দিনরাত বাধা পড়ে থাকে তো তারা শিল্পসাহিত্য করবে কী 
করেঃ দেশের কাজে যোগ দেবে কীভাবে? 

মালিনী বলে, অস্তঃপুর, ভারতমহিলা সব পত্রপত্রিকার দেখো মেয়েদের 
কর্তব্য নিয়ে যেন চিন্তায় ঘুম হচ্ছে না। প্রগতিশীল বাবুমশায়রা বিবিদের 
শিক্ষিত করতে চান, কিন্তু গেরস্থালির 'নিগড় থেকে মুক্তি দিতে নারাজ। 
আর রক্ষণশীলেরা স্ত্রীশিক্ষার নামেই কেঁপে উঠছেন। প্যারীটাদ মিত্র প্রমুখ 
স্ব্ণদিদি, তা হলে অন্দরমহলে এত অন্ধকার কেন? 

আচ্ছা মালিনী, তুই তো এত জানিস, সারদা জানতে চান, বল তো বিলিতি 
মেমরা কি খুব সুখী আর স্বাধীন £ 

ওরা আমাদের মেয়েদের চেয়ে হাজার গুণ স্বাধীন কত্তামা, কিন্তু ওদেরও 


৩৪ 


অনেক দুঃখ আছে, পরাধীনতা আছে। মালিনী জানায়, মারি উলস্টোনক্রাফট 
নামে এক বিবির লেখা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে খুব হইচই হচ্ছে, তিনি 
লিখেছেন, স্ত্রী স্বামীকে ভালবাসবে সহযোগীর মতো কিন্তু তার শাসনদণ্ডের 
কাছে মাথা নোয়াবে না। এ-সব লেখার জন্য তার বর ছেড়ে গেছে। সমাজ 
টিটকিরি দিয়েছে, কিন্তু তিনি লড়াই ঢালিয়ে গেছেন। এখন তাঁর মতামতের 
কিছু শিষ্যা তৈরি হয়েছে। ভাবো কত্তামা, আমরা ওদেশের মেয়েদের স্বাধীন 
ভাবছি আর ওরা সেই স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। তা হলে আমরা কোথায় 
আছি? 

উফ, তুই কী যে বলিস অদ্ধেক আমার মাথায় ঢোকে না মালিনী। বিলেতে 
বসে কোন মেমসাহেব কী লিখছে, কী বলছে আর তুই জেনে ফেললি ! 

মালিনী হাসে, কত্তামা, আমি বলেছি না জাদু জানি। কী শুনতে চাও বলো 
না। সময় আমাকে বাধতে পারে না। আমার বয়স বাড়ে না। কালিদাসের 
কথা জানতে চাও, আমিই হয়তো ছিলাম তার মালঞ্চের মালিনী। হয়তো 
ভবিষ্যতে তোমার ছোট ছেলে রবি কী লিখবে তাও আমার চোখের সামনে 
ফুটে উঠবে। বলো, শুনতে চাও? বিলিতি মেমদের গুহ্যকথা চাও না দু'শো 
বছর পরের কলিকাতা £ বিক্রম বেতাল না বামাবোধিনী £ 

জ্ঞানদা এতক্ষণ শুনছিলেন, এবার বললেন, ঠাট্টা ছাড় মালিনী, ঠিক 
করে বল তো বামাবোধিনীর মতো পত্রিকাগুলি কি তা হলে বিবিসাহেবের 
কথামতো শুধু দাসত্বের পাঠক্রমই শেখাচ্ছেঃ? আবার মেয়েরা সব গৃহকাজ 
তুলে দিলে কাজটা করবেই বা কে? ইংরেজ মেয়েরা কিন্তু খুব নিপুণ ভাবে 
সংসার করে। সেটাও কি শিক্ষণীয় নয়? 

ঘরের কাজ নিয়মিত অভ্যেসে নিপুণ করে তোলাটাকেও একটা আর্ট বলে 
মানেন জ্ঞানদা। সংসারের সবদিকে তার পরিপাটি নজর। রুচিশীল পোশাক 
যেমন পরতে হবে, ভারতীয় সংস্কৃতির ভাল দিকটাও রাখতে হবে। আবার 
তার সঙ্গে মেশাতে হবে ইংরেজ কেতার ভাল অংশটিকে। তিনি নিজেকে 
যেমন ফিটফাট রাখেন, নিজের ঘরকেও। 

স্বণকুমারী কিন্তু জ্ঞানদার মতো গুছিয়ে ঘরের কাজ করা পছন্দ করেন না, 
করার আছে। তিনি প্রতিবাদ করেন, কেন মেজোবউঠান, মেয়ে হয়ে জন্মালেই 
কেন ও-সব করতে হবেঃ মিসেস স্মিথের কাছ থেকে মারি উলস্টোনক্রাফটের 


৩৫ 


ওই বইটা আনিয়ে নিয়ে পড়েছিলাম, “এ ভিন্ডিকেশন অফ দি রাইটস অফ 
উইমেন'। ওঃ, সে কী তেজস্বিনী লেখিকা, কী আগুনঝরা কথাবার্তা! আমিও 
শুনেছি, এজন্য তাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, বিলেতে কেউ তার 
কথাবাত্তা ভালভাবে নেয়নি, সভা বয়কট করেছে, স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে 
গেছে, তবু তিনি দমেননি। 

জ্ঞানদা বললেন, বোম্বাই থাকতে আমিও মারির কথা শুনেছি। সাধারণ 
ইংরেজ মহিলারা তার নাম শুনলে ভয় পান আর পুরুষরা রেগে ওঠেন। 
ঠাকুরঝি, আমরা বোধহয় তীর চেয়ে ভাগ্যবতী, আমাদের দু'জনের স্বামীরা 
আমাদের সঙ্গে আছেন, এবং তারাই স্ত্রী স্বাধীনতার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। 
মারিকে কিন্ত বিলেতে বসেও ঘরে বাইরে যুদ্ধ করতে হয়েছে। ঘরের কাজে 
মন না দিয়ে লেখালেখির চর্চা করে তিনি সে দেশে কোণঠাসা হয়েছেন আর 
এ দেশে বামাবোধিনী শিক্ষিত মেয়েদের ঘরের কাজে অবহেলা করতে না 
বলে কী এমন অপরাধ করছে? 

মালিনী বলে ওঠে, আমাদের এখানেও দুয়েকজন মুখ খুলছেন স্বণদিদি, 
এই তো দু-তিন বছর আগে “সোমপ্রকাশে” বেরিয়েছিল স্ত্রীলোকের 
পরাধীনতা বিষয়ে বামাসুন্দরীর চিঠি। মেয়েরা কী করবে সেটা মেয়েরাই ঠিক 
করুক না! 

ঠিকই তো, দাসী চাকরদের দিয়ে যে-কাজ "করানো যায় তার জন্য শিক্ষিত 
পত্বীর কেন দরকার? না করলেই কেন সাড়ে সবনাশ হবে ? আমি কী করব সেটা 
বামাবোধিনীর জ্ঞান শুনে ঠিক করতে হবে? স্বণকুমারী রাগত স্বরে বললেন। 

একটু হেসে মালিনী বলে, এই বিতর্ক বেশ জমে উঠেছে। কিন্তু স্বণদিদি, 
বামাবোধিনীর এ-লেখা সে-লেখা নয়। আধুনিকা আর পুরাতনীর বিরোধ 
নিয়েই একটা মজার কথোপকথন, শোনোই না__ 


সরম। ও সুশীলার কথোপকথন 


সরমা। ভাই, আজিকালি মেয়েমানুষে লজ্জা সরমের মাথা খেয়েছে। শ্বশুর, 
ভাসুর, শাশুড়ী ননদ দেখিয়া একটু ভয়সমীহ করে না। আর অধিক কি বলিব, 
স্বামীর সঙ্গে নিলজ্জ হয়ে কথাবার্তা কয়। 


৩৬ 


সুশীলা। সরমা মেয়েমানুষেরা কি গারোদে বাধা চোর? দেখ দেখি, 
ঈশ্বরের এতবড় জগতে সকল জীবজস্ত ইচ্ছায় ভ্রমণ করিয়া মনের সুখ লাভ 
করিতেছে। কিন্তু ইহাদিগকে চারি পাঁচিলে ঘেরা অন্তঃপুরের মধ্যে রুদ্ধ 
থাকিতে হয়। পাখীরা যে পিঁজরাতে বদ্ধ থাকে, তার মধ্যে তাহাদের একটু 
স্বাধীনতা আছে, চারি পাঁচিলের মধ্যেও নারীগণ একটু স্বাধীনতা না পাইলে 
তাদের বাঁচিয়া থাকা কেবল যন্ত্রণা মাত্র। আর আমি বলি কেবল ঘোমটা দিয়া 
জুজু হইয়া থাকিলেই যে মেয়েমানুষ খুব ভাল হইল তাহা নয়। যাহার রীত 
চরিত্র ভাল, তাকেই ভাল বলি। 

স। তোমরা কালের মত মেয়ে। তোমাদের ভাব গতিক আলাদা। কোন্‌ 
কালে মেয়েরা বেহায়া হলে ভাল রীত চরিত্র আবার দেখাতে পেরেছে? 
কোন্কালে আবার মেয়েরা লজ্জা খেয়ে গুরুলোকের সঙ্গে স্পষ্টাম্পষ্টি কথা 
কয়ে বেড়ায়েছে? 

সু। যথার্থ লজ্জা, নম্রতা, বিনয়, সুশীলতা তাহা স্ত্রীলোকের অলঙ্কার 
সন্দেহ নাই। কিন্তু যদি মনে সেরূপ ভাল ভাব না থাকে, বাহিরের লজ্জা 
কি কোন কাজের হয়? কত মেয়ে খুব লজ্জা দেখাত, কিন্তু দুঃখের কথা কি 
ফৌটা কাটিয়া যারা বাহিরে ধার্মিক দেখায়, তাদের মধ্যেই ভণ্ড বেশী। যাহা 
হউক তুমি জেন, এখন স্ত্রীলোকদের মধ্যে যেরূপ ভগু লজ্জা দেখা যায়, 
পৃর্বকালে এ রূপ ছিল না। সীতার ন্যায় সতী কে? কিন্তু তিনি রামচন্দ্র 
বনে গেলে কাহার কথা না শুনিয়া পতির অনুসরণ করিলেন এজন্য ত কেহ 
তাহাকে বেহায়া বলিল না। সাবিত্রী, দময়ন্তী প্রভৃতি যত বিখ্যাত রমণীর কথা 
শুনা যায়, কেহ ত পরিবারের মধ্যে ঘোমটা দিয়া বসিয়া ছিলেন না, অথচ 
তাহাদের ন্যায় পতিভক্তিপরায়ণা ও গুণবতী রমণী কোথায় দেখা যায়? বেদ 
পুরাণ ও আর আর প্রাচীন শাস্ত্র যত পাঠ করা যায়, ততই দেখা যায় শাশুড়ী 
ননদ স্বামী কি শ্বশুর ভাসুরের সঙ্গে কোন স্ত্রীলোক কথাবার্তা কহা পাপ 
বিবেচনা করিতেন না। আজি কালি মেয়েদের ভাল গুণ থাকুক না থাকুক 
তাহারা বাহিরে লজ্জা দেখাইয়া বাহাদুরী করিতে চান!! 

স। আমরা রামায়ণ মহাভারতের এ সব কথা শুনেছি বটে, কিন্তু তুমি 
বল দেখি সে কালের ব্যাভার কি একালে খাটে £ আর এরকম না কল্লেই বা 
ক্ষতি কি? 


৩৭ 


সু। এই তুমি বলিতেছিলে কোন্‌ কালে মেয়েরা এরূপ ছিল, কথা উল্টাইয়া 
লইলে। ভাল, পুর্বকালে এখনকার মত ভগ্ু লজ্জা দেখাইবার প্রথা ছিল না 
তাহা ত বুঝিয়াছ। সেকালের ভাল প্রথা একালে ঘটিবে না কেন তাহাত বুঝিতে 
পারি না। বর্তমান প্রথায় কি ক্ষতি, বলিতেছি। জগদীশ্বর সুখ দেছেন কেননা 
মনের ভাব প্রকাশ করিবার জন্য। মেয়ে মানুষেরা কথা কহিতে পায় না বলিয়া 
ত তাহাদের মন চুপ করিয়া থাকেনা। মনের কথা কাহার সঙ্গে প্রকাশ করিতে না 
পাইলে তার চেয়ে দুঃখ কি আছে? কত সময় তাহাদের 'পীড়া ও অনেকপ্রকার 
কষ্ট উপস্থিত হয়, প্রথমে প্রকাশ করিতে না পারিয়া শেষে বিপরীত ঘটিয়া 
উঠে। বাঘা শাশুড়ী ননদের ঘরে নববধূদিগের যে দুরবস্থা, তাহা কে বর্ণনা 
করিতে পারে? এই কারণে অনেকের অপঘাত মৃত্যু ও অপথে পদার্পণও হইয়া 
থাকে। আর মনে কর হিন্দুর ঘরের ৮/১০ বৎসরের একটা শিশু বাপ মা ভাই 
ভগিনী সকল পরিত্যাগ করিয়া শ্বশুরগৃহে আসিল। সেখানে সে যদি আপনার 
লোক না পায়, তাহাকে সর্ধদা কুঠিত হইয়া মুখবন্ধ করিয়া থাকিতে হয়, 
কাহার মুখপানে চাহিয়া স্নেহ পাইবার আশা না থাকে সে কিরূপে জীবনধারণ 
করিতে পারে? অনেক গৃহে নববধূদের যে কষ্ট তাহা তাহারাই জানে আর সেই 
মাতা ভাই ভগিনী তাহারাও পিতামাতা ভাই ভগিনী। তবে তাহাদের নিকট এত 
লজ্জা কেন? লঙ্জী পর বা পাপ বোধ করাইবার চিহ্ু। গৃহ, পিতা মাতা, ভাই 
ভগিনী আপনার সামগ্রী সকল যাহা দ্বারা পর বোধ হয়, এমন লজ্জার ন্যায় 
শত্র আর কে আছে? আর পিতা মাতা ভাই ভগিনী আত্মীয়গণের নিকট সরল 
ভাবে মনের কথা প্রকাশ করিলে তাহাতে যে পাপ আরোপ করে তাহার ন্যায় 
কু আচার বা জগতে কি আছে? 

লজ্জা থাকাতে যাহার প্রতি যে কর্তব্য তাহা প্রতিপালন করিবার অনেক 
ব্যাঘাত হয়। স্ত্রীলোকেরা যদিও হীনবল, কিন্তু তথাপি তাহারা অশেষ প্রকারে 
পরিবারের সাহায্য করেন ও করিতে পারেন। কিন্তু অনেক সময় কুৎসিত 
লজ্জা আসিয়া আপনার মত অতি আত্মীয় জনের বিপদ পীড়া ও দুর্ঘটনার 
সময় সাহায্য করিতে দেয় না। কত সময় বধূ বা ভাত্রবধৃদের সম্মুখে শ্বশুর 
বা ভাসুর যদি প্রাণত্যাগ করেন, তথাপি তাহার হস্ত প্রসারণ করিবার ক্ষমতা 
নাই, একটী সাস্ত্নার কথা বলিবার উপায় নাই। একি সামান্য দুঃখের কথা! 
এসকল শাস্ত্র ছাড়া-_যুক্তি ছাড়া। 


৩৮ 


স। লজ্জা দ্বারা অনেক ক্ষতি হয় তাহার সন্দেহ কি? কিন্তু তুমি যে বলিলে 
ইহা শাস্ত্র ছাড়া, যুক্তি ছাড়া তবে সকলে ইহা ধরিয়া চলেন কেন? 

সু। এতদিন স্ত্রীলোক লেখাপড়া শিখত না কেন? হিন্দুরা জাহাজে চড়িয়া 
বিদেশ যাইত না কেন? বিধবা বিবাহ মন্দ ও সহমরণ ভাল বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল 
কেন? দেশাচার ও কুসংস্কারে কিনা করে? তবে যে প্রথাটী হয় তাহার একটা 
না একটা কারণ থাকে। স্ত্রীলোকের নন্তরতা থাকা উচিত ইহা বেশী করিতে 
গিয়া এবং পুরুষেরা একটু আপনাদের কর্তৃত্ব বাড়াইতে গিয়া স্ত্রীলোকদিগকে 
জুজু করিয়া ফেলিয়াছেন। এ প্রথা কোন দেশে নাই এদেশেও থাকিবে না। 

স। আচ্ছা, বাড়ীর আর আর লোকের সঙ্গে কথা কহুক, কিন্তু বল দেখি 
বৌ হইয়া স্বামীর সঙ্গে স্পষ্টা্পষ্টি কথাবার্তাটা কি ভাল দেখায় £ 

সু। পতিই স্ত্রীলোকের গতি, পতিই সুহদ্‌ বন্ধু সকলই। পতির ন্যায় আত্মীয় 
কে হইতে পারে? পুর্বকালে সতীরা পতির জন্য কি না করিয়াছেন? কিন্তু 
কি আশ্চধ্য একেলে সংস্কার! এমন পরম আত্মীয় পতির সহিত কথা কহাও 
দুষ্য। পতি ও পত্বীর মধ্যে যে ধর্ম সম্বন্ধ আছে তাহা না দেখিয়া লোকে 
কুৎসিত ভাব গ্রহণ করে এবং তাহারাও পরস্পরকে দেখিয়া লজ্জিত হন 
ইহা অপেক্ষা আমাদের সমাজের জঘন্যতার পরিচয় আর কি আছে? আমি 
তোমাকে পুর্বকালের যে সকল সতী রমণীর কথা বলিয়াছি, তাহাদের দৃষ্টান্ত 
দেখিয়া সকলেরই চলা উচিত। স্বামীর সঙ্গে এক হৃদয় হওয়াই সতীর লক্ষণ, 
স্বামীর সুখে সুখ, দুঃখে দুঃখ বোধ করা, ছায়ার ন্যায় সকল কাধে, তাহার 
অনুবর্তিনী হওয়া এবং সখীর ন্যায় তাহার হিতকন্ম করা, শাস্ত্রমতে এই ত 
সতীর প্রধান ধর্ম। যদি স্বামী ও পত্বীর মধ্যে লজ্জা আসিয়া পরস্পরকে পর 
করিয়া দেয় এবং পাপের ভার সধ্থার করে তাহা হইলে প্রকৃত দাম্পত্য ধর্ম 
কোন রূপেই রক্ষা পাইতে পারে না। আজি তোমাকে এই অবধি বলিলাম, 
পরে আর আর কথা বলিব, আমার ইচ্ছা স্ত্রীলোকেরা এরূপ জঘন্য লজ্জা 
পরিত্যাগ করিয়া গৃহে স্বাধীনভাবে আত্মীয়গণের প্রতি যথা কর্তব্য সাধন 
করুন্‌। ইহা কি তোমার ইচ্ছা নয়? 

স। তুমি যে কথাগুলি বলিলে তাহা অকাট্য এবং তাহার মত যতদিন 
আমরা চলিতে না পারি ততদিন আমাদের ভগ্ডামী এবং সকল বিষয়েই কষ্ট 
তাহাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। নম্রতা, বিনয়, সুশীলতা এই সকলই প্রকৃত 
লজ্জা যে তুমি বলিলে তাহা সত্য এবং তাহা কেবল সাত হাত ঘোমটা দিলেও 


৩৯ 


হয় না, মুখে গো দিয়া থাকিলেও হয় না। ভাল কাধ্য দ্বারাই ভাল গুণ প্রকাশ 
পায়। 


বামাবোধিনী পৰ মিটতে বেলা দুপুর গড়িয়ে গেল। ইতিমধ্যে মেয়েরা 
অনেকেই উঠে গেছেন। এই কচকচি সবার ভাল লাগে না। দাওয়ার নীচে 
দাসীরা রাশিকৃত মাছ নিয়ে কুটতে বসেছিল, তাদের কাজও প্রায় শেষ। 
এবার রসুইঘরে বামুনঠাকুরেরা রান্না চাপাবে। তার আগে সবাই নারকেলের 
নাড়ু, দইচিড়ে কলা বাতাসার ফলার দিয়ে জলখাবার খাওয়া শুরু করলেন। 

কর্তাদের ও ছেলেদের মহলে মহলে পাথরের থালা-বাটিতে জলখাবার 
পাঠানো হয়ে গেছে। কোনও বাচ্চা খাওয়া নিয়ে গোল করলে দাসীরা 
চড়থাপ্নড় দিয়ে খাওয়ায়, ও নিয়ে বাড়ির গিন্নিদের খুব একটা মাথাব্যথা 
নেই। প্রতিটি ছেলেমেয়ে অন্নপ্রাশনে উপহার পায় একসেট জয়পুরি সাদা 
পাথরের থালা, বাটি, গেলাস। আর দুধের জন্য একটা রুপোর বাটি। দাসীরা 
সেই বাসনে রান্নাঘর থেকে খাবার এনে বালক বালিকাদের খাওয়ায়। দুধের 
ঘর আলাদা। সাদা থালা-বাটি ভাঙলে ক্রমে ক্রমে আসে মুঙ্গেরের কালো 
পাথরের বাসন। কাসা-পেতলের বাসনে খায় সরকার, বামুন, ঝি, চাকর। 
তখনও কাচের বাসন চালু হয়নি। 

মালিনী সবার সঙ্গে পাথরের বাটিতে ফলার খেয়ে প্রচুর বই বিক্রি করে 
বিদায় নেওয়ার আগে ঠিক হল সে পরের হপ্তায় স্বর্ণকুমারীর বাড়িতে 
যাবে। বলাই বাহুল্য জোড়ার্সাকোর মেয়েরাও সেদিন স্বর্ণর পালঙ্কে আসর 
জমাবেন। তার সিমলের বাড়ির শোবার ঘরের বিরাট পালক্কে প্রায় দুপুরেই 
তাসখেলা, গল্পগুজব, আবৃত্তি, কবিতাপাঠের সঙ্গে চলে মুড়ি-ফুলুরি-বেগুনির 
ঢালাও সরবরাহ। তার সঙ্গে বই-মালিনীর সঙ্গ যোগ হলে তো ষোলো আনার 
ওপর আঠারো আনা। একটি আসর শেষ হতে হতেই পরবর্তী আড্ডার 
সম্ভাবনায় চনমনে হয়ে ওঠে মেয়েরা। 

মেয়েমহলের প্রাণসঞ্জীবনী এই আড্ডার ছোট ছোট সুখ-দুঃখের কোনও 
খবরকেই মহাজ্জানী কর্তামশাইরা অবশ্য গুরুত্ব দেন না। তীদের অজান্তে ও 
অবহেলায় ঘরের কোণে কোণে মেয়েমহলে বিতর্কের আলো জ্বালিয়ে আসে 
বই-মালিনী। 


8০ 


৩ 


কাদন্বরীর প্রবেশ 


সম্মুখে আয়না ধরি 

গবেশ করিতে বন্দী, পাতিছেন নানা ফন্দী 
পান খেয়ে ঠোট লাল করি। 
মরি মরি মরি ॥ 


জ্যোতির উৎসাহে জোড়ার্সীকোয় দ্বু'বাড়ির ছেলেরা মেতে উঠেছে স্টেজ 
বেঁধে “নবনাটক” অভিনয় করতে। মেয়েদের রোলে পুরুষেরাই অভিনেতা। 
চন্দ্রলেখার নারীভূমিকায় পুরুষ অমৃতলালের অভিনয় দেখে মজা করে ছড়া 
বেঁধেছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। বলাই বাহুল্য তা নিয়ে নাটকের কলাকুশলীরাই হেসে 
অস্থির। বহুবিবাহপ্রথার দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে লোকশিক্ষায় এই নাটকটি লিখেছেন 
রামনারায়ণ তর্করত্ব। ও-বাড়ির গণেন্দ্র ও এ-বাড়ির জ্যোতিরিন্দ্রর উদ্যোগে 
অংশ নিতে দেওয়ার সাহস পাননি জ্যোতিরা। অভিজাত বাড়ির আঙিনায় 
পরিবারের ছেলেরা নাটক করছে-_ এটাই যথেষ্ট দুঃসাহসের কাজ। এখনও 
ইতরশ্রেণির যাত্রার সঙ্গে থিয়েটারকে গুলিয়ে ফেলা হয় বাঙালি সমাজে। 

বাবামশাই ব্যাপারটা কীভাবে নেবেন, কে জানে। 
দেবেন্দ্রনাথ অবশ্য খবর পেয়ে খুশি হয়ে ভাইপো গণেনকে চিঠিতে 
বাদ্য দ্বারা অনেকের হৃদয় নৃত্য করিয়াছে-- কবিত্ব রসের আস্বাদনে 
অনেকে পরিতৃপ্তি লাভ করিয়াছে। নির্দোষ আমোদ আমাদের দেশের যে 
৪১ 


একটি অভাব, তাহা এই প্রকারে ক্রমে ক্রমে দূরীভূত হইবে।... কিন্তু আমি 
ন্েহপুব্বক তোমাকে সাবধান করিতেছি যে, এ প্রকার আমোদ যেন দোষে 
পরিণত না হয়।' 

জ্যোতিরিন্দ্র শিল্পসাহিত্যে খুব উৎসাহী, কিছুদিন আর্ট স্কুলে আঁকা 
শিখেছেন। কবিতা ও নাটক লেখেন। সুপুরুষ জ্যোতি এই নাটকে সুন্দরী 
দেখে লোকে হেসে লুটিয়ে পড়ে। 

বাড়ির এক জামাই নীলকমল নট সেজেছেন, আর এক জামাই শরৎকুমারীর 
বর যদুনাথ সেজেছেন চিত্ততোষ। এই যদুনাথকে নিয়ে দেবেন ঠাকুর খুব 
ভূগছেন। প্রায়ই তিনি ইয়ারবন্ধুদের বাড়িতে জুটিয়ে এনে মাতলামি করেন। 
যা কাজের ভার দেওয়া হয় তা কিছুই করেন না, কিন্ত তিনি রসিক এবং 
নাটুকে ব্যক্তি। তার হালকা স্বভাবের জন্য স্ত্রী শরৎকুমারী প্রথম দিকে স্বামী 
নামক ব্যক্তিটির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। নাম ধরে “যদু* “যদ বলে ডেকে 
ফেলে মাঝেমাঝেই সারদাদেবীর কাছে ধমক খেতে হয়েছে তাকে। 

গবেশ নামক চরিত্রের দুই স্ত্রী, বড় গিন্নির রোলে সৌদামিনীর বর 
সারদাপ্রসাদ আর ছোটগিন্ি সাজলেন সরকারমশায়ের ছেলে অমৃতলাল। 
নারীচরিত্রে এঁদের দেখে দর্শকেরা যে কতদূর আমোদিত হচ্ছিলেন 'দ্বজেনের 
কৌতুক ছড়াটি তারই প্রমাণ। . 

কিছুদিন পরেই যে এই অমৃতলালের বোন কাদম্বরী কম্নচারী পরিবার 
থেকে জ্যোতির গৃহলক্ষ্মী হয়ে আসবেন সে-কথা তখনও ভাবা হয়নি। 
জ্যোতির বিয়ের কথা তখন ওঠেওনি। তিনি ব্যস্ত ছিলেন গান, কবিতা, 
নাটকচা নিয়েই। সত্যেন ও জ্ঞানদাও তাকে উৎসাহ দেন এ ব্যাপারে। 

একদিন জোড়ার্সাকোর দালানে হইহই করে মুড়ি তেলেভাজা সহযোগে 
নাটকের মহড়া চলছে, এমন সময় হস্তদস্ত হয়ে একটি কাগজ হাতে জ্যোতি 
এসে উপস্থিত হলেন, দেখো দেখো, “সোমপ্রকাশ” আমাদের নাটকের 
অভিনয় দর্শন করিতে গিয়াছিলাম। এখানে নাটক অভিনয়ের যে প্রণালী 
দর্শন করিলাম, তাহা যদি সব্ধন্র প্রচলিত হয়, আমাদিগের বিশুদ্ধ আমোদ 
ভোগের একটি উৎকৃষ্ট উপায় হইয়া উঠে। নাট্য শালা প্রকৃত রীতিতে নির্মিত 
ও দ্রষ্টবার্থগুলি সুন্দর বিশেষতঃ সুধ্যান্ত ও সন্ধ্যার সময় অতিমনোহর 


৪২ 


হইয়াছিল। অধিকতর আহ্রাদের বিষয় এ সমুদায়গুলি এতদ্দেশীয় শিল্পজাত। 
দর্শকদের উপবেশন প্রণালী অদ্যাপিও উৎকৃষ্ট হয় নাই... এককালে দ্বার 
উদৃঘাটিত হওয়াতে যাবতীয় দর্শক প্রবেশ করিয়া সকলেই সমুখের আসন 
গ্রহণ করিবার চেষ্টা করেন, তাহাতে গোলযোগ, গাত্রঘর্ণ ও আসনভঙ্গ 
নাস্ত্রীলোক না হিজড়ে রূপ ধারণ করে।... কোন কোন অংশে কিছু কিছু ক্রি 
থাকুক সাকল্যে বিবেচনা করিলে গ্রন্থ ও অভিনয় উভয়ই উত্তম হইয়াছে।' 

সোমপ্রকাশ অতি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। অনুকূল রিভিউ পেয়ে সকলেই 
আনন্দে মেতে ওঠেন। ন্যাশনাল পেপারেও ভাল রিভিউ বেরিয়েছে। সমর্থন 
পেয়ে উৎসাহিত কলাকুশলীরা জোড়ার্সাকো রঙ্গমঞ্চে ঘন ঘন প্রায় ন”বার 
নবনাটক মঞ্চস্থ করলেন। 

ফান্ুনমাস নাগাদ সত্যেন তার কর্মস্থল আমেদাবাদে ফিরে যাওয়ার সময় 
জ্যোতিকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন। জ্যোতি না থাকায় কলাকুশলীদের উৎসাহ 
কমে গেল, নবনাটকও বন্ধ হয়ে গেল। 

জ্যোতি এই প্রথম ঠাকুরবাড়ির অভিজাত বনেদিয়ানার বাইরে বেরিয়ে 
জ্ঞানদার গৃহস্থালির মাঝখানে বিশ্বপৃথিবীর আর একটি সংসার খুঁজে পেলেন। 
সত্যেন কাজে বেরিয়ে গেলে দু'জনের অখণ্ড অবসর, দু'জনেই অসীম আগ্রহে 
নতুন নতুন বই পড়েন, গান শোনেন। শেকসপিয়রের নাটক পড়ে উত্তেজিত 
আলোচনা করেন। সিমবেলাইন নাটকটি জ্যোতিকে এত নাড়া দিল যে তিনি 
শুরু করে দিলেন বাংলা তর্জমা। কিছুটা এগিয়ে জ্যোতির মনে হল মাছি মারা 
কেরানির মতো অনুবাদ না করে তিনি এর বঙ্গীকরণ করবেন। জ্ঞানদাকে 
পড়ে শোনাতে শোনাতে জ্যোতি বললেন, নাটকটির নাম কী দেওয়া যায় 
মেজোবউঠান£ 
নামেই নাম দাও না। নায়িকার বাবার নামে এখানে নাটক জমবে না। 

জ্যোতি ভাবতে থাকেন, সুশীলা নামটি মন্দ নয়, কিন্তু আরও ভাল কী নাম 
বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে পসথুমাস নামে এক নিচুশ্রেণির ছেলেকে বিয়ে করে। 
বাবার পছন্দের পাত্র ক্লোটন নানাভাবে ওদের জুটি ভেঙে ইমোজেনের মন 
জয় করার চেষ্টা করে। অনেক যড়যন্ত্র, বিচ্ছেদ, সংকটের মধ্য দিয়ে শেষে 


৪৩ 


ইমোজেন ও পসথুমাসের মিলন হয়, সিমবেলাইন তার ভূল বুঝতে পারেন। 
কিন্তু শেকসপিয়র তার নাটকের নাম ইমোজেন না রেখে সিমবেলাইন কেন 
রাখলেন? 

তাই বলে তুমিও কি নায়িকার বাবার নামে নাম দেবে। বরং নায়কের 
নামে হোক, জ্ঞানদয বলে ওঠেন। তোমার তো সহজে কোনও কিছু পছন্দ হয় 
না নতুন ঠাকুরপো। 

আচ্ছা মেজোবউঠান, “সুশীলা-বীরসিংহ নাটক” নামটা কীরকম হবে? 
জ্যোতি জিজ্ঞেস করেন। 

হ্যা, এবার বেশ বীরত্ব আর লালিত্যের মিলমিশ হয়েছে, এটাই ভাল 
নাম। নাটকের জন্য লোকের আগ্রহ বাড়বে। 

আমেদাবাদে থাকতে থাকতেই তরতর করে নাটক এগিয়ে চলে। মার্চ 
মাস নাগাদ বই হয়েও বেরিয়ে যায়। “সুশীলা-বীরসিংহ' নাটকের পরতে 
পরতে মেজোবউঠানের ছোঁয়া অনুভব করেন জ্যোতি, তার উৎসাহ তরুণ 
নাট্যকারটিকে শস্যশ্যামলা করে তোলে। অবশ্য সত্যেন এই দুই স্বপ্নাতুর 
নাট্যমোদীকে প্রশ্রয় না দিলে কিছুই এগোত না। আমেদাবাদে সরকারি 
অনেক কিছুর সঙ্গে জ্যোতির নাটকের বই প্রকাশ করার সমস্ত ব,ণস্থা করার 
দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় নিয়েছিলেন। এক অর্থে ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে প্রগতিশীল 
পুরুষ সত্যেন্দ্রনাথ স্ত্রীর শিক্ষা ও স্বাধীনতার 'বিষয়ে যেমন, ভাইদের প্রতিভা 
বিকাশের ক্ষেত্রেও তিনিই ছিলেন অগ্রণী। 

আমেদাবাদে এসে জ্যোতির বিকাশে যাতে বাধা না পড়ে সে-ব্যাপারেও 
সত্যেন সতর্ক। তার মনে হল জ্যোতির মনে আনন্দ আনার জন্য সেতার 
শেখানো যেতে পারে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। আবার কিছুদিন জ্যোতি ও 
জ্ঞানদার জন্য মাস্টার রেখে ফরাসি শেখানোর বন্দোবস্ত হল। আমেদাবাদে 
থাকতে দু'-একটি পারসি ও মরাঠি পরিবারের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছেন 
ওরা। বোশ্বাইতে সত্যেনের পুরনো বন্ধু আত্মারাম পাগুরঙ্ের বাড়িতে দল 
বেঁধে যাওয়া হল একবার। 

পাণ্ডরঙ্ের মেয়ে আন্না তড়খড়ের জন্মদিন উপলক্ষে সেদিন তীদের 
বাড়িতে বিরাট পার্টি। জ্যোতিকে সেই পার্টিতে ছেড়ে দিয়ে মজা দেখছিলেন 
জ্ঞানদা। সাহেবমেমরা তো আছেনই, তার সঙ্গে আছেন কিছু অভিজাত 
88 


ভারতীয় পরিবার। পারসি ও মরাঠি সে-সব মেয়েরা কী ঝকঝকে, সপ্রতিভ! 
বাঙালি নারীসুলভ লজ্জায় জড়সড় নয় একেবারেই। যার জন্মদিন সেই আন্নার 
রূপে ও স্মার্টনেসে সবাই মুগ্ধ। চটপটে চৌখস মেধাবিনী মেয়েটি বয়সে 
বালিকা কিন্তু হাবভাবে সাজসজ্জায় যেন রাইকিশোরী। আশেপাশে অনেক 
প্রীতিপ্রাথ্থী কিশোর ঘুরঘুর করলেও নবাগত জ্যোতিকেই তাঁর পছন্দ হল। 

আন্না এগিয়ে এসে জ্যোতির দিকে হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে হাত বাড়িতে 
দিলেন। তুমি মি. ঠাকুর জুনিয়র? আমার নাম আন্না। 

জ্যোতি হাত মেলালেও আন্নার সহজ হাবভাবে একটু অবাক হন। তার সপ্রতিভ 
আচরণে মুগ্ধ হলেও মনে মনে বাঙালি মেয়েদের সঙ্গে তুলনা করতে থাকেন। 
জ্যোতির তরুণ হৃদয় যেন লাজুক বাঙালি কন্যাদের দিকেই ঝুঁকে আছে। 
তুমি কী পানীয় নিয়েছ? 

আন্না কটাক্ষ করে বলেন, কেন, রেড ওয়াইন। তুমি চেনো না? তোমার 
হাত খালি কেন, চলো একটা ডঙ্ক নাও। 

ঠাকুরবংশে সবরকম নেশাই চলে কিন্তু দেবেন ঠাকুরের ছেলেরা শুদ্ধ 
জীবনযাপনে বিশ্বাসী, মদে নয় তারা কাব্যপাঠের নেশায় মাতাল। জ্যোতির 
দ্বিধা দূর থেকে লক্ষ করে এগিয়ে আসেন জ্ঞানদা, জ্যোতির হাত ধরে বলেন, 
সত্যি তো পার্টিতে এসে ড্রিষ্ক নিচ্ছ না কেন নতুন, আন্না তো ঠিকই বলছে, 
চলো। তাকে টেনে সেলারের দিকে নিয়ে যান জ্ঞানদা। 

আন্নাও সঙ্গে সঙ্গে আসেন। স্কচ নেবে, না ওয়াইন? জিজ্ঞেস করেন 
জ্যোতিকে। জ্ঞানদার দিকে প্রশ্নাকুল চোখে তাকান জ্যোতিরিন্দ্র, তুমি বলো 
মেজোবউঠান কী নেব? 

স্কচ, জ্ঞানদা বলেন। 

আন্না তাকে বাধা দিয়ে বলেন, মি. ঠাকুর জুনিয়র, তুমি প্রথমবার খাচ্ছ 
তো রেড ওয়াইন টেস্ট করো। আমার মতো। 

এই সময় ডরিঙ্ক নিতে এলেন মি. জন ম্যাকশ্রেগর, সত্যেনের বন্ধু। জ্ঞানদার 
দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বলেন, ওঃ লুক! হাউ বিউটিফুল ইউ আর 
লুকিং টুনাইট! 

লজ্জায় লাল হয়ে জ্ঞানদা বলেন, মি. ম্যাকগ্রেগর, প্লিজ ডোন্ট মেক মি 
এমব্যারাসড। দেয়ার আর সো মেনি বিউটিজ আযারাউল্ড। 


৪৫ 


মিসেস টেগোর, টুমি সবার থেকে সুন্দর। টোমার ড্রেস সুন্দর, টোমার 
বডি-সুন্দর, টোমার কথা সুন্দর। ইউ আর দি এপিটোম অফ ইন্ডিয়ান বিউটি! 
চলো ডান্স করি। টুমি আমার পার্টনার হবে প্লিইইইইজ। ম্যাক কাতর অনুনয় 
করেন জ্ঞানদার হাত ধরে। 

জ্যোতি প্রথমে অবাক হচ্ছিলেন পরে তার রাগ হতে থাকে। ঠাকুরবাড়ির 
বউয়ের হাত ধরে একজন উটকো সাহেব কেন টানাটানি করবে? মেজদাদা 
দূর থেকে দেখলেও যেন দেখছেন না। হাসছেন, যেন খুব মজার কিছু ঘটছে। 
তিনি জোর করে জ্ঞানদার হাতে ধরা ম্যাকের হাত ছাড়িয়ে দেন। রাগতম্বরে 
বলেন, ডোন্ট ড্টিসটাৰ হার, লিভ হার আযালোন। 

হাউ ডেয়ার ইউ? ম্যার জ্যোতিকে চেনেন না, তেড়ে যান তার দিকে। 
জ্ঞানদার দিকে তাকিয়ে বলেন, লুক লেডি, ইফ ইউ ডোন্ট লাইক মি প্লিজ 
টেল মি ডিরেক্টলি, বাট কনট্রোল ইয়োর বডিগার্ড। 

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সত্যেন এগিয়ে আসেন, 
জ্যোতিকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ম্যাক, হোয়াই আর ইউ সো টেনস ? মাই ইয়াং 
ব্রাদার ইজ আ বিট পজেসিভ আবাউট হিজ বৌঠান। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। 

উত্তেজিত জ্যোতিকে টেনে সরিয়ে এনে সত্যেন বললেন, ম্যাক যদি 
জ্ঞানদার সঙ্গে ডান্স করতে চায় তাতে কী মহাভারত অশুদ্ধ হল? নারীপুরুষ 
একসঙ্গে নাচা তো বিলিতি কালচারের পার্ট, জ্ঞানদা এখনও সহজ হতে 
পারছে না কিন্তু হয়ে যাবে। তোকেও শিখতে হবে। এজন্যই তো এ-সব 
পার্টিতে আসা। তুই কেন কুয়োর ব্যাঙের মতো আচরণ করছিস? 

জ্যোতি ক্ষুব্ধ মনে অন্যদিকে সরে যান। বিলিতি কালচারের সবকিছুই 
আমাদের নকল করতে হবে কেন£ মেজোবউঠানের ইচ্ছে না হলেও ওই 
সাহেবটার সঙ্গে নাচতে বাধ্য করবেন মেজদাদা? 

গৃহস্বামী পাগুরং ম্যাকগ্রেগরের সঙ্গে ধঙ্গতামাশা করে হালকা করে দিতে 
চান ব্যাপারটা । হলঘরের কোনায় রাখা সোফায় আন্না, জ্ঞানদা ও ম্যাকগ্রেগরকে 
নিয়ে আড্ডা দিতে বসেন। শ্রীমতী পাগ্ডুরং অচিরেই তাদের দলে যোগ দিলেন। 
আজ তিনি কী সুন্দর পাথর বসানো কাশ্মীরি সিক্ম পরেছেন, গলায় সাতনরি 
মুক্তোর হার। প্রতিবারের মতো এদিনও তাকে দেখে চমৎকৃত হন জ্ঞানদা। রুচি 
ও সম্পদের কী আশ্চ মিলন। 

প্রথমবার বোম্বাই এসে এঁদের আতিথ্যেই ছিলেন জ্ঞানদা। এই মরাঠি পরিবারের 


৪৬ 


এখানেই তার আধুনিকতার পাঠশালা। পাগুরঙের স্ত্রী শিক্ষিত কেতাদুরস্ত মহিলা, 
সাহেবমেম নারীপুরুষ সবার সঙ্গেই মেলামেশায় স্বচ্ছন্দ। ওঁদের তিন মেয়ে আমা 
দুর্গা ও মানিক, ইংরেজি কেতায় বড় হচ্ছে। বোম্বাই অঞ্চলে সমাজ সংস্কারের 
ব্যাপারে এই পরিবার খুবই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। শ্রীমতী পাণুরঙের বাড়িতে 
দুঃসাহসী সমাজ সংস্কারক পণ্ডিতা রমাবাইয়েরও নিয়মিত যাতায়াত। 

এঁদের সানিধ্যে জ্ঞানদা সবসময়েই উজ্জীবিত হন। কিন্তু এখন ওঁদের সঙ্গে 
কথাবাতার মধ্যেও তার দুর্ভাবনা হচ্ছে। জ্যোতিটা বোকা, কেন যে এত মাথা 
গরম করে ফেলল! সত্যেন পরে নিশ্চয় জ্ঞানদাকেই বকবেন। 

এভাবেই ঠাকুরবাড়ির বৃহৎ সংসারের বাইরে শিল্প সংস্কৃতি আত্মীয়তার 
একটি অন্তরঙ্গ ত্রিকোণ রচিত হচ্ছে সতেরো বছরের জ্ঞানদা, আঠারোর 
জ্যোতিরিন্দর আর তাদের অভিভাবক সত্যেনের মধ্যে। আমেদাবাদে 
আরও কিছুদিন ইংরেজি সাহিত্য চর্চার পর জ্ঞানদার আগ্রহ জাগল সংস্কৃত 
কাব্যের প্রতি। ঠাকুরবাড়ির পাঠশালায় বাংলা ইংরেজি অনেক পড়া হলেও 
জ্যোতির সংস্কৃত পড়া হয়নি। জ্ঞানদার উৎসাহেই সংস্কৃত কাব্য ও নাটকপাঠ 
শুরু করলেন জ্যোতি। প্রতিদিন সন্ধেবেলা সত্যেন ঘরে ফিরলে শুরু হয় 
তিনজনের আসর। কখনও জ্যোতি কখনও সত্যেন অভিজ্ঞান শকুস্তলম্‌ পাঠ 
করেন। পড়তে পড়তে শকুস্তলার অনুবাদ করতে ইচ্ছে হয় জ্যোতির। 

এ-সবের মধ্যেই বাতের ব্যথায় একটু অসুস্থ হয়ে পড়লেন সত্যেন। একদিন 
বললেন, ব্যথাটা বাড়ছে, ভাবছি চিকিৎসার জন্য ছুটি নিয়ে কলকাতায় যাই 
একবার। 

জ্ঞানদা উদ্বিগ্ন হন, পায়ের ব্যথা নিয়ে পনেরোদিন স্টিমারে থাকতে 
পারবে, কষ্ট হবে না? 

সত্যেন হাসতে থাকেন, শোনো এবার আর অনেকদিন ধরে স্টিমারে 
যেতে হবে না। ১১ই অক্টোবর ১৮৬৭ বোম্বাই-কলকাতা রেলপথ খুলে 
গেছে। মাত্র পাচদিনেই পৌছে যাওয়া যাবে বোম্বাই থেকে কলকাতা। 

রেল চালু হওয়ায় চারিদিকে মহা উৎসাহ হইচই। জ্ঞানদা আর জ্যোতিও 
উত্তেজিত নতুন অভিজ্ঞতার সম্ভাবনায়। তাদের উৎসাহের জোয়ারে ভেসে 
দু'-এক দিনের মধ্যেই তিনটে রেলের টিকিট বুক করে ফেললেন সত্যেন। 
জ্বানদা ও জ্যোতিরিন্দ্রকে নিয়ে ফিরে এলেন জোড়ার্সাকোয়। 


৪৭ 


জোড়ার্সাকো কি পালটে গেল? নাকি ইতিমধ্যে স্বাধীনভাবে থাকতে অভ্যস্ত 
জ্ঞানদারই এ-বাড়িতে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হচ্ছে! তার স্বাধীন চলাফেরায় 
যেন প্রতিমুহূর্তে বেড়ি পরিয়ে দিতে চাইছে নানা অনুশাসন। সারদার সঙ্গেও 
খটাখটি লাগছে বারবার। তার ফলে সত্যেনের চিকিৎসাও ব্যাহত হচ্ছে, 
ঠিকমতো বিশ্রাম হচ্ছে না। 

দেবেন্দ্রনাথের অনুমতি নিয়ে এক মাসের জন্য আলাদা বাগান-বাড়ি 
ভাড়া করে স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেলেন সত্যেন। নিজের চিকিৎসার জন্যও 
এই নিরিবিলি পছন্দ হল তার। জ্যোতিও তাদের সঙ্গে এসে জড়ো হলেন। 
আমেদাবাদ ছাড়ার পর তিনজনের সাহিত্যবাসর যেখানে থেমে গেছিল 
আবার সেখান থেকেই যেন শুরু হয়ে গেল। 

ঠাকুরবাড়িতেও সংস্কৃতি চর্চা থেমে নেই। নীপময়ী গান ও পড়াশোনার 
পাশাপাশি বাঁয়া তবলা, খোলকরতাল বাজানো শেখা শুরু করেছেন 
বেণীমাধববাবুর কাছে। হেমেন তাকে নিয়ম করে মিলটনের মহাকাব্য 
'প্যারাডাইস লস্ট” পড়াচ্ছেন। এর আগে পড়িয়েছেন কালিদাসের “অভিজ্ঞান 
শকুত্তলমৃ' কাব্য। এমনকী দেশি ও বিদেশি শিক্ষকের কাছে ছবি আকাতেও 
হাত পাকাতে চেষ্টা করছেন হেমেনের আদরের পত্ী। 

ওদিকে মেয়ে-বউদের পড়ানোর জন্য মেমশিক্ষিকারা আসছেন অন্তঃপুরে। 
কন্যা সৌদামিনীকে বেথুন স্কুলে পাঠিয়েছিভ্লন মহবি, কিন্তু তারপরে আর 
কোনও মেয়ে-বউ স্কুলে যাননি। বাড়িতেই তাদের পড়াশোনার ওপর খুবই 
গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জ্ঞানদা নিজেও সবুরান বিবির কাছে দীর্ঘদিন ইংরেজি 
শিখেছেন। শরৎকুমারীর অবশ্য রূপচর্চা ও রান্নার দিকে আগ্রহ বেশি। 
প্রতিদিন যত্বু করে ঘষে ঘষে সর-ময়দার রূপটান মেখে স্নান করেন তিনি। 
অলিভ অয়েলের মিশ্রণ। তার স্বামী যঙ্গুনাথের কাছে একবার ইয়ারবন্ধুরা 
ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের গায়ের রং জানতে চাইলে যদু রহস্য করে বলেছিলেন, 
সে রং 'দুধে আর মদে”। পড়াশোনার পাশাপাশি চলত অন্যান্য শিক্ষা রান্না, 
সেলাই, সেবা, শিশুপালন সবই নিয়মিত অনুশীলনের বিষয় বলে মানতেন 
অস্তঃপুরিকারা। 

এই সুগৃহিণীপনার পাঠশালায় একেবারেই অনুপস্থিত থাকেন একমাত্র 
স্বর্ণকূমারী। তার এ-সব ভাল লাগে না। বিয়ের আগেও যেমন, পরেও তিনি 
8৮ 


ঘর বন্ধ করে সাহিত্যচায় ব্যস্ত রেখেছেন নিজেকে। মগ্ন হয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের 
উপন্যাস পড়েন আর স্বপ্ন দেখেন তিনিই হবেন বাংলার প্রথম মহিলা 
ওপন্যাসিক। মাঝে মাঝে মালিনী এসে তার স্বপ্নকে উসকে দিয়ে যায় 
ইদানীং। 

ইতিমধ্যে ঠাকুরবাড়িতে আরেকটি বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। নীপময়ীর বোন 
প্রফুল্লময়ী এসেছিল দিদির সঙ্গে দেখা করতে। তাকে দেখে খুব পছন্দ হয়ে 
গেল শরৎকুমারী ও স্বণকুমারীর। তারা ভাই বীরেনের সঙ্গে বিয়ের উদ্যোগ 
নিলেন। বালিকাকে সাজিয়ে গুজিয়ে বীরেনের সামনে টেনে আনতে গেলে 
সে লজ্জায় পালিয়ে গেল। বন্ধু হরদেবের আর একটি মেয়ের সঙ্গে তার 
আর একটি ছেলের বিবাহ প্রস্তাব, দেবেন ঠাকুর খুশি হয়েই সম্মতি দিলেন। 
গা ভরতি গয়না ঝমঝমিয়ে বালিকাবধু ঢুকলেন ঠাকুরদের প্রাসাদে। কিন্তু 
তাঁর বর বীরেন্দ্র হাবভাবে একটু পাগলামির ছাপ। মহধি ভেবেছিলেন বিয়ে 
দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। 

এরপরেই ঠাকুরবাড়িতে শুরু হল জ্যোতির বিয়ের তোড়জোড়। কিন্তু 
সত্যেন ও জ্ঞানদার তাতে মত নেই। সত্যেন দেবেন্দ্রনাথকে বললেন, 
বাবামশায়, এত তাড়াতাড়ি জ্যোতির বিয়ের কথা কেন ভাবছেন? ওর বয়স 
এখনও উনিশ হয়নি। আমার ভাইদের মধ্যে ও সবচেয়ে প্রতিভাধর। ওকে যে 
আমি বিলেত পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষা দিয়ে মেজেঘষে আনব ভাবছিলাম। 

দেবেন ঠাকুর কিন্তু এখনই জ্যোতির বিবাহ দিতে চান। কতদিন আর মেজদা 
মেজোবউঠানের পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াবে সে! বিবাহ না দিলে ছেলেরা 
দায়িত্বশীল হয় না। পরিবারে আশ্রিত কর্মচারী শ্যাম গাঙ্গুলির সেজোমেয়ের 
সঙ্গে জ্যোতির বিয়ের কথা উঠেছে। আট বছরের বালিকা মেয়েটি নিরক্ষর 
হলেও সুন্দরী। চেনাশোনার মধ্যেই এমন মেয়ে যখন পাওয়া গেছে. বিয়ে 
লাগিয়ে দিলেই হয়। 

জ্ঞানদার একেবারেই পছন্দ নয় এই বয়সে দেবরের বিয়ের প্রস্তাব। 
এখন তার তৈরি হওয়ার সময়। জ্যোতি লিখবেন একের পর এক নাটক 
কবিতা প্রবন্ধ, জ্ঞানদা হবেন তার প্রেরণাদাত্রী আর পৃষ্ঠপোষক সত্যেন 
এমন একটা জীবনের পরিকল্পনাই তো তীরা আমেদাবাদে বসে করেছিলেন। 
ফেরত, কেতাদুরস্ত। জ্ঞানদা এমনই এক পাত্রী দেখে রেখেছেন জ্যোতির 


৪৯ 


জন্য। সুকুমার গুডিভ চক্রবর্তীর বিলেত ফেরত মেয়ে, ইংরেজি শিক্ষিত, 
শ্যামলা রং কিন্তু মুখস্তরী সুন্দর। মেয়েটি সেসময় কলকাতায় এসেছিল। 
তাকে জোড়ার্সাকোর বাড়িতে একদিন নেমন্তন্ন করে আনালেন জ্ঞানদা। কিন্তু 
দেবেন্দ্রনাথ এই সম্বন্ধে সম্মতি দিলেন না। সত্যেনের বউ শিক্ষিত কেতাদুরস্ত 
হয়ে ইস্তক বড্ড স্বাধীনচেতা হয়ে উঠেছে, বাড়ির অন্যান্যদের সঙ্গে মানিয়ে 
চলতে চায় না। এজন্য দেবেন্দ্র কিছুটা বিরক্ত। তিনি জ্ঞানদার প্রস্তাব অগ্রাহ্য 
করে শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়ের সঙ্গেই কথা পাকা করতে নির্দেশ দিলেন। 

সত্যেন আহমেদনগর থেকে জ্ঞানদাকে লিখলেন, “আমি যদি নতুন 
হইতাম, তবে কখনই এ বিবাহে সম্মত হইত... [হইতাম] না। কোন্‌ হিসাবে 
যে এ কন্যা নতুনের উপযুক্ত হইয়াছে জানি না। 

“..আমি বলি নতুন যদি ইংলপ্ডে যাইবার সঙ্কল্প করেন তবে বিবাহ না 
করিয়া যাওয়াই ভাল।... আমার ভাগ্যে এমন স্ত্রী হইয়াছে, আমি মুক্তকণ্ঠে 
বলিতে পারি যে এমন 'ন্ত্রীরত্ব' দুর্লভ।... জ্যোতি না দেখিয়া শুনিয়া একজনকে 
বিবাহ করিয়া ইংলণ্ডে ৪1৫ বৎসরের জন্য চলিয়া যাক্‌-__ সেখানকার সমাজে 
সঞ্চরণ করিয়া ও সুশিক্ষিত হইয়া ফিরিয়া আসিয়া এক অপরিচিত, হয়ত 
অশিক্ষিত স্ত্রী কি তাহার মনোনীত হইবে? দেখ যতজন বিলাতে গিয়াছে প্রায় 
সকলেরই ওই প্রকার দুর্দশা ঘটিয়াছে... আমাদের কথা স্বতন্ত্র ।' 

মহধি অবশ্য সত্যেনের আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিলেন না। সত্যেনের স্ত্রীকে 
যশোরের কোন অজগ্রাম থেকে আনা হয়েছিল? ঠাকুর পরিবারের বেশিরভাগ 
বউকেই প্রত্যন্ত পাড়া থেকে বেছে আনা হয়েছে, তারপর মেজে ঘষে 
শিক্ষায় সংস্কৃতিতে তারাই হয়ে উঠেছেন বাংলার আদর্শ নারী। শ্যাম গাঙ্গুলির 
মেয়েটিকে তিনি কয়েকবার দেখেছেন, বেশ সুলক্ষণা। স্ত্যেনকে তিনি চিঠি 
লিখখে জানিয়ে দিলেন, “জ্যোতির বিবাহের জন্য একটি কন্যা পাওয়া গিয়াছে 
এইই ভাগ্য। একেত পিরালী বলিয়া ভিন্ন শ্রেণীর লোকেরা আমাদের সঙ্গে 
বিবাহেতে যোগ দিতে চাহে না, তাহাতে আবার ব্রাহ্মধমের অনুষ্ঠান জন্য 
পিরালীরা আমাদিগকে ভয় করে। ভবিষ্যৎ তোমাদের হস্তে তোমাদের 
সময় এ সঙ্কীর্ণতা থাকিবে না।” 

হতাশ সত্যনন্ত্র স্ত্রীকে লিখে পাঠালেন, “তবে নতুনের বিবাহের ধূম লাগিয়া 
গিয়াছে। হিতেন্দ্র ও নীতিন্দ্রের ভাত, তোমরা বেশ আমোদে আছ। নতুনের 
বিবাহ দেখিবার তোমার যে এত সাধ ছিল, তাহা পুর্ণ হইল। শ্যামবাবুর 


৫০ 


মেয়ে মনে করিয়া আমার কখনই মনে হয় না যে ভাল মেয়ে হইবে-_ 
কোন অংশেই জ্যোতির উপযুক্ত তাহাকে মনে হয় না। জ্যোতি এই বিবাহে 
কেমন করিয়া সম্মত হইল, এই আমার আশ্চধ্য মনে হইতেছে।” কিন্তু সত্যেন 
জ্ঞানদার অপছন্দে বিয়ে আটকে থাকল না। 

২৩ আধাঢের শুভলগ্নে সিঁদুরে রঙের চেলি ও গা-ভরতি জড়োয়া গয়না 
পরে কাদন্বরী ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করলেন। সাজের কী বাহার! গলায় চিক 
ও ঝিলদানা হার, হাতে চুড়ি, জড়োয়া কঙ্কণ ও বাজুবন্দ, কানে বীরবৌলি 
ও কানবালা, পায়ে নুপুর ও চুটকি, কোমরে চাবি ও গোট, মাথায় জড়োয়া 
সিঁথি ও টিকলি। এ-বাড়ির রীতি অনুযায়ী অধিকাংশ গয়নাই দেবেন্দ্র যৌতুক 
হিসেবে দিয়েছেন। জ্যোতির বয়স উনিশ, কাদন্বরীর নয় বছর। জ্ঞানদার 
আশঙ্কা ছিল অশিক্ষিত বালিকাকে পছন্দ হবে না জ্যোতির। সে ভয় মিথ্যে 
করে নববধূকে দেখে জ্যোতিরিন্দ্রের রোমান্টিক মন দুলে উঠল। এই শ্যামল 
বালিকাকে তিনি নিজের মতো করে গড়েপিটে নেবেন। মেজোবউঠান যশোর 
থেকে এসে যদি আভিজাত্যের শিরোমণি হতে পারেন, নতুনবউও নিশ্চয় 
পারবে। আর নববধূকে দেখে তার চেয়ে দু'বছরের ছোট দেওর রবির মনে 
হল রূপকথার রাজকন্যে এসেছেন বাড়িতে। কী যেন অজানা পুলকে শিউরে 
ওঠে বালকের মন। 
ভাইপো গণেন্দ্রকে। সত্যেন বা হেমেনকে এই দায়িত্ব না দেওয়ার একটা 
কারণ নিশ্চয় এ-বিয়ে সম্বন্ধে তাদের বিরূপ মনোভাব। বালক বালিকাদের 
জন্য নতুন জামাকাপড়, ঘটক বিদায়, কুলীন বিদায়, অধ্যাপক বিদায় সবকিছু 
সামলাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন গণেন্দ্র। বিলিতি দোকানের জুতো কেনা হল। 
বিয়েতে গরিবদের জন্য ঢালাও ভোজের ব্যবস্থা নির্দেশ করলেন মহবি। 
এবার অবশ্য ব্রান্মবিয়েতে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্রাহ্মণের উপস্থিতি দেখা গেল। 
তত্ববোধিনী পত্রিকায় সে-খবরটি বিশেষভাবে উল্লেখ করার নির্দেশ দিলেন 
দেবেন্দ্রনাথ। 

আনন্দর পাশাপাশি একটি বেদনার সূত্রপাত হচ্ছিল ঠাকুরবাড়িতে। বীরেনের 
মাথার দোষ বাড়াবাড়ি পায়ে পৌছল। তাকে পারিবারিক আয়ব্যয়ের হিসেব 
রাখার ভার দিয়েছিলেন বাবামশায়, কিন্তু সে-কাজে গাফিলতি হতে থাকল। 
ক্রমে তিনি খাওয়া ছেড়ে দিলেন। তার নিরাময়ের আশায় বোলপুরে নিয়ে 


৫৯ 


গেলেন স্ত্রী প্রফুল্লময়ী। নীপময়ী, ব্রজসুন্দরী, কাদন্বরীরাও তাদের সঙ্গী হলেন। 
কিন্তু সেখানে গিয়েও তার খাওয়াদাওয়ার কোনও উন্নতি হল না। এক চামচ 
ভাত আর একটি পটলপোড়া খেয়েই থালা সরিয়ে দিতেন এক-একদিন। 
কলকাতা ফিরে এসে সাহেব ডাক্তার দেখিয়েও অসুখ সারল না। 

এইসময় থেকেই রবির কবিতা নিয়ে আঁকিবুকি শুরু। সুযোগ পেলে 
পাঠ্যবইয়ের কবিতা মুখস্থ শুনিয়ে মাকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করতে 
লাগলেন বালক। ভেতরমহলে ছলছুতোয় মায়ের কাছে গেলে কিশোরী 
নতুনবউঠানের সঙ্গেও মাঝে মাঝেই দেখা হয়ে যায় সমবয়সি দেওরটির। 
চোখে চোখে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে যেন। বুক কেপে ওঠে অজানা রোমাঞ্চে আর 
রবির গোপন খাতা ভরে ওঠে কবিতায় কবিতায়। নতুনবউঠানের ঘরের 
কাচের আলমারিতে বিচিত্র চিনেমাটির খেলনার ঝলক চোখে পড়ে। ওই 
রহস্যময়ীর সঙ্গে গল্প করতে বড় ইচ্ছে করে রবির। কিন্তু কথা বলতে গেলেই 
বর্ণদিদি কেন যে তেড়ে আসে! মেয়েদের সৌভাগ্যকে একটু ঈধাও হয়, 
আজকাল একসঙ্গে গুরুমশায়ের কাছে পাঠ নিতে বসেন তাঁরা। কিন্তু পড়া 
শেষ হলে রবি, সোম ও সত্যকে যখন ইস্কুলের কয়েদখানায় পাঠানো হয়, 
বর্ণ বেণী দুলিয়ে এবং নতুনবউঠান ঘোমটা টেনে অন্দরের স্বর্গরাজ্যে চলে 
যান। এই মনের দুঃখ কাকেই বা জানাবেন রবি! 

নতুনবউকে মেজেঘষে তোলার দায়িত্ব পেলেন নীপময়ী। তাঁর বাপের 
বলে। নীপময়ী এবার তার জন্য বর্ণপরিচয় ও ধারাপাত কিনে আনালেন। 
পড়াশোনায় বেশ মেধার পরিচয় দিচ্ছেন নতুনবউ। আবার ঘরের কাজের 
শিক্ষাও চলছে পুরোদমে। 

রবি, সোম ও সত্যের উপনয়নে কাদম্বরী ওদের অনেকটা কাছাকাছি এসে 
পড়লেন। এই তিন বালকের বড় হওয়ার সময় হল। ব্রাহ্ম হলেও পইতে 
ধারণের সময় মাথা ন্যাড়া করে, কানে সোনার বীরবৌলি পরে, হাতে বিন্বদণ্ড 
নিয়ে গায়ত্রীমন্ত্রে দীক্ষা নিলেন তীরা। ভিক্ষাপাত্র নিয়ে মা, বাবামশায় ও 
গুরুজনদের কাছে ভিক্ষা নিয়ে আচার আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশকে দান করা 
হল। সারাদিন উপোস করে সন্ধ্যায় গায়ত্রীমন্ত্রজপের পর যখন নতুনবউঠানের 
রেঁধে দেওয়া হবিষ্যান্ন মুখে দিলেন, রবির মনে হল অমৃত খাচ্ছেন। প্রথমবার 
বাড়ির অন্তঃপুরিকার হাতের রান্না খেয়ে স্বাদেগন্ধে মুগ্ধ বালকদের মন 
৫ 


কাদশ্বরীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল। সমবয়সি কাদস্বরীকে যেন বালকদের 
চেয়ে অনেক পরিণত মনে হয়। অন্তঃপুরের শিক্ষায় এবং সপ্রতিভতায় তিনি 
শুধু বালকদেরই নয়, ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরিকাদেরও মন.জয় করে নিচ্ছেন। 
নবীন ব্রন্মচারীদের তিনদিনের হবিষ্যি রান্নার ভার কাধে তুলে নিলেন তিনি। 

রূপা এখন সারদার খুব নেওটা হয়েছে। রোজ দুপুরে এসে হাত-পা টিপে 
দেয়, পাকা চুল তুলে দেয় আর পুটুর পুটুর করে আবোল-তাবোল বকে যায়। 
ওর নরম আঙুলের ছোয়ায় বেশ ঘুম জড়িয়ে আসে সারদার চোখে। 

একদিন বললেন, রূপা, তুই কি এমন মুখ্যু হয়ে থাকবি? দাড়া তোকে 
লেখাপড়া শিখতে পাঠাব বৈঠকখানায়। বর্ণদিদি, রবিদাদা, নতুন বউঠানের 
সঙ্গে বসে বসে পড়া শিখবি মাস্টারমশায়ের কাছে। 

রূপা আনন্দে নেচে ওঠে কত্তামায়ের কথা শুনে। তার পায়ে হাত দিয়ে 
বলে, তোমাকে কত্তামা ডাকতে আমার ভাল লাগে না। বন্নোদিদির মতো মা 
বলে ডাকলে তুমি কি রাগ করবে? 

এই অনাথা বালিকার সঙ্গে কী এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে পড়েছেন 
সারদা, ভাবলে নিজেরই আশ্চ লাগে। রূপা ভার যত কাছে এসে গেছে, 
নিজের গর্ভের সন্তানদের কোনওদিন তত কাছে ঘেঁষতে দেননি। ছোট থেকে 
বুকের দুধ না-দেওয়ায় বাচ্চাদের সঙ্গে কোনও শরীরী বন্ধন গড়ে ওঠেনি। 
এই মেয়েটি যখন গায়ে হাত দিয়ে সেবা করে, তা ঠিক যেন দাসীর মতো 
নয়, বরং কন্যার মতো। আবার মুশকিল হচ্ছে এর হাবভাবে ঠাকুরবাড়ির 
মেয়েদের ঘষামাজা নেই, গ্রাম্যটানের বুলিতে বারবার মনে করিয়ে দেয় ও 
আলাদা। সারদা ঠিক করলেন ওর গায়ে ঠাকুরবাড়ির আলোর ছোয়া লাগিয়ে 
দেখবেন কী হয়। 

শোন, আজ থেকে তোর নাম দিলাম রূপকুমারী। আমার সুকুমারী, 
শরৎকুমারী, স্ব্ণকুমারী, বণকুমারীদের পাশে বেশ মানাবে। কেউ জিজ্ঞেস 
করলে এই নাম বলবি, মাস্টারমশায়কেও। 

কিন্তু সবাই যে রূপা বলেই ডাকবে? বালিকা খুশিতে অধীর হয়ে জানতে 
চায়। 

সে ডাকুক না, রূপকুমারীর ডাকনাম তো রূপা হতেই পারে। সারদা 
আশ্বস্ত করলেন পৃস্যিকন্যাকে। স্ব বণ তো ওকে এখনই মজা করে “মায়ের 
পুষ্যি' বলে। 


৫৩ 


কিন্ত তোর দস্যিপনা আর চলবে না। আমার পুষ্যি হয়ে থাকতে হলে 
আমার মেয়েদের মতো ভদ্রসভ্য শিক্ষিত হতে হবে। ঘরের কাজ, রান্নাবান্না 
শিখতে হবে, উড়ে উড়ে বেড়ানো বন্ধ। 

রূপাকে সন্সেহ করলেও সারদা জানেন ওর মধ্যে একটা অবাধ্য ঘোড়ার 
মতো বুনো স্বভাব আছে, আদর নেবে কিন্তু সহজে পোষ মানবে না। ছোট 
থেকে কুটুম মহলে থেকে থেকে সংসারের কল্যাণকর নিয়মগুলো কিছুই 
শেখেনি। 

রূপার ঝুঁটি ধরে নেড়ে আবার বলেন সারদা, বুঝেছিস, তোকে ভাল 
মেয়ে হতে হবে! 

ভাল মেয়েরা কী করে মা? রূপার প্রশ্নটি সারল্য না দুষ্টুমি ঠিক বুঝতে 
পারেন না সারদাসুন্দরী। এ মেয়েটা একটু অন্যরকম, মনে মনে তারও জেদ 
চাপে, বেতো ঘোড়াকে সোজা করবেনই, তবে তার নাম সারদাসুন্দরী। 

ভাল মেয়েরা স্বর্ণ বর্র মতো, নতুন বউয়ের মতো মায়ের কথা শুনে 
চলে। সব কাজ ধীরে ধীরে করে! সবাইকে সেবা যত্ব করতে শেখে আবার 
লেখাপড়াও শেখে। যাকে বলে, রূপে লক্ষ্মী আর গুণে সরম্বতী। শুনিসনি, 
“সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে”? 

রূপার বয়স একটু বেড়েছে, সারদার প্রশ্রয়ে সাহসও বেড়েছে। সে 
বলে, তা কেন হবে মা। মেয়েরাই শুধু খেটে মরবে কেন? কেন ঘরে বন্দি 
হয়ে থাকবে? আমার তো ইচ্ছে করে ডানা মেলে পাখির মতো উড়ে যাই। 
বেটাছেলেদের গায়ে যেন ডানা লাগানো আছে আর আমরা বিটিরা সব 
ডানাছেঁড়া। 

সারদা ভাবেন, তার পেটের মেয়ে হলে এ-কথা বলত না কখনও। বলেন, 

পরের দিন থেকেই পুরোদমে শুরু হয়ে গেল রূপা থেকে রূপকুমারী হয়ে 
ওঠার ক্লাস, শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতি তৈরি করেই ছাড়বেন সারদা। 

বর্ণকুমারী কিন্তু সহজে মেনে নিতে পারেন না মায়ের পুধ্যিটিকে। সে বেশ 
মায়ের পাশ ঘেঁষে ঘেঁষে বসছে ক্লোজ দুপুরে, আবার পাঠশালায় একসঙ্গে 
পড়া শিখতে আসছে। বিরক্ত বর্ণ ফিসফিস করে রবিকে বলেন, দেখ মেয়েটা 
কেমন উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। 

রবির এ-সব নিয়ে অত মাথাব্যথা নেই। তীর দুশ্চিন্তা যে পড়া শেষ 


৫৪8 


হলেই ইঙ্কুলে যেতে হবে। ও জায়গাটা তার মোটেই পছন্দ নয়। বর্ণদিদির 
আর চিন্তা কী? তিনি তো পড়ার পর অন্দরমহলের আরামে ঢুকে পড়বেন। 
নতুনবউঠানের সঙ্গে গল্পের লোভে রবি দু'-একদিন ওদের পিছু পিছু ঢুকতে 
চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু নিষ্ঠুর বর্ণদিদির তাড়নায় ফিরে আসতে হয়েছে 
চাকরমহলে। সুতরাং রবি ঠিক করে নেন, তিনি কিছুতেই বর্ণদিদির পক্ষ 
নেবেন না। বরং রূপার সঙ্গে বন্ধু পাতানো যায় কারণ সে মায়ের কোলঘেঁষা। 
আহা রূপার মতো ভাগ্যও যদি তার হত! 

রবি বললেন, ও তো পড়া শিখতে এসেছে, তুমি অমন করছ কেন? মা 
পাঠিয়েছেন বলেই তো এসেছে। আর তুমি পারলে সবাই পড়তে পারে। 

রূপা বোঝে তাকে সহজে কেউ জায়গা ছেড়ে দেবে না, লড়ে জায়গা 
নিতে হবে। তবে এরা সব আলালের ঘরের দুলাল, তার সঙ্গে লড়াই করে 
জিততে পারবে না। 

বর্ণকুমারী তাকে ঠেলা দিলে সেও পালটি ঠেলা মারে। বর্ণ চোখ পাকিয়ে 
তাকায়, সেও তাকায়। রবি ফিকফিক করে হাসতে থাকেন মজা পেয়ে। 

মাস্টারমশায় এলে কাদন্বরীও ছাত্রদলে যোগ দিলেন। আজকের পাঠ 
“মেঘনাদবধ কাব্য'। সেই কঠিন পাঠ্য মাস্টারমশায়ের ততোধিক কঠিন পাঠে 
ছাত্রদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে লাগল। 

কাদন্বরীর হাতে রবি একটি চিরকুট গুঁজে দিলেন, তাতে লেখা-_ কী 
বুঝিতেছ? 

তৎক্ষণাৎ চিরকুটের উত্তরও পেয়ে গেলেন রবি, বুঝিলাম তুমি রাবণ 
আর আমি অশোকবনে বন্দিনী সীতা। রামচন্দ্র কবে উদ্ধার করিবেন সেই 
অপেক্ষায় আছি। 

কিশোর রবির মনে দাগা লাগে, নতুনবউঠান কেন তাকেই রাবণ ভাবলেন? 
রবির মধ্যে রামচন্দ্র হওয়ার কোনও যোগ্যতাই কি তীর চোখে পড়ল না! 

অভিমানী রবি পাঠে মন দিয়ে কাদন্বরীকে উপেক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা 
করতে থাকেন কিন্তু রহস্যময়ীর ঠোটের মৃদু হাস্য সেই মনঃসংযোগে বিলক্ষণ 
বিঘ্ন ঘটাতে থাকে। 


৫৫ 


৪ 


বিরহিণী পত্রলেখা 


তেতলায় নতুন কয়েকটি ঘর তোলা হয়েছে। সেখানেই জ্ঞানদা তার নিজস্ব 
ঘরটিকে সুন্দর করে সাজিয়েছেন। মেঝেতে পেতেছেন ফুল-তোল! মাদুর। 
এককোণে ছোট্ট জলচৌকির ওপর কাঁসার ঘটিতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ। 
দেওয়ালে জ্যোতিরিন্দ্রের আকা জ্ঞানদার একটি পোট্রেট। সেদিকে তাকিয়ে 
আপনমনে বসে ছিলেন ছবির মানবীটি। হাতে সত্যেনের পাঠানো একগোছা 
চিঠি। | 
নাও গো বোঠান, তোমার শরীরে এখন গন্তি দরকার। 

জ্ঞানদা আলস্যে শুয়ে থাকেন, দুর বিনি, আর সারাদিন ফল খেতে পারি 
না। যা-না একটু তেঁতুলের আচার নিয়ে আয়। সেজদিদির কাছে চুপিচুপি 
চেয়ে আনবি। 

বিনি মুচকি হেসে বলে, এ সময়ে টক খেতে মন চায়, আমারও এরকম 
হত। মেজোবোঠান, তুমি দাতে করে একটু ফল কাটো দিকিনি, পেটের 
বাবুসোনার পুষ্টি হবে। আমি এই ছুটে আচার নে আসছি। আহা এসময় 
বাপের বাড়ি গেলে কত ভাল লাগত, সে তো কত্তাবাড়ির রেয়াজ নেই। 

বিনি চলে যেতে-না-যেতেই উত্তেজিত হয়ে একটি খাতা হাতে করে 
জ্যোতিরিন্দ্র ঘরে ঢোকেন কালবৈশাখী ঝড়ের মতো। মেজোবউঠান, শুনবে 
একটু আমার নতুন লেখাটা? 

জ্ঞানদা উজ্জ্বল মুখে প্রিয় দেওরের দিকে তাকালেন, এতদিনে তোমার 
আসার সময় হল নতুনঠাকুরপো, আমি তো ভাবলাম নতুন বউ পেয়ে পুরনো 
বোঠানকে ভুলেই গেছ! 


৫৬ 


তুমি কোনওদিন পুরনো হবে না মেজোবউঠান, জ্যোতি জ্ঞানদার হাতদুটি 
ধরে আবেগের সঙ্গে বলে ওঠেন, তবে কাদন্ববীকেও একটু সময় দিতে হবে 
তো! সে বেচারা তো আমার ভরসাতেই এই প্রাসাদে ঢুকেছে। 

নববিবাহের রক্তিমাভায় জ্যোতিকে আগুনের মতো রূপবান মনে হয়। 
জ্ঞানদার হৃদয় এক মুহূর্তের জন্য ঈধায় উালপাতাল হয়ে ভাবে, কে এক 
কাদন্বরী কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে এই তরুণের হৃদয়ে ! পরক্ষণেই 
নিজেকে শাসন করেন ধীমতী এই নারী, ছিঃ, এরকম করে ভাবছেন কেন 
তিনি! দেবরটিকে তো তিনি আঁচলে বেঁধে রাখতে পারেন না চিরদিন। 

মাঝে মাঝেই জ্ঞানদার ঘরের পালক্কে জমিয়ে আড্ডা বসান জ্যোতি ও 
স্বর্নকুমারী। কিশোরী কাদন্ববী কোনও কোনও দিন একপাশে এসে বসে 
থাকেন। জ্ঞানদার সাহিত্যপত্রীতি ও সুচারু সাজসজ্জায় মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে 
থাকেন, কিন্তু মেজোবউঠানের দিক থেকে নতুনবউ বিশেষ সাড়াশব্দ পান 
না। তাদের জমাটি আসরে নিজেকে বড় বেমানান লাগে কাদন্বরীর, কিন্তু 
তিনি ঠিক করেন শিগগিরই শিখে নেবেন স্বামীর ভাললাগা বিষয়গুলি। 

রাতের শয্যায় লাজুক নতুন বউ স্বামীর কাছে জানতে চান, মেজোবউঠানকে 
তুমি খুব ভালবাসো তাই না? 

জ্যোতি বউকে জড়িয়ে ধরে বলেন, হ্যা ভালবাসি কিন্তু তোমাকে তার 
চেয়ে অনেক বেশি ভালবাসি, শতগুণ বেশি। 

তিনি কত কী জানেন, আমি মুখ্যু কিছুই জানি না। তোমাদের মতো করে 
কথা বলতে বড় ইচ্ছে করে, জ্যোতির বুকে মুখ রেখে কাদন্বরী বলেন। 

জ্যোতিও তো তাই চান, নিজের মনের মতো করে গড়ে নিতে চান বউকে। 
বধূকে চুম্বন করে তিনি বলেন, তুমি এখন নরম মাটির মতো, আমি তোমাকে 
গড়েপিটে মনের মতো পুতুল বানাব। সবুর করো ক'দিন, তখন সবাই অবাক 
হয়ে তোমাকে দেখবে। 


জ্ঞানদা নিজের ঘরে বসে সত্যেনের চিঠি পড়তে থাকেন। প্রতিদিনের 
প্রাত্যহিক কথাও চিঠিতে কেমন অসামান্য হয়ে ওঠে। অতিপরিচিত স্বামীটিও 
যেন নতুন হয়ে ধরা দিচ্ছেন নিত্য নতুন চিঠিতে। সতোন প্রায় প্রতিদিন ছিগি 
লেখেন জ্ঞানদাকে। 


৫৭ 


তুমি এখন কেমন আছ? এই দুই তিন দিনে অবশ্য বুঝিতে পারিয়াছ 
অবশিষ্ট কাল কিরূপে থাকিতে হইবে। তোমার সঙ্গে সর্বদা কে কে থাকেন। 
স্বর্ণ ও জানকী কি তেতলায় শোন? খাওয়া তোমার একলা হয় কি কেহ ভাগী 
থাকে? তুমি যেমন চাও তাহা পাইতেছ কি না? সকল বিশেষ করিয়া লিখিবে। 

নূতনকে আমার ন্েহ জানাইবে ও বলিবে যেন মধ্যে মধ্যে লেখেন__ 
শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর 

নীলকমল ও চারুর 770০ তোমার ৪10-এর জন্য পাঠাইলাম। 

শ্রীস, 


“ভাই জ্ঞেনু 

আলাহাবাদ বাগানে একজন অন্ধ ব্রান্মের সহিত সাক্ষাৎ হইল। তিনি 
জন্মান্ধ, তবুও বুদ্ধিমান ও বিবেকী বোধ হইল। কয়েকটি ব্রন্মসঙ্গীত গান 
করিলেন মন্দ নহে-__ অর্থাৎ রাগরাগিনী শুদ্ধ না হোক কিন্তু সুর মন্দ নহে। 
তিনি অন্যের মুখে শুনিয়া উপনিষদ ও ব্রাহ্গধর্মের পুস্তক সকলের মর্ম 
বুঝিয়াছেন। এমন কি অনেক শ্লোক তাহার কষ্ঠস্থ। তুমি সর্ববাপেক্ষা চক্ষু 
হারাইবার ভয় কর, কিন্তু দেখ চক্ষু না থাকিলেও কত করা যায়। আলাহাবাদ 
২৬এ প্রাতে পরিত্যাগ করিয়া সেই দিন সন্ধ্যার সময় জববলপুর পৌছিলাম। 
ভাগ্যে চারুর কাছ থেকে একখানা [০-সংগ্রহ করিতে পারিয়াছিলাম, 
তাহাই পথের একপ্রকার সম্বল হইয়াছে। এখন সেই গ্রন্থ পাঠ করিতেছি__ 
তাহার নাম 05$৬/910 0199--- ্রস্থকর্তী অথবা গ্রস্থকত্রীর নাম [5. [1011 
৬/০০। গ্রন্থখানি মন্দ নহে, তুমি আনাইয়া পড়িলে বুঝিতে পারিবে। ইংরাজ 
সমাজের দোষগুণ-__ ভাল দিক মন্দ দিক__ তাহার অন্তরের ভাব অনেক 
লক্ষিত হইবে। এক এক স্থলে বর্ণনা বেশ আছে।” 


জ্ঞানদা জানতে চান সত্যেনের নিজের কথা। এত পথচলায় কষ্ট হচ্ছে কি? 
পায়ের ব্যথা কেমন আছে? মনের মতো কথা বলার সঙ্গী কি পেয়েছেন 
সত্যেন? 

সত্যেন জানান, 

“দেখ এক সপ্তাহের মধ্যে বোম্বাই আসিয়া পৌছিয়াছি। এখন যে হোটেলে 
রহিয়াছি তাহা /১৫1% অপেক্ষা অনেক গুণে ভাল। হোটেল হইতে পৃথক 


৫৮ 


একটা বাঙ্গলা পাইয়াছি-- গোবিন্দ একটা পার্ববস্তী বাঙ্গলায় রহিয়াছে__ 
আমরা দুইজন একত্রে আহার করি। গোবিন্দ সারাদিনই তোমাকে ইংলগ্ডে 
পাঠাইবার পরামশ দেয়__ তাহা এখন আর কি প্রকারে হয়-_ পরে দেখা 
যাইবে__ কি বল জ্ঞেনু? আজ আমার ছুটির বিষয়ে অনুসন্ধান করিলাম-_ 
তাহার কোন গোল হয় নাই__ ১৫ই মার্চ হইতে তিন মাসের ছুটি পাইয়াছি__ 
কল্য আমার অবশিষ্ট বেতন আদায় করিয়৷ লইব। আহমদনগরই এখন আমার 
কর্মস্থল। কিন্তু আবার আসিষ্টাণ্ট জজের পদ পাইবার চেষ্টা দেখিতেছি, 
শুনিলাম পুণায় একটা খালি আছে।' 

জ্ঞানদা পালটা চিঠিতে জানতে চান, তুমি কী খাও, কেমন স্বাদের খাবার 
খাও জানাবে? যাতায়াতে পথে খাওয়াদাওয়ার কোনও কষ্ট হয়নি তো? 
তোমার সঙ্গে এই বিচ্ছেদ আর ভাল লাগে না। এমন করে কতদিন যে 
তোমাকে ছেড়ে থাকতে হবে! 

সত্যেন জবাব দিলেন, 


'পথিমধো বিশেষ কোন কষ্ট হয় নাই। কল্য দাসপুরে সন্ধ্যার একটু পূর্বে 
পৌছিয়া সুপ মাংস পীচ প্রভৃতি বিলক্ষণ ফলার করিয়া লইলাম। সঙ্গে যে 
আহার সামস্ত্রী ছিল, তাহা প্রায় খুলিতে হয় নাই। রৌদ্রের উত্তাপও বিশেষ 
কিছুই বোধ হইল না। আমি যে গাড়িতে ছিলাম, তাহা আর কেহ অধিকার 
করে নাই, সমস্ত পথটা একাকীই চলিয়াছি। সঙ্গীর মধ্যে এক হৈমবতী পুস্তক, 
তাহাকে লইয়া আর কতক্ষণ থাকিতে পারি। তবে বসিয়া শুইয়া ভাবিয়া ত 
একপ্রকার কালক্ষেপ করিলাম। কল্য সন্ধ্যার সময় “নব ইন্দ্ুকলা' দেখিয়া 
তোমাকে মনে পড়িতে লাগিল-_ দেখিতে দেখিতে তাহা অস্ত গেল-_ 
আমিও শয়ন করিলাম। 

তোমাতে আমাতে এবার এক বৎসরের জন্য বিচ্ছেদ হইবে কাহার মনে 
ছিল কিন্তু তাহাই ঘটিল। বোধহয় কোন দেবতা আমার প্রতি রুষ্ট হইয়া 
আমাকে, যক্ষের অনুরূপ 'বধভোগা কান্তা বিরহ গুরু' শাপ দিয়া থাকিবেন। 
এক্ষণে আর কি করা যায়। ঈশ্বরের প্রতি লক্ষ্য করিয়া ও কর্তব্য সাধন মনে 
করিয়া এক বৎসর কাল কোন মতে ধৈধ্য ধরিয়া থাক; তোমার যখন যাহা 
প্রয়োজন হয় তাহা জানকীকে বলিলে তাহা আনিয়া দিবে। আর যদি কিছু না 
পাও ও তোমার কোনরূপ কষ্ট হয়, আমাকে লিখিলেই আমি তাহার উপায় 


৫ ৯ 


করিয়া দিবার চেষ্টা দেখিব। তোমার যে কোন অসুখ হয়, একজন কাহাকেও 
সব খুলিয়া বলা অত্যন্ত আবশ্যক__ গোপন করিলে অনেক অনিষ্ট হইবার 
সম্ভাবনা। রাজেন্দ্রবাবু তোমাকে যত্ব করিয়া দেখিবেন তাহাতে আমার কোন 
সন্দেহ নাই। তোমার যখনি আবশ্যক হয় তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইবে।' 


কত নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ হয় সত্যেনের, তাদের বর্ণনা পড়তে 
জ্ঞানদার ভারী মজা লাগে। সত্যেনের চিঠিতে ছবির মতন ভেসে ওঠে কত 
মানুষ, এক ভোজসভায় আলাপ হল এক কালাসাহেবের সঙ্গে। 


“কৃষ্ণবণ পুরুষ__ প্রথমেই কেমন নিতান্ত ফিরিঙ্গি ফিরিঙ্গি বোধ হইল। তাহার 
এ দেশের কিছুই আর ভাল লাগেনা । [০851 739০1 ও 7০০ ভিন্ন দেশীয় সামগ্রী 
সকল তাহার মুখরোচক নহে। ভিক্টোরিয়া রাণীর নিতান্ত অনুগত ভক্ত দাস। 
তাহার পিতা হইতে স্বতন্ত্র বাস করিতেছে। ইংলগ্ডের জলবাযু-_ লগুনের 
কর্দাম-ধূম কোওাসা-_ মেঘ বাষ্প প্রভৃতি তাহার পক্ষে অতীব তৃপ্তিকর। আর 
এ দেশের জলবায়ু সৃধ্যকিরণ অসহনীয়। তাহার কথাবার্তা শুনিয়া আমাদের 
অত্যন্ত বিরক্তি বোধ হইল। আমরা যত পারি ইংলগ্ডের নিন্দা করিল'ম ও সে 
দেশের জনসমাজের যে সকল কুপ্রথা তাহা বলিতে লাগিলাম। তাহা শুনিয়া 
যেন সে কিছু অপ্রস্তত হইল।' টা 


পশ্চিমে থাকতে জ্ঞানদার সঙ্গে বেশ ভাব হয়েছিল মিসেস অলিফ্যান্ট-এর। 
জ্ঞানদা সত্যেনের কাছে জানতে চাইলেন তার কথা, সত্যেন স্ত্রীর বন্ধুর সঙ্গে 
দেখা করে এসে লিখলেন, 


“এখানে কাল 01137970দের সহিত 7107 করিলাম। 75. 011)47 তোমার 
কথা অনেক জিজ্ঞাসা করিলেন-__ যথা তুমি ঘোড়ায় চড়িতে শিখিয়াছ কি 
না-_ কলিকাতা থাকিতে ভালবাস কি না ইত্যাদি। আমি 415. 0-কে বলিলাম, 
যদি তুমি আহমদাবাদে তাহাকে ঘোড়ায় চড়িতে শিখাইতে তবে শিখিতে 
পারিতেন, কিন্তু এখন আর তাহার যো নাই। আর বলিলাম, কলিকাতার 
আর সকল ভাল লাগে, কেবল যদি মনের মত থাকিতে পার। আমাদের 
সকল পরিবারেরা কেমন একত্রে মিলিয়া একগৃহে বাস করে, তাহা বলিলাম। 
৬০ 


তুমি বোধ করি 115. 011001071-কে সৌদামিনীর কথা বলিয়া থাকিবে, তাই 
জিজ্ঞাসা করিতেছিল তাহার সহিত সেখানে সাক্ষাৎ হয় কিনা? 


জোড়ার্সাকোর আনন্দের আসরে একটু মনমরা হয়ে থাকেন জ্ঞানদা। এমনিতে 
তিনি এখন অন্তঃসত্বা, কোনও দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়। তবু মাঝে মাঝে 
উদ্বিগ্ন হন। নতুন বউ এসে তার গুরুত্ব কি একটু কমে যাচ্ছে এ-বাড়িতে ? ওই 
একটা নিরক্ষর বালিকার প্রতি এত মনোযোগ দিচ্ছে কেন নতুনঠাকুরপো? 
এমনকী পুঁচকে বালক রবিও তার থেকে মাত্র কয়েক বছরের বড় নতুন 
বউয়ের পেছন পেছন ঘুরছে। বোধহয় তার চেলি ও গয়নার ঝকমকানিতে 
আকৃষ্ট হয়েছে সে। এই বালিকা কী করে উজ্জ্বল জ্যোতির সহধর্মিণী হবে£ 
পরিশীলনে পরিমার্জনায় জ্যোতির মন যে উচ্চ তারে বাঁধা হয়ে গেছে, 
বালিকা কী করে তার নাগাল পাবে? হাসি পায় জ্ঞানদার, দুঃখও হয়। 

জোড়ার্সাকোর মেয়েমহলে প্রাণ হাপিয়ে ওঠে জ্ঞানদার। বিবির কাছে 
ইংরেজি শেখেন, বাচ্চার জামা সেলাই করাও শিখছেন। বাংলা, ইংরেজি 
উপন্যাস পড়ে, চিঠি পড়ে তার দিন কাটে আলস্যে। জ্যোতি কাদম্বরীরা 
অনেকেই বোলপুরে হাওয়া বদলাতে গিয়েছেন। জ্ঞানদা সত্যেনের কাছে 
করে দিতে। সত্যেন দুশ্চিন্তায় পড়েন। ঠাকুরবাড়ির চার-দেওয়ালে আটকে 
পড়া জ্ঞানদাকে কী করে মুক্তি দেবেন? অথচ তাকে তো একলা অন্য বাড়িতে 
রাখা যায় না! 


এখন ত তোমার অনেক কষ্টে দিন খাইতেছে। কাল বাবামহাশয়ের 
ছবিশুদ্ধ তোমার পত্র পাইয়া তবুও কতকটা সুস্থির হইলাম। তোমার গঙ্গার 
ধারে থাকিবার ইচ্ছা হয় ত নিকটে কি কোন বাড়ী পাইতে পার না? তোমার 
সঙ্গে বাড়ীর কাহাকেও পাও আর ডাক্তারদের হইতে দূর না হয়, তবে ক্ষতি 
নাই, কিন্তু এখন বড়ই সাবধানে থাকা প্রয়োজন।' 
না-_ বাবামহাশয় ইহার মধ্যে ত বাড়ী আসিবেন, না জানি তাহার কি মত? 
আর তুমি ত পাঁচিধোবানির গলিতে কোন বাড়ী লইয়া থাকিতে পারিবে না__ 


৬১ 


একটা ভাল স্থানে বাঙালীটোলায় বাড়ী পাওয়া সহজ নহে। তবে যদি কোন 
বাগানে গিয়া থাকিতে ইচ্ছা কর। সে এক কথা।' 


“..কি বল জ্ঞেনু£__ কৈ তোমার ও নতুন বৌয়ের ছবি পাঠাইলে না, 


সত্যেন বারবারই নতুন বউয়ের ছবি দেখতে চান। জ্ঞানদা বারবারই তা 
পাঠাতে ভুলে যান। ফোটোগ্রাফার ডেকে ছবি তোলানো কিছু কঠিন নয়, 
আজকাল ঠাকুরবাড়ির অন্দরেও তারা ছবি তুলতে আসে। কিন্তু নতুনবউ 
এসে তার বাল্য সহচর জ্যোতিকে ছিনিয়ে নিয়েছে জ্ঞানদার কাছ থেকে। খুব 
একা লাগে, মনখারাপ হয়। ছবি পাঠানো আর হয়ে ওঠে না। 

ইতিমধ্যে সত্যেন টাঙ্গাগাড়ি কিনেছেন, কুকুর পুষেছেন। বাংলোবাড়িতে 
আস্তানা গেড়ে স্ত্রীকে লেখেন, 


“আমি এক নতুন খবর তোমাকে লিখিতে ভুলিয়াছি। আমি এক গরু কিনিয়াছি 
ও কাল তাহার এক বৎস হইয়াছে। শুনিতেছি /৫ সের দুধ দেয় ও ৫০ টাকা 
দাম। দুধ দেখিয়া দাম দিব। তার নাম কি রাখিব? তোমাদের বাড়ীতে লক্ষ্মী 
বলিয়া এক গরু ছিল, তাহাকে তুমি ভালবাসিতে-__ এর নামও লশ্ষ্নী রাখি__ 
কি বল? তোমার চিঠি দুই দিন পাই নাই, তোমার শরীর কেমন, কিছু কি ভাল 
হইয়াছে, 


দু'জায়গায় সংসার চালাতে টাকার জোগাড় করতে সকলে দুশ্চিন্তায় পড়েন 
মাঝে মাঝেই। জ্ঞানদা জোড়ার্সীকোয় থাকলেও তার জন্য মেমসাহেব 
শিক্ষিকা রাখার খরচ বা বিশেষ বিশেষ বইপত্রের টাকা সত্যেনকেই 
পাঠাতে হয়। রোজগেরে পুত্রের হাতিখরচ দেওয়ার ব্যাপারে দেবেন 
ঠাকুরের কিছু আপত্তি আছে। অথচ ওই ১০০ টাকা পেলে জ্ঞানদার কাজে 
লাগে। সত্যেন বাবামশায়কে চিঠিতে টাকা বন্ধ না করার আবেদন জানান। 
রোজগার করলেই কি পুত্র তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন? জ্ঞানদাকে 
লেখেন, 


“আগামী মাসে তোমাকে টাকা পাঠাইতে পারিব কিনা সন্দেহ, কারণ 


৬২ 


গাড়ীঘোড়া জিনিষপত্র কিনিতে অনেক খরচ হইয়াছে। বোধ করি আগষ্ট মাসে 
একেবারে ২, ৩ শত টাকা পাঠাইতে পারিব। তুমি যদুর কাছ থেকে ত মাসে 
মাসে কতক পাইবে আর বাবামশায় যদি ১০০ টাকা এখনো দিবার অনুমতি 
করেন তাহা তোমার হস্তে দিবার জন্য জানকীকে লিখিয়াছি।__ যদি এখানে 
/8515/1 জজের কন্ম পাই তবে বেশ হয়। তাহার অনেক সম্ভাবনা আছে। 
হয়ত এবারকার গ্যাজেটে তাহার কিছু থাকিতে পারে। আমার প্রেম ও রাশি 
রাশি চুহ্বন।” 


অন্যদিকে জ্ঞানদার মনে হয় সত্যেন ওখানে সুখেই আছেন, কত বন্ধুবান্ধব, 
কত ভোজসভা, কত নতুন জায়গায় ভ্রমণ। এ-সবেই তার সঙ্গী হওয়ার কথা 
অথচ গর্ভিণী বলে আটকে থাকতে হচ্ছে এই সেকেলে শ্বশুরবাড়িতে। 

সত্যেন ৬৫০ টাকা মাইনের আ্যাসিস্টান্ট জজ হয়েছেন আহমেদনগরে। 
প্রায় সন্ধেবেলাই কোনও না কোনও সাহেবের বাড়িতে গিয়ে সৌজন্যসাক্ষাৎ 
করতে হয়, এটাই নিয়ম। কয়েকদিনের মধ্যে এত মেমসাহেবের সঙ্গে আলাপ 
হয়েছে যে মুখ মনে রাখতে পারছেন না। তার মতে, 

“এখানে অনেক গুলি বিবি আছে-_ একবার দেখা করিয়া সকলকে চিনিয়া 
উঠা কঠিন-__ এক দঙ্গল মেষপালের মধ্যে যেমন এক মেষকে অন্য হইতে 
চেনা দুঙ্কর। নিতান্ত কুৎসিত কি নিতান্ত সুন্দরী যে, তাকেই একবার দেখিয়া 
জানা যায়। এখানে কন্মের বড় অধিক জঞ্জাল নাই, পড়িবার অনেক সময়। 


জ্ঞানদা রোজ চিঠি পান, 
“আমচী জ্ঞেনুমণি, 

এখন অনেক সময় একলা থাকিতে হয় বলিয়া এক একবার বড় বিরক্ত 
বোধ হয়। ১০টার পর নাস্তা করিয়া তারপর দুই প্রহরের সময় কাচারিতে 
যাই, সেখানে দুই তিন ঘণ্টা থাকিয়া আবার আসিয়া চা খাই ও কিঞ্চিৎ পরে 
সন্ধ্যার সময় একবার বেড়াইতে যাই। কাল চলিয়া দেখিলাম কত পথ চলিতে 
পারি। প্রায় আধ ক্রোশ চলিয়াও বিশেষ কষ্ট বোধ হইল না, ক্রমে চলা 
অভ্যাস করিতে হইবে। রাত্রে এখন মন্দ ঘুম হইতেছে না, মশা নাই এক বড় 
সুবিধা, মশারিও দিতে হয় না। তোমার আসিবার আর কত বিলম্ব হইবে 
বোধ কর? 


৬৩ 


... কতদিন হইল আমরা বিচ্ছিন্ন হইয়াছি। বোধ হইতেছে যেন অনেক 
দিন_- অনেক মাস-_... 

...“আমার এখন কেমন কিছুই ভাল লাগে না-- আমি আপনার প্রতি 
বিরক্ত __-এখানকার লোকজনের উপর বিরক্ত-_ কাহারও সঙ্গে মিশিতে 
ইচ্ছা হয় না। ইংরাজদের সঙ্গে মিলিবার স্থান 0১711079792, 3910 50874 
প্রভৃতি আছে-_ কিন্তু সেখানে যদি যাই, অনিচ্ছার সহিত যাই। আর বিবিদের 
সেই একরকম কৃত্রিমতা আমার ভাল লাগে না। আমার এখন ক্রমশই প্রতীতি 
জন্মিতেছে যেন ইংরাজদের সঙ্গে আমাদের যে জাতীয় প্রভেদ তাহা ভাঙ্গিবার 
নহে। যাহা কিছু মিল হয় মৌখিকমাত্র। ইংলগ্ডে আমার. মত একরকম ছিল। 
এখানে উল্টিয়া যাইতেছে।" 


আশ্বিনের এক রাতে জ্ঞানদার ব্যথা উঠল। সারদা খবর পেয়ে দাইকে ডেকে 
পাঠালেন। রাতে আসার জন্য দাই একটু টাকা বেশি চাইলেও শেষে আট 
টাকায় রাজি করানো গেল। আতুঁড়ঘর উঠোনের এককোণে। নাড়ি কেটে দাই 
আতুঁড়ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল শিশুটিকে কোলে নিয়ে, পুত্রসস্তান দেখে 
মেয়েরা শঙ্খ বাজিয়ে উলুধবনি করে নবজাতককে স্বাগত জানালেন। নাতির 
মুখ দেখে খুশি হয়ে সারদা একটি নতুন ধনেখালি শাড়ি ও প্রচুর মিষ্টি দিয়ে 
দাই-বিদায় করলেন। রর 

পরদিন ভোরেই দুধমা ও ধাইমা ডেকে আনা হল। ঠাকুরবাড়িতে প্রায়ই 
শিশু জন্মায় বলে বেশ কয়েকজন বাঁধা দুধমা ও ধাইমা আছে, তারাই পালা 
করে সামলে দেয়। কিন্তু এবার একটা গণ্ডগোল হল। নবজাতক দুধমায়ের 
স্তন্যপান করতে করতে তীব্র স্বরে কেদে উঠল। 

জ্ঞানদা অস্থির হয়ে পড়েন, বাচ্চা কাদে কেন? পেটব্যথা নাকি অন্য কিছু? 
তিনি ধাইয়ের কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে বাচ্চাকে থামাতে চেষ্টা 
করলেও শিশুর কান্না থামে না। সাহেব ডাক্তারের ওষুধ পড়ল, তাও বাচ্চা 
নেতিয়ে পড়ছে কেন? দু'দিন কান্নার পর কেউ কিছু বোঝার আগেই শিশুটি 
মারা গেল। প্রথম সন্তানের মৃতদেহ কোলে নিয়ে সারারাত বসে রইলেন 
জ্ঞানদা। তার চোখের জল যেন শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে। 

কয়েকদিন পর সত্যেনের চিঠি এল, 


৬৪ 


১১ই অক্টোবর জানকীর পত্রে দেখিলাম তোমার একটি পুত্রসন্তান জন্মিয়াছে-_ 
আজ তোমার তেরই-এর পত্রে তাহার মৃত্যুসংবাদ পাইলাম। ইহাতে আর কাহার 
দোষও-_ তোমারই কি দোষ, ডাক্তারদেরই কি দোষ। জন্মমৃত্যুর উপর আমাদের 
ত হাত নাই__ আমরা নিয়মমত থাকিবার চেষ্টা করিতে পারি, তাহাই কর্তৃব্য। 
এক্ষণে তোমার শরীরে বল পাইলেই আসিতে পার-_ দুই এক মাস না গেলে 
হয়ত বল পাইবে না। তুমি যেমন যেমন থাক আমাকে লিখিবে ও তুমি বেশ ভাল 
হইলে তোমার আসিবার কোনরূপ ব্যবস্থা করা যাইবে।' 

শোকার্ত জ্ঞানদাকে কিছুদিনের জন্য পেনেটির বাগান-বাড়িতে নিয়ে আসা 
হল। জ্যোতি, সারদাপ্রসাদ, হেমেন, সৌদামিনীরা তার সঙ্গী হয়েছেন। গঙ্গার 
সংস্পর্শে তার মন যদি কিছুটা আরাম পায়। মৃত সন্তানের জন্য তার প্রথম 
অশ্রপাত ঘটল এখানেই। 

এই শোকের সময় জ্যোতি তাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। 
মেজোবউঠানকে সঙ্গ দেবেন বলে কাদন্বরীকেও সঙ্গে আনেননি এবার। 

গঙ্গার ঘাটে বসে বসে ওঁদের বেশি সময় কাটে। ওপারে কোন্নগরের 
বাগানে ঘাঁটি গেড়েছেন ও-বাড়ির গুণেন্দ্ররা। বাড়ি ভাগাভাগির পরেও গুনো 
আর জ্যোতির খুব ভাব। তারা একসঙ্গে বৌবাজার আট স্কুলের প্রথম বছরের 
ছাত্র ছিলেন। মাঝে মাঝেই বিকেলবেলা ওপারের পানসি এপারে আসে। 
এপারের পানসি ওপারে যায়। 

বন্দুকের আওয়াজে তারা একে অপরকে সিগনাল পাঠান। এপারের থেকে 
গুলি ছোড়েন গুণেন্দ্র। ওপার থেকে জ্যোতির বন্দুক জবাব দেয়। 

গুণেন্দ্র ভারী শৌখিন পুরুষ। নানারকম মহার্থ শিল্পবস্ত সংগ্রহ করেন 
তিনি। স্ত্রীর আয়নার সামনে সাজিয়ে দিয়েছেন অসামান্য একটি স্কটিকের 
টিউলিপ দেওয়া ফুলদানি। যতবার আয়নায় তার মুখের ছায়া পড়ে, ততবারই 
মুখের পাশে ভেসে ওঠে টিউলিপগুচ্ছ। 

কোন্নগরের বাগানে আবার অন্যরকম মজা। কতরকম লোক আসে। 
এক নাপিত কাঠবেড়ালির ছানা এনে দেয়। বাবুইপাখির বাসা জোগাড় করে 
আনে। বহুরূপী এসে নাচ দেখায়। 

বারান্দার বাইরে ছোট চালাঘরে মেয়েরা রান্নার তদারকি করছেন। 
কাঠালতলায় চৌকি পেতে আসর জমিয়েছেন গুণেন্দ্র, জ্যোতি, যদুনাথেরা। 


৬৫ 


কোন্নগরের রাস্তা থেকে এক বালক গায়ককে ধরে এনেছেন গুণেন, 
ছেলেটি ভারী মজার। ব্ল্যাকওয়ার নামে এক সাহেব রোজ ঘোড়ায় চড়ে 
ভ্রমণের পর গয়লাপাড়ায় গিয়ে গয়লানির কাছে এক পো দুধ খেতা পাড়ার 
লোকে তাই নিয়ে গান বেঁধেছে। গুণেনের নির্দেশে অর্গান বাজিয়ে সেই 
গানটি শোনায়। 


'হায় রে সাহেব বেলাকর 

আমি গাই দেব, তুই বাছুর ধর 
ওটি শিষ্ট বাছুর গুতোয় নাকো-_ 
কান দুটো ওর মুচড়ে ধর। 
হায়রে সাহেব বেলাকর। 


গান শুনে হা হা করে হেসে ওঠেন জ্যোতি ও গুণেন। 

গঙ্গাতীরে বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে বসে জ্যোতি একদিন তার শকুস্তলা 
অনুবাদ শোনাচ্ছিলেন জ্ঞানদাকে। জ্যোতির কাব্যের অপুৰ ভাষায় ছন্দে 
জ্ঞানার মনে আনন্দ ফিরে আসছিল। একে একে হেমেন, মদুনাথ ও 
সারদাপ্রসাদ এসে জড়ো হলেন। 

কিছুক্ষণ কাব্যপাঠের পর জ্যোতিরিন্দ্র-একটু থামতেই যদুনাথ জানতে 
চান, ভায়। তোমার কাব্য তো অতি সুন্দর। কিন্তু এই রচনার নেপথ্য প্রেরণা 
কোন সুন্দরী? 
বিদগ্ধ সান্নিধ্যেই জ্যোতির উদ্ভাস। কিন্তু সে-কথা প্রকাশ্যে বলার নয়। 
ভায়রা, তুমি কি জানো না, সদ্যবিবাহিত তরুণ কবির মনে যে শকৃস্তলার 
ছবি ফুটে উঠছে সে আমাদের কাদম্বরী। 

লাজুক মুখে জ্যোতি জানালেন এরকম বেরসিকদের সামনে তিনি কাব্যপাঠ 
করতে চান না। ভাইকে লজ্জারুণ দেখে রাশভারী হেমেন উঠে যান। যদু তখন 
হাত ঘুরিয়ে নেচে নেচে জ্যোতিকে কাদন্বরীর নাম ধরে খ্যাপাতে থাকেন। 
জ্ঞানদা ভীষণ বিরক্ত বোধ করেন, মনে হয় কাদন্বরী এ যাত্রায় ওদের সঙ্গী না 
হলেও তিনিই যেন আসরের মধ্যমণি। 


৬৬ 


জ্ঞানদা যেখানে যান সেখানে সাধারণত তিনিই রানিমৌমাছি। তাকে ঘিরে 
দিশি বিদেশি পুরুষেরা বিস্মিত হন, স্ততি করেন। সত্যেনের বন্ধু ম্যাকগ্রেগর 
সাহেব কতবার বোম্বাই ও আমেদাবাদের পার্টিতে সমবেত বহু মহিলার মধ্য 
থেকে তীকেই বেছে নিয়ে মুগ্ধতা জানিয়েছেন। নাচের আসরে তাঁকে ছাড়া 
আর কারও সঙ্গেই ডান্স করতে চান না ম্যাকগ্রেগর। সত্যেন স্বয়ং তাকে 
নিয়ে কত গৰ করেন। জ্যোতিও তাকে মাথায় করে রাখে। কিন্তু এখন, এই 
গঙ্গাতীরের বাগান-বাড়িতে হঠাৎ মনে হয়, এখানে তিনি প্রধান আকধণ নন, 
অন্য কেউ। প্রিয়জনেরা সবাই তাকে সাস্তবনা দেওয়ার জন্য ঘিরে আছেন, 
জ্যোতিও সেজন্যই এখানে একা এসেছেন, নতুনবউকে আনেননি। কিন্তু 
নতুনঠাকুরপোর মন পড়ে আছে কাদন্বরীর আঁচলেই। 

জ্কানদা এসবের অনেক উধ্র্বে। তাকে অনেক দূর যেতে হবে। এ-সব 
কথাবাতা ত্বার অসহ্য লাগে, এই বিচ্ছিরি আসর ছেড়ে তিনি ঘাটের অবারিত 
সৌন্দর্যের দিকে পা বাড়ান। 

জ্যোতি দেখলেন গোধূলি আলোয় রহস্যময়ী নারীর মতো ধীরে ধীরে 
নদীর জলে পা ভেজাতে নেমে যাচ্ছেন জ্ঞানদানন্দিনী। মুহূর্তের জন্য তার 
ভ্রম হয়, এ নারী কে, মেজোবউঠান না তার নাটকের শকুস্তলা! জলে নেমে 
এইবার বোধহয় তাঁর আংটি খোয়া যাবে! 

কিছুক্ষণ পর জ্যোতিও জলের ধারে নেমে গেলেন। মেজোবউঠানের 
পিঠে হাত রেখে বললেন, চলো ঘরে বসে গান-বাজনা করা যাক। এখানে 
ঠান্ডা বাতাস লেগে যাবে। 

জ্ঞানদা জ্যোতির হাত ধরে বললেন, চলো নতুন, এখানে আর ভাল 
লাগছে না, জোড়ার্সাকো ফিরে যাই চলো। 

জ্যোতিও হাফ ছেড়ে বাচলেন। এখন যে ঘরেই তার পিছুটান। 

এর অল্পদিন পরেই স্টিমারে বোম্বাই ফিরে গেলেন সদ্য সম্তানহারা জ্ঞানদা। 
বাড়ির দুই জামাই সারদাপ্রসাদ ও জানকীনাথ সে-যাত্রায় তার সঙ্গী হলেন। 


পশ্চিমে বসেও জোড়ার্সাকোর সব খবর পান জ্ঞানদা। জ্যোতি বেনামে 
“কিঞ্চিৎ জলযোগ” নামে একটি প্রহসন লিখেছেন। আশ্চষের ব্যাপার এই 
নাটকে ব্রাহ্গিকাদের স্ত্রীস্বাধীনতাকে কটাক্ষ করা হয়েছে এবং কলকাতার 
বিভিন্ন পত্রিকায় তা নিয়ে যথেষ্ট বাদানুবাদ শুরু হয়ে গেছে। 


৬৭ 


ক্ষুব্ধ সত্যেন এসে জ্ঞানদাকে ধমনতত্ব পত্রিকার রিভিউ পড়ে শোনান, 
“আমরা শুনিয়া যারপরনাই দুঃখিত হইলাম যে “কিঞ্চিৎ জলযোগ” 
নামক একখানি নাটক সম্প্রতি প্রকাশিত হইয়াছে। এই পুস্তকে ভারতাশ্রম, 
ব্রন্মমন্দির, প্রচারকগণকে বিলক্ষণ গালি দেওয়া হইয়াছে, ব্রান্মিকাদিগকেও 
ইহার মধ্যে আনিয়া গ্রন্থকত্তা যথোচিত আপনার নীচতা ও বিকৃত স্বভাবের 
পরিচয় দিয়াছেন। আমরা এ কথা শুনিয়া অবাক হইলাম যে উক্ত গ্রন্থকর্তা 
কলিকাতা ব্রান্গসমাজের ভক্তিভাজন প্রধান আচাধ্যের পুত্র।' 

জ্ঞানদাও খুব বিরক্ত হন, আমাদের নতুনঠাকুরপো কী করে এরকম 
নারীবিরোধী নাটক লিখতে পারেন, মেয়েপুরুষ একসঙ্গে প্রার্থনাসভায় বসছে 
বলে ব্যঙ্গ করতে পারেন, আমি ভেবে পাচ্ছি না। শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়েকে 
বিয়ে করে এত অধঃপতন! ছি ছি! 

আবার বঙ্কিমচন্দ্র কেমন তাতে ধুনো দিয়েছেন দেখো, সত্যেন বলেন, 
বঙ্গদশনে কত প্রশংসা বেরিয়েছে। রাজা রাধাকান্ত দেব ডেকে নিয়ে তার 
নাটমন্দিরে মঞ্চস্থ করিয়েছেন। মধুসুদনের “একেই কি বলে সভ্যতা” আর 
“কিঞ্চিৎ জলযোগ” একসঙ্গে অভিনীত হয়েছে শনিবার। 

জ্যোতি কেন রক্ষণশীলদের দলে গিয়ে ভিড়ল বলো তো? জ্ঞানদা অবাক 
হন, আমার তো মনে হয় নতুনবউ ওর মাথাট্রা খাচ্ছে। এইজন্যই শিক্ষিত 
মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। বাবামশায় আপত্তি করলেন, এখন 
বুঝুন তিনি, জ্যোতি তো তার বিরুদ্ধেই কলম ধরেছে। 

জ্যোতিটা একটু ওরকমই, সত্যেন বললেন, জ্ঞেনু তোমার মনে নেই 
আমরা মেয়েপুরুষ মিলে গাড়ি করে ময়দানে হাওয়া খেতে বেরলে জ্যোতির 
কেমন অস্বস্তি হত, তোমাকে গাড়ির পরদা তুলতে দিত না। তারপর অনেক 
বুঝিয়ে সুঝিয়ে পরদা তোলা গেল তো মেয়েদের জন্য ঢাকা গাড়ির বায়না। 
তুমি এখানে এমন খোলা গাড়িতে ঘুরছ দেখলে জ্যোতির বোধহয় লজ্জায় 
মাথা কাটা যাবে। আর নিজের বউকে বোধহয় ঘরবন্দি করে রাখবে মা 
দিদিমার যুগের মতো। 

তুমি ওকে এখানে ডেকে পাঠাও। আমাদের সঙ্গে থাকলে ওর মনের 
ধোঁয়াশা কেটে যাবে। আমরা মেয়েরা কত সাহস করে এগিয়ে যাচ্ছি আর 
ওর মতো প্রতিভাবান ছেলে এমন পিছিয়ে থাকবে কেন? 

এখন কি আর ওকে একলা পাবে, এখন ওকে ডাকলে নতুনবউকেও 
৬৮” 


বলতে হবে। সেটা তোমার ভাল লাগবে কি বউ? জ্ঞানদা কাদন্বরীকে কতখানি 
অগছন্দ করেন সত্যেন সেটা বিলক্ষণ জানেন। 

হায়, রাহুগ্রস্ত টাদকে কে বাঁচাবে! অনালোকিত কাদন্বরীর গ্রাস থেকে 
প্রিয় দেওরটিকে কী করে রক্ষা করবেন? চাদে যে গ্রহণ লেগেছে। গভীর 
বিষাদে মৌন হয়ে যান জ্ঞানদা। 


রে 
% 


৫ 


স্বর্ণকুমারীর বোম্বাইবাস 


স্বর্ণকুমারীর বয়স এখন পনেরো। ঠাকুরবাড়ির বিখ্যাত রংরূপের সঙ্গে তেজি 
চালচলনে তাকে যেন আগুনের হলকা মনে হয়। জ্যোতিদাদার সঙ্গে দু'- 
একটি সভায় গিয়ে কবিতাপাঠ করেছেন ইতিমধ্যেই আর তাতেই যেন হইচই 
পড়ে গেছে কলকাতার তরুণ কাব্যপ্রেমী মহলে। ছিপছিপে কনকবর্না তরুণী 
কবিটিকে একটু দেখার জন্য ভিড় জমে যায় সভায় সভায়। 

শোভাবাজারের এক বনেদি বাড়ির কবিতার আসরে স্বর্ন সেদিন এলেন 
কমলা রঙের পাটোলা সিক্ক পরে, সঙ্গে তিনলহরী মুক্তোর হার। সবচেয়ে 
চোখে পড়ে মাথার ছোট্ট ট্রপি ও কপালে চুলের গুচ্ছে জড়ানো মুক্তোর 
টায়রা। তাকে দেখেই গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। স্বর্ণ নিজেও শুনতে পান 
নানারকম ফিসফাস আলোচনা। 

কেউ বলছে, আরে বাবা, মেয়ের সাজ দেখব না পদ্য শুনব! শুনেছি ইনি 
নাকি একটি কন্যার জননী। আবার কবিতাও লেখেন। 

উত্তরে আর-একজন বলে, আমি অবশ্য বিশ্বাস করি না এ-সব পদ্য ওই 
সাজুনি মেয়ের লেখা, নিশ্চয় দাদারা লিখে €দয় বোনের নামে। মেয়েদের 
আবার সাহিত্যচ্চা! কলি কালে কত কী দেখব! 

প্রথমজন বলে, তালে বোধহয় রূপের জোরে লেখা ছাপাচ্ছে, সম্পাদকেরা 
অমন চেহারা দেখেই কুপোকাৎ। 

আরে সম্পাদকেরা তো সব ঠাকুরবাড়ির প্রসাদ পাওয়ার জন্য বসে আছে। 
বিদ্যেসাগর ফিমেল এডুকেশন করেছেন, তাই দেখে দেবেনঠাকুর মেয়েকে 
সাহিত্যিক বানাচ্ছেন। ভাবছেন তরু দত্ত, জেন অস্টেন যদি পারে, তার ঘরের 
মেয়েই বা পারবে না কেন! 


৭০ 


স্বর্ণর এ-সব শুনে কান্না পায়, তার এত সাধনার কি কোনও দাম নেই 
এদের কাছে£ঃ অন্য সবাই যখন তাঁকে ধন্য ধন্য করছে তখনও এ-সব 
নিন্দুকদের কুকথা ভুলতে পারেন না তিনি। 

সভার মাঝখানে একবার জ্যোতিদাদার হাত চেপে ধরে বলেন, এখানে 
অনেকে বোধহয় আমাকে পছন্দ করছেন না, চলো আমরা ফিরে যাই। 

জ্যোতি অবাক হন, সেকী রে, সবাই যে তোর কবিতার কথাই বলছে! 
এ-সব বাজে কথা কে তোর মাথায় ঢোকাল? 

সবাই হা হা করে জ্যোতিকে সমর্থন করে। এমনকী যারা এতক্ষণ বাজে 
কথা বলছিল তারাও সামনে এসে স্ব্কুমারীকে বলে, সেকী আপনি চলে 
গেলে এই সভা যে অন্ধকার হয়ে যাবে! বিলেতের যেমন জর্জ এলিয়ট 
আছেন, আমাদের তেমন আপনি। অন্য মহিলারা যাঁরা বামাবোধিনীর পাতায় 
লেখার চেষ্টা করেন তারা কি লেখক নাকি? 

লোকের ভণ্ডামি সইতে পারেন না স্ব্ণ। প্রতিবাদ করে বলেন, ওভাবে 
বলবেন না, ওঁরা অনেক অসুবিধের মধ্যে দিয়ে চেষ্টা করছেন, অনেকেই 
ভাল লেখেন। আমি তো ওঁদেরই মতো, সবে শুরু করেছি। 

একজন তাচ্ছিল্য করে বলে ওঠে, আহা কীসে আর কীসে... 

এবার জ্যোতি ঠাকুর বিরক্তি প্রকাশ করলে আসরের করতাব্যক্তিরা 
গোলমেলে লোকদের কয়েকজনকে সরিয়ে নিয়ে যান। আবার কবিতাপাঠ 
শুরু হয়। 


ঠাকুরবাড়িতে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে স্বর্ণকুমারী ও জানকীনাথের মেয়ের 
নামকরণ অনুষ্ঠান আর বর্কুমারীর বিয়ের তোড়জোড়। পরপর দুটি উৎসব 
তাই সবার মনেই সাজো সাজো রব। দেবেন ঠাকুর প্রত্যেক বাচ্চার জন্মের 
ছ"মাস থেকে একবছরের মধ্যে সুবিধেমতো দিনে মুখেভাত ও নামকরণ 
করার নিয়ম করেছেন। তিনি হিন্দুদের মতো অন্নপ্রাশন বলেন না, কিন্তু 
সেরেস্তার কম্নচারীরা ওই অন্নপ্রাশন বলেই হিসেব লেখেন। 

স্বর্ণর মেয়ের নামকরণ অনুষ্ঠানটি পেনেটির বাগান-বাড়িতে বেশ ধুমধাম 
করে সম্পন্ন হল। রবির জন্মের পর থেকেই এ-বাড়ির অন্নপ্রাশন ব্রা্মমতে 
হয়ে আসছে। এ ব্যাপারে দেবেন ঠাকুর একটি সুন্দর প্রথা চালু করেছেন। 
নামকরণ উপলক্ষে একটি পিঁড়িতে শিশুর নাম লেখা হল “হিরণ্নয়ী'। তার 


৭৯ 


মোমবাতি লাগিয়ে দিল। নামের চারদিকে মোমের আলো জ্বলে ওঠার পর 
স্বর্ণর মনে হয় তার মেয়ের নামের ওপর যেন বাবামশায়ের আশীবাদ ঝরে 
পড়ছে। 

জানকীনাথের অবশ্য একটু মনখারাপ তার বাবামায়ের অনুপস্থিতির কথা 
ভেবে। তার মনে হয়, স্বণণর মতো পুত্রবধূ পাওয়া যে কত ভাগ্যের ব্যাপার তা 
তো আমার বাবামশায় বুঝলেন না, এখন কি নাতনিকেও দেখতে আসবেন 
না! 

গোঁড়া হিন্দুরা না এলেও বাড়িতে লোকজন অনেক। দেবেন ঠাকুর 
যথারীতি সারদার হাত দিয়ে নাতনির জন্য সোনার বিছেহার আশীবাদী 
পাঠিয়েছেন। জয়পুরি সাদা পাথরের থালা বাটি গেলাসের পারিবারিক 
হয়েছে মেয়ের জামা সেলাই করার জন্য রাশিকৃত রেশমি ছিট কাপড়। সবাই 
হিরণকে কোলে নিয়ে মাতামাতি করছে, এত সুন্দরী মেয়ে হয়েছে বলে। 

সব অতিথি চলে গেলে বিকেলের মরা আলোয় স্বর্ণ ও জানকীনাথ ঘাটে 
এসে বসলেন, জানকীর কোলে হিরপ্ময়ী। 

আমি যে আজ কত খুশি তা তুমি ভাবতেও পারছ না স্ব, গবিত বাবা 
জানকীনাথ বললেন। শুধু বাবামশায়ের অভাবটা মনে আসছে এত আনন্দের 
মধ্যেও। 

স্বর্ণ আদুরে গলায় বলে ওঠেন, তুমি কি এখন শুধু মেয়েকেই ভালবাসবে, 
আমার আদর ফুরিয়ে গেল! 

স্বর্ণ, তোমার জন্য আমি জননী জন্মভূমি ছেড়েছি, এখন যদি বলো 
মেয়েকে ছাড়তে, তা পারব না। কৌতুক কুরে জানকী বলেন, অত পরীক্ষা 
নিয়ো না সখী। 

সাহা কত ভালবাসা জানা আছে, এই তো সেদিন বলছিলে বোম্বাইতে 
মেজোদাদার কাছে পাঠিয়ে দেবে আমাকে। আর ভাল লাগছে না বুঝি? 

স্বর্ণ, স্বর্ণ, সে দু'-তিন বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে। তুমি তো সেখানে 
আরামে থাকবে, আমিই একা একা কষ্ট পাব। কিন্তু তুমি যখন দু'বছর পর 
ঘষে মেজে ঝকঝকে কেতাদুরস্ত হয়ে ফিরে আসবে, সেদিনটা ভেবে শবে 
আমার বুক ভরে যাচ্ছে। 
৭২ 


মেজোবউঠানের সঙ্গে বসে বসে এ-সব ষড়যন্ত্র করেছ তাই না? স্বর্ণ বলেন। 
কিন্তু তোমরা যা ভাবছ তা কী করে হবে? মেয়েকে সেখানে দেখাশোনা 
করতে হবে, অত পড়াশোনা কখন করব? 

সেটা তুমি মেজোবউঠানের ওপর ছেড়ে দাও স্বর্ণ, তিনি যখন তোমার 
দায়িত্ব নিয়েছেন তখন আমি নিশ্িন্ত, সব ব্যবস্থা তিনি ঠিকঠাক করবেন, 
জানকীনাথ আশ্বস্ত করেন। 

মেজোবউঠানকে তোমার খুব পছন্দ তাই না, তুমি চাও আমি অবিকল 
তার মতো হই। স্বর্ণ বললেন একটু অভিমানের স্বরে, আমার লেখার টেবিলে 
আমি যে সবার চেয়ে আলাদা তা বুঝি তোমার চোখে পড়ে না? 

জানকী মেয়ে সমেত পঞ্চদশী স্ত্রীকে কাছে টেনে হেসে ওঠেন, স্বণ তুমি 
এখনও বড় হলে না। অবশ্য সেটাই তোমার দুনিবার আকষণ। 

তা হলে দূরে পাঠীচ্ছ কেন, আমার যে তোমাকে ছেড়ে থাকতে একদম 
ভাল লাগে না, স্বর্ণ ঠোট ফোলান। 

জানকী বলেন, তুমি এখন খনি থেকে তোলা কয়লা-চাপা হিরে, কিন্তু 
বোম্বাইয়ে মেজদাদা মেজোবউঠানের শিক্ষায় ডায়মন্ড কাটিঙে তুমি হয়ে 
উঠবে দুত্প্রাপ্য কোহিনূর। 

আর সেই কোহিনুর শুধু তোমার মুকুটে শোভা পাবে? ন্বণ হেসে বলেন, 
সেটি হচ্ছে না মশায়, তখন দেখবে আমি প্রেমের স্বয়ন্বর ডাকব। 

আর আমি হব তোমার স্বয়ন্বরের দারোয়ান। হা হা করে হেসে ওঠেন 
জানকী। তার হাসির আওয়াজে ভয় পেয়ে হিরগ্ময়ী কাদতে শুরু করে। কান্না 
কিছুতে থামাতে না পেরে শেষে দাইকে ডেকে বাচ্চা হস্তান্তর করেন নতুন 
বাবা-মা। সন্ধ্যার গঙ্গার হাওয়ায় পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ হয়ে আরও কিছুক্ষণ ঘাটে 
বসে থাকেন স্ব্নকুমারী ও জানকীনাথ, দূরে বয়ে যাওয়া নৌকোয় এক এক 
করে রেড়ির তেলের কুপির আলো জ্বলে ওঠে। 

অক্টোবরে হিরগ্ময়ীর নামকরণের রেশ কাটতে না কাটতেই নভেম্বরে 
বর্ণকুমারীর বিয়ে লাগল। এবার মেডিকেল কলেজের একটি মেধাবী ছাত্রকে 
জামাই করতে পেরে দেবেন ঠাকুর বেশ খুশি। সতীশচন্দ্র ব্রাহ্মণ সম্তান, 
বাড়ি গোস্বামী-দুর্গাপুরে। পিরালি বংশে বিয়ে করায় ইনিও তআজ্যপুত্র 
হয়ে দেবেন ঠাকুরের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিলেন। বিয়ের পর থেকেই তার 


৭৩ 


মেডিকেল কলেজের খরচ জোগানো হতে থাকল ঠাকুরবাড়ি থেকে। এমনকী 
বিলেতে পাঠিয়ে ডিগ্রি অর্জন করানোর পরিকল্পনা ভেবে ফেললেন মহরি। 
নববিবাহিত বর্ণ ও সতীশের জন্য ঠাকুরবাড়িতে একটি আলো হাওয়াযুক্ত 
বড় ঘর বরাদ্দ হল। 

এইসময়, ১৮৭০ সালের এক আশ্চর্ধ দিনে দেবেন্দ্রনাথের স্নানঘরে কলের 
জল লাগানো হল। তখন কলকাতার বাড়িতে বাড়িতে পাইপের সাহায্যে 
পলতা থেকে হুগলি নদীর পরিশ্রুত জল পাঠানো শুরু হয়েছে। সে এক 
বিস্ময়, তেতলার ওপরে এত অনায়াসে কল খুললেই জল পাওয়া যাচ্ছে 
দেখে বাড়ির ছোটবড় সকলেই মুদ্ধ। 

বালক রবির বড় ইচ্ছে একদিন বাবামশায়ের ওই অবিরল জলধারায় 
্নান করেন। কিন্তু তিনি বাড়ি থাকলে তা সম্ভব নয়, চাকরদের নজর এড়িয়ে 
কী করে চান করা যায় তার মতলব করতে থাকেন রবি ও সমবয়সি ভাগনে 
সত্য। 

একদিন কুস্তির আসরের পর দুই বালক সবার নজর এড়িয়ে গুটিগুটি ঢুকে 
পড়ল বাবামশায়ের চানঘরে। কাদামাটি মাখা ছোট দেহদুটি জলধারার নীচে 
পেতে দিয়ে কী অনিবচনীয় আনন্দ! কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্যামা চাকর এসে 
হাজির। দুই অপরাধীকে নিয়ে যাওয়া হল সারদাব্র, দরবারে। 

সারদাদেবী কিছুক্ষণ বালকদের আপাদমস্তক দেখে বলেন, কেন গেছিলি 
কত্তার চানঘরে? 

কাচুমাচু বালকরা উত্তর দেন, বড্ড কাদা লেগে গেছিল কুত্তি করতে গিয়ে। 
ওরা জানে মা কুস্তি পছন্দ করেন না। 

সারদা যথারীতি বললেন, কী দরকার ও-সব বাজে খেলার? গায়ে ময়লা 
লাগে। একে তো শ্যামলা ছেলে, তায় আব্র কাদা মেখে ভূত সাজছিস 
কেন রবি? 

কী করব, হেমদাদা গণাদাদারা যে ডেকে নিয়ে যান, আমার কি ভাল 
লাগে নাকি তেল মেখে কাদা মেখে কৃত্তি করতে? রবি জবাব দেন সাহস 
করে। 

সারদাদেবী মানদা দাসীকে ডেকে বলেন, ওরে, আমার সামনে সর-ময়দা 
দিয়ে ছেলেদুটোকে আচ্ছা করে দলাইমলাই করার ব্যবস্থা কর। রোজ মাখাবি। 
আমার এই ছোট ছেলেটাই ময়লা, দেখি রং ফেরে কিনা! 


৭৪ 


রবির কাছে এ এক নতুন শাস্তি। কিন্তু ছাড় পাওয়ার কোনও উপায় নেই। 
মায়ের সামনে চলল ছেলেদের কষে রূপটান মাখানোর আসর। 

একদিন হঠাৎ সারদার কাছে ছুটে এসে কাদতে শুরু করেন প্রফুল্লময়ী। 
মা, মা গো, আপনার ছেলের পাগলামি আর সামলাতে পারছি না। দেখুন 
আমাকে কীরকম মেরেছে! ঘরের জিনিস সব ভেঙে ফেলছে। 

সারদা বিচলিত হয়ে দাসীদের ডাকেন। দেখ তো হেমেন আছে কি না, 
বীরেনের পাগলামি এত বেড়ে গেছে বউ তুমি আগে বলনি কেন, তা হলে 
তোমাকে মার খেতে হত না। 

শান্ত দুঃখী এই বউমাটির জন্য সারদার মায়া হয়। বিয়ের পর থেকে 
বীরেনের পাগলামি ক্রমশ বাড়ছে। সারানোর সব চেষ্টাই বিফলে গেছে। এত 
দুঃখের মধ্যেও একটাই ভাল ঘটনা ঘটেছে প্রফুল্পময়ীর জীবনে, সম্প্রতি তার 
একটি ছেলে হয়েছে। দেবেন্দ্র নাতির নাম দিয়েছেন বলেন্দ্রনাথ। শিশু বলেন্দ্র 
তার বাবার পাগলামি দেখে খিলখিল করে হাসে। 

পরিবারে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। হেমেন্দ্রনাথ ভাইকে সামলাতে না পেরে 
সাহেব ডাক্তার ডেকে পাঠালেন। 
কলাবউ? 

হেমেন ধমক দিয়ে বলে ওঠেন, কী পাগলামো করছ বীরেন, ওই তো 
তোমার বউ প্রফুল্পময়ী, কলাবউ আবার কে? 

বিয়ের আগে থেকেই বীরেন দিদিদের কাছে বায়না ধরেছিলেন কলাবউ 
বিয়ে করার। এখনও মাঝে মাঝে সেটা মনে পড়ে যায় বোধহয়। প্রফুল্পর 
ঘোমটা সরিয়ে ভাল করে মুখটা দেখে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন বীরেন, যাঃ 
তুমি আমার কলাবউ না। 

প্রফুল্পময়ী জোরে কেঁদে ওঠেন। দিদি এবং বড় জা নীপময়ী তাকে সরিয়ে 
নিয়ে যান। বড় শখ করে বোনের সঙ্গে দেওরের বিয়ে দিয়েছিলেন, এখন ওর 
কষ্ট চোখে দেখা যায় না। 

ডাক্তারের পরামর্শে লুনাটিক আ্যাসাইলামে পাঠানো হল বীরেনকে। 
ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের কম বেশি সকলেরই চন্দ্রদোষ আছে কিন্তু বীরেনই 
প্রথম ক্লিনিকালি লুনাটিক। বীরেনের জন্য শোকের ছায়া নেমে আসে সারা 
বাড়িতে। 


৭৫ 


এর ওপর হঠাৎই একদিন কলেরা হয়ে মাত্র আটাশ বছর বয়সে ও-বাড়ির 
গণেন্দ্র মারা গেলেন। লম্বা ফরসা উদ্যোগী দায়িত্ববান এই যুবকের মৃত্যুর 
জন্য কেউই তৈরি ছিলেন না। দু"*বাড়ির বিরোধের মধ্যে তিনি সেতুবন্ধন 
করেছিলেন, তারই উদ্যোগে দৃ"বাড়ির ছেলেরা মিলে নবনাটক করেছেন। 
চৈত্রমেলার আয়োজন করে সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। বাড়ির সবাইকে 
একসুতোয় বাধার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। এখন দেবেন ঠাকুরের ন্নেহধন্য 
এই ভাইপো চলে যেতে পুরনো ফাটলটা যেন আরও বড় হা করে গিলে 
খেতে আসে পরিবারটাকে। দেওয়ালের একদিকে গণেনের মৃত্যুর জন্য শোক 
করেন সারদা, আর অন্যদিকে যোগমায়ার চোখের জল পড়ে বীরেনের কথা 
ভেবে। কন্তাও এখন প্রবাসে, সারদার মনে হয়, এতবড় সংসারের সব ভার 
তিনি আর বইতে পারছেন না। একসঙ্গে থাকলে তাও তো দুই জা মিলে এই 
শোক ভাগ করে নিতে পারতেন! 

মহষি এখন আর কলকাতার বাড়িতে থাকতে ভালবাসেন না। আগে 
দুর্গাপূজা এড়ানোর জন্য ওইসময়ে বেড়াতে যেতেন, আজকাল প্রায় সারাবছরই 
ওপর চেপেছিল। এক পাওনাদার দেনার দায়ে দেবেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি 
পরোয়ানা জারি করিয়েছিল। কিন্তু নানারকম .ব্যয়সংকোচ ও কৃচ্ছসাধনের 
মধ্য দিয়ে কিছুদিনের মধ্যে সেই দুর্দিন কাটিয়ে উঠেছেন দেবেন। 

ওইসময়ের একটা মজার ঘটনার কথা সারদার মনে পড়ে। ঠাকুরদের 
সেই দুর্দিনে একবার শোভাবাজার রাজবাড়িতে গানের জলসায় নিমন্ত্রণ এল 
দেবেনের কাছে। সব ধনী অভিজাত পুরুষেরা উৎসুক হয়ে আছেন, অভাবের 
দিনে দ্বারকানাথের ছেলে কী পোশাক কেমন অলংকার পরে আসবেন। সভা 
গমগম করছে হিরে জহরতের গয়না, জরি*কিংখাবের পোশাক পরা বাবুদের 
দিকে। তার পরনে সাদা ধবধবে আচকান-জোড়া, সাদা পাগড়ি, কোথাও সোনা 
রুূপো জরি কিংখাবের লেশমাত্র নেই। তাকিয়ায় গা এলিয়ে বসে পা দুটো একটু 
বাড়িয়ে রাখলেন দেবেন, পায়ে সাদা মখমলের জুতোয় বিরাট দুটো মুক্তো 
বসানো। শ বাজারের রাজামশায় ছিলেন তার বন্ধু। ছেলে ছোকরাদের ইশারা 
করে তিনি নাকি বলেছিলেন, “দেখ, তোরা দেখ... একেই বলে বড়লোক। 
আমরা যা গলায় মাথায় ঝুলিয়েছি__ ইনি তা পায়ে রেখেছেন।" 
৭৩৬ 


দেবেন্দ্র হিমালয়ে ঘুরে বেড়ান প্রিয় দু'একটি শিষ্য নিয়ে। ঘরে বসে 
দুশ্টিন্তায় অধীর হয়ে ওঠেন সারদা। একদিন রবিকে অস্তঃপুরে ডেকে 
পাঠালেন তিনি। যে- কোনও সুযোগে অন্দরে যেতে পারলেই খুশিতে মেতে 
ওঠেন রবি, নীরস চাকরমহলের কঠিন অনুশাসন থেকে সাময়িক মুক্তির 
আশায়। মা এমনিতে ডাকর্খোজ বেশি করেন না, না ডাকলে ভেতরে ঢোকাও 
বারণ বাচ্চা ছেলেদের, রবির মন তবু উৎসুক হয়ে থাকে সুদূরচারী জননীর 
এমন একটি ডাকের অপেক্ষায়। 

রবি আসতেই সারদা তাকে হুকুম দেন, কন্তামশায় অনেকদিন হল পাহাড়ে 
গেছেন, তার কোনও খবর পাচ্ছিনে, আমার হয়ে তাকে একটি চিঠি লিখে 
দে তো বাবা। 

রবির মন অজানা পুলকে নেচে ওঠে, দাদাদের না ডেকে তাকেই যে মা 
ডেকেছেন এই কাজের জন্য এ-কথা ভেবে তার বুক ভরে যায়। তাড়াতাড়ি 
ছুটে কাগজ কলম নিয়ে মায়ের চৌকির পাশে বসে পড়ে বলেন, কী লিখতে 
হবে মা? 

আসলে এবার সারদা অনেক ভেবেচিন্তেই রবিকে ডেকেছেন। এর 
পেছনে একটা কাহিনি আছে। এক হিতৈষিণী আত্মীয়া দু'দিন আগে সারদাকে 
জানিয়েছেন যে রাশিয়া ভারত আক্রমণ করেছে। কোথায় কোন রাজ্যে সেই 
যুদ্ধ লেগেছে সারদা জানেন না, আত্মীয়াও বলতে পারেননি। হেমেন ও 
জ্যোতিকে জিজ্ঞেস করেও জানতে পারেননি। তারা এরকম কোনও যুদ্ধের 
খবর শোনেননি। কিন্তু খবর না পেয়ে দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা স্বামীর জন্য 
সারদার উদ্বেগ তাতে বেড়েছে বই কমেনি। আবার জ্যোতি জানিয়েছেন 
শ্রাবণের সোমপ্রকাশ পত্রিকায় একটি সংবাদে লিখেছে, “বাবু দেবেন্দ্রনাথ 
ঠাকুর সংসার ত্যাগ করিয়া হিমালয়ের নিকটস্থ ধর্মশালায় জীবন যাপন 
করিবার মানস করিয়াছেন।” জ্যোতি যদিও বলেছে এ-সব গুজবে কান না 
দিতে, সারদা সন্দেহ নিরসনের জন্য কত্তামশায়কে পত্র দিতে চান। জ্যোতি 
হেমেনরা তার চিন্তাকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তিনি রবিকে ডেকেছেন। 

কিন্তু মা ও ছেলে কেউই জানেন না চিঠির ভাষা ঠিক কীরকম হওয়া 
উচিত। জমিদারি সেরেস্তার মহানন্দ মুনশির শরণ নিয়ে রবি চিঠি রচনা 
করলেন। সারদাকে পড়ে শুনিয়ে চিঠি ডাকে দেওয়া হল। 


৭৭ 


দেবেন। এতে সারদা আশ্বস্ত হলেন কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা যে, বালক 
রবীন্দ্রনাথ বাবাকে প্রথম চিঠি লিখে এবং জবাব পেয়ে উত্তেজিত হয়ে প্রায়ই 
মহানন্দের দপ্তরে হাজির হতে লাগলেন। রোজ তিনি বাবামশায়কে চিঠি 
পাঠাতে চান। মহানন্দবাবু বালকের আবদারে মাঝে মাঝে চিঠি লেখার ভান 
করেন ঠিকই, কিন্তু সে-চিঠি আর হিমালয়ে পৌছয় না। তখন রবি তাকে 
নিয়ে একটি ছড়া লিখে ফেললেন নিজের খাতায়, 


“মহানন্দ নামে এ কাছারিধামে 
আছেন এক কর্মচারী, 

ধরিয়া লেখনী লেখেন পত্রখানি 
সদা ঘাড় হেট করি।... 

হস্তেতে ব্যজনী ন্যস্ত, 

মশা মাছি ব্যতিব্যস্ত__ 


হেমেনের খুব ঘোড়ায় চড়ার শখ, তার একটা ঘোড়া বারবাড়ির আস্তাবলে 
বাঁধা থাকে। সেই অশ্ব বাড়ির অনেকের মনেশ্পরক্ষীরাজের স্বপ্ন উসকে দেয়। 
জ্যোতি আর কাদন্বরীর ঘরেও এমন এক স্বপ্নবোনা চলছিল। 

কাদম্বরী আদুরে গলায় স্বামীকে বলেন, আমাকে ময়দানে হাওয়া খেতে 
নিয়ে চলো-না একদিন, তোমার সঙ্গে খোলা হাওয়ায় বেড়াতে যেতে ইচ্ছে 
করে খুব। 

জ্যোতি ভয় পান, তোমাকে নিয়ে হাওয়া খেতে গেলে মা তোমার ওপর 
রাগ করবেন, অশান্তি হবে, না হলে আমার তো ইচ্ছে করে সেজদাদার 
ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে তোমাকে উড়িযে নিয়ে যাই। রূপকথার রাজকন্যে, 
দাড়াও না, একদিন ঠিক নিয়ে যাব। 

কাদশম্বরী ঠোট ফোলান, মেজোবউঠান যে স্টিমার পাড়ি দিয়ে ঘনঘন 
যাতায়াত করছেন, তখন তো ধন্য ধন্য কর। নিজের বউকে নিয়ে বাইরে 
বেরুতে এত ভয়? 

সে যাচ্ছেন ঠিক, কিন্তু খাস কলকাতার বুকে হাওয়া খেতে তিনিও এখনও 
বেরোননি। আগে তিনি পথ দেখান, তারপর তুমি। 


৭৮ 


জ্যোতির কথায় অভিমান হয় কাদম্বরীর, কেন সবসময়ে তিনি আগে আর 
আমি পরে? তুমি ভেবেছ আমি আগে কিছু করতে পারি নাঃ আসলে আমার 
সাহস আছে, তোমার নেই। 

দমকা হাওয়ার মতো ঘরে' ঢুকে পড়ে রূপকুমারী। সে জানলার বাইরে 
দাড়িয়ে কয়েকটা কথা শুনতে পেয়েছে। সে বলল, জ্যোতিদাদা, আমিও 
ঘোড়ায় চড়ব, নতুনবউঠানের সঙ্গে আমিও যাব হাওয়া খেতে। 

এই রে পাগলিটা এসে গেছে, জ্যোতি বলে ওঠেন। তুই সবসময় আমার 
কাছে ঘুরঘুর করিস কেন রে? জানো নতুনবউ, যেখানে যাব, ও এসে পথে 
দাঁড়িয়ে সঙ্গে যাওয়ার বায়না ধরবে। 

ও মুখ ফুটে বলতে পারে আর আমি মনের ইচ্ছে চেপে রাখি। কাদশ্বরী 
বলেন, ও যেমন ছটফট করে বেড়ায় আমার হৃদয়টাও তেমনি ছটফটে। 
খাঁচায় থাকতে চায় না। 

জ্যোতি বলেন, সেজদাদার ঘোড়াটা তো আচ্ছা জ্বালালে! কথায় বলে 
লোকে ঘোড়া দেখলে খোঁড়া হয়, আর তোমরা যে পক্ষীরাজের ডানা চাইছ! 
চলো, তোমাদের আমার নতুন নাটক পড়ে শোনাই। 

জ্যোতি এখন যে নাটকটা লিখছেন তার নাম দিয়েছেন “সরোজিনী?। 
কাদন্বরী নাট্যরসে মজে যান, তার মনে অপুব আনন্দের সৃষ্টি হয়। কিন্তু রূপা 
কিছু'ক্ণ পরেই কোথায় যেন চলে গেল। 

আরও কিছুক্ষণ পরে বারবাড়িতে হইচই টেচামেচি শুনে জ্যোতি বাইরে 
বেরিয়ে এসে শুনলেন সেজদাদার ঘোড়ায় চড়ে রূপকুমারী উধাও হয়ে 
গেছে। | 

সারদার বারান্দায় এসে কাদন্বরী দেখলেন সেখানেও হুলুস্থুলু কাণ্ড। 

মানদা দাসী লাফাচ্ছে, আরও আশকারা দাও কত্তামা, আরও মেয়ে মেয়ে 
করে মাথায় তোলো। কী দস্যি দজ্জাল বিটিরে বাবা! ওই বেটি তোমার মুণ্ডু 
ঘুরিয়ে দেবে। 

সারদা ঠান্ডা থাকার চেষ্টা করেন, আঃ চুপ কর মানদা, গোল করিস না। 
আরে মেয়েটা তো মরে যাবে, ওই বিচ্ছু ঘোড়া নিপ্ঘাত পিঠ থেকে ফেলে 
দেবে ওকে, কেউ কি বাঁচাতে গেছে? যা, খবর নে। 

কাদন্বরী বললেন, মা আপনার ছেলে তো দেখতে গেছেন, কিছু একটা 
ব্যবস্থা নিশ্চয় করবেন। 


৭৯ 


সারদা অকুলে কূল পান যেন, গেছে জ্যোতি? দেখো যদি শেষরক্ষা হয়। 
মনে মনে গৃহদেবতার নাম জপ করতে থাকেন তিনি। 

বড় মেয়ে সৌদামিনী সারদাকে সাবধান করতে চান, মা, এবার তুমি রাশ 
টানো। হয় ওকে থামাও নয় নিজে থামো। মেয়েটা বড্ড অবাধ্য, তোমাকে 
তিষ্ঠটোতে দেবে না। 

তাড়াও কত্তামা, ওকে এবার তাড়াও। মানদা আবার ফুঁসে ওঠে, আমরা 
কত কষ্ট করে চাট্টি ভাত খাচ্ছি আর ওকে তুমি আমাদের সবার মাথায় নেত্য 
করতে বসিয়ে দিলে। 

এবার কাদম্বরী মানদাকে বকেন, আঃ মানদা, তোর কি কোনও আক্কেল 
নেই। বাচ্চা মেয়েটা না হয় না বুঝে একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, তাই বলে 
তুই মায়ের মুখের ওপর এরকম কথা বলবি? 

সারদাও জোর পান নতুনবউয়ের কথায়, মানদা তোর বড় বাড় বেড়েছে 
দেখছি আমি। যত অলক্ষুনে কথা বলিস। দূর হয়ে যা এখান থেকে। যতক্ষণ 
না মেয়েটা ভালয় ভালয় ফিরে আসে ততক্ষণ আমার সামনে আসবি না। 

ঘণ্টাখানেক বাদে বহু কসরত করে দারোয়ান বেহারার দল রূপকুমারীকে 
ঘোড়াসহ ধরতে পারল। ঝৌকের মাথায় ঘোড়ার পিঠে চেপে বসলেও 
ঘোড়সোয়ারির কোনও কিছুই তার জানা নেই,_তাই ঘোড়া ছুটতেই নিজের 
বিপদ আঁচ করেছে রূপা কিন্তু তখন ঘোড়াই তার চালক। থামানোর কোনও 
উপায়ই সে জানে না। জ্যোতি চারদিকে লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। রূপার 
আর্ত চিৎকারেও পেছন পেছন মজা দেখার অনেক লোক জড়ো হয়েছে। 
ভিড় থেকে নানারকম মস্তব্যও উড়ে আসছে রূপাকে লক্ষ্য করে। 

কেউ বলছে, ঘোড়ার ওপর ডবকা মাগীর খেল দেখে যা আয়। আবার 
কেউ বলছে দেবীর কি এবার অশ্বে আগমন্£ ইনি দেবী না মানবী? গায়ে 
তো গয়নাগাটিও বেশ। 

ভদ্দরলোকের বেটি তো খোলামেলা রাস্তায় নামবে না, এ নিশ্চয় কোনও 
বেশ্যামাগীর বাবু ধরার ছলাকলা। 

একে ঘোড়া থামে না তারপর এ-সব নোংরা নোংরা কথা। বাইরের 
জগৎটা এত খারাপ, লোকেরা এত ইতর হতে পারে জানত না রূপা। এ-সব 
শোনার জন্যই সে বাইরে বেরতে চেয়েছিল, হায় রে! ক্ষোভে, ভয়ে তার 
চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। 


৮০ 


কোনওতক্রমে রাস্তার লোকেরা ও বাড়ির দারোয়ান বেহারারা মিলে ঘোড়ার 
দড়ি ধরে থামায় শেষপর্ষস্ত। ঘোড়া থামামাত্র উৎসাহী কিছু বদমাশ লোক 
রূপার গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে। একটি বিচ্ছিরি ঢ্যাঙা লোক রূপার 
বাহু ধরে টানতেই রূপা তাকে ঠাসিয়ে চড় কষায়। বেহারারা কিছু বুঝে ওঠার 
আগেই এতসব ঘটে গেল কিন্তু এবার কী হবে? 

চোয়াড়েমার্কা কয়েকটি লোক রূপাকে জাপটে ধরার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু 
করল, এ মাগীটা তো বেশ সরেস মাল, আবার গায়ে হাত তোলে। দেখি 
এবার কে তোকে বাঁচায়! 

ঘটনা আরও খারাপ দিকে যেতে পারত, কিন্তু ঠিক সময়ে জ্যোতিরিক্দ্ 
পালকি চেপে এসে উপস্থিত হলেন। তাকে দেখে লোকগুলো পালাল বটে 
তবে তেড়ে খিস্তি দিতে ছাড়ল না। পরের দিন বিখ্যাত জ্যোতি ঠাকুরকে 
ঘটনার নায়ক করে দুটি সংবাদপত্রেও এই মুখরোচক খবর ছাপা হল। 


৮১ 


৬ 


সারদার মৃত্যু 


জ্যোতির আজ মনখারাপ। টাকাপয়সার অভাবে একটি দাতব্য হাসপাতালে 
অসহায়ভাবে মারা গেলেন মধুসূদন দত্ত। ধনী পিতার আদরের সন্তান মধু 
ভেবেছিলেন ইংরেজিতে কবিতা লিখলে বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাবেন আর 
সেজন্য ছেঁদো হিন্দুধন্ম ছেড়ে খ্রিস্টান হওয়া দরকার। মধুর ধর্মত্যাগ সমাজে 
হুলুস্থুলু ফেলে দিল। রাগে ক্ষোভে বাবা রাজনারায়ণ তাকে ত্যাগ করলেন। 
মায়ের স্নেহ ছেড়ে, প্রেসিডেন্সি কলেজের বন্ধুদের পেছনে ফেলে, দেশত্যাগ 
করে মধু বেরিয়ে পড়লেন ভাগ্যান্বেষণে। কিন্তু ভাগ্যদেবী তার সর্দে ছলনা 
করেছেন। সরস্বতীর কৃপায় কবিতায় আর নাটকে তার খাতা ভরে উঠেছে, 
কিন্ত লক্ষ্মী তাকে ধরা দিলেন না.কোনওদিনই। মধু অবশ্য খুব শিগগিরি 
বুঝতে পেরেছিলেন যে লিখতে হলে ইংরেজি নয় বাংলাতেই লিখতে হবে। 
দিতে চায় না। কিন্তু বাংলায় বহু কিছু করার আছে। প্যারীচাদ মিত্র বা টেকচাদ 
ঠাকুররা যে রকম কুলিমজুরের ভাষায় লিখছেন তা দিয়ে কালজয়ী সাহিত্য 
হতে পারে না। দুয়োরানি বাংলামায়ের শরীরে অলংকার পরিয়ে তিনি তাকে 
সুয়োরানি সাজাবেন। একটি কবিতায় বাংলাভাষার উদ্দেশে তার অন্তিম 
ইচ্ছের কথাও লিখে গেছেন মাইকেল মধুসৃদন দত্ত, 


“রেখ মা দাসেরে মনে € মিনতি করি পদে 
সাধিতে মনের সাধ ঘটে যদি পরমাদ 
মধুহীন কোরো নাকো তব মন কোকোনদে' 


৮ 


মধুসুদনের প্রহসনের সঙ্গেই জ্যোতির “কিঞ্চিৎ জলযোগ” নাটকটি মঞ্চস্থ 
হয়েছিল একবার। তার আগে থেকেই জোড়ার্সাকোর বাড়িতে মধুর আসা- 
যাওয়া। 

জ্যোতি বললেন, নতুনবউ, তুমি তো তাকে দেখনি। অমন প্রতিভা শেষ 
হয়ে গেল লালনের অভাবে, টাকাপয়সার অভাবে। আর ওদিকে তার বিপুল 
পৈতৃক সম্পত্তির ওপর ছাতা পড়ছে! 

কাদন্বরী জানতে চান, ওঁর বিদেশিনী স্ত্রী এখন ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে 
কী করে দিন কাটাবেন? তার পাশে তো কেউ দাড়াবে না কলকাতায়? 

হেনরিয়েটা খুব বিপদে পড়লেন। খাঁটি ফরাসি সুন্দরী, তার ওপর বিপন্না। 
অনেক ভদ্রলোকবেশী লম্পট ঘুরঘুর করবে তার পেছনে কিন্তু প্রকৃত সাহায্য 
পাওয়া মুশকিল। সত্যি কষ্ট হয় তার কথা ভাবলে। 

আচ্ছা তুমি তার পাশে দাড়াতে পারো নাঃ সরল বালিকার মতো কাদম্বরী 
বলেন। 
রূপসি বিধবার কাছে পাঠাতে তোমার একটুও ভয় করবে না? আমি যদি 
তার প্রেমে পড়ে যাই? 

তা হলে আমাকে বিষ খেয়ে মরতে হবে, কাদশ্বরী মুখ নিচু করে বলেন। 

জ্যোতি শিউরে ওঠেন বালিকাবধূর মুখে এমন কথা শুনে, আর কোনওদিন 
ঠাট্টা করেও এরকম কথা বলবে না নতুনবউ, তা হলে আমি ভীষণ রাগ 
করব। 

অজানা আশঙ্কায় স্বামীর বুকে মাথা গুঁজে দেন কাদম্বরী। জ্যোতির মনে 
হয় যেন মহীরূহের গায়ে লবঙ্গলতিকাটি। 

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কচি দাম্পত্যের অস্তরঙ্গ দৃশ্যটি দেখে ফেলেন জ্ঞানদা। 
মনের কোনায় কোথায় যেন খচ করে বেঁধে তার। 

বলেন, কী ব্যাপারটা কী, কখন রোদ উঠেছে, এখনও বিছানায় প্রেমালাপ 
চলছে তোমাদের? নতুনবউয়ের তো বেশ রীতি, আর সবাই কাজে লেগে 
পড়েছে, তুমি বরের সোহাগের লোভে বিছানায় পড়ে আছ এখনও? 
জ্যোতিকেও বুঝি কাজ করতে দেবে না? 
বকুনি খেয়ে। কিন্তু জ্যোতি হাসিমুখেই আবাহন করেন জ্ঞানদাকে, এসো 


৮৩ 


এসে বউঠান, আজ কার মুখ দেখে উঠেছি বলো তো, তোমার তোমার। 
মনটা ভাল ছিল না, এবার ভাল হয়ে যাবে। 

কী কথা হচ্ছিল শুনি? জ্ঞানদা একটু নাক গলিয়ে ফেলেন, এই কচি বউকে 
নিয়ে কী এত আলাপচারি করে নতুন! 

দেখো না বউঠান, কাদন্বরী ভয় দেখাচ্ছে যে আমি অন্য কোনও নারীর কাছে 
গেলে ও আত্মহত্যা করবে, তুমিই বিচার করো এ-কথা কি ওর বলা উচিত? 

জ্যোতির কথা শুনে কাদন্বরী অবাক হয়ে বলেন, ওমা কী মিথ্যে কথা, 
আমি তো তোমাকে যেতে বললাম, তুমিই অন্য কথা বলছিলে তাই-__ 

জ্ঞানদা বিরক্ত হন, ওমা এইটুকু মেয়ের পেটে পেটে এত? ঠাকুরপো 
তোমাকে এত ভালবাসে তাও এমন ভয় দেখাচ্ছঃ দেওরের কাছ ঘেঁসে 
রহস্য করে আবার বলেন, তুমি কি ওকে আমার সঙ্গেও মিশতে দেবে না 
নতুনবউ? 

জ্যোতি তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন, সেকী কথা মেজোবউঠান. তুমি আমার 
প্রথম প্রেরণা, বউ তো অনেক পরে এসেছে। 

এবার কাদন্বরীর একটু অভিমান হয়, জ্ঞানদাকে বলেন, তোমার সঙ্গে 
মিশতে বারণ করব এমন সাহস আমার নেই মেজদি। আর সে-কথা লবই 
বা কেন, উনি কার সঙ্গে মিশবেন, কীভাবে মিশবেন, সেটা ওঁর ব্যাপার। 
আমি ওঁর শ্রীচরণে স্থান পেয়েছি এই আমার ভাগ্য! 

ওবাবা, মেয়ের তো বোল ফুটেছে। না জ্যোতি এখন আর ওকে এড়িয়ে 
তোমার সঙ্গে মেশা যাবে না। আমাদের সাহিত্যবাসরে ওকেও ডেকে 
নিয়ো এরপর, জ্ঞানদার গলায় ঈষৎ শ্লেষ। বউয়ের অধিকার ফলাতে গিয়ে 
সাহিত্যবাসরে এসে বসলে নতুনবউয়ের সব জারিজুরি বেরিয়ে যাবে, 
জ্যোতিও নিজের ভুল বুঝবে। সাহিত্যিক হতে চাইলে ওর উচিত ছিল 
জ্ঞানদার কথামতো শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করা। শুধু রূপসি বলেই স্বামীর 
কাব্যের প্রেরণা হতে পারবে কি এই পুঁচকে বালিকা। 

কিন্তু জ্যোতি বউকে বলেন অন; কথা, নিজেকে কোনওদিন কারও 
শ্রীচরণে নামাবে না, এমনকী স্বামীর পায়েও না। নতুনবউ, কখনও ভূলো 
না, তোমার স্থান আমার হদয়ে। 

আর আমাকে কোথায় রেখেছ ঠাকুরপো? জ্ঞানদা কৌতুক করে জানতে 
চাইলেন। 


৮৪ 


তোমাকে মাথায় করে রেখেছি বুঝতে পার না মেজোবউঠান? জ্ঞানদার 
মুখের দিকে তাকিয়ে জ্যোতির হঠাৎ মনে হল কাদম্বরীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতায় 
মেজোবউঠান কি কোনওরকম কষ্ট পাচ্ছেন! কিন্তু তা কেন হবে? বউঠান 
কি আশঙ্কা করছেন যে দেওর-বউঠানের মধুর সম্পর্কে কাদম্বরী বাধা দেবে? 
সেরকম ভাবলে তাঁর তুল ভাঙানো দরকার। 

জ্যোতি বলেন, এখন যে ক'দিন জোড়ার্সাকোয় থাকবে তোমরা 
মেজোবউঠান, সে ক'দিন তোমার সাহচর্ষের জাদুতেই গুটিপোকা থেকে 
প্রজাপতি হয়ে উঠতে পারে নতুনবউ। 

জ্ঞানদা কথাটায় যেন খুশি হলেন না, বললেন, সে ভার তো বাবামশায় 
নীপময়ীকেই দিয়েছেন, নতুনবউ তো দিব্যি কথা বলছে। বাবামশায় যখন 
আমার ওপর আস্থা রাখেননি, এর মধ্যে আবার আমাকে টানছ কেন 
নতুনঠাকুরপোঃ বরং তোমার নতুন লেখা পড়ে শোনাও, আমি তো সকাল 
সকাল কাজ সেরে তোমার শকুস্তলা কাব্য শুনব ভেবেই এসেছি। 

দেওর আর বউঠান কাব্যপাঠে মজে যান। কাদন্বরীর সঙ্গে আর-একটি 
উৎসুক শ্রোতাও তৃষ্কার্তের মতো সেই কাব্যসুরা পান করতে থাকেন তাদের 
অলক্ষ্যে, সে জানলার বাইরে থাকা রূপকুমারী। 


সারদা খবর পেলেন রূপা নাকি জ্যোতির পিছু পিছু গিয়ে বৈঠকখানায় 
পুরুষদের আসরে বসে থাকছে আর দিব্যি জমিয়ে গল্পগাছাও করছে। 

তার কাণ্ড দেখে বর্ন একদিন এসে বললেন, মা আর তো পারা যাচ্ছে 
না তোমার পুষ্যিকে নিয়ে! তার জন্য যে আমাদের বাড়ির মেরেদের সম্মান 
ধুলোয় লুটোচ্ছে। 

কেন, আবার কী করল সে£ সারদার হয়েছে জ্বালা, না পারেন গিলতে, 
না পারেন ফেলতে মেয়েটাকে। অবাধ্য, বেয়াড়া কিন্তু মনটা স্বচ্ছ সরোবরের 
মতো। ও যা করে সেটা কেন বারণ তাই সে বোঝে না। 

তুমি যেন কিছু জানো না!]বর্ণ রাগ করে, তুমি ওকে যেমন মাথায় তুলছ, 
আমাদের তো কখনও তেমন স্বাধীনতা দাওনি। ওর বয়স তো অনেক হল 
মা! 

সারদার মাঝে মাঝে বিষপ্ লাগে, এ কি তীরই ব্যথ্বতা! আবার মনে হয় 
তা কেন, এতগুলো হিরের টুকরো ছেলেমেয়ে তার, রূপা যে রক্তসম্পর্কের 


৮৫ 


না তাই বোধহয় শোধরাতে পারলেন না। তিনি বললেন, কেন রে, সাহিত্যের 
আসরে তো স্বর্ণও যায়, মেজোবউমাও যায়, রূপা গেলেই বা দোষ কী? 

এবার সৌদামিনী মাকে বোঝাতে নামলেন, মা স্বণ বা মেজোবউঠানের 
সঙ্গে কি ওর তুলনা হয়? রূপা সাহিত্যের কী বোঝে? তা ছাড়া ও তো 
সাহিত্যের টানে যায় না, ওর আকধণ যুবক ছেলেরা। রূপা তাদের সকলের 
সঙ্গে কীরকম ইয়ারদোস্তের মতো মেশে তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে 
না। আমি পরদার আড়াল থেকে দেখেছি, হ্যারি নামে একটি সাহেবের সঙ্গে 
সারাক্ষণ ফুসফুস করছে, হেসে গড়িয়ে পড়ছে। 

মানদা দাসী কত্তামার জন্য পান সেজে রুপোর পাত্রে রাখছিল। সে আর 
চুপ করে থাকতে পারে না, বকুনি খাবে জেনেও বলে ওঠে, কী ঢলাঢলি, কী 
ঢলাঢলি মা গো! দেখলে মনে হবে বাইজিপাড়ার.মেয়ে। 

ছিঃ, চুপ কর মানদা। কত্তামা ধমকে ওঠেন। সব কথায় কথা বলিস না। 
পান দে একটা। 

কথা শেষ হতে না হতেই রূপকুমারী ছুটে এসে ধুপ করে সারদার পায়ের 
কাছে বসে পড়ে। তাকে দেখে সবাই চুপ। 

সারদা তার চুলের মুঠি ধরে জিজ্ঞেস করেন, মুখপুড়ি, তুই কি আমায় 
শান্তিতে থাকতে দিবি নাঃ সারাদিন তোর নামে-সবাই নালিশ করে কেন? 
আর সব মেয়েদের মতো লক্ষ্মীমস্ত হতে পারিস না তুই? কাল সকালে উঠে 
যার মুখ দেখব তার সঙ্গেই তোর বিয়ে দিয়ে দেব। 

রূপা হেসে গড়িয়ে পড়ে, মা, তা হলে তো কোনও মেয়ের সঙ্গে আমার 
বিয়ে দিতে হবে, বাইরে না বেরলে তুমি ছেলেদের মুখ দেখবে কোথেকে£ 
যাচ্ছি আর মেয়ের কোনও হুঁশ নেই? না, হাসির কথা নয়, এবার সত্যিই 
রূপার বর খুঁজতে হবে, বয়স তো তেরো-চোদ্দো হল। 

রূপা আদুরে গলায় বলে, আমি বিষে করবই না। 

সারদা এবার কঠোর হয়ে বলেন, না করতে চাইলে জোর করে বিয়ে দেব। 
তোকে বিদেয় না করে আমি মরেও শান্তি পাব না। 

তা হলে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাব, পালাবই। স্থির সিদ্ধান্ত জানায় 
রূপকুমারী। 


৮৬ 


জোড়াসীকোর বাড়িতে হঠাৎই একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সারদাসুন্দরী 
বেড়াতে গিয়েছিলেন পেনেটির বাগানে, সেখানেই তার হাতের ওপর ভেঙে 
পড়ল লোহার সিন্দুকের ভারী ডালা । তড়িঘড়ি তাকে বাড়ি আনা হল। হাতে 
প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে শয্যাশায়ী হলেন গৃহলক্ষ্মী। প্রথমে আনিকা ও মলম দিয়ে 
সারানোর চেষ্টা ব্যথ্ঘ হল। তারপর বাড়ির ডাক্তার ডা. নীলমাধব হালদার 
এবং মেডিকেল কলেজের সার্জারির অধ্যাপক ডা. প্যাট্রিজ তাকে চিকিৎসা 
করলেও সারাতে পারলেন না। পরপর অনেক ডাক্তার এলেন গেলেন। 
ভেতরে লোহার টুকরো ঢুকে গিয়েছে। একবার অস্ত্রোপচার করে লোহা বার 
করার পরেও ব্যথা কমল না। 

ঠিক এসময়েই দেবেন ঠাকুর বাড়িতে অনুপস্থিত। রবিকে সঙ্গে নিয়ে 
তিনি বেড়াতে গেছেন ডালহৌসি পাহাড়ে। দু'মাসের মধ্যেও সারদার রোগ 
না সারায় তাকে টেলিগ্রাম করা হয়েছে। সংবাদ পেয়ে চিঠিতে, টেলিগ্রামে 
পরামশ দিতে লাগলেন উদ্দিগ্ন মহষি। 
বসল সারদাদেবীর রোগ সারাতে। তাদের প্রত্যেকের ভিজিট বত্রিশ টাকা। 
তাদের পরামশ অনুসারে ক্ষতস্থানের মাংস কেটে বাদ দিয়ে ট্রান্সপ্লান্ট করতে 
হবে। এরকম চিকিৎসার কথা আগে বিশেষ শোনা যায়নি। সাহেবদের মাথা 
থেকেই এ-সব উত্তট চিকিৎসা বেরিয়েছে। কিন্তু কথা হল কার দেহ থেকে 
মাংস কেটে সারদার অঙ্গে লাগানো হবে, একমাত্র পরিবারের রক্তসম্পর্কের 
কেউ যদি এগিয়ে আসেন তবেই সারদা রাজি হবেন নয়তো বিনা চিকিৎসায় 
থাকবেন তাও ভাল। 

বাবামশায় বাড়ি নেই। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে এলেন সেজো ছেলে 
হেমেন। সন্তানের অঙ্গ থেকে নতুন মাসমজ্জা লাগল গর্ভধারিণীর দেহে। 

তবুও ব্যথা কমে না। সারদা অধীর হয়ে ওঠেন। অসুখও সারে না. 
কত্তামশায়ও ফেরেন না। তাকে একবার দেখতে বড্ড সাধ হচ্ছে। কী জানি 
আবার দেখা হবে কি নাঃ তার অনুরোধে বাবামশায়কে ফিরে আসার জন্য 
চিঠি পাঠান হেমেন। 

মহধি তখন রবিকে নিয়ে ডালহৌসি পাহাড় থেকে সমতলে নেমেছেন, 
দিকে পা বাড়াবেন। 


৮৭ 


শীতের শুরুতে ব্যথা বাড়লে হাওয়া বদলের জন্য গঙ্গায় বোট ভাড়া করে 
মাকে সেখানেই রাখলেন হেমেন্দ্রনাথ। বাড়ির বন্ধ চার দেওয়ালে চিরদিন 
বাস করে এখন এই নৌকোয় যেন মুক্তির আনন্দ পাচ্ছেন সারদাসুন্দরী। 
এই নৌকোটি যেন তার একান্ত নিজের। এখানে তিনি আর ব্রন্মোপাসনা 
করেন না, নৌকোঘরের এক কোণে লক্ষ্মীজনার্দনের নাম করে দুটি ঘট স্থাপন 
করেছেন। মানদা দাসীকে বলা আছে টাটকা ফুল বেল পাতা এনে দিতে, 
তিনি স্নান করে গঙ্গাজলসহ ওই নৈবেদ্য ঘটে নিবেদন করেন রোজ। 

একদিন হেমেন এসে খবর দিলেন, মা, বাবামশায় ফিরে আসছেন 
শিগগিরই, টেলিগ্রাম করেছেন। 

স্বস্তির শ্বাস ফেলে হাত মাথায় ঠেকান সারদা। গৃহদেবতা তার কথা 
শুনেছেন, কত্তার সঙ্গে দেখা না হলে যে তার মরেও শান্তি নেই। 

বাড়ির ডাক্তার দ্বারিকানাথ গুপ্ত রোজ বোটে এসে তাকে পরীক্ষা করেন। 
মেয়েবউমারা রোজ দেখা করতে আসেন, কেউ কেউ সঙ্গে থেকেও যান। 
সবাইকে দেখে আনন্দ পান শুধু প্রফুল্লময়ী এলেই সারদার বড় কষ্ট হয় তার মুখের 
দিকে তাকিয়ে। ওর জন্য কিছু করে যেতে পারলেন না তিনি। কচি বয়সে ছেলে 
নিয়ে বিধবা হয়েছে, সারাজীবন নিরানন্দে কাটাতে হবে মেয়েটাকে। বীরেনের 
মৃত্যুশোক তিনিই কাটিয়ে উঠতে পারেননি, তো ও-বেচারার কী অবস্থা! 

মাসখানেকের মধ্যেই দেবেন ঠাকুর জোড়ার্সাকো ফিরে এলেন। পথে 
কিছুদিন অবশ্য রবিকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে কাটিয়ে এসেছেন তিনি। 
যাওয়া-আসার পথে এভাবেই তিনি প্রকৃতি উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে জমিদারি 
পরিদর্শন করে নেন। 

মহধি ফিরে এলে সারদা বোট থেকে ঘরে ফিরলেন। তেতলার ঘরে 
এতদিন পরে স্বামীকে দেখে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। 

দেবেন্দ্রনাথ তার মাথায় হাত রাখেন, এই তো আমি এসেছি, ভয় কী 
সারদা? এখন তোমার কাছেই থাকব। 

কন্তার হাত জড়িয়ে ধরে সুখের কান্না কাদতে থাকেন সারদা, এবার না 
এলে আর আপনার দেখা পেতাম না। আর বোধহয় বাঁচব না আমি। 

দেবেন সাস্ত্বনা দিলেন, কে বলেছে বাঁচবে না? তোমার এখনও পধ্যাশ 
হয়নি গিন্নি, এখন কোথায় যাবে? আমি নিজে দাড়িয়ে চিকিৎসা করাব, দেখি 
অসুখ সারে কি না! 
৮৮ 


সত্যি যেন প্রাণে নতুন জোয়ার এল সারদার। আগের তুলনায় তিনি এখন 
অনেক সুস্থ। ব্যথা আছে কিন্তু তার সহ্য করার শক্তি যেন অনেক বেড়েছে। 
মাঝে মাঝে সকালের রান্নার জোগাড়ের সময় বা বিকেলের চুল বাঁধার 
আসরেও বসতে শুরু করলেন। 

হিমালয় থেকে ফিরে রবি যেন অনেক বড় হয়ে গেছেন। বড়রা তাকে 
সম্মান দিচ্ছেন, মা তাকে ডেকে ডেকে হিমালয়ের গল্প শুনতে চাইছেন 
প্রায়দিনই। অন্তঃপুরের বন্ধ দরজা খুলে গেছে কী এক আশ্চ্ ফুসমস্তরে। 
সবাই তার কাছে বেড়ানোর গল্প শুনতে চায়, বিশেষ করে নতুনবউঠান। রবি 
যেন একটি ভ্রমণকাহিনির খোলা পাতা। 

সারদা তার তেতলার ঘরে রবিকে ডেকে পাঠিয়ে জানতে চান, হ্যা রে 
রবি, তোরা যে এত পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলি, তোর বাবামশায় ঠিকঠাক 
খাওয়াদাওয়া করতেন তো? 

রবির একটু অভিমান হয়, মা কি শুধু বাবামশায়ের কথাই জানতে 
চান, আমার খাওয়াদাওয়ার খোজ নেবেন নাঃ কিন্তু মা তো এরকমই। তবু 
তিনি যে ডেকে পাঠিয়ে এত কথা শুনছেন তাতেই আনন্দে বুক ভরে ওঠে 
রবির। 

তিনি সোৎসাহে বলেন, মা রোজ সকালে বেরোনোর আগে আমরা পেট 
ভরে দুধরুটি খেয়ে নিতাম। তারপর ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ে বেরিয়ে পড়া। 
উফ! সে যে কী অপুব সুন্দর, না দেখলে বোঝানো যাবে না। আমি বড় হয়ে 
তোমাকে নিয়ে যাব মা। 

হায় রে রবি, তুই যখন বড় হবি আমি কি তখন থাকব রে? সারদা দীর্ঘশ্বাস 
ফেলেন। 

রবি আকুল হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেন, তুমি কোথায় যাবে মা, কোথাও 
যেতে দেব না। আমি শিগগির বড় হয়ে যাব। 

আমার যে অসুখ করেছে রবি। আর বোধহয় বেশিদিন তোদের কাছে 
থাকতে পারব না। সারদা রবির মাথায় হাত রেখে বলেন, তুই এইরকম তোর 
বাবামশায়ের সঙ্গে সঙ্গে থাকিস, তা হলেই তোর ভাল হবে। পাহাড়ের মতো 
বড় হবি তুই। 

রবি মায়ের রুগ্ণ দেহের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে আঁকড়ে ধরে বলেন, না 
মা, তুমি থাকবে। ছোটবেলায় তোমার কাছে আসতে পারতাম না। এখন 

৮৯ 


তুমি আমাকে ডেকে নিয়েছ, আর কোথাও যাবে না। আমি তোমাকে পালকি 
করে তেপাস্তরের মাঠে নিয়ে যাব একদিন। 

সারদা হাসেন, এই ছেলেটা এখনও ছেলেমানুষ। তুই একা একা আমাকে 
নিয়ে কোথায় যাবি£ যদি ডাকাত ধরে? 

ডাকাত? আসুক না, আমি যুদ্ধ করে তাড়িয়ে দেব। রবি একটা লাঠি 
হাতে নিয়ে তলোয়ারের মতো ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, দেখো মা, আমি 
বীরপুরুষ! ডাকাতের সঙ্গে লড়াই করতে যাচ্ছি। 

সারদা মজা করে বলেন, যাস নে খোকা ওরে! আমি যে ভয় পাচ্ছি! এত 
লোকের সঙ্গে লড়াই কী করে করবি? 

রবি অনেকক্ষণ লড়াইয়ের ভঙ্গিতে তলোয়ার ঘোরায়। ছেলের খেলার 
যুদ্ধ দেখতে মজা পান সারদা, নিজেও যেন তার সঙ্গী হয়ে গেছেন। ব্যথার 
কথাও সাময়িকভাবে ভূলে গেছেন তিনি। 
এসে বলেন, দেখো, লড়াই গেছে থেমে । আমিই জিতেছি। আর তোমার 
ভয় নেই। 

সারদা কষ্ট করে উঠে বসেন। রবিকে বহুদিন পরে কোলে টেনে নিয়ে চুমু 
খেয়ে বলেন, ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল, কী দুর্দশাই.হত তা না হলে! 

আরও বেশ কিছুদিন ক্ষুদ্র ভ্রমণকারীটি মায়ের কাছে এবং অন্দরের ঘরে 
ঘরে হিমালয় বেড়ানোর গল্প বলে আদর কাড়তে লাগল। স্বাধীনতার মাত্রাও 
বেড়ে গেল। চাকরদের শাসন এবং ইস্কুলের বন্ধন শিথিল হয়ে এল। বাড়ির 
দাদা দিদিদের সঙ্গে গান ও সাহিত্যের মজলিশে ঢুকে পড়তে লাগলেন কিশোর 
রবীন্দ্রনাথ। জ্যোতির আর কাদম্বরীর প্রেমঘন কাব্যসভায় নতুন কবিদের চর্চা 
হয়। নতুনবউ তখন বিহারীলালের কবিতার ভক্ত হয়ে উঠেছেন, প্রায়ই কবির 
সারদামঙ্গল কাব্য মুখস্থ বলছেন, আর সেই অমুতসুধা পানের আশায় তার 
পিছু পিছু ঘুরতে থাকেন রবি। সমবয়সি দেওর ও বউঠানের মধ্যে খেলার 
সঙ্গীর মতো খুনসুটি চলতে থাকে। জ্যোতির কাছে যা যা শেখেন কাদন্বরী, 
তাই আবার রবিকে শেখাতে চান। জ্যোতির প্রিয়শিষ্যা তিনি আর রবি তার 
ছায়াশিষ্য। 

ঠাকুরবাড়ির ঘরে ঘরে তখন সাহিত্যের নবজোয়ার। দ্বিজেনের 'ন্বপ্নপ্রয়াণ' 
কবিতাটি সকলের প্রশংসা পেয়েছে। সত্যেন ও জ্ঞানদা এলে তীদের ঘরেই 


৪৯০ 


আজকাল শহরের বিশিষ্ট কয়েকজন সাহিত্যিক আসর বসান। জ্যোতি 
ইতিমধ্যেই একজন প্রতিষ্ঠিত কবি ও নাট্যকার। অন্ধকারে টাদের উদয়ের 
মতো স্বর্ণকুমারীর জ্যোতম্না ছড়িয়ে পড়ছে। এইসব উত্ভতাসে পাগল পাগল 
লাগে কিশোর রবির, তিনি কবিতারসে মাতাল হতে থাকেন ক্রমশ। 

জ্যোতি ও দ্বিজেন ঠিক করে ফেললেন সামনের বসন্তে ঠাকুরবাড়িতে 
একটি বিদ্বজ্জন সমাবেশ করা হবে। দেশের সন্ধিক্ষণে ঠাকুরবাড়িকেই নিতে 
হবে অগ্রণী ভূমিকা। সবাই মেতে উঠলেন তার প্রস্তুতিতে। 

সারদার শরীর কিছুটা ভাল থাকায় দেবেন ঠাকুরও নিশ্টিন্ত হয়ে পৌষের 
এক সন্ধ্যায় সদলবলে ব্রাঙ্মসমাজে এলেন। ছেলেদের মধ্যে দ্বিজেন ও 
জ্যোতি এবং জামাই বন্ধু আত্মীয়স্বজন মিলে বেশ বড় দল। তাদের যোগদানে 
সেদিন ব্রহ্মসংগীত বেশ জমে উঠল। জ্যোতি ও দ্বিজেনের উদাত্ত গলার গানে 
যেন নতুন জোয়ার এল ব্রান্মদের দলটিতে। উপাসনার সময় দেবেন আজ শুধু 
স্ত্রীর আরোগ্য কামনা করলেন। সারদা অসুস্থ থাকলে ঘরে মন বসে না তীর। 
গৃহকে গৃহ মনে হয় না। 

কিছুদিনের মধ্যেই উচাটন কাটাতে শিলাইদহে জমিদারি দেখতে গেলেন 
তিনি। সারদাও ঘরবন্দি না থেকে গঙ্গাবক্ষের মনোরম বাতাসে ফিরে যাওয়ার 
সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু স্বামীর অনুপস্থিতিতে আবার তার শরীর খারাপ হতে 
শুরু করল। এবার শুরু হল তুকতাক। এক হাতুড়ে আচাধিনীর পরামশে 
তেতুলপোড়া বেটে ক্ষতের চারপাশে লাগানোয় ক্ষত বিষাক্ত হয়ে পেকে 
উঠল। এবার বোধহয় আর বাঁচবেন না। সারদা ভাবলেন, শেষ কষ্টাদিন 
বাড়িতে কাটানোই ভাল। 

রবির আবদারে বাড়িতে কয়েকদিন বালকদের ঘরের একপাশে বিছানা 
করে থাকছিলেন সারদা। অসুখ বেড়ে যেতে তেতলার ঘরে নিয়ে যাওয়া 
হল। ক্রমশ বিছানা থেকে ওঠার শক্তি হারালেন। বেডসোর থেকে বাচানোর 
জন্য উইলসন হোটেলের দোকান থেকে হাওয়া-বালিশ আনা হয়েছে। রোজ 
সেই বাতাসের বিছানা-বালিশে হাওয়া ভরার জন্য গাড়ি করে একজন লোক 
পাঠাতে হয়। 

খবর পেয়ে বিষণ্ন হয়ে পড়েন দেবেন্দ্রনাথ। সারদাকে কি আর ধরে রাখা 
যাবে না সত্যিই? গিন্নি না থাকলে বাড়ির প্রতি টানটুকু ধরে রাখাই মুশকিল 
হয়ে যাবে এরপর। 


বাড়িতে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেছে। সবাই ভাবছেন কর্তামশায় শিলাইদহ 
থেকে ফিরে এসে দেখতে পাবেন তো কর্তামাকে? 

'সারদা কিন্তু নাড়ি ছেড়ে যায় যায় অবস্থাতেও বললেন, তোরা ভাবিস না, 
কন্তার পায়ের ধুলো না নিয়ে আমি মরব না। 

ঠিক তাই হল। দেবেন ফিরে এলেন জোড়াসীকোয়। সোজা চলে এলেন 
স্ত্রীর তেতলার ঘরে। সারদা অতি কষ্টে হাত বাড়িয়ে কর্তার পা ছুঁয়ে বললেন, 
আমি তবে চললাম। আর জন্মে আবার দেখা হবে। 
নিয়ে চোখ বুজলেন সারদাসুন্দরী। ব্রাক্মঘরের কোনও এক বউ মরদেহকে 
প্রণাম করে যেন গোঁড়া হিন্দুদের মতো বলে উঠলেন, আহা, শাখা সিন্দুর 
নিয়ে চলে গেলেন সৌভাগ্যবতী। 

চুপচাপ কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে ছাদে চলে গেলেন দেবেন্দ্রনাথ। 

শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময় আবার নেমে এলেন। চিরসঙ্গিনীর দেহে 
নিজের হাতে ফুল চন্দন ছিটিয়ে স্বগতোক্তি করেন, “ছয় বৎসরের সময় 
এনেছিলেম, আজ বিদায় দিলেম।” 

সত্যেন মাকে শেষদেখা দেখতে পাননি। খবর পেয়ে সাতদিনের মাথায় 
জ্ঞানদাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। জীবিত. সব পুত্রকন্যাবধূর উপস্থিতিতে 
ব্রাহ্গমতে মহাসমারোহে তার শেষ কাজ হয়ে গেল। সারদার মৃত্যুতে 
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে একটি যুগের অবসান ঘটল। 


বারবাড়িতে শুরু হল নতুন একটি যুগ। মাসখানেক পরে শোক কাটিয়ে 
উঠে সারদার ছেলেরা বাড়িতে বিদ্বজ্জনসমাগম ঘটিয়ে ফেললেন। সত্যেন 
এখানে থাকায় সভার আয়োজন হল ম্সবাঙ্গসুন্দর। রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন 
বন্দ্যোপাধ্যায়, বাবু রাজেন্দ্রলাল মিত্র, বাবু রাজনারায়ণ বসু, বাবু প্যারীচরণ 
সরকার ইত্যাদি বু লেখক সম্পাদক গুণীজনে গমগমে সেই সভায় দ্বিজেন 
তার স্বপ্নপ্রয়াণ কাব্য পাঠ করলেন আর জ্যোতি পড়লেন নিজের নাটকের 
একটি অঙ্ক। কিন্তু গোলমাল বাধল প্যারীমোহন কবিরত্ব যখন ইংলন্ডেশ্বরীর 
প্রতি নিবেদিত একটি গানে স্বদেশির সঙ্গে বিলিতি দ্রব্যের বিনিময়ে ভারতের 
সবনাশের কথা বললেন। অনেকে তার সঙ্গে একমত না হওয়ায় তর্ক শুরু 
হয়ে গেল। সেখানে প্রায় শ'খানেক বাঙালি বুদ্ধিজীবী জড়ো হয়েছেন, সবাই 
৯২ 


তো কোনও বিষয়েই একমত হবেন না। 

শেষে সত্যেন সংগীত শুরু করিয়ে দিতে হট্টগোল থামল। ঠাকুরবাড়ির 
অবসানে গানের চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে! 

এই অনুষ্ঠানটি রবির পক্ষে খুবই আনন্দের। যাঁদের লেখা পড়তে শুরু 
করেছেন, যাঁদের কথা বারে বারে শুনেছেন, তারাই সশরীরে একেবারে 
ঘরের মধ্যে উপস্থিত! তাদের উৎসাহ পেয়ে মনে তার খুশির বাধ ভাঙল 
যেন। 

এই সভায় মেয়েদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কিন্তু সকলকে অবাক করে 
দিয়ে হঠাৎই কালো চাদরে মুখ ঢাকা দু'জন নারী আসরে এসে বসলেন। 
অথচ কৌতৃহল হচ্ছে। 

কেউ জানতে চান, মেয়েদুটি সত্যি মেয়ে তো? 

আবার আর-একজন ফিসফিস করে বলেন, মুসলমানি মেয়েরা তো 
এভাবে বেরতেই পারে না? মেয়ে না কি হিজড়ে? 

জ্যোতির কাছে সবাই জানতে চান। তার অবশ্য সন্দেহ হয় স্বপ্ন দুষ্টুমি 
করছে না তো কাউকে জুটিয়ে নিয়ে? সে আসতে চেয়েছিল কিন্তু অনুমৃতি 
দেওয়া হয়নি দু'-চারজন রক্ষণশীল আপত্তি জানানোয়। নিজেদের বাড়িতে 
প্রথমবার সমাগম করতে গিয়ে কোনও বাধা আসুক তা জ্যোতি চাইছিলেন 
না। পরের বার নিশ্চয় মেয়েরাও আসবে। কিন্তু মেয়েদুটি কারা? 

ঘোমটার নীচে মেয়েদুটি হাসিগল্পে মশগুল। জ্যোতিরিন্দ্র কায়দা করে 
ওঁদের পরিচয় জানার জন্য রবিকে পাঠালেন। 

রবি ওঁদের সামনে গিয়ে জ্যোতিদাদার শেখানো কথাটাই বললেন, 
আপনারা যদি নিজেদের পরিচয় দিয়ে কোনও আলোচনায় অংশ নেন, 
আমরা খুব খুশি হব। 

মেয়েরা রবিকে পাত্তা দেয় না। হাত নেড়ে চলে যেতে বলে, কিন্তু রবি 
নাছোড়বান্দা তাঁকে একটা গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি বারবার নানাভাবে 
ওদের নাম জানতে চান। 

রবির জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একটি মেয়ে বলে ওঠে, জ্যোতিদাদাকে বল 
আমরা সখীসমিতি। 


৯৩ 


রবি জানতে চান, দু'জনেরই এই নাম? 

মেয়েটি বলে, দু'জনে মিলে এই নাম। বুঝলি গবেট! যা জ্যোতিদাদাকে 
বল আর আমাদের নিস্তার দে। সবাই হা করে দেখছে। 

রবির এবার চেনা চেনা লাগে গলাটা, তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, 
বুঝেছি, তুমি তো স্বর্ণদিদি। স্বর্ণ তাড়াতাড়ি রবির মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেন, 
চুপ চুপ। 

তা হলে বলো, তোমার সঙ্গে উনি কে£ রবি ছাড়ার পাত্র নয়। না বললে 
চিৎকার করব। সবাইকে বলে দেব তোমরা লুকিয়ে লুকিয়ে এসেছ। 

আরে আমি রূপা। এবার চুপ করো রবিদাদা। আমরা লুকোচুরি খেলছি 
বিদ্বজ্জনের সঙ্গে। | 

সখীসমিতিকে ঘোমটার মধ্যে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখে এবার রবিও 
হাসতে থাকেন। তিনিও যেন ওদের লুকোচুরি খেলার সঙ্গী হয়ে যান। 

উৎসুক দু'-একজন প্রশ্ন করলে রবি বলেন, সে একটা গুহ্যকথা, সবাইকে 
বলা বারণ। শুধু জ্যোতিদাদাকে বলা যাবে। 

উৎসবের শেষে খাওয়াদাওয়াটি অতি চমৎকার হলেও সবাই মনে একটা 
প্রশ্ন নিয়ে ফিরে গেলেন। রহস্যটা জানা হল না, কিন্তু জানতেই হবে নেয়েদুটি 
কে? 

সভা যখন ভঙ্গ হল দেবেন্দ্রনাথ তখন অনেক দূরের এক পাহাড়ূচড়ায় 
সুাস্ত দেখছেন। 


৯৪ 


৭ 


হেকেটি ঠাকরুন 


১৮৭৬-এ ইংলন্ডের রানি ভিক্টোরিয়া ভারতসন্ত্রাজ্জী উপাধি নিয়ে সাড়ম্বরে 
সে-কথা ঘোষণা করলেন কলকাতায়। এদিকে ঠাকুরবাড়িতে সারদার মৃত্যুর 
পর বিরাট সংসারের ভার কাধে তুলে নিলেন তার বড় মেয়ে সৌদামিনী আর 
নতুনধউঠানের এই আন্তরিক চেষ্টার মধ্য দিয়েই নারীর কোমলতার প্রথম 
স্বাদ পাচ্ছেন রবি। 

মেজোবউঠান বোম্বাই থাকায় জ্যোতিও এখন স্ত্রীর প্রতি পুরোপুরি 
মনোযোগী ও নির্ভরশীল। দুই তেজি নারীর অনুপস্থিতিতে ঠাকুরবাড়ির অন্দরে 
নতুন তারকার মতো ক্রমশ উজ্জল হয়ে উঠছেন কাদন্বরী। তেতলার ছাদের 
ওপর তার ঘর ও বাগান হয়ে উঠল জ্যোতির গান ও কবিতার কম্মশিবির। 
আর রবি সেই ঘরে সবক্ষণের অতিথি। জ্যোতি আর কাদন্বরীর উৎসাহে 
এখন বাড়িতে অন্দরমহলের পরদা যেন উঠে গেছে। জীবনের প্রথম দশবছর 
বাড়ির রূপরসগন্ধ আনন্দ-বেদনার মুল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন রবি বুভুক্ষের 
মতো গৃহসুখ আকণ্ঠ পান করতে লাগলেন। 

নতুনবউঠানের পুতুলের বিয়েতে প্রধান নিমস্ত্রিত রবি। কাদন্বরীর হাতে 
চিংডিমাছের চচ্চড়ির সঙ্গে লঙ্কামাখা পাস্তাভাতের আয়োজনই হয়ে ওঠে 
অসাধারণ । 

পরের দিন ঘরের সামনে বউঠানের চটিজোড়া দেখতে না পেয়ে মুখ গোমড়া 
হয়ে যায় রবির, নিশ্চয় তাকে না বলে কোথাও নেমন্তন্ন রাখতে গেছেন! ফিরে 
আসতেই পুতুলের গয়না লুকিয়ে সেই ছুতোয় ঝগড়া শুরু করেন রবি, আমি 
কি তোমার চৌকিদার, তুমি না থাকলে তোমার ঘর কে সামলাবে? 


৯৫ 


কাদন্ধরী হেমে বলেন, তোমাকে সামলাতে হবে না রবি, তুমি নিজের 
হাত সামলাও। 

কখনও ছাদের ওপর ডাল বেটে বড়ি দেওয়া হয়েছে, আমসত্ব শুকোচ্ছে। 
শীতের দুপুরে মাদুরে চুল এলিয়ে আলস্য করে পাহারা দিচ্ছেন বউঠান, সঙ্গে 
রবি। 

ছাদের ঘরে যেদিন পিয়ানো এনে বসিয়ে দিলেন জ্যোতি, সেদিন যেন 
উৎসব। পিয়ানো বাজাচ্ছেন জ্যোতি আর সুরে কথা বসিয়ে গান গেয়ে উঠছেন 
রবি। বারো বছরের ছোট ভাইকে সব বিষয়েই প্রশ্রয় দেন জ্যোতিরিন্দ্র, রবির 
মধ্যে তিনি প্রতিভার ছটা দেখেছেন। 

কিন্তু কাদম্বরী তা মানতে নারাজ। রবির সঙ্গে খুনসুটি করে প্রায়ই বলেন, 
তোমার মধ্যে বিশেষত্ব তো কিছুই দেখছি না রবি। না রূপে না গুণে। 

রবি বলেন. আমার গুণ না হয় তুমি চিনতে পারছ না বোঠান, চেহারাটাও 
কি তোমার চোখের বালি? 

কাদন্বরী রহস্য করেন, না রবি ঠাকুরপো, তোমার দাদাদিদিদের তুলনায় 
তোমার নাকটা বেশ বৌচা। 

না হয় নাক বৌচাই হল, তা বলে আমি কি দেখতে খারাপ? রবি৪ উসকে 
দিয়ে নিজের চেহারার কথা শুনতে চান বউঠানের মুখে। 

গায়ের রং ময়লা, মা এত রূপটান মাখিয়েও রং ফেরাতে পারেননি। 
কাদন্বরী চোখ নাচিয়ে বললেন। 

পুরুষের আবার রং লাগে নাকি বোঠান? ইংরেজি সাহিত্যে পড়ছ না টল 
ডার্ক হ্যান্ডসাম নায়কদের গুণগান! রবি এবার টক্কর দিয়েছেন। 

কাদন্বরী ঠেস দেন, ইস! খুব নায়ক সাজার শখ না? কীসে নায়ক হবে, 
কবিতা লিখে? পারবে বিহারীলালের মতো কবিতা লিখতে? 

রবি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, পারতেই হবে, বউঠানের কাছে একদিন 
না একদিন নিজেকে প্রমাণ করবেন তিনি। কাদন্বরীর ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ 
থেকেই রবির ছোট নীলখাতাটি ভরে উঠতে থাকে কবিতায় কবিতায়। 

সারাদুপুর কবিতা আর পিয়ানো চর্চার পর দিনের শেষে ছাদের ওপর 
জল ছিটিয়ে রেখে দিলেন কাদন্বরী, পিরিচে বরফ দেওয়া জল আর বাটায় 
ছাঁচিপান। 


৯৬ 


গা ধুয়ে, খোঁপায় বেলফুলের মালা জড়িয়ে এক-এক দিন এক-এক রঙের 
নয়নসুখ বা বেগমবাহার তাতের শাড়ি পরে কাদম্বরী এসে যখন মাদুরের 
ওপর বসেন, রবির মনে হয় যেন স্বয়ং সরস্বতী নেমে এসেছেন। ফরাসি 
পারফিউমের গন্ধে ম ম করে ওঠে সন্ধ্যার বাতাস। 

জ্যোতি আসেন ধুতি বা পাজামার ওপর গায়ে পাতলা একটি উড়নি 
বিশেষ মূল্য না দিয়ে বউঠান উৎসুক থাকেন জ্যোতির কণ্ঠসুধার জন্য। 

ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে রূপবান গুণবান যুবকটিকে স্বামী হিসেবে পেয়ে 
নিজেকে রূপকথার রাজকন্যে মনে হয় কাদন্বরীর। প্রথম প্রথম তার ভয় ছিল 
স্বামীর যোগ্য হতে পারবেন কি না। জ্যোতি যদি তাকে উপেক্ষা করতেন, 
আত্মহত্যা করবেন ভেবে রেখেছিলেন কাদন্বরী। বিশেষত মেজোজা 
জ্ঞানদানন্দিনী বিয়ের আগে থেকেই অযোগ্য বলে তাকে যেরকম অপছন্দ 
করতেন তাতে কাদন্বরী ভয় পেয়েছিলেন। 

কিন্তু জ্যোতির আদরে সোহাগে তিনি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী রমণী। 
পড়াশোনা ও কাব্যপাঠের পাশাপাশি তিনি মন দিয়ে ঘরকন্নাও করেন। অতি 
সাধারণ পদও তার রান্নার গুণে অসাধারণ হয়ে ওঠে। আবার ছাদের ওপর 
তার নিজের হাতে সাজানো বাগানটিও দেখার মতো। কিনারায় সারি সারি 
লম্বা পামগাছ। আশেপাশের টবে চামেলি, গন্ধরাজ, করবী, দোলনটাপা। 
ছাদের ভোল পালটে গেছে কাদন্বরীর হাতে। 

বাড়ির মেয়েরা কেউ কেউ অবশ্য সেরেস্তার সামান্য কম্চারীর মেয়ে বলে 
এখনও তাঁকে অবজ্ঞা করেন কিন্তু কাদন্বরী আর গ্রাহ্য করেন না। প্রেমিক 
স্বামী ও লক্ষ্মণ দেওর নিয়েই তার দিন বেশ ভরপুর হয়ে ওঠে। 

মাঝে মাঝে শিলাইদহের জমিদারি দেখতে চলে যান জ্যোতি, কখনও 
কখনও নিজের লেখা নাটকের রিহারসালে আটকে গিয়ে বাড়ি ফেরা হয় না, 
তখন কাদন্বরীর বড় একলা লাগে আর সেই বিরহিণী বউঠানের মনোরঞ্জনের 
আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন রবি। 


কবি অক্ষয় চৌধুরী। কিছুদিন আগেও ঠাকুরবাড়ির অন্দরে নারীপুরুষের এমন 
খোলামেলা আসরের কথা ভাবা যেত না। অক্ষয় আবার কাদন্বরীকে মুগ্ধ 


৯৭. 


করার জন্য গাইয়ে হওয়ার চেষ্টাও করছেন, যদিও তার গলায় একফোৌটা সুর 
নেই। তিনি হাতের কাছে একটা মোটা বাঁধানো বই পেয়ে সেটাকেই তবলায় 
রূপাস্তরিত করলেন। গান শুরু হতেই জ্যোতি আর কাদন্বরী চোখে চোখে 
হাসেন। 

জ্যোতি বললেন, অক্ষয়, গান থাক না, আজ একটা কবিতা পড়ে শোনাও। 
কাদন্ধবরী কতদিন তোমার কবিতা শোনেনি। 

অক্ষয় বিগলিত নয়নে কাদন্বরীর দিকে তাকিয়ে বলেন, সত্যি শুনবেন 
বউঠান£ঃ আমি ক'দিন ধরে নতুন বর্ধা-কবিতাগুচ্ছ লিখেছি, আপনাকে না 
শোনালে সেই বরাজলধারা ঠিক প্রাণ পাচ্ছে না। 

নিজের লেখা ছাড়াও অক্ষয়চন্দ্র “আইরিশ মেলোডি; কাব্যগ্রন্থ থেকে 
উদাত্ত স্বরে আবৃত্তি করে মুগ্ধ করে দিতেন রবিকে। পড়ার বইয়ের শুকনো 
পাতায় যা পাওয়া যেত না, সেই নিত্যনতুন কাব্যরসের সন্ধান মিলত তার 
উৎসাহে। রবি এ-সব কবিতাগুলি বাংলায় অনুবাদ করে কখনও জ্যোতি 
কখনও অক্ষয়কে শোনাতে শুরু করলেন। এভাবেই ভরে উঠছিল তার 
“মালতীপুথি+র পৃষ্ঠাগুলি। দাদাদের কাছে কিশোরকবি যতটা গুরুত্ব পাচ্ছিলেন 
কাদন্বরী অবশ্য সমবয়সি দেওরকে তা দিতে রাজি নন। 

রবির সঙ্গে কাদন্ববীর একদিন তর্ক. বেধে যায় পাখি পোষা নিয়ে। 
ধনীঘরের বউ-মেয়েরা আজকাল বারান্দায় খাঁচায় পাখি ঝুলিয়ে রাখেন। 
খাঁচার কোকিলের ডাক শুনলে রবির অসহ্য লাগে। কোথা থেকে একটা চিন 
দেশের শ্যামাপাখি এনে পুষতে শুরু করেছেন কাদন্বরী। 

রবি ঝগড়া বাধিয়ে দিলেন তার সঙ্গে, খাঁচার পাখির কষ্টে তোমার 
মনখারাপ হয় না? ওকে ধরে রেখেছ কেন, ছেড়ে দাও। 

কাদম্বরী জবাব না দিয়ে পাখিকেদানা দিতে থাকেন। রোজ সকালে 
এক পোকাওয়ালা আসে পাখির জন্য ফড়িং, পোকামাকড় জোগাতে। 
পোকাওয়ালার সঙ্গে কথায় ব্যস্ত হয়ে যান তিনি আর রবির রাগ বাড়তে 
থাকে। 

রবি বললেন, উত্তর দিচ্ছ না কেন। জ্যোতিদাদা কিন্তু আমার সব প্রশ্নের 
জবাব দেন। 

কীসের জবাব শুনি? সব কাজের কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি তোমাকে? 
ঝাঝিয়ে ওঠেন কাদম্বরী। আমার অত সময় নেই, দেখছ না৷ কাজ করছি? 


৯৮ 


রবি মনে মনে রেগে যান কিস্তু বউঠানের কাছে নতিম্বীকার করা চলবে 
না। তিনিও ঝাঝিয়ে উত্তর দেন, কাজ না অকাজ? অসহায় প্রাণীগুলোকে 
খাঁচায় বেঁধে রেখে আবার কাজ দেখানো হচ্ছে? 

পাখি পোষা খারাপ কাজ? দেখছ না কত আদর যত্ব করছি? কাদন্বরী 
একটু আপসের সুরে বললেন। 

রবি ছাড়ার পাত্র নন, আজ তিনি হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বেন। শুধু পাখি? 
তুমি যে কাঠবেড়ালিদুটোকে পুষ্যি নেবার নাম করে খাঁচায় পুরেছ, বনের 
প্রাণীকে বন্দি করা তোমার ভারী অন্যায়। 

কাদন্বরী চোখ পাকিয়ে দেবরটিকে বললেন, তোমাকে আর গুরুমশায়গিরি 
করতে হবে না, আমার ন্যায় অন্যায় আমি বুঝব। 

একে তো ঠিক জবাব বলা যায় না, বড় হওয়ার সুযোগে বউঠান তার 
সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন। কিন্তু রবির মন মানে না, এটা যে অন্যায় সেটা 
বউঠান বুঝবেন না কেন? জ্যোতিদাদাকে বলেও কোনও লাভ হবে না, 
তিনি তো আবার হরিণ পুষেছেন। হয়তো তর্ক এড়াতে বউঠানের মতেই 
মত দেবেন। 

রবি তখনকার মতো চুপ করে গেলেন। কিন্তু একরাকে চুপি চুপি খাঁচা 
খুলে ছেড়ে দিলেন বনের প্রাণীদের। তারপর দেওর বউঠানের ঝগড়া থামাতে 
অবশ্য জ্যোতিকে আসরে নামতে হয়েছিল। 

জ্যোতিরিন্দ্রের নতুন নাটক “সরোজিনী” বা “চিতোর আক্রমণ” প্রকাশিত 
হয়েই হইচই ফেলে দিয়েছে। নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে, 
প্রধান ভূমিকায় নটা বিনোদিনী। এই নাটকের একটি গান রবির লেখা। 
ভাইয়ের প্রতি অনুরাগবশত জ্যোতি তাকে গান লেখার দায়িত্ব দিয়েছেন, 
আর রবি এই অভাবিত সুযোগ পেয়ে নিজের সৃজনীশক্তি নিংড়ে গানটি রচনা 
করেছেন। 

যদিও রবির গান লেখা নিয়ে কাদন্বরীর আপত্তি ছিল। তার মতে এই 
নাটকটি জ্যোতির সেরা রচনা। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাটকে নটা বিনোদিনীর 
কণ্ঠে যে গান গাওয়া হবে সেটা রবিকে লিখতে দিয়ে অবিবেচনার কাজ 
করছেন জ্যোতি। গানটা তার নিজেরই লেখা উচিত। 

নাটক এবং নাটকের ওই বিশেষ গানটি কিন্তু দর্শকদের মাতিয়ে দিল। 
যে দৃশ্যে চারদিকে ধু ধু চিতা জ্বলছে, আর রাজপুত মেয়েরা কেউ লাল 


৯৯ 


শাড়ি পরে, কেউ বা ফুলের গয়নায় সেজে গান গাইতে গাইতে চিতারোহণ 
করছেন, সেই গানটিই রবির লেখা, 


“জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ 
পরাণ সঁপিবে বিধবা বালা। 
জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন 
জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা 
দেখ রে যবন দেখ রে তোরা 
যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে। 
সাক্ষী রহিলেন দেবতা তার 
এর প্রতিফল ভুগতে হবে 0 


স্টেজে সত্যি আগুন জ্বালানো হত। মেয়েরা গান গাইতে গাইতে ঝুপ 
করে আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে আর পিচকিরি করে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন দাউ 
দাউ জ্বলে উঠছে। অভিনেত্রীদের গায়ে আচ ল।গছে, চুল পুড়ে যাচ্ছে, কারও 
কোনও জাক্ষেপ নেই, দেশপ্রেমের উত্তেজনায় তারাও শরিক। 

এই নাটকে সরোজিনীর নামভূমিকায় বিনোদিনী সবাইকে মুগ্ধ করে 
দিচ্ছেন। নাট্যকার স্বয়ং মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন বিনোদিনীর দিকে। তার 
হৃদৃস্পন্দন বেড়ে যায়, বুক ধুক ধুক করে। 

রবি বউঠানকে কটাক্ষ হেনে বলেন, কী বোঠান, একেবারে হেলাফেলা 
করার মতো নয়, কী বলো£ 

মন্দ নয়! কাদন্বরী হেসে তার পিঠ চাপড়ে দিলেন। তোমার একট পুরস্কার 
পাওনা হল। 


কী পুরস্কার দেবেন বউঠান, রবি কৌতুহলে ছটফট করতে থাকেন কয়েকদিন 
ধরে। তীর ঘুর ঘুর করা দেখে মজা পান কাদশ্বরী, কিন্তু রহস্য ভাঙেন না। 
ইতিমধ্যে একবার জ্যোতি শিলহদহে মাওয়ার সময় রবিকে সঙ্গে নিয়ে 
গেলেন। সরোজিনী নাটকের গানটি লিখে রবি তাকে চমৎকৃত করেছেন, 
জ্যোতি ঠিক করলেন এখন থেকে রবিকে তার সব কাজের সঙ্গী করে নেবেন। 
কবিতা লেখাই তো শুধু কাজ নয়, জ্যোতি ঘোড়ায় চড়া আর পাখি শিকারেও 


১০০ 


রবিকে সমকক্ষের মধ্ধাদা দিচ্ছেন। কাদম্বরী জ্যোতিকে চিঠি লেখেন, রবিকেও। 
সেই চিঠির বড় বড় উত্তর লেখাও রবির একটি কাজ। 

শিলাইদহ রবিকে বাধাবন্ধন হীন স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিল, যেন প্রখর 
গ্রীষ্মের পর একপশলা বৃষ্টি। এখানে এসে জ্যোতি নিজেও যেন হৃদয় খোলা 
খেপামিতে মেতে ওঠেন। এই খেপামি কলকাতায় ফিরেও থামল না। তিনি 
মেতে উঠলেন সঞ্জীবনী সভা নিয়ে। 

তখন কলকাতার যুবকমহলে ইতালির মাৎসিনির স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনি 
প্রচার করে সাড়া ফেলেছেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে 
স্বাধীনতার আন্দোলনে গুপ্তসমিতি তৈরি করে তিনি যে স্বাদেশিকতার 
আগুন জ্বালিয়েছেন, সে-সব শুনতে শুনতে অনুপ্রাণিত বাঙালি যুবকেরা 
বেশ কিছু গুপ্তসমিতি তৈরি করছিলেন, সেরকমই একটি সঞ্জীবনী সভা। 
উদ্দেশ্য লোকহিত এবং জাতীয়তাবাদের চর্চা। 

জ্যোতি ও রবি তার সদস্য হলেন। গুপ্ত সমিতি, তাই সভা বসত 
গোপনে, ঠনঠনের একটি পোড়োবাড়িতে। দীক্ষাগ্রহণের দিন সভার অধ্ক্ষ 
রাজনারায়ণ বসু মশায় এলেন লাল পষ্টবস্ত্র পরে। আদি ব্বাহ্গসমাজ থেকে 
আনা লাল কাপড়ে জড়ানো একটি বেদ পুঁথি টেবিলে রাখা হল। বেদগান 
দিয়ে সভার শুরু। তারপর টেবিলের দু'পাশে দুটি মড়ার খুলি রেখে তাদের 
চোখে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলেন কেউ। মড়ার মাথা মরা ভারতের প্রতীক, 
মোম জ্বালিয়ে মৃতদেহে প্রাণসঞ্ধারের ও জ্ঞানচোখ উন্মোচনের শপথ নিলেন 
দুই ভাই। 

সভ্যরা তাদের আয়ের এক দশমাংশ সভায় দেন। ঠিক হল যে স্বদেশি 
দেশলাই, স্বদেশি কাপড়কল ইত্যাদি উদ্যোগে টাকা দেওয়া হবে। প্রথম 
সমাচার চন্দ্রিকায় খবর বেরিয়েছে, “একটি শুভ চিহ।/আজ আমরা একটি 
নৃতন দেশলায়ের বাঝ্স দেখিলাম। বাঝ্সটীর আকার বিলাতি ব্রায়ান্ট এবং 
মের সেফটিম্যাচের ছোট বাকের ন্যায়। পাতলা দেবদারু কাঠেই সুন্দর রূপে 
বাঝ্সটী নিম্মিত হইয়াছে। দুই ধারে দেশলাই ঘষিবার মসলা মাখান। কাঠিগুলি 
দেবদারু কাঠের না হইয়া বাসের করা হইয়াছে, ঘষণ মাত্রেই উত্তম জ্বলিয়া 
উঠিল, কিন্তু একটু ঠাণ্ডা লাগিলে বাঁসের কাষ্ঠ যেমন সহজেই শীতল হইয়া 
জ্বলনশক্তির হ্রাস হয় এগুলিকেও সে দোষ হইতে মুক্ত দেখিলাম না।' 


১০১ 


তিনি উত্তেজিত হয়ে রবিকে ডেকে পাঠান, দেখ রবি সমাচার চন্দ্রিকা কত 
প্রশংসা করেছে স্বদেশি দেশলাইয়ের। 

রবি কীচুমাচু হয়ে বললেন, কিন্তু বড্ড খরচ। এ দেশলাই চালানো শক্ত 
হবে। এরকম এক বাক্স দেশলাই তৈরির খরচে একটি পল্লির সারা বছরের 
জ্বালানি হয়ে যায়। 

জ্যোতি আশঙ্কা উড়িয়ে বললেন, দিশি দেশলাই করা গেল তাই না কত, 
টাকাপয়সা যা লাগে সবাই মিলে তুলে দেওয়া যাবে। বাজারে নামুক তো 
আগে। 

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে রবির আশঙ্কাই সত্যি হল। স্বদেশি দেশলাই তৈরি 
করতে দেনার দায়ে গাঁ উজাড়। অনেক টাকা খরচ করে যে কাপড়ের কল 
বসানো হল, সেটাও কয়েকটি গামছা উৎপন্ন করে খণের ভারে থেমে গেল। 
কিন্তু স্বদেশি উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়া থামল না। পাথুরিয়াঘাটার বাবু 
আনন্দচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুদ্রাযস্ত্র নিমাণ করলেন, বাবু গিরীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 
সুতাকল বসালেন। বাঙালির বিক্ঞানচ্ার জন্য সত্যপ্রসাদকে কুপার্স হিল 
ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পাঠানো হল। রবিকে উৎসাহিত করা হল বিলেতে 
গিয়ে সৃক্ক্রশিল্প শিখতে। 

জ্যোতির মাথায় এল ভারতীয়দের সবক্রনীন পোশাকের ডিজাইন করতে 
হবে। অনেক ভাবনাচিস্তার পর একদিন তিনি পায়জামার ওপর একখণ্ড 
কাপড় দিয়ে মালকৌচা করে পরলেন, মাথায় লাগালেন পাগড়ি ও টুপির 
মাঝামাঝি একটা বস্ত। প্রখর দিনের আলোয় সেই অভ্তুত পোশাক পরে 
দেশোদ্ধারে চললেন জ্যোতি ঠাকুর। এই বিচিত্র দৃশ্য দেখতে রাস্তায় লোক 
জমে গেল। 

মুগ্ধ ভাই রবি সেদিকে তাকিয়ে ন্ছুনবউঠানকে বললেন. ধন্য তোমার 
স্বামী। দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দিতে পারে এমন বীরপ্রুষ অনেক 
করে কলকাতার রাস্তা দিয়ে যেতে পারার মতো লোক নিশ্চয় বিরল। 

কাদন্বরীও মুগ্ধ, সত্যি রবিঠাকুরপো, এমন দুঃসাহসী স্বামীর জন্য আমার 
গব হয়। তাই তো আর কাউকে আমার মনে ধরে না। 

আর কাউকে মনে ধরার দরকার কী ঠাকরুন, রবি তাকান কাদন্বরীর দিকে, 
তুমি তো সকলের মাথা ঘুরিয়ে দাও। 


১০৭ 


পরের দিন অবশ্য জ্যোতিই সবার মাথা ঘুরিয়ে দিলেন আরেকটি নতুন 
উত্তাবনে। সেদিন সকালেই তেতলার ঘরে জড়ো হয়েছেন অক্ষয় আর রবি। 
দু'জনে পাল্লা দিয়ে কবিতা পড়ছেন আর কাদম্বরী লুচি তরকারি জোগান 
দিয়ে যাচ্ছেন। 

জ্যোতির হঠাৎ মনে হল এই দুই কবি-বিহঙ্গের গান শুধু আকাশে মিলিয়ে 
যাচ্ছে, ওদের জন্য একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। কাব্যপাঠ থামিয়ে দিয়ে 
বললেন, আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। 

কাদন্বরী কৌতুক করে বলেন, তোমার মাথায় তো সবসময়েই আইডিয়া 
গিজগিজ করছে। এ আর নতুন কী? 

না না, এ একেবারে নতুন, শুনলে চমকে উঠবে। রবি ও অক্ষয়ের অগাধ 
আস্থা তার ওপর, তারা উৎসুক হয়ে ওঠেন। 

জ্যোতি বললেন, আইডিয়া একটা পত্রিকার। এই ঘর থেকেই বেরবে একটি 
চমকে দেওয়ার মতো সাহিত্য পত্রিকা। তোমাদের আর যাযাবরের মতো 
ওড়াওড়ি করতে হবে না, যা লিখবে সব ধরা থাকবে পত্রিকার পাতায়। 

রবি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, ওঃ জ্যোতিদাদা, তোমার এই আইডিয়াটা 
একেবারে তুরুপের তাস। বাবামশায়কে রাজি করাতে পারবে তো? 

আগে চল দোতলায় বড়দাদার ঘরে যাই। প্রবীণ বিহঙ্গরাজ মত দিলে 
বাবামশায় আপত্তি করবেন না। 

চারজনে দল বেঁধে নেমে আসা হল দ্বিজেন্দ্রনাথের কাছে, তিনি 
কাব্যসাহিত্যের চেয়ে জ্ঞানচগায় বেশি ব্যস্ত থাকেন। কনিষ্ঠদের উৎসাহে তিনিও 
মদত জোগালেন, আইডিয়া তো খুব ভাল, কিন্তু জ্যোতি, নতুন পত্রিকার কী 
দরকার, আবার সবাই মিলে তত্ববোধিনীকেই জাগিয়ে তুলি না কেন? 

জ্যোতি দ্বিধা করেন, বড়দা, তত্ববোধিনীর গায়ে বড্ড রাশভারী গন্ধ। 
সাহিত্যের পত্রিকা হবে বঙ্গদর্শনের মতো স্বাদু অথচ এক্সপেরিমেন্টাল। 
পাঠকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারি এমন পত্রিকা চাই, যাতে পাঠকের 
রুচি উন্নত করা যায়। 

ভাল পত্রিকা হলে মানুষ তো পড়বেনই, ও নিয়ে চিন্তা করিস না, দ্বিজেন 
আশ্বস্ত করতে চান। 

কিন্তু অক্ষয় অন্য কথা বললেন, বড়দাদা, আপনি দেখছেন তো কতশত 
বাঙালি পাঠকের রুচি এখনও বটতলায় আটকে আছে। 


জ্যোতি তার কথা লুফে নিয়ে বলেন, সেই নিন্নরুচি পাঠকদের শিক্ষিত 
করার দায় নেব আমরা, সাহিত্যরুচি উন্নত না হলে জাতির প্রগতি হয় না। 
তত্ববোধিনী সাধারণ লোকের কাছে পৌঁছতে পারে না, আমাদের সম্পূর্ণ 
নতুন করে শুর করতে হবে। 

দ্বিজেন জানতে চান, তা হলে কী নাম দেবে ভাবছ পত্রিকার? 

তুমিই ঠিক করে দাও বড়দাদা, রবি এবার বললেন। 

দ্বিজেন বললেন, “সুপ্রভাত” কেমন নাম? সবাই একটু চুপ। জ্যোতির ঠিক পছন্দ 
হয় না, অবশেষে তিনি বলেন, এই নামটার মধ্যে একটু গঁদ্ধত্য আছে। মনে হবে 
আমরা দাবি করছি যে এতদিনে বাংলা সাহিত্যে সুপ্রভাত আনলাম আমরাই। 

একটু ভেবে দ্বিজেন আরেকটা নাম বললেন, তা হলে “ভারতী” কেমন 
হাবে? 

জ্যোতির পছন্দ হল নামটা, বেশ একটা স্বদেশি গন্ধ আছে, আবার 
ভারতীর একটা অর্থ বাণী, আর-এক অর্ধ বিদ্যা। 

দ্বিজেন আবার বলেন, যে অর্থে ব্রিটেনের অধিষ্টাত্রী ব্রিটানিয়া, আথেন্সের 
এথেনিয়া, সেই অর্থেই ভারত-সরস্বতীর নাম ভারতী ধরা যায়। 

সবার সম্মতিতে ভারতী নামটাই রইল্ল। প্রথম সংখ্যা পাঁচশো কপি 
ছাপার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল, আর ভারতীকে কেন্দ্র করে ঠাকুরবাড়িতে 
শুরু হয়ে গেল সাহিত্যের মহাসম্মেলন। প্রন্তি রোববারে রবি আর জ্যোতি 
ভারতীর ফাইল নিয়ে চলে আসেন অক্ষয়চন্দ্রের বাড়িতে, সেখানে অক্ষয়ের 
স্ত্রী শরৎকুমারী লাহোর থেকে সদ্য এসেছেন। তিনিও মহা উৎসাহে জড়িয়ে 
পড়লেন। কোনও কোনও দিন আবার সবাই মিলে যাওয়া হত বিহারীলালের 
বাড়িতে। রোববার ছাড়া অন্য দিনগুলোর সন্ধেবেলায় প্রায়ই ভারতীর 
দপ্তর বসে স্বপ্-জানকীর রামবাগানের বাড়িতে। সেখানে কাদন্ধরীর সঙ্গে 
প্রফুল্পময়ীও মাঝে মাঝে চলে আসতেন গান ও কবিতায় বিষণ্নতা কাটানোর 
জন্য। স্বণ কোনওদিন ডিনার না করিয়ে ছাড়েন না, ফলে আসর লম্বা হতে 
থাকে দীর্ঘ রাত্রির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। 

ভারতী পত্রিকায় অনুবাদ করবেন ভেবে তেতলার ছাদে বসে রবি একদিন 
কাদশ্বরীকে ম্যাকবেথ পড়ে শোনাচ্ছিলেন। তিন ডাইনির বণনা শুনে কাদন্বরী 
উত্তেজিত হয়ে বললেন, এই ডাইনিরা কত স্বাধীনা, নিজের ইচ্ছেয় বাঁচে, 
ইচ্ছেমতো পুরুষের মুক্ড চিবিয়ে খায়। 
১০৪ 


রবি হেসে ফেললেন, বউঠান তুমি ডাইনিদের হিংসে করছ! তুমিই বা কম 
কীসে, সারাক্ষণ আমার মুত্ডু তো চিবোচ্ছোই, আর বেচারা অক্ষয়বাবুর তো 
আর মুন্ডুই নেই। 
£, আমাকে ডাইনি বলছ রবি ভাল হচ্ছে না কিন্ত, কাদন্বরী ঈষৎ 
অভিমানী হয়ে বললেন। অক্ষয়বাবুর ঘরে শরৎকুমারী আছেন, তাকে ওরকম 
বদনাম দিয়ো না রবি। 
রবি বলেন, হে আমার মাথা চিবিয়ে খাওয়া দেবী, আজ থেকে তোমার 
নাম দিলেম হেকেটি ঠাকরুন। তুমিই ম্যাকবেথের হেকেটি ডাইনি, তুমিই 
ত্রিমুণ্ড গ্রিক দেবী হেকেটি। কোন মন্ত্রে আমাকে ভেড়া করে রেখেছ ঠাকরুন, 
তুমিই জানো। 
যাও যাও, তোমাকে ভেড়া করে রাখতে আমার বয়েই গেছে, এখনও 
নাক টিপলে দুধ বেরোয়, আবার পাকা পাকা কথা! 
ষোলো বছরের রবির মাঝে মাঝে নতুনবউঠানের ওপর খুব অভিমান হয়, 
ষোলো বছর বয়স কি এতই ফেলনা! সংস্কৃতশাস্ত্রে ষোলো বছরের ছেলেকে 
প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হয়। এখনও তো এ বয়সের কত যুবক বিয়ে করে বাচ্চার বাবা 
হয়ে যায়। এই তো সেদিন রবির ভাগনে সত্যর বিয়ে হয়ে গেল। 
রবি বুঝতে পারেন না, বউঠান কেন শুধু তার সঙ্গেই এমন কৌতুক 
করেন! একে তো তিনি এখনও প্রতিশ্রতি মতো পুরস্কার দেওয়ার নাম 
উচ্চারণ করছেন না, তার ওপ্র জ্যোতিদাদাকে তিনি যত মনোযোগ দেন, 
ইদানীং তার অর্ধেকও যেন রবিকে দিতে চাইছেন না। অথচ কেন যে তার 
একটু প্রশংসার জন্য রবির কবিমন কাঙাল হয়ে থাকে! নিজের ওপরেই রাগ 
হয় তার। জ্যোতি ও অক্ষয় এলে কবিতা পড়া শুরু হয়। 
একসময় তেতলার ছাদের সান্ধ্যবাসর শেষ হয়ে সবাই ঘরে ফেরেন, 
জ্যোতি ও কাদন্বরী নিজেদের শোবার ঘরে চলে যান, তারপরেও অনেকক্ষণ 
একা একা ছাদে ঘুরে বেড়ান অস্থির রবি। কত কী আকাশ পাতাল ভাবনা 
মাথায় আসে। টাদনি রাতে ছাদের ওপর সারি সারি পামগাছের ছায়া যেন 
মায়াবী আঁকিবুকি। রাত একটা বাজে, দুটো। সামনের বড় রাস্তায় ধ্বনি ওঠে 
“বল হরি, হরি বোল'। 
সেদিন এমন গভীর রাতে ছাদে পায়চারি করতে করতে জ্যোতিদের ঘরের 
জানলায় চোখ পড়তে চন্দ্রাহত হয়ে তাকিয়ে থাকলেন রবি। জানলার পরদা 
১০৫ 


উড়ে গেছে হাওয়ায়, আর জ্যোৎল্না গিয়ে পড়েছে ঘরের নিভৃত একটি দৃশ্যে। 
টাদের আলোয় শঙ্খলাগা দুটি নারী ও পুরুষের অপরূপ দৃশা। রবির মাথা 
ঝিমঝিম করে। 

সেই একঝলক দেখা দৃশ্যই কৈশোরের ঘোরলাগা সরলতার গণ্ডি পেরিয়ে 
হঠাৎ যেন প্রাপ্তবয়স্ক করে দিল তাকে। নিষিদ্ধ আপেল দেখে ফেলা রবির 
মাথায় নৃত্য করতে থাকে এক জ্যোন্নাময়ী। সারারাত ঘুমোতে পারেন না 
তিনি, শেষ রাতে ধুম জ্বর আসে। 


ইতিমধো শিকারপুরে ডিস্ট্রিক্ট জাজের কাজ করার সময় সত্যেনের একটি 
ছেলে হয়েছে, নাম কবীন্দ্র। কলকাতায় স্বর্ণকুমারীর ছোটমেয়ে উ্নিলাও সদ্য 
জন্মেছে। 

সত্যেন ও জ্ঞানদা ছেলেমেয়েদের নিয়ে কলকাতায় এলেন বিলেত 
যাওয়ার তোড়জোড় করতে। সত্যেনের ইচ্ছে রবিকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন, 
লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়াবেন। 

ওরা এসে পড়ায় তেতলার ছাদের সাহিত্যবাসরে নতুন জোয়ার এল। 
রোজ সন্ধ্যায় জ্যোতি, রবি, কাদন্বরীর সঙ্গে যোগ দেন সত্যেন ও স্গ্লানদা। 
স্বর্ণকূমারী তো আসেনই, এখন কাদন্বরীর প্রিয় কবি বিহারীলালও মাঝে 
মাঝে এসে কবিতা শোনান। ছাদের ওপর ধেন চাদের হাট নেমে এসেছে। 
রবি অবশ্য কয়েকদিন নতুনবউঠানের থেকে একটু দূরে দূরে থাকছেন। 

সেদিন সবাই জড়ো হলেন বিহারীলালের কবিতা শুনতে। এত নামী কবি, 
এত লালিত্যময় কবিতা, সত্যেন আর জ্ঞানদার উৎসাহ সবচেয়ে বেশি। তাঁরা 
প্রবাসে অনেকদিন উপোসি থাকার পর কবিকণ্ঠে কবিতা শোনার এমন সুযোগ 
পেয়েছেন। কিন্তু জ্ঞানদা লক্ষ করছেন কবি বিহারীলাল যেন নির্দিষ্ট একজনের 
উদ্দেশেই সব কবিতা পড়ছেন, পড়তে পড়তে বারে বারে শুধু কাদন্বরীর 
মনোযোগ চাইছেন। আর কাদন্বরীও মুগ্ধ বিস্ময়ে তার কবিতা শুনছেন। 

আর এইসব বাইরের 'পুরুষদের সামনে নতুনবউ কত অনায়াস! জ্ঞানদা 
কিছুদিন ছিলেন না, তার মধ্যে জোড়ার্সাকোর বাড়িতে অনেক পরিবর্তন 
হয়েছে। অন্তঃপুরের পরদা উঠে গেছে। কাদন্বরী ঘোমটা খুলে ফেলে হয়ে 
উঠেছে সাহিত্যবাসরের মক্ষীরানি। এতে জ্ঞানদার খুশিই হওয়ার কথা কিন্তু 
তার মন খচখচ করছে। এ-সব পরিবর্তন তো তিনিই শুরু করেছিলেন, 


১৯০৬ 


তখন কত বিরোধিতা, বাবামশায় আর শাশুড়ির গোমড়া মুখ, দাসী চাকরের 
কান্নাকাটি, রাস্তার লোকের টিটকিরি! কত সহ্য করেছেন জ্ঞানদা আর এখন 
মেয়ে? কী এমন তালেবর হয়ে উঠল যে বিহারীলাল তার প্রশংসার কাঙাল, 
অক্ষয়চন্দ্র মুগ্ধচোখে তাকিয়ে থাকেন, রবিকে এমন গুণ করেছে যে সে 
নতুনবউঠান বলতে অজ্ঞান। আর জ্যোতি তো মাথা কেটে বউয়ের পায়ের 
তলায় রেখে দিয়েছে। 

এই পরিবেশে তার দম বন্ধ হয়ে আসে, এরা কি সব পাগল হয়ে গেল, 
জ্ঞানদা সামনে থাকতেও কাদন্বরীর জাদুতে বশীভূত! স্বর্ণকে জ্ঞানদা বললেন, 
চলো ঠাকুরঝি, তুমি আমি একটু নিভৃতে গল্প করি। 

স্বর্ণ সাহিত্যের আড্ডা ছেড়ে যেতে চান না, একটু পরেই তিনি কবিতা 
শোনাবেন বিহারীলালকে, তিনি বলেন, দীড়াও না মেজোবউঠান, এখন 
কবিতা শুনি তারপর রাতে গল্পগুজব হবে। 

বিহারীলাল এবার জ্ঞানদার দিকে ফেরেন, সে কী বউঠান, আমার কবিতা 
কি এতই খারাপ, আপনি চলে যেতে চাইছেন? 

জ্ঞানদা হেসে বললেন, আপনার অনেক মুগ্ধ পাঠক-পাঠিকা আছেন 
এখানে, আমার না থাকলেও চলবে। 

বোসো না মেজোবউঠান, জ্যোতি অনুরোধ করলেন এবার, তুমি চলে 
গেলে আসর জমবে না। 

জ্ঞানদা গম্ভীর মুখে বলেন, তোমরা আসর জমাও, আমি জলখাবার 
পাঠানোর ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। 

এবার কবিতার ঘোর ভেঙে কাদন্বরী বলে ওঠেন, ও নিয়ে তোমাকে ব্যস্ত 
হতে হবে না মেজদি, জলখাবার এসে পড়বে এক্ষনি, সব বলা আছে। 

বলতে বলতেই দুটি দাসী থরে থরে সাজানো রেকাবি নিয়ে আসে। 
উৎফুল্প হয়ে অক্ষয়চন্দ্র বলে ওঠেন, ওই দেখা যায় থালাভরা ফিশ কাটলেট, 
মাটন চপ। 

কাদম্বরী হেসে বলেন, না মশায়, আজ মাটন চপ নেই, আজ অন্য মেনু। 

অক্ষয় দুঃখী মুখ করে বললেন, সেকী কাদম্বরী বউঠান, এখানে আসার 
প্রথম আযন্টাকশন আপনি স্বয়ং আর দু'নম্বরটা আপনার হাতের স্পেশাল 
মাটন চপ। সেটাই নেই! 


সবাই হেসে উঠে ধোঁয়া-ওঠা শিক কাবাবের দিকে হাত বাড়ালেন। 
শুধু জ্ঞানদার মনে হয়, গৃহিণীপনাতেও কি তাকে হারিয়ে দিচ্ছে নতুনবউ? 
জোড়ার্সীকোর বাড়িতে তিনি যেন একটু অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছেন, আর 
তার অনুপস্থিতির সুযোগে জীকিয়ে বসেছে কাদন্বরী। 

কাদশ্বরী বুঝতে পারেন মেজোজা প্রখর দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ করছেন। মনে 
মনে মজা পান তিনি। এই মেজোবউ একদিন কী অবহেলাই না করেছেন 
তাকে। আজ তিনি দেখুন। আমার ছাদের বাগানে এত গুণীজন আমাকে ঘিরে 
কবিতা শোনায়। গান করে। আমাকে খুশি করতে পারলে আর কিছু চায় না। 
দেখো মেজদি যাকে কাচ বলে ফেলে দিতে চেয়েছিলে সেই এখন জ্যোতি 
ঠাকুরের কণ্ঠের হারে। 

জ্ঞানদা আর কাদন্বরীর মধ্যে সবার অলক্ষে ঠান্ডা লড়াইয়ের বাতাস বইতে 
থাকে। জ্ঞানদা ভাবেন, দাড়াও নতুনবউ, দুটো কাব্য পড়তে শিখেছ বলে মুড়ি 
মিছরি এক করে পাল্লা দিতে চাইছ আমার সঙ্গে! 

সাহিত্যের নিমল বাতাসের (পেছনে ঘনিয়ে ওঠে ঘনঘোর দুধযোগ। 


৮ 


বটতলা বনাম ভারতী পত্রিকা 


সেদিন বই-মালিনী ঠাকুরবাড়ির উঠোনে পা দিতেই কয়েকজন মেয়ে-বউ 
খিলান পেরিয়ে তাকে টেনে নিয়ে আসে মাবেলের বারান্দায় মহিলা আসরের 
মাঝখানে। তার কাছে ঢপ, খেউড়, ঝুমুরগান শুনতে আবদার ধরে তারা। 
মালিনীর মুখ তখন পানের রসে টইটম্বুর, পিক ফেলে মুখ ধুয়ে এসে মাদুরের 
ওপর জমিয়ে বসে সে একটি ঝুমুর গেয়ে ওঠে, গানটি চিরাচরিত বৈষ্ণব 
পদাবলির একটি লোকায়ত প্যারডি, ভবানী বা ভবরানির প্রচলিত ঝুমুরগান, 


চল সই বাঁধা ঘাটে যাই অ-ঘাটের জলের মুখে ছাই 
ঘোলাজল পড়লে পেটে গাটা অমনি গুলিয়ে ওঠে 
পেট ফেঁপে আর ঢেকুর উঠে হেউ হেউ হেউ... 


একসময় ভবানী বা ভবরানি নামে এক মহিলার ঝুমুরগানের দল খুব 
বিখ্যাত হয়েছিল কলকাতায়। তার গান এখনও শুনতে চায় আধুনিক শিক্ষার 
ছোঁয়া-না-লাগা অন্তঃপুরের মেয়েরা। সেসময় বিয়েতে ঝুমুরওলির নাচগান 
খুব চলত, এমনকী গ্রামের বিয়েতে গোরুর গাড়ির ওপরে ঝুমুর দলের নাচ 
হত। 

গান শুনে নিস্তরঙ্গ অন্তঃপুরে একটু ঢেউ ওঠে। আরেকটা শোনাও, বলে 
মালিনীর গলা ধরে ঝুলে পড়ে রূপা। 

ঝুমুরের পর মালিনী বলে, এবার তা হলে একটা খেউড় শোনো, 
রূপারানি। স্ত্রী-পুরুষের প্রেমালাপ। শোনো, স্ত্রী বললে, মালিনী সুর টেনে 
বলে: “ওরে আমার কালভ্রমর, মধু লুটবি যদি আয়।, 


৯০৪) 


মেয়েরা ছেঁকে ধরে, তখন পুরুষ কী বললে? 
বোঠানরা? এবার বেশ সুর করে বলে মালিনী, আর পুরুষ বলে, “আমি 
থাকতে চাকের মধু পাঁচভ্রমরে খেয়ে যায় £ 
আছেন, কম শিক্ষিতরা আছেন, গরিব আশ্রিতারা আছে, দাসীরা আছে। 
তারা অনেকেই এধরনের ছড়ায়-খেউড়ে মজা পায়। সৌদামিনী, নীপময়ী, 
শরৎকুমারীরও মাঝে মাঝে এমন কৌতুকরস ভালই লাগে। রূপকুমারী তো 
বেড়ায়, মালিনীর গা ঘেঁসে ওর সঙ্গে গাইবারও চেষ্টা করে। 

অথচ এ-সব চলতি গ্রাম্য ভাষায় কোনও পরিশীলনের ছোয়া নেই বলে 
জ্ঞানদার কানে তা রীতিমতো অশ্লীল শোনায়। মকরমুখী রুপোর জীতিতে 
সুপুরি কাটতে কাটতে তিনি বিরক্তিতে ভুরু কৌচকালেন, কী'শোনাও এ-সব 
মালিনী, না আছে কোনও ছন্দ না শ্রী। 

শহরের বুদ্ধিজীবীরা যখন ভাষাসরম্বতীকে ইতর অশ্লীল গেঁইয়াপনার হাত 
থেকে উদ্ধার করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন, তখন এ-সব মেঞেলি খেউড় 
শুনে ধর্ণও খুব রাগ করেন, নতুন বঙ্গদশনের পাত। থেকে মুখ তুলে তিনি 
বললেন, এ-সব কী হচ্ছে মালিনী, তুমি কত ভাছ। ঙাল সাহিত্য জানো, কত 
অশিক্ষিতাকে অক্ষর শেখাও আর সেই তুমি এ-সব লঘু খেউড় শোনাচ্ছ 

শুধু লঘু না, জ্ঞানদা বলেন, রীতিমতো অশ্লীল সব গাইয়া ছড়া। এ-সব 
এখানে বোলো না মালিনী। রূপ ওখান থেকে উঠে আয়, খবরদার ও-সব 
গান মুখে আনবি না। আমাদের ঘরের মেয়েরা ও-সব গায় না। 

মালিনী ক্ষুব্ধ হয়ে ঝাপি গুটোনোর উদ্যোগ করে বলে, তোমরা না চাইলে 
বলব না স্বর্ণদিদি, কিন্তু এ-সব ঢপ, ছড়া, খেউড় কীর্তন যারা চা করে 
তোমরা যে তাদের মানুষ মনে কর না সেটা কি ঠিক? যে মাদুরটার ওপর 
বসেছ, সেটাও তো সেই গায়ের জিনিস। 

স্বণন বলেন, আরে ও-সব গাইয়! অশুদ্ধ কালচার কি সাহিত্যের শুদ্ধ 
অঙ্গনে জায়গা পেতে পারে? অনেক পরিশীলনে এই নতুন বাংলাভাষা তৈরি 
করেছেন বিদ্যাসাগর মধুসুদনের মতো লেখকরা, না হলে তো বাংলা সাহিত্য 
হুতোম পাচার নকশা" আর “আলালের ঘরের দুলাল"-এই থেমে থাকত। 


৮৯০ 


নীপময়ী শুনছিলেন, এখন বললেন, গানের আবার জাত বেজাত কীসের 
স্বর্ণঠাকুরঝি? আমার তো সুরে গাইলে সব গানই ভাল লাগে। সেতারে যে 
সুর বাজে, একতারাতেও সেই সুর। 

জ্ঞানদা বিস্মিত হয়ে বললেন, সে কী সেজো? তুমি নিজে এত ভাল 
উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিয়ে এ-কথা বলতে পারলে? গানের জাত থাকবে 
না? সেতার আর একতারা কি এক হল? 

বঁটিতে ঝিঙের শিরা ছাড়াতে গিয়ে নীপময়ীর আঙুলগুলো তখন 
তরকারির রসে মাখামাথি। আঁচলে আঙুল মুছে তিনি বললেন, আমার তো 
কোনও অসুবিধে হয় না ঢপ খেউড় শুনতে, ওর মধ্যেও মানুষের প্রাণের 
ভাষা আছে, লোকায়ত জীবনের রস আছে। 

গায়ে সর-ময়দা মাখছিলেন শরৎকুমারী, তিনিও মুখ খোলেন, আমারও 
কিন্তু খারাপ লাগে না মেজোবউঠান, মালিনীর কাছে এ-সব গান শুনে 
গ্রামের সহজ জগৎটাকে দেখতে পাই। 

মালিনীর গোমড়া মুখ অবশ্য সহজ হয় না, সে বলে, জানো মেজোবউঠান, 
তোমাদের এই গুমরের জন্য এখন শহরে ইতর-ভদ্র ভাগ হয়ে যাচ্ছে! 

হোক না ভাগ, যা রুচিহীন তাকে তো জাতে তোলা যায় না, যতই তোমরা 
ওই সম্ত। খেউড়ে তাল দাও, ও-সব গান বাড়ির পরিবেশ নষ্ট করছে। জ্ঞানদ। 
বললেন, যার শুনতে হয় নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে শোনো না! 

নীপময়ী স্পষ্টতই বিরক্ত হন জ্ঞানদার কথায়, সবসময় এত গুরুগিরি 
ফলানো ভাল লাগে না বাপু। টিপটপ বিবি সেজে বসে থাকো সারাক্ষণ আর 
গবনরের পাটি টার্টিতে যাও বলে কি আমাদের সকলের মাথা কিনে নিয়েছ 
মেজদি? বাইরে মেলামেশা করি না বলে কি বাড়ির ভেতর আমাদের কোনও 
মতামত থাকবে না? এখানে তোমার যত দাবি আমারও ততটাই। 

তোমার সঙ্গে আমার মতে মিলবে না সেজো, জ্ঞানদা বলেন, কিন্তু তাই 
বলে ইতর রসে আমার আপত্তি তো আমি গিলে ফেলতে পারি না। তার 
নাকে হিরের ফুল রাগে ঝলকিয়ে ওঠে। 

বই-মালিনীর রুপোর পাঁয়জোরও রাগ করে ঝমকায়, সে বলে, দেখো 
মেজৌবউঠান, তোমাদের এ-সব গানবাজনা, সাহিত্যচর্চা, পোশাক, স্ত্রীশিক্ষা 
ও স্বাধীনতার হাওয়াকে ওরা ঠাট্টা করছে আবার ওদের চিরকেলে ছড়া, গান, 
খেউড়, যাত্রাপালার ভাষাকে তোমরা এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিতে চাইছ। দেশের 


১৯৯ 


দুর্দিনে কোথায় ইংরেজের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়বে তা না নিজেরা লড়ে 
মরছ। এটা কি ভাল হচ্ছে স্বর্ণদিদি£ 

কথাটা ঠিক। ইদানীং শহরে ভদ্র ও ইতর সংস্কৃতির শ্রেণির লড়াই বেশ জমে 
উঠেছে। গ্রাম থেকে আসা মানুষদের সঙ্গে শহরে ঢুকে পড়েছে গ্রাম্যরসের 
যাত্রা, কথকতা, পাঁচালি, ঢপ, খেউড়। শহরের ধনীঘরের বারবাড়িতে আর 
অন্তঃপুরে একসময় আমোদের খোঁজে এদের ডেকে আনা হত। কিন্তু এখন 
সেই ঝাঝালো বাংলাকে হঠিয়ে জায়গা নিচ্ছে সংস্কৃতঘেঁষা উচ্চবর্গের বাংলা। 
এই লড়াইয়ে কেউ কাউকে সইতে পারছে না। মালিনী স্ব্ণকে সাক্ষী মানতে 
চায় কিন্তু তিনি কোনও সাড়া দেন না। 

বরং জ্ঞানদা আবার বলেন, ওই যে তোমাদের কাড়াদাস না কে একজন 
আমাদের নিয়ে ঠেস দিয়ে গান বেঁধেছে, কী অসভ্য সব কথা! ইতর লোকে 
তা নিয়ে ধেই ধেই নৃত্য করছে। এগুলোকে সংস্কৃতি বলছ মালিনী? ছিঃ! 

কোন গানটা বলছ মেজোবউঠান£ মালিনী অবশ্য জানে উচ্চবর্গের 
জনপ্রিয় হয়েছে সম্প্রতি। ওই যে ওই গান্টা? জ্ঞানদাকে খেপাতেই যেন সে 
গেয়ে ওঠে, 


'হদ্দমজা কলিকালে কল্পে কলকেতায়।/ মাগীতে চড়লো গাড়ী ফেটিং জুড়ি। 
হাতে ছড়ি হ্যাট মাথায়/ ষষ্ঠী মাকাল আর মানেনা, 

সেঁজুতির ঘর আর মানেনা,/ আরসিতে মুখ আর দেখেন। 

এখন কেবল ফটোগ্রাফ চায়।/ এখন গাউন পরে ঘোড়ায় চড়ে, 
গঙ্গান্নান তো দেছে ছেড়ে,/ গোসলখানায় খানসামাতে টাউয়েল দিয়ে গা 
মোছায়।, 


খবরদার ওই গান গাইবে না মালিনী, ব্বর্ণও রেগে ওঠেন, ছিঃ, খানসামা 
এসে গৃহিণীর গা মুছিয়ে দিচ্ছে, এ-সব কী কেচ্ছা? ইচ্ছে করে ভদ্রঘরের 
মেয়েবউদের টেনে নামাতে চাইছে। আর এত ভূলভাল ছন্দমিল আমার 
কানে সয় না। 

সে তো বুঝতেই পারছ দিদি, মালিনী বলে, গ্রাম্য কবিয়াল শহুরে 
ভদ্রমেয়েদের আচার আচরণ ততো নিজের চোখে দেখেননি, কিছুটা শুনেছেন, 
১১২ 


বাকিটা কল্পনা করেছেন। একটু নিঞ্নল ঠাট্টা করতে চেয়েছেন বই তো নয়। 
পুরুষের রচনায় মেয়েদের মুখ চিরদিনই কল্পনার ঘোমটায় ঢাকা থাকে, এও 
(সরকম। খানসামা যে মুসলমান বাড়িতে রান্না করে তা না জেনেই বোধহয় 
কবি তাকে দিয়েছেন চানঘরে হিন্দু বা ব্রাহ্ম গৃহলক্ষ্মীর গা মোছানোর ভার। 

তুমি আর ওদের হয়ে সালিশি কোরো না মালিনী, এ-সব শুনে জ্ঞানদা 
স্বাভাবিকভাবেই রেগে যান। বরং তোমার ঝাপিতে পত্রপত্রিকা কী আছে 
(বের করো, নতুন কোনও মহিলা লেখিকার খোঁজ পেলে কি না বলো। 

আজ তোমরা মনটা খারাপ করে দিলে গো মেজোবোঠান। যদি মেয়েদের 
লেখার কথাই বলো তো বলি, তোমাদের ঘরের শিক্ষিত মেয়েদের অনেক 
আগে থেকেই কিন্তু এ-সব হাটঘাটের মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে 
তাল মিলিয়ে ছড়া লিখছে, ঢপ-খেউড়-ঝুমুর গাইছে, কবির লড়াই করছে। 
টেনেছে। বছর কুড়ি আগে বিখ্যাত জগন্মোহিনী তো এই ঠাকুরবাড়িতেও 
টপকীর্তন গেয়ে গেছেন। তোমাদের মা দিদিমায়ের আমলে এ-সব জাতবিচার 
ছিল না। 

স্বণর একটু গায়ে লাগে, তিনি এখনকার মহিলা লেখকদের মধ্যে অগ্রণী 
হয়েও যেন মালিনীর কাছে ঠিকঠাক স্বীকৃতি পাচ্ছেন না, বললেন, মালিনী 
তুমি যে-সব মেয়েদের লেখার কথা বলছ, তাদের একটাও স্মৃতিধাধ পঙ্ক্তি 
বলতে পার? 

মালিনী তৎক্ষণাৎ জবাব দেয়, নিশ্চয়ই পারি, রামী ধোপানির কবিতা 
শোনো, তিনিই বোধহয় বাংলার পয়লা মেয়ে কবি, 


“কি কহিব বধু হে বলিতে না জুয়ায়/ কাদিয়া কহিতে পোড়ামুখে হাসি পায় 
অনামুখো মিনসেগুলোর কি বা বুকের পাটা/ দেবীপুজা বন্ধ করে কুলে 
অবিচারপুরী দেশে আর না রহিব /যে দেশে পাষণ্ড নাই সেই দেশে 

যাব।” 


মালিনী বলে, দেখছ কী ঝাঝাল ভাষা, কী সাহসী! মিনসে-তস্ত্রের দাপটের 
কাছে মাথা না নুইয়ে কেমন পালটা কথা বলতে পেরেছে! 
১১৩ 


হেটো মেয়েরা পুরুষের অবিসংবাদিত কর্তাতির প্রতি যে উদ্ধত উপহাস 
ছুড়ে দিতে পেরেছে শিক্ষিত স্বাধীন মেয়েদের সে সাধ্য বা সাহস হয়নি। 
সেটার স্বীকৃতি দিতেও নারাজ তারা। 

স্বর্ণ বলেন, সাহস আছে তো কী হল, কাব্যগুণ কম। 

বেগুনি পাড় সবুজ ধনেখালির শাড়ি গাছকোমর করে পরা মালিনী যেন 
সেই প্রান্তিক রামী, যজ্ঞেশ্বরী, জগন্মোহিনীদের প্রতিনিধি, তাদের হয়ে 
অভিমান করে সে বলে, আজ আর ভাল লাগছে না গো দিদিরা বোঠানরা। 
আজ আমি চললাম। 

সবার অলক্ষ্যে ওদ্ধত্যের এই নতুন রসের খোঁজে উৎসুক হয়ে ওঠে 
ঠাকুরগৃহপালিত রূপকুমারী। সে ভেতরের আঙিনা ছেড়ে মালিনীর পিছুপিছু 
চলতে থাকে। মালিনীর অন্যরকম কথা, অন্যরকম কাপড়চোপড়, গয়নাগাটি, 
অন্য জগতের হাতছানি তাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে। হেটো মেয়েদের এই 
স্বাধীন ভাষায় ও আচরণে ভদ্রমেয়েরা প্রভাবিত হয়ে পড়বে বলে বাবুদের যে 
আশঙ্কা ছিল, তা যেন সত্য হয়ে উঠছে রূপার আচরণে। 

ইংরেজ এবং বাঙালি হিন্দুবাবুরা একজোট হয়ে ঝুঁমুরওলি, ঢপওলি, 
কীর্তনিয়াদের উচ্ছেদ করার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। সোমপ্রকাশ 
সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, “কৃষ্ণলীলা 'বর্ণনাবসরে রাস ও বস্তহরণাদি 
বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অশিক্ষিত যুবতীর চিত্ত অবিচলিত থাকা সম্ভাবিত নয়... 
যাহারা কুলকামিনীদিগকে কথকতার স্থলে গমণের অনুমতি দিয়া থাকেন, 
তাহাদিগের সতর্ক হওয়া উচিৎ।; 

যেন চিন্তবিচলিত হওয়ার অধিকার একমাত্র পুরুষের, তারা বাইজির ঘরে 
পড়ে থাকবে, আদিরসের গান শুনবে, কৃ্ণলীলা রচনা করবে, কিন্তু মেয়েরা 
দেখলে, শুনলে, করলেই গেল গেলরব ওঠে। পুরুষ যেন জন্মেছে নারীর 
ওপর খবরদারি করতেই, আর নারীরা তাদের খেলার পুতুল! 

রূপার গর্ঁজ্বলে যায় এসব দেখলে-শুনলে। কেন রে তোরা আমার ওপর 
খবরদারি করবি? আমি কম কীসে? 

মালিনী হেসে বলে, ওই যে কথায় বলে না, “দরবারে না মুখ পেয়ে ঘরে 
এসে মাগ ঠেঙায়”। পুরুষগুলো সব ওরকম। ওই বাবুদের দেখ না, ইংরেজের 
কাছে মান পায় না, ঘরের বউয়ের ওপর কর্তারি ফলাচ্ছেন। 

কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। বাঙালি হিন্দুবাবুরা ঘরের মেয়েদের অশিক্ষিত 


১১৪ 


করে ঘরে আটকে রেখেছে তাই ইংরেজরা তাদের অনগ্রসর বলে উপহাস 
করে, আর বাবুদের তত রোখ চেপে যায়। নিজেদের উদারতা প্রমাণ করতেই 
এক-এক করে স্ত্রীশিক্ষার অনুমতি দিচ্ছিলেন তারা। তবে শিক্ষা দিলেও 
স্বাধীনতা দিতে প্রস্তুত নন বেশিরভাগ ভদ্রজন। পাছে নিন্নবর্ণের স্বাধীন 
মহিলাদের দেখে ভদ্রমহিলারাও গৃহবিপ্লব করে বসেন, সেই দুশ্চিন্তায় তারা 
খুব কাতর। তাই তো অস্তঃপুরিকাদের সঙ্গে ঢপওয়ালি, খেউড়ওলিদের 
মেলামেশা বন্ধ করতে চান বাবুরা। জ্ঞানদা স্বর্নর মতো উচ্চশিক্ষিত মেয়েরাও 
তাই এই লোকসংস্কৃতির ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলতে শিখেছেন। 

সৌদামিনী ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, রূপা মেয়েটা কোথায় গেল রে? নালিনীর 
পিছু পিছু বেরিয়ে গেল নাকি £ আমার হয়েছে জ্বালা, মা এই আপদটাকে ঘাড়ে 
চাপিয়ে দিয়ে গেলেন। আঁচলটা গাছকোমর করে বেঁধে আবার বললেন, নে 
মানদা, অনেক তরকারি হয়েছে, এইবেলা পাকঘরে পাঠিয়ে দে। 

তোমরা ওকে ঠিকমতো শাসন করতে পারছ না, জ্ঞানদা ঘোষণা করেন, 
এ-বাড়ির সংস্কৃতির কোনও ছাপই পড়ছে না ওর ওপর। পশ্চিমের মিহি 
তাতের শাড়ি পরা, খোঁপায় ফুল লাগানো জ্ঞানদার দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে 
সৌদামিনী মনে মনে বলেন, হু, ফুলবিবি আবার মাস্টারনিগিরি শুরু 
করলেন। 

ঝুড়িতে স্তুপাকৃতি তরকারি গোছাতে গোছাতে মানদা বলে ওঠে, এক 
গাছের শেকড় কি অন্য গাছে লাগে গো বোঠান? য্যাতই শেখাও, ও শিখবে 
না। : 
সেটা কোনও কথা নয় মানদা, এবার স্ব বললেন, আমাদের দাদামশায়কেই 
তো বড়দাদামশায় দত্তক নিয়েছিলেন, তবে হ্যা, দ্বারকানাথ এই বংশেরই 
অন্য শাখার সন্তান। রূপাকে শাসন করা দরকার। 

সৌদামিনী মুখ ভার করে জানান, ওকে শাসন করা খুব শক্ত, বকাঝকা 
করলে আগে মায়ের আচলের তলায় লুকোত আর এখন নতুনবউয়ের ঘরে 
পালায়। ছেলেপিলে হয়নি বলে নতুনবউ ওকে আগলে রাখে। 

নতুন বোঠানের সব ভাল, কিন্তূ এ বয়সে একটাও বাচ্চা এলনি। মানদার 
মুখ থেকে কথা খসতেই শরৎকুমারী বললেন, সে যদি বলো, কাদন্বরীর জন্য 
আমার মায়াই হয়, অমন লক্ষ্মীমস্ত রূপ, মেয়েটার এত গুণ, কিন্তু বাজা। 

জ্ঞানদা সুপুরি কাটা থামিয়ে বলেন, তোমার ওর জন্য মায়া হচ্ছে সেজদি, 


৯৯৫ 


আমি ভাবছি নতুনঠাকুরপোর কথা, আট বছর হয়ে গেল বিয়ের, তার বোধহয় 
আর সন্তানের মুখ দেখা হল না। শুষ্ক জীবনটাকে সাহিত্য দিয়ে, ব্যাবসা দিয়ে 
ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। 

জ্ানদার খোঁপায় রূপোর কাটা লাগাচ্ছিলেন স্বণকুমারী, তিনি কিন্তু 
অন্যসুরে বলেন, কী করবে বেচারি নতুনবউঠান, হয়তো বন্ধ্যানারী, অথচ 
ওর মনটা কত ন্নেহময়। আমি আমার লেখার কাজ নিয়ে থাকি বলে বাচ্চাদের 
কোলে নেওয়ারও সময় পাই না কিন্তু নতুনবউঠান সবকাজের মধ্যেও আমার 
ছোট মেয়েটাকে নিয়ে কত আদর যত্ব করে, রূপাকে কত আগলে রাখে আর 
রবি তো বলতে গেলে ওর কাছেই মানুষ। 

ইতিমধ্যে দাসীরা পাথরের থালায় থালায় জলখাবারের ফল সাজিয়ে 
এনেছে। নীপময়ী চুপচাপ স্ব্ণর কথা শুনছিলেন, থালা থেকে দু'একটি আঙুর 
মুখে দিয়ে এবার বললেন, রবিকে নিয়ে অত বাড়াবাড়ি বাপু আমার ভাল্লাগে 
না, আগে তো দেওর বউঠানের এত মাখামাখি দেখিনি, সে তোমরাই চালু 
করেছ মেজদি। তুমি যেমন জ্যোতিকে একেবারে মাথায় তুলেছিলে, এখন 
নতুনবউ রবিকে তুলছে। দেওর-বউঠানের ভাব ভাল, অতিভাব চোখে লাগে। 

তাতে আবার দোষের কী দেখলে সেজো? বিরক্ত হন জ্ঞানদা, পরিবারের 
মধ্যে এমন সহজ মেলামেশায় মনের বিকাশ হয়। কাব্যসাহিতোর আদানপ্রদানে 
মন বড় হয়। তুমি যে ঘরে বসে এত ভাল গান শিখলে, বাইরের মানুষকে 
শোনাও না কেন? 

নীপময়ীও বিরক্ত, তা মেজদি, তোমার গায়ে লাগছে বেন£ আমার 
(তো ঘরেই ভাল লাগে। গান শিখেছি নিজের জন্য, বাইরের লোক ডেকে 
শোনানোর জন্য তো নয়। পরদা উঠে গেলেও একটা আক্র থাকা ভাল, 
তেতলার ছাদে আসর জীকিয়ে একগাদা পরপুরুষের সামনে মক্ষীরানি 
হয়ে বসে থাকা আমার পোষাবে না আর তোমার মতো পাটিতে গিয়ে 
সাহেবমেমদের সঙ্গে বলডান্সপও করতে পারব না। 

বউয়েরা নিজেরাই নিজেদের ঠেস দিচ্ছে। সৌদামিনী কথা ঘোরানোর 
জন্য দাসীদের হুকুম দেন, যা তো রূপাকে খুঁজে আন, ধরে আন যেখান 
থেকে পারিস। দেখি আজ তার কতবড় বুকের পাটা। 

মেয়েমহলের তিক্ততায় আর মন বসে না স্বণর, ফলাহার শেষ হলে তিনি 
১১৬ 


জ্যোতির ঘরেই আপাতত ভারতীর দপ্তর। সেখানে যথারীতি রবি, জ্যোতি, 
অক্ষয় ও কাদন্বরী মহা উৎসাহে সম্পাদকীয় কাজকম্ন করছেন। লেখা জমা 
থেকে। সেটা থাকে কাদন্বরীর জিম্মায়। 

কফি ও বড়া সহযোগে সেখানে তখন মহা কর্মযজ্ঞ চলছে। রবি ও অক্ষয় 
লেখা পড়ে বাছাই করছেন, সাজাচ্ছেন। কাদন্বরী মহা উৎসাহে বাছাই করা 
লেখা সাজিয়ে রাখছেন হলুদ টিনের বাক্সে। বাড়ির অন্য মেয়েদের থেকে 
তিনি যেন আলাদা, কাজের মধ্যে থাকলেও মনে হয় তিনি যেন দুটো ডানায় 
উড়ে বেড়াচ্ছেন মাটি থেকে ওপরে। 

জ্যোতি হিসেবপত্র নিয়ে ব্যস্ত। ভারতীর খরচ জোগাতে দ্বিজেন ও 
জ্যোতি দু'জনেই পঞ্চাশ টাকা করে জমা করেছেন। অল্পশ্বল্প গ্রাহক্ঠাদাও 
উঠছে। দপ্তরে বেশ কিছু গ্রাহক আবেদন জমা পড়েছে, তা নিয়ে সকলের 
হইচই। প্রথম সংখ্যার আগে গ্রাহক সংগ্রহের জন্য হিন্দু প্যান্রিয়ট পত্রিকায় 
একটি বিজ্ঞাপন দেওয়ার আইডিয়াটা কাজে লেগে গেছে। বিজ্ঞাপনে লেখা 


“আগামী শ্রাবণ মাস হইতে ভারতী নামে সাহিত্য-বিজ্ঞান-দর্শন প্রভৃতি নানা- 
বিষয়িণী এক খানি মাসিক সমালোচনী পত্রিকা প্রকাশিত হইবে। এখনকার 
সুপ্রসিদ্ধ লেখকের মধ্যে অনেকে এই পত্রিকার সাহায্য করিবেন। ইহার কলেবর 
রয়েল ৮ পেজি ৫ ফন্মা। মূল্য বাধষিক ৩ তিন টাকা। বিদেশে বাধিক [...] ছয় 
আনা ডাকমাসুল লাগিবে। ইহা প্রতি মাসের ১৫ই প্রকাশ হইবে। যাহারা ইহার 
গ্রাহকশ্রেণীভুক্ত হইতে চাহেন তাহারা যোড়ার্সাকো দ্বারকানাথ ঠাকুরের লেন 
৬ নং বাটাতে শ্রীযুক্ত প্রসন্নকুমার বিশ্বাসের নামে পত্র লিখিবেন। 
শ্রীদ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সম্পাদক।" 


কাগজ বেরলেই দু'জন বিলি সরকার হাওড়া ও কলকাতায় লেখক, গ্রাহক 
ও বিশিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেন। মফস্সলে ডাক মারফত ৮৪ কপি পাঠানো 
হল প্রথমদিনেই। 

বাড়ির মধ্যে থেকেই বেশিরভাগ লেখা সংগ্রহ হয়ে যায়। প্রধান লেখক 
রবি, জ্যোতি ও অক্ষয়। প্রথম সংখ্যায় রবির কবিতা ও গল্প একসঙ্গেই 


৯৯৭ 


প্রকাশিত হল। অক্ষয় কবিতা ছাড়াও সরস সাহিত্য আলোচনায় হাত 
পাকাচ্ছেন। দ্বিজেন মাঝে মাঝেই ভাবগস্ভীর প্রবন্ধ লেখেন, আবার গঞ্জিকা 
নামে কৌতুক বিভাগেরও তিনি প্রধান রচয়িতা। 

স্বর্ণ ও জ্ঞানদা জ্যোতিদের ঘরে এসে পৌঁছলে আসর জমে উঠল। রবি 
স্বর্ণকে বললেন, দেখো নর্পদিদি, কত মেয়েরাও কবিতা পাঠিয়েছেন। অবশ্য 
মেয়েরা একটু চোদ্দোমাত্রা মিলিয়ে লিখলেই সবাই ধন্য ধন্য করছে, আর 
ছেলেদের বেলায় যত সুক্ক্সবিচার। 

স্বর্ণ তর্ক তোলেন, তা কেন বলছিস রবি, মেয়েদের লেখাও যথেষ্ট 
চুলচেরা বিচার করা হয়। এত যে মেয়েদের কবিতা এসেছে, কোনওটাই 
তোর ভাল লাগেনি? 

রবি মোটেই মেয়েদের লেখার গুণ বিচার করতে চায় না, মেয়েদের নিয়ে 
কাব্য লিখতে চায়, কাদম্বরী হাসিমুখে ঠাট্টা করেন। মেয়েরা যেন শুধু কবির 
প্রেরণা হয়ে থাকবে, কবিতা লিখবে না। 

রবিও হেসেই জবাব দেন, তা সত্যি নতুনবউঠান, তুমি নিজেই তো এই 
অধম কবির ভগ্রহৃদয়ের মুর্তিমতী প্রেরণা। পাতলা সুতির পাজামার ওপরে 
গেরুয়া ফতুয়া পরে আছেন রবি। যেন এক নগরবাউল উঠে দাড়িয়ে কাদন্বরীর 
দিকে নাচের ভঙ্গিতে হাত ঘুরিয়ে গেয়ে উঠলেন, “তোমারেই করিয়াছি 
জীবনের প্রুবতারা”, হে বউঠান। 

বাবা রে, জ্ঞানদা বললেন, কাদন্বরীর প্রশ্রয়ে রবির মুখে যে কাব্যের খই 
ফুটছে। রবি আর কিশোরটি নেই, রীতিমতো বড়দের ভাষায় কথা বলে। 

অক্ষয় কৌতুকে যোগ দেন, আপনি জানেন না মেজোবউঠান, শুধু রবির 
নয়, উনি আমাদের ত্রিমুণ্তী হেকেটি। জ্যোতি, রবি আর আমি তিনজনেই 
সারাক্ষণ ওঁর প্রেরণার জন্য কাড়াকাড়ি করছি। 

সম্প্রতি মহাকবি বিহারীলালও সেই দন্ধচল যোগ দিয়েছেন মনে হচ্ছে। দুষ্টু 
রবি ফোড়ন কেটে বললেন। 

স্বর্ণ এবার বলেন, দাড়ান অক্ষয়বাবু, লাহোর থেকে আপনার শরৎকুমারী 
আসুন না, তখন লাহোরিণীর সামনে আপনার সব জারিজুরি বেরিয়ে যাবে। 

জ্ঞানদা ভাবেন, কী আশ্চ্, জ্যোতি কী করে বিগলিত মুখে বউয়ের 
গুণগান শুনছে? তিনি জানতে চান, কী নতুন, তোমার বউ যে সব তরুণ 
কবিদের হৃদয়হরণ করছে, তোমার বুকে কোনও জ্বালা ধরছে না? 
১১৮ 


জ্যোতি জবাব দেওয়ার আগেই কাদম্বরী বলেন, আর উনি যে নাটকের 
রিহার্সালে গিয়ে কত অভিনেত্রীর হৃদয় হরণ করছেন, মেজদি কি তার খবর 
রাখ£ঃ এক-একদিন তো বাড়ি আসতেই সময় পান না। 

এ-কথা সত্যি যে আজকাল মাঝে মাঝে রিহার্সালে গিয়ে আটকে পড়েন 
জ্যোতি। আর এ-কথাও সত্যি, যে অভিনেত্রীর জন্য সব বাবুরা পাগল সেই 
স্বয়ং নটী বিনোদিনীই জ্যোতি ঠাকুরের রূপগুণে মুদ্ধ। কিন্তু আট বছরের 
পুরনো স্ত্রীর প্রতি জ্যোতির টান এখনও এতটুকু কমেনি। 

কাদন্বরীর গলায় চাপা অভিমান ঠিকই টের পান জ্যোতি, বলেন, যখন 
বাইরে যাই আমার হৃদয়টা তো তোমার সিন্দুকেই জমা রেখে যাই বউ, তবু 
তোমার মনে সন্দেহ? 

কী জানি, আমি তো তাদের মতো ছলাকলা পারি না! কাদন্বরী নিচু গলায় 
বলেন। তার মতো সুন্দরীও নই। 

জ্ঞানদা তাকে ধমক দেন, সে কী নতুনবউ, তুমি এমন করে ঘরে আটকে দিতে 
চাও নতুনকে£ ওর কত নামযশ, কত ব্যস্ততা। না হয় দু'-চারজন নটী মুগ্ধ হল, 
তাতেই বা কী? মন ছোট কোরো না। তোমারও তো রূপমুগ্ধ কম দেখছি না। 

জ্ঞানদার গলায় অসন্তোষ চাপা থাকে না। ঘরের মধ্যে আবার যেন একটা 
ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়ে গেছে দুই রূপসি মেধাবিনীর। জ্ঞানদার গায়ে লেপটে 
চুল যেন কালবৈশাখীর বিদ্যুৎ। 

জ্যোতি বোঝেন মেজোবউঠান এখনও কাদম্বরীর ওপর অপ্রসন্ন। তাকে 
ঘিরে এত প্রশংসা যেন ভালচোখে দেখছেন না। কী যে করেন তিনি, এই 
দুই নারীই তাঁর অতি প্রিয়। কিন্তু প্রথমদিন থেকেই যেন দুজন দু'জনকে 
বিষনজরে দেখেছেন। পরিস্থিতি সামলাতে জ্যোতি বলেন, মেজোবউঠান, 
আমি তো এখনও মুগ্ধ তোমাকে দেখে। আজীবনের মুগ্ধহরিণ। ইনি হেকেটি 
হলে তুমি “বর্জিনী+। 

তা, বর্জিনী-বউঠান বুঝি শকুস্তলার মতো হরিণ শিশুকে গুণ করেছেন। 
জ্যোতিকে কটাক্ষ করে অমনি কাদম্বরী বলে ওঠেন। 

স্বর্ণ অধীর বোধ করেন এতক্ষণ এসব আলোচনায়, তোমরা কি শুধু 
এ-সব রসের কথা বলবে না ভারতীর লেখাপত্র কিছু পড়ে শোনাবে? দাও 
না নতুন কী লেখা এসেছে দেখি। 


১৯১৯ 


রবি ফাইল থেকে একটি কবিতা এগিয়ে দিয়ে বলেন, দেখো ন"দিদি, 
অক্রুর দত্তের বাড়ির এক মহিলার রচনা, খারাপ নয়, পড়ে দেখো। 

স্বণকুমারী কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলেন কবিতার ওপরে মুক্তোর মতো 
হাতের লেখায় কবির নাম, গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী। স্বর্ন পড়তে থাকেন। 

তখনই এক দাসী ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকে কাদন্বরীকে আড়ালে ডেকে 
নিয়ে কী সব ফিসফিস করে। কাদন্বরীও ছুটে বেরিয়ে যান তার সঙ্গে। কী 
হল খোজ নিতে পেছনে জ্ঞানদাও গেলেন। নীচের মহলে তখন হইচই লেগে 
গেছে, রূপকুমারীকে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ বলছে সে মালিনীর সঙ্গে গেছে 
আবার এক দারোয়ান নাকি তাকে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে এক সাহেবের 
সঙ্গে চলে যেতে দেখেছে। 

একটি বালিকাদাসী সৌদামিনীর গায়ে অলিভ তেল মালিশ করে দিচ্ছে, 
আর তিনি তাকিয়া ঠেস দিয়ে চৌকিতে আধশোয়া হয়ে আরাম নিতে নিতে 
রাগে টঙ হয়ে কাদন্বরীকে বলছেন, আর নয়, এবার তোমার পুষ্যিকে তাড়াও। 
ফের এলে আর ঘরে ঢুকতে দেব না। এতদিন অনেক সহ্য করেছি, আর না। 

সামনে দাড়ানো কাদন্বরী মুখ গৌঁজ করে বললেন, মা যাকে এত আদর 
করে পুষির নিয়েছিলেন, তাকে তাড়িয়ে দিলে যদি তোমার প্রাণে সুখ হয়, 
আমি আর কী বলব বড়ঠাকুরবি। 

জ্ঞানদা নেমে এসে পরিস্থিতি দেখে সৌদ'মিনীর পক্ষ নেন, সত্যি নতুনবউ, 
আর একে ঘরে রাখা যায় না, বাড়ির মেয়েরা ভূল শিক্ষা পাবে। মা না হয় 
নেহের বশে আদর করে কাছে রেখেছিলেন, সে যদি এখন বেয়াড়া হয়ে 
যায়, নষ্ট হয়ে যায়, তাকে আর ঘরে রাখা যায় না। 

কাদন্বরী মানতে চান না, ভুল মনে হলে শেখানো যায়, তোমরা কে 
কতটা শেখানোর চেষ্টা করেছ বলো তো? আমি জানি ওর মনটা সরল। 
বিধিনিষেধের গণ্ডি পেরিয়ে মজা দেখতে গিয়ে অনেক ভূল করে ফেলে 
কিন্তু অন্যায় জেনে করে না। তোমরা এত নিষ্ঠুরভাবে বিচার করলে ম! স্বর্গ 
থেকেও কষ্ট পাবেন। 

মায়ের নাম করে তুমি কেন এই বেয়াড়াপনাকে প্রশ্রয় দিচ্ছ নতুনবউ? 
জ্ঞানদা ধমকান, আমাদের বাড়িতে কোনও মেয়ে কি কখনও এরকম কাজ 
করতে সাহস করত £ নিজের পেটের মেয়ে হলে তুমি তার এমন বেয়াড়াপনার 
প্রশ্রয় দিতে? 
১৯২০ 


কাদম্বরীর চোখ জ্বালা করে, মেজোবউঠান তাকে অযথা আঘাত করতে 
চাইছেন কিন্তু তিনি ঠোট চেপে চুপ করে থাকেন। 

সৌদামিনীও কাদশ্বরীর ওপর রাগ করেন, আমাকে সংসারটা চালাতে হয় 
নতুনবউ, তুমি ওকে আগলে রেখে অশান্তি জিইয়ে রাখছ। একে তোমার 
চালচলন নিয়ে বাঁকা কথা শুনতে হয় আমাকে, তার ওপর ওই অবাধ্য 
মেয়েটাকে পুষছ। 

আমার চালচলনে আবার কী দোষ দেখলে বড়ঠাকুরঝি? কাদস্বরী 
অভিমানী স্বরে জানতে চান। 

সে আর শুনে কী হবে বাছা! সৌদামিনী বললেন, নীচের তলায় তো 
নাম না আজকাল, জানবে কী করে£ আঁচলে তেলহলুদের দাগ নিয়ে আমরা 
খেটে মরছি আর তুমি সক্কালবেলা সেজেগুজে সাহিত্যচর্চা করছ। তাই বলছি 
সংসারের ব্যাপারে তুমি আর নাক গলাতে এসো না। 

কোন কাজটা করিনি ঠাকুরবি£ এবার কেঁদে ফেলেন কাদন্বরী, আমাকে 
এত কথা শোনাচ্ছ কেন? রূপা তোমাদের চক্ষুশুল না আমি? সৌদামিনীর 
দিকে তাকিয়ে তিনি মনে মনে ভাবেন, তুমিই বা কম কীসে, চৌকিতে বসে 
গায়ে তেল মাখাচ্ছ আর হুকুম চালাচ্ছ! 

বালাই ষাট, নীপময়ী এবার বললেন, তুমি £কন চক্ষুশুল হবে নতুনবউ£ 
কিন্তু সংসারে থাকতে গেলে সংসারের নিয়ম একটু মানতে হয়, না হলে 
কথা ওঠে। | 

কী নিয়ম মানিনি? কাদন্ববী জানতে চান। তার মনে হয় সবাই যেন 
একযোগে পেছনে লেগেছে। কেউ কি তার হয়ে বলার নেই! 

শরৎকুমারীর রূপটান এতক্ষণে শুকিয়ে গেছে, গা থেকে ঘষে ঘষে 
সর-ময়দা তুলছিলেন, এখন বললেন, ছাড়ো তো ও-সব। ওর বাচ্চা হয়নি, 
বেচারা নিজের মতো সাহিত্য নিয়ে, বাগান নিয়ে, রূপা আর উগ্রিলাকে নিয়ে 
মেতে আছে, থাকতে দাও না। 

না, আমি আজ জানতে চাই, দোহাই তোমাদের। শরতের সহানুভূতি 
পেয়ে কাদম্বরী তার পাশে বসে পড়ে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যা যা মনে 
আছে বলো। 

জ্ঞানদার এতক্ষণে মনে হচ্ছে একটু বেশিই আক্রমণ করা হয়ে যাচ্ছে 
কাদন্বরীকে, তিনি সাস্তবনা দিতে চান, দেখো নতুনবউ. তুমি ওদের থেকে দূরে 

১২১ 


দূরে থাক তো, বাইরের লোকেদের সঙ্গে রোজ মেলামেশা করছ, এসব 
সবাই ঠিক ভালচোখে নিতে পারছে না। পরদা তো আমিই ভেঙেছি, বাইরের 
পুরুষদের সঙ্গেও যথেষ্ট মিশি। কিন্তু বাড়ির মহিলাদের সঙ্গেও মিলেমিশে 
থাকি। 

কাদম্বরী বলেন, আমি মিশি না এটা ঠিক কথা না মেজদি। ওরাই বরং 
আমাকে দূরে রাখে, কেন সেটাই বুঝি না আমি। সেজন্য নিজেকে গুটিয়ে 
নিয়েছি তেতলার ঘরে, সেখানেই নিজের জগৎ রচনা করেছি। 

বোঠান তুমি একটু ষষ্ঠী ঠাকরুনের পুজো দাও না, মানদা দাসী বলল, এত 
বয়সে ছেলেপুলে হয়নি, দোষ কেটে যাবে। নিজের কোলে একটা এলে রূপা 
রূপা করে পাগলামিও সারবে। 

কাদ্বরী ফুঁপিয়ে কাদতে শুরু করলেন। ভার ভেতরের কষ্টটাকে হঠাৎ 
এরা সবাই মিলে যেন উলঙ্গ করে দিয়েছে। সন্তান না হলে কি নারীজন্মের 
কোনও দাম নেই? শুধু মা হতে পারছেন না বলে বাড়ির মেয়েমহলে সবাই 
তাকে পর করে দেবে? 

তাকে কাদতে দেখে স্বর্ণর খারাপ লাগে, এগিয়ে এসে পিঠে হাত দিয়ে 
বলেন, তুমি তো অনেক সৌভাগ্য পেয়েছ, না হয় সন্তান হয়নি, কাদছ 
কেন? 

নীপময়ী বললেন, হ্যা, আমাদের তো কখনও স্বামীর সঙ্গে ঘোড়ায় চেপে 
ময়দানে হাওয়া খাবার সৌভাগ্য হয়নি, আর ভক্ত পরিবৃত হয়ে গান-কবিতা 
শোনাও হয়নি। কাদতে হয়তো আমরা কাদব, তুমি কেন? 

বিরক্ত হয়ে স্ব বললেন, আঃ সেজোবউঠান, শুধুমুধু নতুনবউঠানকে ঠেস 
দিচ্ছ কেন? তুমি যা করনি অন্য কেউ সেটা করতে পারবে না তা তো হয় না। 
সেজদাদা যখন তোমাকে ওস্তাদের কাছে গানের তালিম দেওয়ালেন, তখনও 
অনেকে ভূরু ঝুঁচকেছিল, তাতে কি তুমি থেমে গেছঃ তোমার মেয়েদের যে 
অন্যদের সঙ্গে মিশতে দাও না, আলাদা করে গান শেখাচ্ছ, পড়াচ্ছ, তাতে 
কি আমরা আপত্তি করছিঃ বাবামশায় আমাদের সবাইকে নিজের মতো করে 
জীবন গড়ে নিতে দিয়েছেন, তাতে তুমি আমি কেন আপত্তি জানাব? 

শরৎকুমারীও অশ্রুময়ী কাদম্বরীকে জড়িয়ে ধরে বললেন, সত্যি বাপু, 
নতুনদাদার আদরের বউটাকে কীদাচ্ছ কেন তোমরা? 

জ্ঞানদার অবশ্য এই কান্না ন্যাকামি মনে হয়, কাদম্বরী কেদেই বাজিমাত 


১২২ 


করবে ভাবছে। কিন্তু তিনি তা মুখে বলেন না। বরং বললেন, নতুনবউ, তুমি 
নিজের মতোই থাকো কিন্তু ওই রূপাটাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না, তা 
হলেই কেউ কিছু বলবে না তোমাকে। 

কাদ্বরী কান্না থামিয়ে হঠাৎ ফুঁসে ওঠেন, আমার যা হয় হোক মেজদি, 
কিন্তু প্রাণ থাকতে আমি ওই অসহায় নিরপরাধ মেয়েটাকে তোমাদের 
ক্রোধানলে বলি হতে দেব না। 

এই বিদ্রোহে যেন আগুনে ঘি পড়ে। জ্ঞানদা, নীপময়ী, সৌদামিনীর মুখ 
রাগে গনগনে। আঁচলের চাবির গোছা খুলে মেঝেতে ছুড়ে দিয়ে সৌদামিনী 
বললেন, ভাল, তবে আজ থেকে সংসারের ভার তুমিই নাও, আমাকে বেগার 
খাটার দায়িত্ব থেকে ভারমুক্ত করো নতুনবউ। 
চাবিটি ঝমঝম শব্দে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। 

কিছুক্ষণ নৈঃশব্দ্যের পর জ্ঞানদা বললেন, তা হলে বাবামশায়ের কাছে 
চিঠি লেখা হোক, তিনিই ঠিক করুন রূপার ভবিষ্যৎ। তিনি রাখলে রাখবেন, 
না রাখলে যা বলবেন তাই হবে। 

আর চাবিটা? সৌদামিনী জিজ্ঞেস করেন, সংসারের হাল কে ধরবে? 

সংকটকালে জ্ঞানদাই সিদ্ধান্ত নেন, চাবিটা মেঝে থেকে কুড়িয়ে আবার 
সৌদামিনীর আঁচলে বেঁধে দিয়ে বলেন, ছোট ছোট বিষয়ে মাথা গরম করতে 
নেই বড়ঠাকুরঝি। তোমার এই আঁচলেই চাবিটা ভাল মানায়। 

কাদন্বরীর মনে হয় চারদিকে সবাই তার বিরুদ্ধে, তাকে নিয়েই এত 
অশান্তি। তিনি তো কিছুই চাননি, শুধু নিরপরাধকে বাঁচাতে চেয়েছেন। অশ্রু 
চেপে একা একাই তেতলার নির্জন কোণের দিকে পা বাড়ান তিনি। 

স্বর্ণ তার আড়াই বছরের ফুটফুটে মেয়ে উর্মিলাকে কোলে করে দৌড়ে 
নতুনবউঠান, আজ থেকে উন্মিলা তোমার মেয়ে, তোমার কাছেই থাকবে। 

উদ্িলার দেবশিশুর মতো হাসিতে বারান্দার কলহতিক্ত আসরটা যেন 
আলো হয়ে যায়। তাকে কোলে চেপে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলেন কাদন্বরী, 
চোখে তখন খুশির অশ্রু। 


৯২৩ 


দীপনিবাণ 


পৃথিবীর সেই বিরল সৌভাগ্যবতীদের একজন ব্বর্ণকুমারী, যার লেখিকা 
হওয়ার পথে গোলাপের পাপড়ি বিছিয়ে দিয়েছেন তার স্বামী, ছেলেমেয়েদের 
দেখাশোনায় বা সংসারের কাজে আটকে স্ত্রীর লেখাপড়ায় যাতে কোনও 
ব্যাঘাত না ঘটে সে দিকে কড়া নজর জানকীনাথের। তিন ছেলেমেয়ে 
জ্যোতক্নানাথ, হিরঘ্ময়ী ও সরলাকে নিয়ে প্রথমে শেয়ালদার বৈঠকখানা 
রোডে বাসা বেঁধেছিলেন জানকী ও স্বর্নকুমারী। বাচ্চাদের দেখার দায়িত্ব 
দাসীদের। এ ব্যাপারে স্বণ মায়ের চেয়েও উদাসীন। 

রোজ বিকেলে হাত মুখ ধুইয়ে পরিষ্কার জামা পরিয়ে শেয়ালদা স্টেশনে 
বেড়াতে নিয়ে যায় দাসীরা। দাসীর সঙ্গী দারোয়ান দীড়িয়ে থাকা বগিতে 
বাচ্চাদের বসিয়ে রেখে যুবতী দাসীর সঙ্গে একটু রসের কথাবার্তা বলে। 
ওই বিকেলের লোভনীয় অবসরটুকুর জন্য বাচ্চাদের মতো রোজই দাসী- 
চাকরেরাও মুখিয়ে থাকে। কিন্তু একদিন বাচ্চাদের নিয়ে দাড়িয়ে থাকা বগি 
শান্টিং করার জন্য হঠাৎ চলতে শুরু করল। সরলা কেঁদে উঠে বলে, একী, 
একী গাড়ি চলছে? কোথায় যাচ্ছে? 

দাসীও ভয়ে চিৎকার করে উঠলে দারোয়ান তার বীরত্ব দেখিয়ে বগির 
সঙ্গে সঙ্গে হাত নেড়ে হাটতে লাগল দু'মিনিটের মধ্যেই অবশ্য গাড়ি থেমে 
গেল। ছেলেমেয়েদের এ-সব আযডভেঞ্ধারের কাহিনি স্বণণ বা জানকী কখনও 
জানতে পারেন না। তবে বাচ্চা জন্মানোর পর জানকীর বাবামশায় আর রাগ 
করে থাকতে পারেননি। মাঝে মাঝেই তিনি এসে নাতিনাতনিকে আদর করে 
যান, বাচ্চারাও সেই ন্নেহস্পর্শটির জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে৷ 

কিছুদিন পর স্বণ ও জানকী সিমলেপাড়ায় মিনার্ভা থিয়েটারের পাশের গলিতে 


৯২৪ 


একটি দৌতলা বাড়িতে উঠে এলেন। সেখানে চার বছরের সরলা একদিন 
খেলতে খেলতে ছাদের মাবেল সিঁডি থেকে গড়িয়ে পড়ে রক্তারক্তি কাণ্ড বাধাল। 
জন্য সরলাকে এমন বকতে লাগল যে 'স ভয়ে কাদতেও পারল না। 

একে অসহ্য ব্যথা তার ওপর দিদি হিরঘ্ময়ী বলল, তোর দাত ভেঙেছে, 
চিরকাল ফোকলা থাকবি। 

দাসীরা আবার আরও ভয়ংকর কথা বলল, সরলাদিদির বিয়ে হবে না, বর 
এসে ফোকলা দাত দেখে ফিরে যাবে। 

অনেক শোরগোলের পর জানকীনাথ নেমে এসে ওষুধ লাগিয়ে দিলেন 
কিন্তু তপস্যারত স্বর্ণকুমারীর কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। তার ধারণা 
আতুপুতু না করলেই বাচ্চারা স্বাবলম্বী হবে। বাঙালি মায়েরা বাচ্চা মানুষ 
করতে গিয়ে যেভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয় সেটা তার একেবারেই 
পছন্দ নয়। 

মাতৃত্ব নিয়ে জ্ঞানদার বিচার প্রিয় ঠাকুরঝির থেকে একদমই আলাদা 
বোম্বাই প্রবাসে প্রায়ই এ নিয়ে তর্ক বেধে যেত ননদ-ভাজে। স্বর মতে মাতৃত্ব 
একটি অনিবাধ জৈবিক ঘটনা, তা নিয়ে বেশি মাতামাতি করলে মেয়েদের 
লেখাপড়া করা সম্ভব না। জ্ঞানদা কিন্তু মনে করেন মেয়েদের প্রগতির পথে 
মাতৃত্ব কোনও বাধা হবে না, বরং যে সন্তানদের তিনি স্বেচ্ছায় পৃথিবীতে 
এনেছেন, অগ্রগতির পথে তাদের পেছনে ফেলে নয়, বরং সঙ্গে নিয়েই 
এগোতে হবে। 


এখন স্বর্নকুমারী সিমলের বাড়ি ছেড়ে জোড়ার্সাকোয় আছেন, জানকীনাথ 
ব্যারিস্টারি পড়তে গেছেন বিলেতে। বাইরের দিকের তেতলায় জ্যোতিদাদার 
ঘরেব পাশেই স্বর্র শোবার ঘর। একেবারে যাকে বলে, নিজস্ব কুঠুরি। 
নতুনবউঠান ও জ্যোতিদাদাকে। এই ঘর সরস্বতীর আপন দুনিয়া। 
দিনান্তে একবারও তাদের সঙ্গে দেখা হয় না বহুদিন। মায়ের সঙ্গ না পেলেও 
জোড়ার্সাকো বাড়ির বিশালত্ব, মাস্টার পণ্ডিত, দাসদাসী, ভাইবোনেদের 
সঙ্গে মেলামেশা, চলাফেরার মধ্যে দিব্যি দিন কেটে যায় সরলা, হিরখায়ী, 
১২৫ 


জ্যোতস্সানাথের। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে একটু পার্থক্য ছিল যে, ঝি চাকর 
থাকলেও তারা মাঝে মাঝে মা-বাবার সংসর্ন পেত কিন্তু স্ব্ণর শিশুরা 
একেবারে তাদের হাতেই সমর্পিত। 

তিনজনের তিনটি আলাদা দাসী, তারা যে যার ভাগের বাচ্চার জন্য ভাল 
খাবারটুকু জোগাড় করার চেষ্টা করে। নাওয়া, ধোয়া, পরিচ্ছন্নতা দেখে। তবে 
স্বভাব অনুযায়ী দেখাশোনার তারতম্য হয় তো বটেই। সরলার মঙ্গলা দাসী 
হিন্দুস্তানি গয়লানি, গায়ের রং যেমন ঘোর কালো তেমনি তার মেজাজ। 
দেখভাল করে বটে, তবে তার কথার একচুল এদিক ওদিক করলেই মেরে 
হয়। সরলার আগের বাড়ির যাদুদাই স্নেহের টানে মাঝে মাঝেই দেখতে 
আসে হাতের ঠোঙায় কিছুমিছু খাবার নিয়ে। সে বড় ন্নেহপ্রবণ, আদরে 
চুমুতে ভরিয়ে দেয় এলেই। কিন্তু তাকে দেখলেই ভাইবোনেরা বড্ড হাসিঠাট্টা 
করে বলে সরলার লজ্জা করে। ওদিকে সতীশ পণ্ডিতের কাছে পড়তে বসেও 
আরেকপ্রস্থ মার খেতে হয় বালক-বালিকাদের। তিনি বাড়িতেই থাকতেন, 
ফলে পাঠশালার বাইরেও যখন তখন তার রুলের বাড়ি গায়ে পড়ার 
সম্ভাবনাও সামলে চলতে হয় বাচ্চাদের। সকালে উঠে দুধ খেয়েই বাইরের 
পড়ার ঘরে তার কাছে আসতে হয়, "তিনি প্রথমেই দেখেন দাত ঠিকমতো 
মাজা হয়েছে কি না, না হলেই রুলের গুঁতো। 

সরলা, হিরঞ্নয়ীর স্কুলে যাতায়াত শুরু হয়েছে। স্কুল থেকে ফিরেই 
শশীপগ্ডিতের কাছে সংস্কৃত পড়া, তারপরেই চলে আসেন গানের মাস্টারমশাই 
ভীমবাবু। বড়মেয়ে হিরগ্ময়ীর গুণপনা নিয়ে খুশি ছিলেন স্বর্ণকুমারী, এবার 
রাজা সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের স্কুল থেকে আসা ভীমবাবু যখন সরলার গানের 
গলা নিয়ে ভাল রিপোর্ট দিলেন, সেই প্রথম মেজোমেয়ের দিকে ভাল করে 
নজর পড়ল তার। 

শরৎকুমারীর মেয়ে সুপ্রভা বিশেষ পড়াশোনার ধার ধারে না, কিন্তু 
উপস্থিত বুদ্ধির জোরে সে বালিকামহলের নেত্রী। সরলার গান প্র্যাকটিসের 
সময় বেড়ে যাচ্ছে দেখে সে সরলাকে উদ্ধার করার একটা উপায় বলল, 
অতক্ষণ ধরে প্র্যাকটিস করতে যদি ভাল না লাগে, দরকার কী করার? 

সরলা ভয় পেয়ে যায়, সে কী করে হবে? প্র্যাকটিস না করে তো উপায় 
নেই। 


৯১৬ 


আছে বইকী, অকুতোভয় সুপ্রভা বলে, ওই সময়ে ঘড়ির কাটাটা রোজ 
একবার করে এগিয়ে দিলেই হবে। 

ওরে বাবা, সে আমি পারব না, সরলা শিউরে ওঠে এই প্রস্তাবে। 

সুপ্রভা বলে, ঠিক আছে, আমি করে দিচ্ছি। একটি চেয়ারের ওপর উঠে 
ঘড়ির কাটা কুড়ি মিনিট এগিয়ে দিয়ে সে চলে যায়। 

কিছুক্ষণ পরে স্বর্ণ এসে কিছু একটা সন্দেহ করলেন। সরলা ঘড়িতে হাত 
পাবে না, কিন্তু সুপ্রভাকে এ ঘরে ঘ্ুরঘুর করতে দেখেছেন তিনি। বুঝে নিলেন 
সবটাই কিন্তু দিদির মেয়েকে তো শাসন করা যায় না আর আসল দোষ তো 
সরলার। স্বর্ণ ঠিক করলেন চড় মেরে শাসন করবেন সরলাকে। কিস্তু ঘরে 
অন্য সকলে আছে, তাদের সামনে চড় মারা স্বর্ণর বিচারে অশোভন। তাদের 
ঘর থেকে চলে যেতে বলে তারপর একটি কোমল চপেটাঘাতে শান্তি দিলেন 
মেয়েকে। কিন্তু মঙ্গলার বিরাশি সিক্কার চড়ের কাছে মায়ের এই চড় তো 
আদরমাত্র। লোকের সামনে মারলে বালিকার আত্মমর্ধাদায় লাগবে, স্বর্ণ 
এই সংবেদনশীলতায় সরলার বালিকামনে যেন আলোর ছোঁয়া লাগে। শাস্তি 
পেয়ে সরলা এত খুশি কেন তা বুঝতে পারলেন না স্বর্ণ কিন্ত তারপর থেকে 
গানের তালিমটা কমিয়ে দিলেন আধঘণ্টা। 

হেমেন আর নীপময়ীর সন্তানরা ঠাকুরবাড়িতে আর-এক রকম কড়া 
শাসনে থাকে, বাবা-মায়ের শাসন। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মেশার হুকুম নেই 
তাদের, নিজেদের মহলে গান ও পড়ার নিয়মনিগড়ে একদম বাঁধা। একটু 
বিচ্যুত হলেই হেমেন তাদের উত্তমমধ্যম লাগান। 

স্বর্ণর ছোট মেয়েকে অবশ্য এসব কঠিন নিয়ম স্পর্শ করে না, তাকে 
নিয়ে সারাক্ষণই মেতে থাকেন কাদশ্বরী। তার নিঃসস্তান মাতৃহদয়ের সব 
ন্নেহমমতা দখল করে নিয়েছে উদ্মিলা। শুধু সে যখন থেকে স্কুলে ভরতি 
হয়েছে, সরলা, হিরগ্ময়ীর সঙ্গে এক পালকিতে যাওয়ার সুবাদে তিনবোনের 
মেলামেশা হচ্ছে কিছুটা। 

জানকীনাথ এখন প্রবাসে। স্বর্ণ এই পুরো সময়টা সরস্বতীর সেবায় ব্যয় 
করবেন ঠিক করেছেন। মেয়েরা লিখতে পারে না-_ এই বদনাম ঘোচাতেই 
হবে তাকে। এতদিন ধরে লিখে সবে শেষ করেছেন তার প্রথম উপন্যাস 
দীপনিবাণ। টডের রাজস্থানি কাহিনি “আ্যানালজ ত্যান্ড ত্যান্টিকুইটিজ 


১২৭ 


কপালকুগুলার প্রভাবে স্ব্ণ লিখতে চেয়েছেন ঘটনাবহুল একটি এঁতিহাসিক 
কাহিনি। 

জ্যোতিদাদার মতো তিনিও রাজপুত নায়কদের বীরগাথায় মুগ্ধ। 
জ্যোতিদাদার মতোই মুসলমান ও ইংরেজ শাসনের চাপে কোণঠাসা হিন্দু 
সংস্কৃতিকে লেখার মাধ্যমে জাগিয়ে তোলার ব্রত নিয়েছেন স্বণও। রবি 
কয়েক বছর আগে শান্তিনিকেতনে গিয়ে “পৃরথ্থীরাজের পরাজয়” নামে একটি 
বীররসের কবিতা লিখেছিলেন। স্বর্ণও মহম্মদ ঘোরির হাতে পৃথ্বীরাজের 
পরাজয় নিয়ে তার দেশাতঝ্বোধক উপন্যাসের উপাদান আহরণ করেছেন এই 
রাজপুত ইতিহাস থেকে। আধ অবনতির এই কাহিনিতে পৃর্বীরাজ আধদের 
লুপ্ত শৌধের প্রতীক। স্ত্রীচরিত্রগুলিও সেইসব কল্পনার আধনারীর প্রতিচ্ছবি, 
যাদের জন্য গব হয়। জ্যোতির ধারণা, আধভারতকে স্বদেশি মন্ত্রে দীক্ষিত 
করতে সাহায্য করবে এই উপন্যাসটি, তাই বইটি প্রকাশের ব্যাপারে জোতি 
ও কাদন্বরী অত্যন্ত উৎসাহী। গ্রন্থ প্রকাশের তোড়জোড় চলছে। 

লেখা ছাড়া স্বর্ণকুমারীর বাকি সময়টা কাটে নতুনবউঠান আর জ্যোতিদাদার 
সঙ্গে, ভারতীর মজলিশে। মাঝে মাঝে কখনও খেয়াল হলে নীচের মহিলাদের 
আসরে গল্প করতেও নামেন। 

ঠাকুরবাড়ির উঠোনে সেদিন বিশু তাতিনন্নি এসেছে। বিরাট শাড়ির পুঁটলি 
ঘিরে জমা হয়েছে মেয়ে-বউরা। কাদন্বরীর হাত ধরে স্ব্ণও নেমে এলেন 
ন7। 

একটি মেঘডন্বরু বিঞুপুরী সিক্কের শাড়ি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে 
করতে কাদন্বরী বলেন, বেজায় দাম বলছ বিশু। 

শাড়িওলি বলল, কিন্তু বোঠান, এ কাপড়ের জাত আলাদা, দৃ'-তিন 
পুরুষ ঠেসে পরলেও ছিঁড়বে না। আরম্যিনি পরবেন তাকে দেখাবে যেন 
রাজরানি। 

দ্র'-তিন পুরুষ কী গো, আমরা কি পুরুষমানুষ নাকি? হি হি করে হেসে 
গড়িয়ে পড়ে রূপকুমারী। 

সৌদামিনী সুপুরি কাটছিলেন, তিনি খোঁজেন লুপ্ত হয়ে যাওয়া এক বিশেষ 
বন্ত্র। বলেন, মায়ের ছিল একখানা ধূপছায়া রঙের সূক্ষ্ম পায়নাপল শাড়ি। 
এখন আর সেরকম একটা কাপড় আনতে পার না তাতিনি? 

মিলের সুতোয় তৈরি একটি গানপেড়ে শাড়ি দেখে স্বর্ণ পুলকিত হন, তার 


১২৮ 


পাড় জুড়ে বুনে তোলা কবিতার দুটি পঙ্‌ক্তি-_ “যমুনাপুলিনে কাদে রাধা 
বিনোদিনী/ বিনে সেই বাঁকা রায়শ্যাম গুণমণি।” 

এমন শাড়ি আগে দেখিনি তো! স্বর্ণ বলেন। কিন্তু কাদন্বরী মনে করান, 
কেন ঠাকুরঝি, সেই যে একসময় স্ত্রীশিক্ষা আর বিধবা বিয়ে চালু করার জন্য 
যার পাড়ে লেখা হয়েছিল, “বেঁচে থাকুন বিদ্যেসাগর চিরজীবী হয়ে, মনে 
নেই! 

বিশু তাতিনির কাছে গামছার বাহারও কম নয়। সে চমৎকার ছড়া কেটে 
বলে, জানো তো দিদিমণি বউমণিরা, কথায় বলে, “নিরগুণ পুরুষের তিনগুণ 
ঝাল/ পরনে গামছা, গায়ে ঠাকুরদাদার শাল?। 

মানে কী তাতিনি? রূপকুমারী জানতে চায়। দেবেন ঠাকুরের সৌজন্যে সে 
এ-বাড়িতে টিকে গেছে। সব শুনে রূপাকে ধমক দিয়ে সংযত হতে বলেছেন 
দেবেন্দ্রনাথ, কিন্তু সারদার আদরের পুষ্যিকে বাড়িছাড়া করতে তার মন সায় 
দেয়নি। 

কাদন্বরী রূপাকে কাছে টেনে নিয়ে বলেন, বোকা মেয়ে, এটাও বুঝলি 
না, মানে হল যে পুরুষের গুণ নেই, কাপড় কেনার মুরোদ নেই সে গামছার 
ওপর ঠাকুরদাদার শাল জড়িয়ে দুর্দশা ঢাকতে চায় আর ঈর্ধায় অন্যের ওপর 
ঝাল ঝাড়ে। 

মেয়েদের কারও কারও ভুরু কুঁচকে যায় এ-কথায়, কেননা স্বণ আর 
কাদন্বরী যত মহাথ সব সিক্ষের শাড়ি বাছছেন, অনেকেরই তা কেনার সামপ্থয 
নেই। বাড়ির বউরা স্বামীর উপার্জনে গরবিনী, তাদের খরচের হাতটাও 
বড়। কিন্তু মেয়েদের অনেকের হাতেই অত টাকা থাকে না, তাদের স্বামীরা 
ঘরজামাই, ভাইদের মতো ততটা সম্পন্ন নন। আর শরৎকুমারী, সৌদামিনীরা 
ঘরে থাকেন বলেও কমদামি বেগমবাহার, বাগেরহাট বা ফরাসডাঙা কেনেন 
পারিবারিক তহবিল থেকে। নানারকম শাড়ির ঝলকানিতে রঙবেরঙে্র 
তস্তজালে উঠোন আলো হয়ে যায়। 

স্বর্ণর বর জানকী অবশ্য ভাল রোজগার করেন। ঘরজামাই হওয়ার গ্লানিও 
তিনি বহন করেননি কোনও দিন। বরং দেবেন ঠাকুরের আদরিণী কন্যাকে 
আদরে সম্পদে ভরিয়ে দিয়েছেন তিনিও। 

কাদন্বরী একটি মভরঙের বালুচরী বেছে স্বর্কুমারীকে বললেন, তোমার 


১২২০ 


প্রথম উপন্যাসের প্রকাশ উপলক্ষে এটা আমার উপহার, অনুষ্ঠানের দিন 
এই শাড়িটা পরবে। স্বর্ণ আনন্দে নতুনবউঠানকে জড়িয়ে ধরেন। দু'-একদিন 
পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে তার প্রথম উপন্যাস “দীপনিবর্বাণ”, সেই 
নিয়ে নতুনবউঠানের উত্তেজনার স্পর্শে স্বর্ণও আবেগতাড়িত হলেন। 

স্বর্ণ সাজগোজ করতেও ভালবাসেন। এই কিছুদিন আগে তিনি যখন 
সাজগোজ দেখতে থাকেন। চওড়া সাদা পাড়ের কালো বোম্বাই শাড়ি, ফ্রিল 
ও লেস লাগানো বারো আনা হাতার জ্যাকেট, সঙ্গে মুক্তোর সাতলহরী হার। 
সভায় এসেছিলেন কবি কামিনী রায়, তিনি তো স্বর্ণকে বলেছেন সাক্ষাৎ 
স্বর্গচ্যুত সরন্বতী। স্বর্ণ ঠিক করেছেন কামিনীর সঙ্গে সই পাতাবেন। 

অনেক মেয়েরাই সেখানে এসেছিলেন, কিন্তু গিরীন্দ্রমোহিনী আসেননি। 
স্বর্ণর খুব ইচ্ছে তার সঙ্গে আলাপ করে বন্ধুত্ব পাতাবেন। চিঠিতে যোগাযোগ 
হয়েছে, তাতে সামনাসামনি সাক্ষাতের ইচ্ছে আরও বেড়েছে কিন্তু তাদের 
বাড়ির মেয়েদের এখনও বাইরে বেরোনোর নিয়ম নেই। 

এখনও মেয়েরা এরকম বন্দি হয়ে থাকবে এটা অসহ্য লাগে, ঘরের কোণ 
থেকে মেয়েদের বাইরে নিয়ে আসার জন্য আন্দোলন করতে ইচ্ছে হয় স্ব্ণর। 
স্বদেশিভাব জাগানোর জন্য মেয়েদের মধ্যে সখ্য গড়ে তুলতে হবে, ফিমেল 
বন্ডিং। তাই তো স্বর্ণ একের পর এক লেখিকার সঙ্গে সই পাতান। লাহোরিণী 
শরৎকুমারী তার বিহঙ্গিনী সই। গিরীন্দ্রমোহিনীকে পাতিয়েছেন মিলনসই। 
অথচ তার সঙ্গেই মিলন হয়নি এখনও। তাই স্বর্ণ চিঠির পর চিঠি পাঠান তার 
মিলনসইকে, কখনও কখনও বন্ধুত্বের তীব্র আকাঙক্ষায় গিরির উদ্দেশে লেখা 
কবিতা প্রায় প্রেমের কবিতার মতো শোনায়, 


“বিরহে থাকে প্রেম মরমে মিশি, 
তাই অদরশনে সুখ সাধে ভাসি, 

বিরহে আখি জাগে সকলি জেগে থাকে, 
আঁখিতে আঁখি হলে শুধু জাগে হাসি।, 


পত্রকবিতা পেয়ে গিরিও উতলা হন, কিন্তু তার উপায় নেই। তিনি গোঁড়া 
পরিবারের গৃহিণী, বাইরে বেরোনোর হুকুম নেই। লুকিয়ে চুরিয়ে লেখালিখি 


১৩০ 


শুরু করেছিলেন। স্বামী জানতে পেরে পরে অবশ্য অনুমতি দিয়েছেন। 
ঘরসংসার সামলে স্ত্রী যদি সাহিত্যচ্গা করেন, তাতে তার আপত্তি নেই। এখন 
তো কত মেয়েরাই লিখছে “ভারতী', “বামাবোধিনী'র মতো পত্রপত্রিকায়। 
গিরিকে তিনি লেখা পাঠানোর উৎসাহ দেন। শিক্ষিত ভদ্রলোকের পক্ষে 
শিক্ষিত পত্বী অত্যন্ত গৌরবের। বাড়ি বসে যত ইচ্ছে লেখাপড়া করুক, কিন্তু 
পরদা ভেঙে স্ত্রীর বাইরে বেরোনোর কথা ভাবতে পারেন না দত্তমশায়। 
দীপনিবাণের প্রকাশ উপলক্ষেও গিরিকে ডাক পাঠিয়েছেন ব্বর্ণ, কিন্তু তিনি কি 
ছাড়া পাবেন! এবারেও স্ব্ণকে হতাশ করলেন গিরিন্দ্রমোহিনী। পৌষের এক 
শিরশিরে বিকেলে প্রকাশিত হল দীপনিবাণ, আর বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই 
সাড়া পড়ে গেল বাংলা বইয়ের বাজারে। আশ্চর্য ব্যাপার, বইটিতে লেখকের 
নাম ছাপা হয়নি। কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে ঠাকুরবাড়ির কোনও মেয়ের লেখা। 
এর আগেও দু'চারজন মহিলা আখ্যান লেখার চেষ্টা করেছেন, সেগুলো 
কোনওটাই এর মতো পরিশীলিত হয়নি। 

সাধারণী পত্রে সমালোচনায় সন্দেহের চোখে ব্যজস্তরতি লেখা হল, 
শুনিয়াছি এখানি কোন সস্ত্রান্তবংশীয়া মহিলার লেখা। আন্রাদের কথা। 
স্ত্রীলোকের এরূপ পড়াশোনা, এরূপ রচনা, সহদয়তা, এরূপ লেখার ভঙ্গী 
বঙ্গদেশ বলিয়া নয় অপর সভ্যতর দেশেও অল্প দেখিতে পাওয়া যায়।' 

কেন ছাপা হয়নি নাম? জ্যোতির মনে হয়েছিল আগে লোকের রিআ্যাকশন 
দেখে তারপর নাম প্রকাশ করে সবাইকে চমকে দেওয়া হবে। তার ফল 
হল মজার, লোকেরা তো ভাবেইনি সত্যি সত্যি মেয়েরা এরকম লিখতে 
পারে, এমনকী কাছের লোকদের ধোঁকা লাগল। সবচেয়ে কৌতুকের ঘটনাটা 
ঘটালেন সত্যেন্দ্র। ডাকমারফত অনামিকা বইটি পেয়ে তিনি জ্যোতিকে 
চিঠিতে লিখলেন, “জ্যোতির জ্যোতি কি প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে? 

উপন্যাসটি যে সত্যিই স্বণকুমারীর লেখা সে-কথা বিশ্বাস করতে পাঠকের 
সময় লাগল। কিন্তু ১৮৭৬ সালটি মেয়েদের লেখালিখির ইতিহাসে উজ্জ্বল 
হয়ে উঠল শুধু দীপনিবাণের জন্যই নয়, এই বছরে মহিলাদের আরও দু'টি 
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বেরিয়েছে। কুমিল্লার নবাব ফয়জুনেসা চৌধুরানি লিখে 
ফেলেছেন রূপজালাল নামে একটি দীর্ঘ প্রণয়কাব্য। পিছিয়ে থাকা মুসলমান 
সমাজের পক্ষে তা সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠেছে, অথচ নবাবকে চটানোও 
বিপজ্জনক। ফয়জুন্নেসা হয়ে উঠেছেন তাদের শীখের করাত। 


৯৩১ 


অন্য আর-একটি গ্রন্থ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অন্তঃপুরবাসিনী জনৈক প্রৌঢ়া 
রাসসুন্দরী দেবীর নামে প্রকাশিত হয়েছে একটি আশ্চর্ব আত্মজীবনী, “আমার 
জীবন”। তার রচনা থেকে গোঁড়া হিন্দুবাড়ির অন্দরের এমন সব ছবি পাওয়া 
যাচ্ছে যা ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের আলোকিত জীবনযাত্রা থেকে একদম 
আলাদা। মালিনীর কাছ থেকে বইটি হাতে পেয়ে পড়তে পড়তে রাসসুন্দরীর 
জীবনের প্রতি ছত্রে ছত্রে স্বপ্ন চমকে ওঠেন। 
পাশের ঘরে গেছেন, তখনই কত্তার ঘোড়াটি উঠোনে ধান খেতে এল। রাশিকৃত 
ধানের স্তূপ থেকে রোজই ধান খায় ঘোড়া কিন্তু তাকে দেখলে রাসসুন্দরীর 
বড় লজ্জা করে। তিনি পরদানশীন মহিলা, বুক পর্যন্ত ঘোমটা টেনে চুপচাপ 
উদয়াস্ত ঘরের যাবতীয় কাজ সারেন। বিধবা ননদিনীদের সঙ্গে কথা বলতেও 
লঙ্জা পান, বউমানুষের তো এমনই রীতি। ঘোড়া তো কর্তার প্রতিভূ, তার 
সামনেও লজ্জায় বেরতে পারেন না। এখনও ঘোড়াকে দেখে ওপাশের ঘরে 
গিয়ে আটকে গেলেন রাসসুন্দরী, এদিকে বাচ্চারা মা মা করে ডাক শুরু করল 
পাকঘরে। কেউ কাদতে লাগল, ঘোড়াও ধান খেতে লাগল। যায় না। 

রাসসুন্দরী এক-একবার এগোন আবার লজ্জায় পেছিয়ে যান। ধনে মনে 
দেখে, তবে বড় লজ্জার কথা।” রঃ 

তখন তার বড়ছেলে এসে মাকে অভয় দেয়, মা, ও ঘোড়া কিছু বলবে না, 
ও তো আমাদের জয়হরি ঘোড়া, ভয় কি? 

ছেলের কথা শুনে মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দেন তিনি। ছি ছি আমি 
কি মানুষ! সবাই ভাবছে আমি ঘোড়া দেখে ভয় পাই, আসলে যে লজ্জায় 
পালাচ্ছি সেকথা শুনলে ওরা ভাববে পাগল। কেউ তো আমাকে শাসন 
করছে না, ঘরে নিজের মতো থাকতে ভয় পাই কেন নিজেই বুঝি না। 

ছেলের হাত ধরে রাসসুন্দরী পাকঘরে আসেন। আর ঘোড়া দেখে লজ্জা 
করবেন না মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন। পাকথরই তার নিজের জায়গা। 
সারাদিন কেটে যায় পঁচিশ-তিরিশজন লোকের রান্নাবান্নায়, বারবাড়িতে 
আটটি দাসীচাকর অন্দরে কেউ নেই। আগে চাকরানিদের সঙ্গেও কথা 
বলতেন না, তিনি নিজেই লিখছেন যে ইদানীং তাদের নির্দেশ না দিলে তারা 
বড্ড কাজে ফাকি দেয়। 
১৩২ 


কাজ সারা হলে গোপনে পড়াশোনা করেন রাসু। জানতে পারলে 
লোকে ছি ছি করবে সে তার সইবে না। কত যত্বে পাকঘরের খড়ির নীচে 
চৈতন্য ভাগবতের পাতা লুকিয়ে রেখে একটু একটু করে পড়তে শিখেছেন 
তিনি। এখন জীবনের না বলতে পারা কথা কিছু কিছু লিখেও রাখেন, সেই 
স্মৃতিচারণের তালপাতায় আজও দুটি নতুন পঙক্তি লিখলেন__ 


“এখন কখন মনে পড়ে সেই দিন। 
পিঞ্জরেতে পাখী বন্দী, জালে বন্দী মীন।, 


বয়সে বিয়ে হয়েছিল রাসসুন্দরীর। তখনও তিনি এক সরলা বালিকা। বিয়ের 
আগে বাপের বাড়ি খেলতে খেলতে শুনে এলেন তাকে নাকি পরের ঘরে 
যেতেই হবে। 
' ঘাটের ধারে একটি লোক তাকে দেখিয়ে বলেছিল, এ মেয়েটি বেশ সুন্দর। 

যার ঘরে যাবে সে খুব সৌভাগ্যশালী। 

আরেকজন বললে, কতজন যেচে নিতে এসেছে, এর মা কাউকেই মেয়ে 
দিতে চাননি। 

সেই প্রথম রাসুর মনে পরের ঘরে যাওয়ার ভয় ঢুকল। যখন চারদিকে 
গৌরীদানের বাড়বাড়ন্ত আট-ন” বছরের মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় তখনও এই 
বালিকা পরম নিশ্চিন্তে মায়ের কোলে মুখ ডুবিয়ে বসে ছিলেন। বলিপ্রদত্ত 
ছাগলছানার মতো নিরুদ্ধেগ। খেলার সঙ্গিনীরা তাকে 'সোহাগের আরশি” বলে 
ঠাট্টা করলেও তিনি কেঁদে ভাসিয়ে দিতেন। সে যে সংসারের অনেক নিয়ম 
জানতে পারেননি তার একটা কারণ এই যে তীর মা তাকে একটু তুলে তুলে 
মানুষ করছিলেন। সঙ্গিনীদের দুষ্টুমি থেকে বাঁচাতে তার খেলা বারণ হল। তাদের 
বাড়িতেই বসত ছেলেদের বাংলা শেখার স্কুল। গ্রামে তখন মেয়েদের পড়াশোনা 
শুরু হয়নি। দাদারা রোজ সকালে তীকে কালো ঘাগরার ওপর ওড়নি পরিয়ে 
পাঠশালায় বসিয়ে রাখা শুরু করলেন। এক মেমসাহেব পড়াতে আসতেন। 
শুনে শুনে আর দেখে দেখে বালিকা সেখানেই কিছু বর্ণমালা শিখেছিলেন। 
পাঠশালায় চুপ করে বসে থাকলেও তার রূপের খ্যাতি ছড়াতে লাগল। লোকে 
তাকে দেখে যা যা বলত মনে করে গোপনে ছড়া বেঁধেছেন রাসসুন্দরী-_ 


১৩৩ 


“বর্ণটি আছিল মোর অত্যন্ত উজ্জ্বল। উপযুক্ত তারি ছিল গঠন সকল ॥ 
সেই পরিমাণে ছিল হস্তপদগুলি। বলিত সকলে মোরে সোনার পুতুলী ॥, 


ঘাট থেকে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে এ হেন সরলা বালিকা সেদিন 
জানতে চেয়েছিলেন, মা, আমাকে যদি কেউ চায়, তুমি কি আমাকে অন্যের 
হাতে দিয়ে দেবে? 

এ-কথা শুনে মা চোখের জল মুছে বললেন, ষাট ষাট, তোমাকে কেন 
দেব? কে এসব বলল তোমাকে? 

মায়ের কান্না দেখে রাসু বোঝেন অন্যের ঘরে যেতেই হবে। শুনে ভয়ে 
তাঁর নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। পরে অবশ্য বিয়ের কথা উঠতে নতুন 
শাড়ি গয়না বাজনাবাদ্যির আবহে একটু একটু আনন্দও হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের 
পরে বর যেই তাঁকে পালকিতে তুলে রওনা দিলেন রাসু হাপুস নয়নে কেঁদে 
উঠলেন। নিজেকে বলির পাঁঠার মতো মনে হচ্ছিল। 

সেদিন রাসসুন্দরীর মাথার ওপর থেকে মাতৃচ্ছায়া সরে গেল, তিনি মনে 
মনে ভগবানকে বললেন, “লোকে যেমন আমোদ করিয়া পাখী পিঞ্জরে বদ্ধ 
করিয়া থাকে, আমার যেন সেই দশা ঘটিয়াছে। আমি এ পিঞ্জরে এ জন্মের 
মতো বন্দী হইলাম, আমার জীবদ্দশাতে আর মুক্তি নাই।' 

প্রথম ছ'-সাত বছর শাশুড়ির কাছেও খুব যত্বে ছিলেন রাসু। সেই যে বিয়ের 
পর পালকি থেকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন শাশুড়ি, কোনও কাজই করতে 
দেননি। রাসুর দিন কাটত পাড়ার বালিকাদের সঙ্গে খেলাধুলো করে। সময় 
পেলে মাটি দিয়ে নানারকম পুতুল গড়তেন। একবার মাটির সাপ গড়ে রং 
করে পালক্কের নীচে রেখে দিয়েছেন, আর বাড়ির লোকেরা আসল সাপ ভেবে 
হইচই বাধিয়ে দিল। লাঠি নিয়ে এসে সাপ ভাঙার পর সবাই হেসে কুটোপাটি 
আর রাসু লজ্জায় অধোবদন। সেই থেকে আর মাটির পুতুল গড়েননি। 

কিন্তু কিছু তো করতে হবে! তখন টাকাপয়সার চল হয়নি, কড়ি দিয়ে 
বেচাকেনা হত। রাসু কড়ি দিয়ে নানারকম জিনিস তৈরি শুরু করলেন, 
ঝাড়, আরশির গায়ে ঝোলানোর মালা, পদ্মফুল করে ঘরে ঘরে লটকে 
দেন। শাশুড়ি হাসিমুখে প্রশ্রয় দেন বালিকাবধৃটিকে। কিন্তু এই সুখ বেশিদিন 
রইল না। চোখের দৃষ্টি হারিয়ে শাশুড়ি সান্নিপাতিকে শয্যাশায়ী হলেন আর 
সংসারের সব ভার এসে পড়ল রাসুর ওপর। 


১৩৪ 


সেইসব ভয়াবহ দিনের কথা মনে করে রাসু তালপাতায় লিখতে থাকেন, 
'ক্রমে ক্রমে ওই সকল কাজ আমার পক্ষে ঈশ্বরেচ্ছায় এমন সহজ হইল 
যে, আমি একাই দুবেলার পাক করিতে পারগ হইলাম, এবং সমুদায় কাজ 
করিয়া বসিয়া থাকিতাম। তখন মেয়েছেলেরা লেখাপড়া শিখিত ন], সংসারে 
খাওয়াদাওয়ার কর্ম সারিয়া কিঞ্চিৎ অবকাশ থাকিত, তখন কর্তাব্যক্তি যিনি 
থাকিতেন, তাহার নিকট নত্রভাবে দণ্ডায়মান থাকিতে হইত। যেন মেয়েছেলের 
গৃহকর্ম বৈ আর কোন কর্মই নাই।” 

রাসু এ-সব নিয়মই অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। উদয়াস্ত খাটনির 
পর প্রায়ই নিজে খাওয়ার সময় পান না। সকালে উঠেই আগে কর্তার ভাত 
রান্না করে খাওয়ান। তারপর গুষ্টির সবার ভাত ডাল মাছ তরকারি, -্মাটটি 
বাচ্চাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, পুজোআগির পর নিজের খাওয়া। কোনও 
কোনও দিন বাচ্চাদের ঘুম ভেঙে গেলে তার আর খাওয়া হয় না। কর্তা ঘরে 
থাকলে কাজ সেরে ঘোমটা টেনে গলবস্ত্র হয়ে তার পাশে দাড়িয়ে থাকা। 
কতা মানুষটি ভাল, কিন্তু পত্বীর দিকে নজর দেওয়ার কথা তার মাথায় আসে 
না। 

ঘরে ঢুকেই তিনি হাক পাড়েন, কই গো, কোথায় গেলে, পা ধোয়ার 
জলটল দাও। যন্ত্রচালিত রোবটের মতো ছুটে এসে সেবা করেন রাসু। বুক 
পর্যন্ত ঘোমটার ফাক দিয়ে কোনওরকমে স্বামীর যে পাদুটি দেখতে পান জল 
ঢেলে ধুইয়ে দেন। 

জলখাবার খেয়ে কোনও বই নিয়ে বসেন সীতানাথ। ছেলেদের সঙ্গে পড়া 
ভাগবত পড়বেন। কিন্তু তিনি তো বইটাই চেনেন না। 

রাসসুন্দরীর জীবনে একটা ম্যাজিক ঘটে গেল যেদিন মালিনীর সঙ্গে 
তার হঠাৎই দেখা হয়ে যায় খিড়কির পুকুরঘাটে। তার কাছেই ধীরে ধীরে 
আঁক কষতে শেখেন রাসু। বিদ্যেসাগরের বর্ণপরিচয় কিনে মালিনীর কাছে 
বসে বসে অক্ষর শেখেন। সেদিনের কিশোরী বই-মালিনী রাসুর ভেতরে যে 
আগুন উসকে দিয়েছিল সে-খবর কেউ রাখেনি, কিন্তু তালপাতার পুথিতে 
যে লেখার শুরু তা যে আজ ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত, তাতেই বেজায় খুশি 
মালিনী। প্রথমেই একটি কপি নিয়ে দৌড়ে এসেছে স্ব্ণকুমারীর কাছে। 

স্বর্ন এতদিন ভাবতেন তাকেই লেখার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে অহরহ, 


১৩৫ 


কিন্তু এই বই পড়ার পর তার সেই প্রত্যয় নড়ে গেল। এই অবরোধে বন্দি 
প্লৌঢ়া লেখার জন্য তার চেয়েও কত বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন দেখে শ্রদ্ধায় মাথা 
নত হয়ে আসে স্বণর। 

পরের সপ্তাহে মালিনী এলে আবিষ্কারকের সম্মান দিয়ে স্বণন তাকে জড়িয়ে 
ধরেন। তেতলার ঘরে মুড়ি, ফুলকপির বড়া ও নতুন বঙ্গদর্শন সহযোগে 
মজলিশ জমিয়ে তোলেন স্বর্ণ, মালিনী ও কাদন্বরী। 

মালিনী জানতে চায়, নতুন সংখ্যাটি পড়ছ স্বর্ণ দিদি? বঙ্কিমবাবু যে কী ভাল 
কাজ করছেন এই পত্রিকা বের করে, কত নতুন নতুন লেখা পড়া যাচ্ছে। 

স্বণ পালক্ক থেকে নেমে লেখার টেবিল থেকে বঙ্গদর্শনের একটি কপি 
সংখ্যাটি আসবে। প্রতিমাসে “বিষবৃক্ষ” না পড়লে আমার ঘ্বুম হয় না যেন। 

খোঁপায় বেলকুঁড়ি লাগাতে লাগাতে কাদন্বরী বললেন, বিষবৃক্ষের 
কুন্দনন্দিনীকে আমার খুব ভাল লেগেছে। নিঃসঙ্গ মেয়েটির দুঃখ আমার ঘুম 
কেড়ে নেয়। কেউ কি তাকে সত্যি ভালবাসবে না? 

কুন্দ আর সূ্যমুখীর দ্বন্দটাই তো গল্প জমিয়ে দিয়েছে, স্বর্ণ উত্তেজিত হয়ে 
পড়েন, বঙ্কিমবাবুর সাহস আছে বলতে হবে, বিধবার প্রেম দেখাচ্ছেন এত 
খোলাখুলি, পেটরোগা বাঙালির হজম হলে হয়। 

কাদম্বরী উঠে এসে স্বর্ণকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তুমি যে প্রতিকূলতাকে জয় 
করেছ নিজের চেষ্টায় সেটা কি কম বড় বথা হল! মেয়েদের লেখালেখিকে 
এখনও বিদ্বজ্জনরা গুরুত্ব দেন না, কিন্তু আমরা তো জানি কত অসম্ভবকে 
সম্ভব করতে হচ্ছে তোমাকে। 

স্বণ বললেন, দেখো না নতুনবউঠান, বাড়িতে সবাই আমার লেখার আদর 
জ্যোতিদাদ্য লিখে দিচ্ছেন। 

যাঃ, তাই আবার হয় নাকি? কাদম্বরী হেসে লুটিয়ে পড়েন, মানুষের 
কল্পনাশক্তি কত লম্বা দেখো! 

শোনো মালিনী, এই লম্বা জল্সনাকল্পনা সব মেয়েদের বিরুদ্ধে তেড়ে 
আসছে, স্বর্ণ বিরক্ত হয়ে বললেন। আমার সই গিরীন্দ্রমোহিনী তো কোনওদিন 
কোনও সাহিত্যসভায় আসতেই পারেননি। কতদিন ধরে দু'জন দু'জনকে 


৯৩৬ 


গিরিকে বাড়ি থেকে বেরোতে দেয় না। এই তো মেয়েদের অবস্থা! রাসসুন্দরী 
দেবীর মুখ কি কোনওদিন দেখতে পাব আমরা? 

সখীদের এই মিলনবাসরে হঠাৎ এসে পড়ে স্ব্ণর ছোট্ট মেয়ে উত্মিলা। 
কাদন্বরী হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেন ফুটফুটে শিশুটিকে। 

উমিলাও কাদশ্বরীর কোলে উঠে মহা খুশিতে তার গলা জড়িয়ে ধরে। 
কিন্তু স্বর অত আহ্রাদ আসে না। কতদিন পরে এমন আসর বসেছে, আজ 
এই সৃজনশীল মজলিশে বাচ্চাকাচ্চার উৎপাতে সময় নষ্ট করতে তার একটুও 
ইচ্ছে নেই। 

দাসীকে চিৎকার করে ডেকে বলেন, উমিলাকে নিয়ে যাও, ও এখানে 
এল কী করে? তুমি কি ঘুমোচ্ছ নাকি? 
পেচ্ছাপ করতে গেছিলাম, সেই ফাঁকে পালিয়ে এসছে। 

দাসীর অমার্জিত শব্দ ব্যবহারে আরও খেপে যান স্বণ, যাও বলছি, 
আমাকে আর বিরক্ত কোরো না, বেবিকে নিয়ে নীচে যাও। 

কাদশ্বরী আর চুপ করে থাকতে পারেন না, দাসীকে বলেন, তুই যা, 
আমি দেখছি। উমিলা আমার কাছেই থাকবে। স্বর দিকে ফিরে বলেন, 
ছোট্টসোনাটা থাকলে কোনও অসুবিধে হবে না, কী যে কর না তুমি! 

তোমরা আবার বাচ্চাদের বড্ড মাথায় তোল বউঠান, স্বণ নিজের মতে 
স্থির থাকেন, যেমন মেজোবউঠান তেমন তুমি। আমরা যেভাবে বড় হয়েছি, 
এ-বাড়ির হাওয়া বাতাসে ওরাও সেরকম বড় হয়ে যাবে। তার জন্য আমার 
অমূল্য সৃষ্টিশীল সময় নষ্ট করতে পারি না বাপু। 

কাদন্বরীর চোখে জল আসে, তোমাদের কোল আলো করে দেবশিশুর৷ 
না চাইতে এসেছে বলে এমন অবহেলা করছ ঠাকুরঝি, আমার যে কোল 
খালি। উদ্িলাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে সাহিত্য আলোচনা করার জোর 
আমার নেই। 

মালিনী এবার কাদন্বরীর পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। স্বর্ণ বলেন, বউঠান, 
উমিলা তো তোমারই মেয়ে, আমার হলে কি আমি ঘর থেকে যেতে বলতাম! 
কাদশ্বরী ও স্বর্ণ পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেন প্রবল সখীত্বে। সেই মুহতে বালিকা 


১০ 


আনাবাই নলিনী 


১৮৭৭-এর শ্শ্রীষ্মকালের এক ফুরফুরে বিকেলে তিনটি শিশুকে নিয়ে 
অস্তঃসত্বা জ্ঞানদা একা-একাই বিলেতের জাহাজে চেপে বসলেন। এ যাত্রায় 
সত্যেন তাদের সঙ্গী হতে পারলেন না, পরিচিত এক ইংরেজ দম্পতির সঙ্গে 
জ্ঞানদাকে পাঠিয়ে দিলেন লিভারপুলের উদ্দেশে । দেখাশোনার জন্য সঙ্গে 
গেল একটি গুজরাতি ও একটি মুসলমান চাকর। স্ত্রীর ওপর সত্যেনের অগাধ 
ভরসা । তিনি জানেন জ্ঞানদা সব সামলে নেবেন। 

বোম্বাই বন্দরে তাকে সি অফ করতে এসেছেন পাগ্ুরং পরিবারের গৃহিণী 
ও মেয়েরা। ওঁদের বড় মেয়ে আনা বেশ কিছুদিন বিলেতে কাটিয়ে এসেছেন 
অথচ ভারতীয় সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়েও তাঁর আগ্রহ প্রবল। একা বিলেতযাত্রা 
নিয়ে জ্ঞানদার মনে একটু ইতস্তত ভাব ছিল। এই ক"দিনে আনা তার সেই 
ভয় কাটিয়ে দিয়েছেন। লন্ডনের মহা মহা ব্যাপার সম্বন্ধে আনা তড়খড়ের 
বর্ণনা, উৎসাহ এবং তাঁর নব আহরিত বিলিতি দ্যুতিতে জ্ঞানদাও উৎসাহিত। 
প্রগতির যাত্রায় এই পরিবারের মেয়েদের কাছে তার খণ বেড়ে চলেছে। 

প্রসন্ন ঠাকুরের ছেলে জ্ঞানেন্দ্রমোহন্‌ খ্রিস্টধর্ন নিয়ে লন্ডনে বাস করছেন, 
বিলেতে তিনিই জ্ঞানদা ও ছেলেমেয়েদের স্থানীয় অভিভাবক হবেন। 
সত্যেনের মতে ইংরেজদেব আদবকায়দা শেখার জন্য জ্ঞানদার বিলেতে গিয়ে 
বসবাস করা অত্যন্ত জরুরি। সুরেন, বিবি ও চোবিকেও বিলিতি কেতায় দুরস্ত 
করে তোলা তার উদ্দেশ্য। এরপর নিজে যখন যাবেন, বাবামশায়ের অনুমতি 
পেলে ঠিক করেছেন রবিকেও সঙ্গে নিয়ে যাবেন ব্যারিস্টারি পড়াতে। 

জ্ঞানদা দুর্জয় সাহসিনী। তার মতো আর কোনও বাঙালি মেয়েই কোনও 
পুরুষ সঙ্গী ছাড়া তিনটি বাচ্চা নিয়ে কালাপানি পেরোনোর কথা ভাবতে 


১৩৮ 


পারেনি। তার সাহস দেখে ঠাকুরবাড়ির অন্য মহিলাদের হাত পা ঠান্ডা হয়ে 
যায়। তবু প্রথমদিন সন্ধের মুখে জাহাজের ডেকে দাড়িয়ে মনখারাপ লাগে 
জ্ঞানদার। 

সূ অস্ত যাচ্ছে। দেশের ছবি মুছে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে। রামমোহন 
রায় এবং দ্বারকানাথ বিলেতে গিয়ে আর দেশে ফিরতে পারেননি, তাই 
সকলেই কালাপানি পেরতে ভয় পায়। যখন জাহাজ জেটি ছাড়ল, হাত 
নাড়তে নাড়তে ক্রমশ ছোট হয়ে এল বন্দরে দাড়িয়ে থাকা সত্যেন ও পাণুরং 
কোনওদিন ফেরা হবে কি না কে জানে! 

জাহাজপথ অতি মনোহর। জ্ঞানদা বাচ্চাদের নিয়ে সমুদ্রযাত্রা পুরোমাত্রায় 
উপভোগ করছেন। মুসলমান চাকরটি খুব সেবাযত্ব করে, জাহাজ লিভারপুল 
পৌঁছলে সে অবশ্য বিলেতের তীর থেকে ফিরে আসবে। বিলেতে সঙ্গে 
থাকবে গুজরাতি রামা চাকর। এ-সব ব্যাপারে সত্যেনের ব্যবস্থা পাকা। 

সমুদ্রের নীল জল ক্রমে অন্ধকার হয়ে আসে। রাত্রি নামলে আলোয় ভরে 
যায় জাহাজটি। সুসজ্জিত ইংরেজ নারীপুরুষেরা জোড়ায় জোড়ায় ডেকে ভ্রমণ 
করছে। সুরেন, বিবিদের সুন্দর পোশাক পরানো হয়েছে, তারা এই অবারিত 
অভাবিত পরিসরে মনের আনন্দে খেলে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট চোবি রামা চাকরের 
কোলে। মেমসাহেবরা দেবদূতের মতো শিশুটিকে দেখে আদিখ্যেতা করে 
গাল টিপে দিচ্ছে প্রায়ই। সন্ধে গভীর হলে সবাই ডাইনিং রুমের দিকে রওনা 
দিল। 

বুক দুরুদুরু সংবরণ করে জ্ঞানদাও সুন্দর করে সাজলেন। যে শাড়ি পরে 
এসেছিলেন সেটি পালটে পরলেন গুজরাত থেকে আনা একটি ঘননীল বাঁধনি 
সিক্ষ। এই বাঁধনি কাপড়গুলি ভারতের মেয়েদের হাতের অপুব শিল্প। প্রথমে 
সাদা ক্যানভাসের মতো পুরো শাড়িটাতে বিন্দু বিন্দু করে সুন্ষ্স সুতোর বাঁধন 
দিয়ে উজ্জ্বল কোনও রঙে চোবানো হয়। রং বসে গেলে শুকিয়ে নেওয়া হয় 
শাড়ি। পাড়টিও আলাদা বাধন দিয়ে আলাদা রং করা হয়। শুকনো শাড়ি 
থেকে সুতোর বাধন খুলে ফেললেই আসল ম্যাজিক, সারা শাড়িতে লাল, 
সবুজ, নীল রঙের ওপর বিন্দু বিন্দু সাদা নক্ষত্র ফুটে ওঠে। আমেদাবাদে 
থাকতে গুজরাতি গ্রামে গিয়ে নিজে এ-সব শাড়ি সংগ্রহ করেছেন জ্ঞানদা। 
আজকের গ্রে রঙের পাড় দেওয়া নীল শাড়িটিতে তার চেহারার আভিজাত্য 


১৩৯ 


যেন ঠিকরে উঠছে। ডাইনিং রুমে তিনিই একমাত্র ভারতীয় মহিলা, সবার 
চোখ ঘুরে ঘুরে আসছে তার দিকে। কোণের টেবিলে সুরেন ও বিবিকে 
নিয়ে সঙ্গী ইংরেজ দম্পতির সঙ্গে বসেছেন জ্ঞানদা। ঘরে মোৎসার্টের সুর 
বাজছে হালকা চালে। কীটা-চামচ সহযোগে প্রতিটি খাবারের স্বাদ নিতে 
নিতে গল্প করছেন তারা। হলঘরে দু'-একটি ইংরেজ মেয়ের কাধখোলা 
গাউন যেন একটু বেশিই উনুক্ত। পোশাকের শাসন না মেনে তাদের স্তনের 
আভাস উপচানো মাখনের মতো উঁকি মারছে। অধিকাংশ পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টি 
সেইদিকে। জ্ঞানদার একটু অস্বস্তি হয়। 

সঙ্গিনী মিসেস মেরি ফিলিপের অনুরোধে একটু রেড ওয়াইন নিয়েছেন 
জ্ঞানদা। এর আগে স্বামীর সঙ্গে পার্টিতে পান করলেও এখন এত অচেনা 
লোকের সামনে একটু বাধোবাধো ঠেকে। সত্যেনের চাকরির সুবাদে একটু 
আধটু পান করতে হয় ঠিকই, কিন্তু ব্রান্মধর্মের প্রভাবে ঠাকুরবাড়িতে এখন 
বইছে মদ্যপান বিরোধিতার হাওয়া। জ্যোতিদের সপ্ত্রীবনী সভাতেও মদের 
বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সারা কলকাতার বাবুরা যেভাবে সুরাসমুদ্রে গা 
ভাসিয়ে বাইজি চায় মেতে আছেন তা দেখে ওঁরা শিউরে ওঠেন। এখন 
দেবেন ঠাকুরের পুত্রবধূকে ওয়াইন পান করতে দেখে কে কোথা থেকে খবরের 
কাগজে রিপোর্ট করে দেবে কে জানে: ওয়াইন যদিও মদ নয়, তবু জ্ঞানদা 
একটু সাবধান থাকতে চান। অনেক সাধ্যসাধনা করে বাবামশায়ের কাছ থেকে 
বিলেত যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেছে, তিনি আবার রুষ্ট না হন! 

ডিনারের পর ডেকের ওপর শুরু হল বাজনার তালে তালে ইংরেজ 
নারীপুরুষের জোড়ায় জোড়ায় বলনৃত্য। এক সাহেব জ্ঞানদার হাত ধরে নাচের 
জন্য টানাটানি করতে থাকে। জ্ঞানদা এতে খুব একটা অনভ্যস্ত নন, বোম্বাই 
আমেদাবাদে থাকাকালীন ম্যাকগ্রেরের পাল্লায় পড়ে অনেকবার নাচে অংশ 
নিতে হয়েছে তাকে। কিন্তু অপরিচিত কারও সঙ্গে নাচার প্রশ্ন ওঠে না, তিনি 
মৃদু হাসিতে প্রত্যাখ্যান করলেন। সুরেন আর বিবি দু'জন দু'জনের পার্টনার 
হয়ে ডান্স করছিল। বিবির পাকা হাবভাব দেখে জ্ঞানদার মজা লাগে, সেই 
রাত্রে অল্প ওয়াইন পান করতে করতে তিনি নাচগান উপভোগ করলেন। 
পরদিন সকাল থেকে শুরু হল জ্বর বমি মাথা ঘোরা। সত্যেন তাকে সাবধান 
করে দিয়েছিলেন, তবু এত তাড়াতাড়ি সি সিকনেস দেখা দেবে তা বোঝেননি 
জ্ঞানদা। চাকরদুটো এ যাত্রায় খুব সেবা করল। 
১৪০ 


কলকাতার বাবুমহল অবশ্য ঘটনাটাকে বিশেষ সুনজরে দেখলেন না। 
স্ত্রীস্বাধীনতার এহেন বাড়াবাড়ি করে সিভিলিয়ান সত্যেনবাবু নিজের 
বউকে মাথায় তুলছেন আর অন্য মেয়েবউদের গোল্লায় যাওয়ার পথ 
প্রশস্ত করছেন। ঘরকন্না না সামলে মেয়ে-বউরা সবাই এখন কালাপানি 
পেরতে চাইলে বাঙালির সংসার লাটে উঠবে। সমাচার চন্দ্রিকা তো স্পষ্টই 
সমালোচনার সুরে লিখেছে, “আমাদেবাদের [আমেদাবাদের] সিবিল এবং 
সেসন জজ বাবু সত্য্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী নিজ পুত্র কন্যাদিগের সহিত 
লিবারপুলে পৌঁছিয়াছেন। সন্তানদিগকে বিলাতে রাখিয়া শিক্ষা দেওয়াই 
গমনের উদ্দেশ্য।__ কালেকালে কত কি হবে, 

ওই বছরে শীতে দেবেন ঠাকুর জামাই সারদাপ্রসাদকে সঙ্গে নিয়ে 
চিনভ্রমণে গেলেন। 

আর বধায় জ্যোতি ও কাদন্বরী হাওয়া বদলাতে এলেন শ্রীরামপুরের 
গঙ্গার ধারে বাগান-বাড়িতে। অবধারিতভাবেই তাদের সঙ্গী হলেন রবি। 
জোড়ারসীকোর দেওয়ালের বাইরে খোলা প্রকৃতির মাঝখানে গঙ্গাতীরে 
নতুনবউঠানের সঙ্গে দিন কাটাতে কাটাতে তার মালতীপূরঁথির পাতা ভরে 
উঠল। নৌকোর ওপর বসে লিখে ফেললেন, “শৈশব সঙ্গীত'। 

নতুন বার জলধারা রবির মনে আনন্দের স্রোত নামায়। স্রোতের ওপর 
ভেসে বেড়ানো মেঘের ছায়া রবির মনে তীব্র প্রণয়াকাঙক্ষা জাগিয়ে তোলে। 
কিন্তু কার প্রতি £ কাকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখবেন রবি? চোখ বুজলেই 
সামনে ভেসে ওঠে এক অনিন্দ্যসুন্দর মুখ, সে মুখ হেকেটি ঠাকরুনের। এ 
কী সবনাশ হল তীর! 

ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গঙ্গার ধারে এসে বসেন রবি। বৃষ্টি পড়ছে। তার 
শরীর আনচান, চোখ দিয়ে জলধারা গড়িয়ে নেমে আসে। গলা থেকে বেরিয়ে 
আসে বিদ্যাপতির পদ, “ এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মোর... 

সামনে জেলেনৌকোগুলির আবছা চলাচল। পেছনে বাগানে রান্নার 
তোড়জোড়। নতুনবউঠান আজ বাগানে রান্না করবেন, বেশ পিকনিকের 
মতো। রবি, রবি বলে তার ডাক ভেসে আসছে বাগান থেকে। বোধহয় 
জলখাবারের আহ্ান। রবির হৃদয় চলকে ওঠে। আবার নিজেকে শাসন 
করেন তিনি। এটা ঠিক হচ্ছে না, হৃদয় সামলাতে না পারলে নতুনবউঠানের 
সামনে বড় লজ্জায় পড়তে হবে। আর জ্যোতিদাদাই বা কী ভাববেন? ওরা 

১৪১ 


তাকে নিয়ে হাসাহাসি করলেও সহ্য হবে না রবির। আবেগ লুকোনোর ঢাল 
হিসেবে সংগীতের জুড়ি নেই, রবি বিদ্যাপতির পদটি নিজের মতো গুনগুন 
করতে করতে বাগানে এসে বসলেন। 

বকুলগাছতলায় ইটের উনোন জ্বলছে। চারদিকে হাতা, খুস্তি, মশলা, 
তরকারিপাতি ছড়ানো। দাসীরা জোগান দিচ্ছে, কুটনো কাটছে, হলুদ বাটছে 
বিরাট শিলনোড়ায়। টুলে বসে তদারকিতে ব্যস্ত কাদন্বরী। 

একটু পাশেই পাতা হয়েছে বেতের চেয়ার টেবিল। সেখানে জলখাবারের 
ফল মিষ্টি সাজানো। একটি চেয়ারে সম্রাটের মতো বসে আছেন জ্যোতি, 
তার গায়ে ঢোলা মলমল পাজামার ওপর লখনউ চিকনের লম্বা আকাশনীল 
চাপকান। কাধে একটি উড়নি পাট করে রাখা। 

জ্যোতির রূপের খ্যাতি অনেকদিনের। ছাত্রবয়সে তিনি যখন গাড়ির 
অপেক্ষায় প্রেসিডেন্সি কলেজের সিঁড়ির ওপর দাড়িয়ে থাকতেন, তাকে 
দেখতে ভিড় জমে যেত। কয়েক বছরের ছোট রসরাজ অমৃতলাল গল্প করেন, 
থাকতেন গ্রিক সৌন্দর্যের সেই প্রতিমৃততির দিকে। রবির কাছেও সৌন্দধ, 
সাহিত্য, সংগীতে জ্যোতিদাদাই আদন্শ্‌!, 

রবি জানতে চান, কলকাতায় যাচ্ছ নাকি জ্যোতিদাদা? এত সকালে? 

সে-কথার উত্তর না দিয়ে জ্যোতি আঙুরের রসে চুমুক দেন। বলেন, কী 
গাইছিলি, জোর গলায় গা তো! চেনা চেনা লাগছিল সুরটা? আবার একটু 
অচেনা যেন? বিদ্যাপতি? 
মতো করে নিয়েছি। তাই চিনতে গ্রারছ না। রবি আবার গানটা ধরে। 

মাথার ওপর ঠাদোয়া, বাইরে বৃষ্টি। বিদ্যাপতির পদে পরিবেশ হয়ে ওঠে 
মেঘমন্দ্রিত। রবির গানে গলা মেলালেন জ্যোতিরিন্দ্র আর আবেশে চোখ বন্ধ 
করে কাদম্বরী শুনতে থাকেন। 

রবির ফলের রস খেতে ইচ্ছে করে না, এই ভরা বাদরে কফির পেয়ালার 
দিকে হাত বাড়ান তিনি। তার চুলে বৃষ্টি লাগা, গায়ের মেরজাই আধভেজা। 
চোখে সবনাশ। 

কাদম্বরী হা হা করে ওঠেন, আরে পাগল, আগে তো কিছু খাবার মুখে 
দাও। 
১৪২ 


খেতে ইচ্ছে করছে না বোঠান, রবির চোখের দিকে তাকিয়ে কাদন্বরীর মনে 
হয় যেন কালবৈশাখীর আভাস। কয়েকদিন ধরেই রবির মনের অশান্তভাব 
লক্ষ করেছেন তিনি। তার বুক গুরুগুর করে অজানা শঙ্কায়। কী হয়েছে ওর, 
সামলাতে পারবেন তো রবিকে! 

মনের কথা বুঝতে না দিয়ে তিনি বলেন, এমন কিছু ভাল গাওনি। নেহাত 
বৃষ্টির দিন বলে তোমার জ্যোতিদাদার পছন্দ হয়েছে। 

রবি বোঝে না কেন কিছুতেই খুশি হন না কাদন্বরী ঠাকরুন। বিশেষ করে 
রবির কোনও গুণ যেন ওর চোখে পড়ে না। ঝগড়ার সুরে রবি বললেন, 
জ্যোতিদাদা ভাল বললে তুমি আমাকে হিংসে করো বউঠান, তাই প্রশংসা 
করতে চাও না। 

জ্যোতি হাসেন, আঃ, কী ছেলেমানুষের মতো ঝগড়া কর না তোমরা! 
আরেকটা গান কর রবি। তোর গান দিয়ে দিনটা শুরু করলাম আজ, দেখি 
রিহার্সালটা জমে কিনা। 

নাটক নেমে গেছে, সবাই ভাল বলছে, তবু এত রিহার্সালে যাওয়ার কী 
দরকার তোমার? কাদন্বরী ঠোট ফোলান, এমন বাদলাদিনে জমিয়ে খিচুড়ি 
মাছভাজা আর গান হতে পারত। আজ না গেলেই নয়! 

জ্যাতি বলেন, আমার না গেলে চলে না বউ, ওরা অপেক্ষা করবে। আমি 
এখন রবির সঙ্গে গান কবিতা কর। 

কে অপেক্ষা করবে, বিনোদিনী? কাদন্বরী নাছোড় জানতে চান। তীব্রচোখে 
তাকিয়ে থাকেন জ্যোতির দিকে। 

তুমি বড় সন্দেহপ্রবণ, বিরক্ত জ্যোতি উঠে দাড়ান। আমাকে নস্টার স্টিমার 
ধরতে হবে, রবি তোর বউঠানকে দেখিস। 

জ্যোতি চলে যান, কাদন্বরী মুখ গোমড়া করে বসে থাকেন। সেদিকে 
তাকিয়ে রবি ভাবেন এই নারীটি যে আমার সামনে বসে খাওয়ায়, ঝগড়া 
করে, স্বামীর জন্য অভিমান করে সে নতুনবউঠান। আর আমার মনের ভেতরে 
যিনি ঢুকে বসে জ্বালাচ্ছেন, কারও বউ নন, বউঠান নন, সেই রহস্যময়ীটি 
হেকেটি ঠাকরুন। তিনিই আমার কবিতার বিয়াত্রিচে। 

হে আমার বিয়াত্রিচে, জ্যোতি যখন অস্তমিত, এই উদীয়মান ভানুর দিকে 
একটু মনোযোগ দাও, গোমড়ামুখো কাদন্বরীর দৃষ্টি আকধণ করতে চান রবি। 


১৪৩ 


কাদম্বরী বলেন, সবসময় ইয়ারকি ভাল লাগে না রবি। দেখছ না তোমার 
নতুনদাদা কেমন রঙ্গমঞ্ধচের অভিনেত্রীদের দিকে ধেয়ে চলেছেন। এমন বরষাদিনে 
আমাকে রেখে চলে গেলেন, তা হলে তো কলকাতাতেই থাকলে হত। 

না বউঠান, এই নদীতীর তোমার মতো স্বামী-বিরহিণীর পক্ষেও মনোরম। 
রবি বলেন, উনি চলে গেলেন, কিন্তু তোমার নদী আছে, বাগান আছে, 
হরিণশিশু আছে, রূপকুমারী আছে আর ও দুটি চোখের একটু কৃপাদৃষ্টির 
আশায় পায়ের তলায় চাতকের মতো বসে আছি আমি। . 

কীসে আর কীসে, জ্বলন্ত কটাক্ষ করেন কাদন্বরী, তুমি কি নিজেকে তোমার 
নতুনদাদার সঙ্গে তুলনা কর? আমি তো তোমার কোনও রূপগুণ দেখি না 
এখনও। তুমি নিতান্ত একটি সতেরো বছরের শিশু। 

রবির নবজাগ্রত পৌরুষে ঘা লাগে। চোখের কোনায় জল চিকচিক করে 
ওঠে। জ্যোতিদাদা আমার কতখানি জুড়ে আছেন সে আমিই জানি, কিন্তু তুমি 
যে আমার প্রিয়তর। তোমার কৃপাপ্রত্যাশী বলে এমন করে কি আঘাত দিতে 
হয়, হেকেটি ঠাকরুন! 

দেখো, আবার কাদছ বাচ্চাদের মতো! আমি যখন রেশে থাকি তখন 
আমাকে বিরক্ত কোরো না তো রবি ঠাকুরপো! কাদন্বরী ঘরের দিকে উঠে 
যান। 

বিষগ্ন রবি বসে থাকেন। ভগ্রহৃদয়ের এই বেদনা কাকেই বা বলবেন। প্রায় 
সমবয়সি নতুনবউঠানের চোখে তিনি এখনও কিশোর, অথচ কিশোরের 
শরীর মন জেগে উঠছে সে-খবর তিনি রাখেন না। কেনই বা রাখবেন, তার 
টেনে স্বগতোক্তির মতো দু'-চারটি লাইন নাড়াচাড়া করেন, 


“জানিতেম ওশো সখী, কাদিলে মমতা পাব, 
কাদিলে বিরক্ত হবে একি নিদারুণ? 
চরণে ধরি গো সখী, একটু করিও দয়া 
নহিলে নিভিবে কিসে বুকের আগুন 


আবার যেদিন কাদন্বরীর মেজাজ ভাল থাকে সেদিন যেন স্বপ্নের মতো 
পরিবেশ রচিত হয়। সে-সব দিনে জ্যোতন্নারাতে নদীর সামনে বসেন তিনজন। 


১৯৪৪ 


জ্যোতির গানে রবির কবিতায় যেন গন্ধবরা নেমে আসেন। টাদপরির মতো 
দু'জনের মাঝখানে ঘুরে বেড়ান কাদন্বরী। এক-এক দিন কলকাতা থেকে চলে 
আসেন সন্ত্রীক অক্ষয়চন্দ্র। তীর স্ত্রী শরৎকুমারী কিছুদিন হল লাহোর থেকে 
এসেছেন। ঠাকুরবাড়িতেও একজন শরৎকুমারী আছেন, তাই রবি তাকে মজা 
করে ডাকেন লাহোরিণী। 

একদিন অক্ষয়ের কাছে ইংরেজ বালক কবি চ্যাটারটনের গল্প শুনছিলেন 
রবি। চ্যাটারটন প্রাচীন কবিদের নকল করে এমন কবিতা লেখেন যে কেউ 
ধরতে পারেনি। অবশেষে ষোলো বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করে বিখ্যাত 
হন। রবি শুনে রোমাঞ্চিত হয়ে ভাবলেন, তিনিও বিদ্যাপতি চস্তীদাসের 
নকলে কবিতা লিখবেন। 

বাগানে বসে জলম্োতের মতো লিখতে শুরু করলেন ভানুসিংহের 
কবিতা। বন্ধুদের বললেন, লাইব্রেরি থেকে বহু প্রাচীন এক কবির পুথি উদ্ধার 
করেছেন, কবির নাম ভানুসিংহ। বন্ধুরাও শুনে উত্তেজিত, এমন কবিতা 
বিদ্যাপতি চণ্তীদাসের হাত দিয়েও বেরোয়নি! পরে অবশ্য আসল কবির 
পরিচয় পেয়ে তারা ঢোক গিলতে বাধ্য হলেন। 

জ্যোতি তখন অশ্রমতী নাটকটি লিখছিলেন। ভানুসিংহের প্রথম পদটিই 
তার এত পছন্দ হল যে মঞ্চাভিনয়ের সময় নাটকে এটি গান হিসেবে জুড়ে 
দেবেন ঠিক করলেন। পদটি ছিল-_ 


'গহন কুসুম কুপ্জী মাঝে মৃদুল মধুর বংশী বাজে 
বিসরি ত্রাস লোকলাজে সজনি, আও, আও লো।' 


মোরান সাহেবের বাগানে কোনও কোনও নির্জন দুপুরে রবি আর 
কাদম্বরী তেতুলের আচার খেতে খেতে বাগানের দোলনায় আড্ডা দেন। 
কাদ্ধরী সেদিন বেশ সেজেছেন, গায়ে হাল ফ্যাশানের লেস দেওয়া বহুবণ 
জ্যাকেটের সঙ্গে নীলাম্বরী শাড়ি। কিন্তু ওই জ্যাকেট বস্তুটি কোনওদিন পছন্দ 
হয় না রবির। 

তিনি বোঠানের গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধান, এটা কি একটা ড্রেস, না উমেশ 
দরজির সেলাই করা ঢাকনি? যত রাজ্যের জলের দরে কিনে আনা ঝড়তি 
পড়তি রেশমি ছিটকাপড় জুড়ে দরজিরা যা তৈরি করে দেয় তাই আদর 


১৪৫ 


করে গায়ে তোল তোমরা, আবার নাম দেওয়া হয়েছে জ্যাকেট! এর চেয়ে 
সেকেলে সাদা কালোপেড়ে ঢাকাই শাড়ি পরলে ঢের বেশি মানাত! 

আহা রে, তুমি ফ্যাশানের কী বোঝ হে বালক? কাদন্বরীও ছাড়বেন না, 
জানো আমি নিজে সব ডিজাইন এঁকে দরজি দিয়ে করিয়েছি? আর দেখো, 
জ্যাকেটের বর্ডারের এই এমব্রয়ডারিটাও আমার করা। 

ওঃ, ভারী তো এমব্রয়ডারি, জ্যাকেটে নকশা তোলা তো ফাঁকিবাজি। 
এমব্রয়ডারি করে দেখাও, তো বুঝি! 

ইস! কী আবদার! কাদম্বরী হাতের একটি এমতব্রয়ডারির ফ্রেম দেখিয়ে 
বললেন, এই দেখো কী সেলাই করছি এটা। সাধের আসন। 
কাটতে কাটতে রবি জানতে চান। 

কাদন্বরীর ঠোটে মোনালিসার হাসি, বলেন, এটা কবি বিহারীলালের জন্য 
আমার উপহার, তার কবিতার চারটে পঞ্্‌ক্তি এমব্রয়ডারি করে বুনে দিচ্ছি 
সাধের আসনে। 

রবির শ্লান মুখের দিকে তাকিয়ে সাস্ত্বনা দেন, যেদিন বিহারীলালের মতো 
কবিতা লিখতে পারবে, সেদিন তোমার পাওনা হবে এরকম উপহার। 

রবি কাদম্বরীর কথায় কান না দেওয়ার জন্য কবিতার খাতায় মন দিলেন। 
জ্যোতি বাগানে এসে দেখলেন বকুলগাছে বাধা দোলনায় গুনগুন করতে 
করতে দোল খাচ্ছেন কাদম্বরী আর তার পায়ের কাছে মাদুরের ওপর উপুড় 
হয়ে শুয়ে রবি লিখছেন নতুন কবিতা, 


“একদিন মনে পড়ে, য্াহা-তাহা গাইতাম 
সকলি তোমারি সখি লাগিত গো ভাল 
নীরবে শুনিতে তুমি, সমুখে বহিত নদী 
মাথায় ঢালিত চাদ পুণিমার আলো। 
সুখের স্বপনসম, সে দিন গেল গো চলি 
অভাগা অদৃষ্টে হায় এ জন্মের তরে 
আমার মনের গান মন্মের রোদনধবনি 
স্পর্শও করে না আজ তোমার অন্তরে। 


১৯৪৬ 


তবুও-_ তবুও সখি তোমারেই শুনাইব 
তোমারেই দিব সখি যা আছে আমার। 

দিনু যা মনের সাথে, তুলিয়া লও তা হাতে 
ভগ্রহদয়ের এই প্রীতি উপহার।, 


কবিতাটি লিখতে লিখতেই রবি ঠিক করে ফেলেন এটি হবে তার আগামী 
বইয়ের উৎসর্গ কবিতা। এখনি পড়াতে হবে জ্যোতিদাদাকে আর দোলনায় 
দুলত্ত ওই নিষ্ঠুরা মানবীকেই তিনি সব লেখা উৎসর্ম করবেন। রবি ভাবেন, 
তবু কি নিভবে তার বুকের আগুন? 


রবির মনের এই টানাপোড়েনের মাঝখানেই সত্যেন বিলেত যাওয়ার সব 
ঠিকঠাক করে ফেললেন। জ্ঞানদা ইতিমধ্যে ছেলেমেয়েদের নিয়ে লন্ডনের 
পাশে সমুদ্রতীরের ব্রাইটন শহরে গুছিয়ে সংসার করছেন। কয়েকমাসের 
মধ্যেই রবিকে নিয়ে সেখানে যাবেন সত্যেন। রবির বিদ্যালয়-বিমুখ চঞ্চল 
মনকে বাগে আনতে হলে বিলেত ঘুরিয়ে আনা দরকার। 

তার আগে ইংরেজি কেতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য রবিকে কিছুদিন 
সত্যেনের কর্মস্থল শাহীবাগ ও বোম্বাইয়ের পাগুরং পরিবারে থাকতে হল। 
ওই পরিবারের মধ্যে নাকি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আশ্চ্ মিলমিশ হয়েছে, 
দেশের মেয়েদের মধ্যে বিলেতের আদবকায়দা শেখার একটি পথ হবে 
ওদের সঙ্গে মেলামেশা। এসবই সত্যেনের সিদ্ধান্ত। 

রবির মনে হয় তাকে যেন শিকড়সুদ্ধ উপড়ে আনা হয়েছে এক খেত থেকে 
অন্য খেতে। নতুন পরিবেশে সব কিছুতেই লঙ্জী। অচেনা লোকের সঙ্গে আলাপ 
হলে কী বলবেন, কী করবেন ভেবে পান না। ইংরেজি বলার অভ্যেস নেই। 

আনা কিন্তু সত্যিই অবাক করল রবিকে । অচেনাকে আপন করে নিতে তাঁর 
জুড়ি নেই। বয়সে ষোড়শী, ইতিমধ্যেই বিলেত থেকে ঘষেমেজে এনেছেন 
শিক্ষার পালিশ। সমবয়সি রবিকে আন্না কবি হিসেবে যেরকম আস্তরিক 
সমাদরে গ্রহণ করলেন তা আগে কেউ করেনি। 

আনার মতো মেয়ে সত্যিই আগে দেখেননি রবি। বাঙালিঘরের রীতিনিয়মে 
মেয়েরা যেন জড়সড় হয়ে থাকে। এমনকী ঠাকুরবাড়ির আলোমাখা মেয়েরাও 
এত সহজে বাইরের পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন না। স্মার্ট ছটফটে আনাকে 


১৪৭ 


প্রথম প্রথম একটু গায়ে পড়া মনে করে সংকুচিত ছিলেন রবি। কিন্তু ক্রমশ 
আড় ভাঙল। আনার সপ্রতিভতার সামনে বড়াই করার মতো একটি গুণই 
মনে হল তার। প্রতিদিন সকাল বিকেল আনার কাজ রবিকে ইংরেজি সাহিত্য 
পড়ানো। কিন্তু তার বদলে বেশিরভাগ দিন রবিই তাঁকে নিজের বাংলা কবিতা 
শোনান। আনাও সোৎসাহে রবির গা ঘেঁসে বসে কাব্যের মানে বুঝে নেন। 

এত কাছে অনাত্মীয়া তরুণীটিকে পেয়ে বুক দুর দূর করে রবির। তীর 
শরীরের মাদক গন্ধের সঙ্গে ভেসে আসা পারফিউম রবিকে এলোমেলো 
করে দেয়। 

আনা একদিন বললেন, তোমার মুখে কোনওদিন দাড়ি রাখতে পারবে না, 
আমাকে কথা দাও। এত সুপুরুষ মুখশ্রী নষ্ট কোরো না খবরদার। 

রবির শিহরন হয়, এই প্রথম নিজের চেহারার তারিফ শুনলেন তিনি। 
এতদিন নতুনবউঠানের গঞ্জনা শুনে শুনে চেহারার সাধারণত্ব সন্বন্ধে তার 
ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। এবার তিনি আনার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন। 
বলেন, কেন আনা, দাড়ি খারাপ কীসে? 

দাড়ি খারাপ না! হেসে লুটিয়ে পড়েন আনা, দাড়ি থাকলে মেয়েরা 
তোমাকে চুমু খেতে দেবে না। তোমার মুখের সীমানা যেন কোনওদিন 
দাড়িতে ঢাকা না পড়ে৷ 

রবি দেখলেন, আনার মুখ কৌতুকে উজ্জ্বল, চোখে রহস্যের ইশারা। ও 
কেন চুমুর কথা বলল? এর কি কোনও মানে আছে? রবির কী করা উচিত? 
রবির বিহুল লাগে৷ 

আনা আবার জানতে চান, তুমি কি কোনও মেয়েকে চুমু খেয়েছ? চুমু 
খেতে না শিখলে কবিতা লিখবে কী কুরে রবি? ও কী, ব্লাশ করছ কেন? 
কাম অন ইয়ং ম্যান, পুরুষ কি ব্লাশ করে? 

অপ্রস্তত রবি কবিতার খাতায় ফিরে যেতে চান। 

আনা শুনতে চান প্রেমের গান। রবির হাত ধরে বললেন, কবি, তোমার 
গান আমাকে মৃত্যুশয্যা থেকে টেনে তুলতে পারে। কী অপুব তোমার গান! 

রবির মনে পড়ে তার গান শুনে নতুনবউঠান কেমন তাচ্ছিল্য কবেন। 
শুধু জ্যোতিদাদার উৎসাহে এতদিন গান গেয়ে চলছিলেন তিনি। আনা, তুমি 
আমার জ্যোতিদাদার গান শুনেছিলে? 


১৪৮ 


আনা বলেন, হ্যা, জ্যোতি ঠাকুরও খুব সুন্দর গাইতেন। কিন্তু তুমি যখন 
গান কর আমার শরীরে পদ্মকাটা ফুটে ওঠে। 

রবির এবার বোল ফোটে, বলেন, আনা তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর 
মেয়ে! তোমার দেহ সুন্দর, মন সুন্দর, ভাষা সুন্দর। তুমিই আমার গানকে 
সুন্দর করেছ আনা। 

তুমি আমাকে একটা নাম দেবে কবি? রবির সামনে অঞ্জলি পেতে আনা 
বলেন, সবাই যে নামে ডাকে তুমি সেটায় ডাকবে না। তোমার গান থেকে, 
কবিতা থেকে একটা নাম দাও। 
ভোরে তুমি যখন ঘুমিয়ে থাকবে, তোমার জানলার কাছে গিয়ে নতুন নামে 
(ডেকে ঘুম ভাঙাব আমি। 

আনন্দে উচ্ছল হয়ে ঘুমোতে যান আনা। রবির চোখে ঘুম আসে না। 
ষাকে ছেড়ে এসেও দিনরাত মনে পড়ে, তিনি রবির ব্যাকুলতাকে পাত্তা 
দেননি। আর এখন এই ব্যাকুল নবযুবতীকে নিয়ে রবি কী করবেন £ কী নামে 
ডাকবেন তাকে? কীভাবে ভাঙাবেন তার ঘুম £ 

রবি আনার জন্য নাম ঠিক করলেন, “নলিনী”। ওই নাম নিয়ে সারারাত 
ধরে গানটি রচনা করলেন। না ঘুমিয়ে ভোরবেলা সুধের আলো ফোটার 
আগে বাগানে চলে এলেন। হাতে একগুচ্ছ বকুলফুল কুড়িয়ে আনার জানল। 
দিয়ে ঘরে ছড়িয়ে দিয়ে গান ধরলেন, 


“উঠ নলিনী, খোল গো আঁখি ঘুম এখনো ভাঙিল ন। কি' 


ভোরবেলার এই গানের প্রতীক্ষায় আনাও জেগে ঘুমিয়ে ছিলেন সারাটি 
রাত। জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন রবির দিকে, আনার চাপার কলির 
মতো আউুলগুলি মিশে গেল রবির কম্পমান হাতে। 
একমাস সময় বড় তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে আসছে। রবি আনাকে গান 
শোনান, ভারতীর পৃষ্ঠা থেকে কবিকাহিনীর কবিতা শোনান আর আনা মুগ্ধ 
চোখে কাব্যসুরা পান করেন। কিছু একটা ঘটছে, রবি বুঝতে পারেন। কিন্তু 
কিছুতেই এগোতে পারেন না নিজে থেকে। 
রবি যত ইংরেজি শিখলেন তার চেয়ে বেশি বাংলা শিখে ফেললেন আনা। 
১৪৯ 


তিনি এখন ভারতী পড়তে পারেন। রবি ঠিক করলেন ভারতীর সংখ্যাগুলি 
এই পাঠিকাকেই উপহার দিয়ে যাবেন। 

রবির মনখারাপ লাগছিল বাড়ির জন্য, বাড়ি বলতেই তার মনে ভেসে 
ওঠে কাদন্বরীর মুখ। সেই গঙ্গাতীর তেমনি আছে, পাখিরা তেমনি ডাকছে, 
শুধু রবি সেখানে অনুপস্থিত। ডানা থাকলে উকি দিয়ে দেখে আসতেন কী 
হচ্ছে সেখানে। 

পেছন থেকে এসে চোখ টিপে ধরেন আনা। বলেন, কী এত ভাব 
আকাশপাতাল? 

রবি ভাবেন আজ আবার কী কাণ্ড বাধাবেন আনা কে জানে £ মনে নিশ্চয় 
কোনও মতলব আছে। এই চঞ্চলা মেয়েটিকে রবির ভাল লাগে আবার ভয়ও 
পান। চেনা জীবনের মাঝে কোনও অচেনা মহল থেকে উড়ে আসা আনাবাই 
যেন আপন মানুষের দৃতী, হৃদয়ের সীমানা বাড়িয়ে দিচ্ছে ক্রমশই। যে- 
কোনও মেয়ের কাছ থেকে পাওয়া সহ, প্রীতি, প্রেম যেন জীবনের ওপর 
ঝরে পড়া প্রসাদ। যাকে ফেভার বলা যায় ইংরেজিতে। মেয়েদের ভালবাসা 
তা যেরকমই হোক, রবির মনে যেন না-ফোটা ফুল ফুটিয়ে রাখে। সেই ফুল 
ঝরে গেলেও গন্ধ মেলায় না। এই যে নলিনী-্না ডাকতেই কাছে আসে, রবি 
ভাবেন, একদিন হয়তো ডেকেও পাওয়া যাবে না তাকে। তবু তার আহ্থানে 
সাড়া দিতে সাহস হয় না। ডুবতে ভয় পান রবি। 

উত্তর না পেয়ে রবির গা ঘেঁসে নেয়ারের খাটে বসে পড়েন আনা। রবির 
জেতে টাগ অফ ওয়ারে! 

কেন যে এই খেলাটাই খেলতে হবে &রাঝেন না রবি। খেলা শুরু হতে 
না হতেই শক্তি পরীক্ষায় হেরে গিয়ে আনা এসে পড়লেন রবির কোলে। 
তারপর শুরু হল রবির গলা জড়িয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা। ঠোটের এত 
কাছে ঠোট নিয়ে আসেন আনা, তবু কি একবার চুমু খেতে পারে না রবি 
আনা ভাবেন, হাদা একেবারে! কোনও রসকষ নেই! আনার একটু প্রসাদ 
পাওয়ার আশায় কত ছেলে পেছন পেছন ঘুরছে, আর এই কিশোর কবির 
কাছে তার মোহিনীশক্তির কোনও মর্যাদাই নেই! রবি কি জানে না কবির 
হৃদয়েশ্বরী হওয়ার জন্য কত প্রণয়ীকে উপেক্ষা করছেন আনা! স্বয়মাগতা 


৯৫০ 


হয়ে ওঠেন! অথচ রবির ব্যাকুল মনে অন্য এক রহস্যময়ীর ছায়া। 

শেষে একদিন মরিয়া হয়ে আনা বললেন, জানো কোনও মেয়ে ঘুমিয়ে 
লেসের বিলিতি গাউন পরা আনাকে এঞ্জেলের মতো পবিত্র দেখায়। অথচ 
মুখ দুষ্টু হাসিতে ভরপুর। 

রবি তো কিছুই বোঝেন না, কখন যে কী বলে মেয়েটা। এই প্যাচপেচে 
ভাদ্রের গরমে দস্তানার কথা আসেই বা কেন! অবাক হয়ে জানতে চান, কী 
হয়? কী আবার হবে দস্তানা চুরি করলে? চোর ধরা পড়লে মেয়ের লাবার 
হাতে পিট্রি খাবে। 

ধুর বোকা, আনা রবির গালে টোকা দিয়ে কানে কানে বলেন, ঘুম ভাঙিয়ে 
মেয়েটিকে চুমু খাওয়ার অধিকার জন্মায় তার। আনার প্রগলভ উসকানিতে 
কান গরম হয়ে ওঠে রবির। 

এমন আজব নিয়ম কোন শাস্ত্রে বা লেখা আছে, আর কেনই বা এমন 
করে তাকে চোরা ঘূর্ণিতে টানছে আনা? রবি অন্য গল্প শোনান, গ্যেটের 
গল্পটা জানো তো নলিনী, যুরোপে একরকম তাস খেলায় মহিলাদের কাছে 
পুরুষ হেরে গেলে চুম্বন দণ্ড দিতে হয়। গ্যেটে এই খেলাটা খেলতেন কিন্তু 
হেরে গেলে চুম্বনের পরিবর্তে মহিলাদের কবিতা উপহার দিতেন। তুমি বলো, 
চুন্ধনের চেয়ে কবির কবিতা কি অনেক লোভনীয় উপহার নাঃ 

আনার মোটেই পছন্দ হয় না গল্পটা। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, চুম্বন ছাড়া 
কবিতা লেখা যায় না। কিন্তু কবিতা না থাকলেও চুম্বন থাকবে। বলেই আনা 
টুপ করে রবির বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। 

ঘুমন্ত আনার দিকে তাকিয়ে থাকেন বিস্মিত রবি। পাশেই পড়ে আছে 
খুলে রাখা আনার দস্তানা। ভাবেন, তার কী করণীয়? আনা কিছু কি ইঙ্গিত 
করছে? কিন্তু রবির দ্বিধা কাটে না, দস্তানার দিকে হাত বাড়িয়েও আবার 
গুটিয়ে নেন। না, রবি কিছুতেই পারবেন না আনাকে চুমু খেতে। অনিবাধ 
নিয়তির মতো তার মনে পড়ে যাচ্ছে কাদম্বরীর মুখ। 

ঘুমপরিকে ফেলে রেখে চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে যান রবি। চুন্বন নয়, 
আনার জন্য তার মাথায় ভেসে বেড়ায় কবিতার লাইন, 


৯৫১ 


“শুনেছি শুনেছি কি নাম তাহার 
শুনেছি শুনেছি তাহা 

নলিনী নলিনী নলিনী নলিনী 
কেমন মধুর আহা! 


ভারতবর্ষের সমুদ্রসীমা ও আনার দুরন্ত অভিমানকে পেছনে ফেলে ১৮৭৮ 
সালের ২০ সেপ্টেম্বর সত্যেনের সঙ্গে বিলেতের জাহাজে চাপলেন রবি। 
জাহাজে তার প্রধান কাজ দেখা আর লেখা । কখনও কবিতা লিখছেন, কখনও 
চিঠি। সাতদিন ধরে সবচেয়ে বড় চিঠিটিই লিখলেন নতুনবউঠানকে__ 
ছেড়ে দিলে। আমরা তখন জাহাজের ছাতে দাড়িয়ে। আস্তে আস্তে আমাদের 
চোখের সামনে ভারতবষের শেষ তটরেখা মিলিয়ে গেল। চারি দিকের 
লোকের কোলাহল সইতে না পেরে আমি আমার নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে 
পড়লেম। গোপন করবার বিশেষ প্রয়োজন দেখছি নে, আমার মনটা কেমন 
নিজীব, অবসন্ন, ভ্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিল, কিন্তু দূর হোক গে-_ ও-সব 
করুণরসাত্মক কথা লেখবার অবসরও নেই ইচ্ছেও নেই; আর লিখলেও, হয় 
তোমার চোখের জল থাকবে না, নয় তোমাবু.ধৈষ থাকবে না। 

সমুদ্রের পায়ে দণ্ডবৎ। ২০শে থেকে ২৬শে পর্স্ত যে করে কাটিয়েছি 
তা আমিই জানি। সমুদ্রপীড়া কাকে বলে অবিশ্যি জান কিন্তু কী রকম তা 
জান না। আমি সেই ব্যামোয় পড়েছিলেম, সে কথা বিস্তারিত করে লিখলে 
পাষাণেরও চোখে জল আসবে। ছটা দিন, মশায়, শয্যা থেকে উঠি নি। যে ঘরে 
তাই চার দিকের জানলা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ। ক্রসৃম্পশ্যরূপ ও অবায়ুস্পশ্যদেহ 
হয়ে ছয়টা দিন কেবল বেঁচে ছিলেম মাত্র। প্রথম দিন সন্ধেবেলায় আমাদের 
একজন সহযাত্রী আমাকে জোর করে বিছানা থেকে উঠিয়ে খাবার টেবিলে 
নিয়ে গেলেন। যখন উঠে দাড়ালেম তখন আমার মাথার ভিতর যা-কিছু আছে 
সবাই মিলে যেন মারামারি কাটাকাটি আর করে দিলে, চোখে দেখতে পাই 
নে, পা চলে না, সবাঙ্গ টলমল করে! দু-পা গিয়েই একটা বেঞ্চিতে গিয়ে 
বসে পড়লেম। আমার সহ্যাত্রীটি আমাকে ধরাধরি করে জাহাজের ডেক-এ 
নিয়ে গেলেন। একটা রেলের উপর ভর দিয়ে দাড়ালেম। তখন অন্ধকার রাত। 


১৯৫২ 


আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন। আমাদের প্রতিকূলে বাতাস বইছে। সেই অন্ধকারের 
মধ্যে সেই নিরাশ্রয় অকুল সমুদ্রে দুই দিকে অগ্নি উৎক্ষিপ্ত করতে করতে 
আমাদের জাহাজ একলা চলেছে; যেখানে চাই সেইদিকেই অন্ধকার, সমুদ্র 
ফুলে ফুলে উঠছে__ সে এক মহা গম্ভীর দৃশ্য।... 

..আমি যখন ঘর থেকে বেরোতে আরম্ত করলেম, তখন জাহাজের 
যাত্রীদের উপর আমার নজর পড়ল ও আমার উপর জাহাজের যাত্রীদের 
নজর পড়ল। আমি স্বভাবতই “লেডি” জাতিকে বড়ো ডরাই। তাদের কাছে 
ঘেঁষতে গেলে এত প্রকার বিপদের সম্ভাবনা যে, চাণক্য পণ্ডিত থাকলে 
লেডিদের কাছ থেকে দশ সহস্র হস্ত দূরে থাকতে পরামশ দিতেন। এক তো 
মনোরাজ্যে নানাপ্রকার শোচনীয় দুর্ঘটনা ঘটবার সম্ভাবনা-_ তা ছাড়া সবদাই 
ভয় হয় পাছে কী কথা বলতে কী কথা বলে ফেলি, আর আমাদের অসহিষ্ণু 
লেডি তাদের আদবকায়দার তিলমাত্র ব্যতিক্রম সইতে না পেরে দারুণ ঘৃণায় 
ও লজ্জায় একেবারে অভিভূত হন। পাছে তাদের গাউনের অরণ্যের মধ্যে 
ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই, পাছে আহারের সময় তাদের মাংস কেটে দিতে হয়, 
পাছে মুরগির মাংস কাটতে গিয়ে নিজের আঙুল কেটে বসি__ এইরকম 
সাত-পাঁচ ভেবে আমি জাহাজের লেডিদের কাছ থেকে অতি দূরে থাকতেম। 
খুঁত করতেন যে, তার মধ্যে অল্পবয়স্কা বা সুশ্রী এক জনও ছিল না।... 

... প্রত্যহ খাবার সময় ঠিক আমার পাশেই ৪-_-বসতেন। তিনি একটি 
ইয়ুরাশীয়। কিন্তু তিনি ইংরেজের মতো শিস দিতে, পকেটে হাত দিয়ে পা 
ফাক করে দাড়াতে সম্পূর্ণরূপে শিখেছেন। তিনি আমাকে বড়োই অনুগ্রহের 
চোখে দেখতেন। একদিন এসে মহাগস্তীর স্বরে বললেন, “ইয়ংম্যান্‌, তুমি 
অক্সফোর্ডে যাচ্ছ? অক্সফোর্ড যুনিভার্সিটি বড়ো ভালো বিদ্যালয়।, আমি 
একদিন ট্রেঞ্চ সাহেবের 2105805 8110 11101716১01? বইখানি পড়ছিলেম, 
তিনি এসে বইটি নিয়ে শিস দিতে দিতে দু-চার পাত উল্টিয়ে পাল্টিয়ে 
বললেন, “হা, ভালো বই বটে।' 

এডেন থেকে সুয়েজে যেতে দিন-পাঁচেক লেগেছিল। যারা ব্রিন্দিসি-পথ 
দিয়ে ইংলন্ডে যায় তাদের জাহাজ থেকে নেবে সুয়েজে রেলওয়ের গাড়িতে উঠে 
আলেকজান্দ্রিয়াতে যেতে হয়__ আলেকজীান্দ্রিয়ার বন্দরে তাদের জনো একটা 
স্টামার অপেক্ষা করে-_ সেই স্টামারে চড়ে ভূমধ্যসাগর পার হয়ে ইটালিতে 


১৫৩ 


পৌঁছতে হয়। আমরা ০%০7%70 ডাঙা-পেরোনো যাত্রী, সুতরাং আমাদের সুয়েজে 
নাবতে হল। আমরা তিনজন বাঙালি ও একজন ইংরেজ একখানি আরব নৌকা 
ভাড়া করলেম। মানুষের “৮7০” মুখশ্রী কতদূর পশুত্বের দিকে নাবতে পারে, 
তা সেই নৌকোর মাঝিটার মুখ দেখলে জানতে পারতে। তার চোখ দুটো যেন 
বাঘের মতো, কালো কুচকুচে রঙ, কপাল নিচু, ঠোট পুরু, সবসুদ্ধ মুখের ভাব 
অতি ভয়ানক। অন্যান্য নৌকোর সঙ্গে দরে বন্ল না, সে একটু কম দামে নিয়ে 
যেতে রাজি হল। ব-_- মহাশয় তো সে নৌকোয় বড়ো সহজে যেতে রাজি 
নন__ তিনি বললেন আরবদের বিশ্বাস করতে নেই-__ ওরা অনায়াসে গলায় 
ছুরি দিতে পারে। তিনি সুয়েজের দুই-একটা ভয়ানক ভয়ানক অরাজকতার গল্প 
করলেন। কিন্তু যা হোক, আমরা সেই নৌকোয় তো উঠলেম। মাঝিরা ভাঙা ভাঙা 
ইংরেজি কয়, ও অল্পস্বল্প ইংরেজি বুঝতে পারে। আমরা তো কতক দূর নিবিবাদে 
গেলেম। আমাদের ইংরেজ যাত্রীটির সুয়েজের পোস্ট আপিসে নাববার দরকার 
ছিল। পোস্ট আপিস অনেক দূর এবং যেতে অনেক বিলম্ব হবে, তাই মাঝি একটু 
আপত্তি করলে; কিন্তু শীঘ্বই সে আপত্তি ভঞ্জন হল। তার পরে আবার কিছু দূরে 
গিয়ে সে জিজ্ঞাসা করলে “পোস্ট আপিসে যেতে হবে কি? সে দুই-এক ঘন্টার 
মধ্যে যাওয়া অসম্ভব।” আমাদের রুক্ষস্বভাব সাহেবটি মহাক্ষাপা হয়ে চেঁচিয়ে 
উঠলেন, “%০এ প্রাথ1077000911” এই তো আমাদ্রের মাঝি রুখে উঠলেন, “৮01? 
10001? 11001)01? ৮0 710101)01, 00111 525 110070া1” আমরা মনে করলুম 
সাহেবটাকে ধরে বুঝি জলে ফেলে দিলে, আবার জিজ্ঞাসা করলে, “ডা 00 
5? (কী বললি?) সাহেব তার রোখ ছাড়লেন না। আবার বললেন, “*০এ 
ঠ2010710110। এই তো আর রক্ষা নেই, মাঝিটা মহা তেড়ে উঠল। সাহেব 
গতিক ভালো নয় দেখে নরম হয়ে বললেন, ১৮০৪ 0017” 999) 10 81100192170 
৬178 ] 58১1 অর্থাৎ তিনি তখন %%1707100ঞ বলাটা যে গালি নয় তাই প্রমাণ 
করতে ব্যন্ত। তখন সে মাঝিটা ইংরেজি ভাষা ছেড়ে ধমক দিয়ে চেচিয়ে উঠল 
“বস- ফুপ'। সাহেব থতমত খেয়ে চুপ করে গেলেন, আর তার বাক্যস্কৃতি হল 
না। আবার খানিক দূর গিয়ে সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন “কতদূর বাকি আছে? 
মাঝি অগ্নিশমা হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "/০ $01]112 21৬৩, 296 ৬01 01920001, 
আমরা এইরকম বুঝে গেলেম যে, দু-শিলিং ভাড়া দিলে সুয়েজ-রাজ্যে এইরকম 
প্রশ্ন জিজ্ঞাসা আইনে নেই! মাঝিটা যখন আমাদের এইরকম ধমক দিচ্ছে তখন 
অন্য অন্য দাড়িদের ভারি আমোদ বোধ হচ্ছে, তারা তো পরস্পর মুখচাওয়াচাওয়ি 


১৫৪ 


করে মুচকি মুচকি হাসি আরম্ভ করলে। মাঝিমহাশয়ের বিষম বদমেজাজ দেখে 
তাদের হাসি সামলানো দায় হয়ে উঠেছিল। একদিকে মাঝি ধমকাচ্ছে, একদিকে 
দাড়িগুলো হাসি জুড়ে দিয়েছে, মাঝিটির উপর প্রতিহিংসা তোলবার আর কোনো 
উপায় না দেখে আমরাও তিনজনে মিলে হাসি জুড়ে দিলেম-__... 

..আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে আমাদের জন্য “মঙ্গোলিয়া” স্টামার অপেক্ষা 
করছিল। এইবার আমরা ভূমধ্যসাগরের বক্ষে আরোহণ করলেম। আমার 
একটু শীত-শীত করতে লাগল। জাহাজে গিয়ে খুব ভালো করে স্নান 
আলেকজান্দ্রিয়া শহর দেখতে গেলেম। জাহাজ থেকে ডাঙা পর্ষস্ত য'বার 
জন্যে একটা নৌকো ভাড়া হল। এখানকার এক-একটা মাঝি সার উইলিয়ম 
জোন্সের দ্বিতীয় সংস্করণ বললেই হয়। তারা গ্রীক ইটালিয়ান ফ্রেঞ্চ ইংরেজি 
প্রভৃতি অনেক ভাবায় চলনসই রকম কথা কইতে পারে।... 

..চার-পাচ দিনে আমরা ইটালিতে গিয়ে পৌঁছিলেম। তখন রাত্রি একটা- 
দ্ুটো হবে। গরম বিছানা ত্যাগ করে জিনিসপত্র নিয়ে আমরা জাহাজের ছাতে 
গিয়ে উঠলেম। জ্যোৎস্সারাত্রি, খুব শীত; আমার গায়ে বড়ো একটা গরম 
কাপড় ছিল না, তাই ভারি শীত করছিল। আমাদের সুমুখে নিস্তব্ধ শহর, 
বাড়িগুলির জানলা দরজা সমস্ত বন্ধ-_ সমস্ত নিদ্রামগ্ন। আমাদের যাত্রীদের 
মধ্যে ভারি গোল পড়ে গেল, কখনো শুনি ট্রেন পাওয়া যাবে, কখনো শুনি 
পাওয়া যাবে না। জিনিসপত্রগুলো নিয়ে কী করা যাবে ভেবে পাওয়া যায় না, 
জাহাজে থাকব কি বেরোব কিছুই স্থির নেই। একজন ইটালিয়ান অফিসার 
এসে আমাদের গুনতে আরম্ভ করলে-__ কিন্তু কেন গুনতে আরম্ভ করলে 
তা ভেবে পাওয়া গেল না। জাহাজের মধ্যে এইরকম একটা অস্ফুট জনশ্রুতি 
প্রচারিত হল যে, এই গণনার সঙ্গে আমাদের ট্রেনে চড়ার একটা বিশেষ 
যোগ আছে। কিন্ত সে-রাত্রে মূলেই ট্রেন পাওয়া গেল না। শোনা গেল, তার 
পরদিন বেলা তিনটের আগে ট্রেন পাওয়া যাবে না। যাত্রীরা মহা বিরক্ত হয়ে 
উঠল। অবশেষে সে-রাত্রে ব্রিন্দিসির হোটেলে আশ্রয় নিতে হল। 

এই তো প্রথম যুরোপের মাটিতে আমার পা পড়ল। কোনো নূতন দেশে 
আসবার আগে আমি তাকে এমন নৃতনতর মনে করে রাখি যে, এসে আর 
তা নূতন বলে মনেই হয় না। যুরোপ আমার তেমন নৃতন মনে হয় নি শুনে 
সকলেই অবাক। 


১৫৫ 


...প্যারিসে পৌঁছিয়েই আমরা একটা টার্কিশ-বাথে” গেলেম। প্রথমত একটা 
খুব গরম ঘরে গিয়ে বসলেম, সে-ঘরে অনেকক্ষণ থাকতে থাকতে কারও কারও 
ঘাম বেরতে লাগল, কিন্তু আমার তো বেরল না, আমাকে তার চেয়ে আর 
একটা গরম ঘরে নিয়ে গেল, সে ঘরটা আগুনের মতো, চোখ মেলে থাকলে 
না, সেখান থেকে বেরিয়ে খুব ঘাম হতে লাগল। তার পরে এক জায়গায় নিয়ে 
গিয়ে আমাকে শুইয়ে দিলে। ভীমকায় এক ব্যক্তি এসে আমার সবাঙ্গ ডলতে 
লাগল। তার সবাঙ্গ খোলা, এমন মাংসপেশল চমত্কার শরীর কখনো দেখি নি। 
'ব্যুটোরক্কো বৃষস্কন্ধঃ শালপ্রাংশুমরহাভুজঃ।” মনে মনে ভাবলেম ক্ষীণকায় এই 
মশকটিকে দলন করার জন্যে এমন প্রকাণ্ড কামানের কোনো আবশ্যক ছিল না। 
সে আমাকে দেখে বললে, আমার শরীর বেশ লম্বা আছে, এখন পাশের দিকে 
বাড়লে আমি একজন সুপুরুষের মধ্যে গণ্য হব; আধ ঘণ্টা ধরে সে আমার সবাঙ্গ 
অবিশ্রান্ত দলন করলে, ভূমিষ্ঠকাল থেকে যত ধুলো মেখেছি, শরীর থেকে 
সব যেন উঠে গেল। যথেষ্টরূপে দলিত করে আমাকে আর-একটি ঘরে নিয়ে 
গেল, সেখানে গরম জল দিয়ে, সাবান দিয়ে, স্পঞ্জ দিয়ে শরীরটা বিলক্ষণ 
করে পরিষ্কার করলে। পরিষ্করণ-পব শেষ হলে আর-একটা ঘরে নিয়ে গেল। 
সেখানে একটা বড়ো পিচকিরি করে গায়ে গরম.জল ঢালতে লাগল, হঠাৎ গরম 
জল দেওয়া বন্ধ করে বরফের মতো ঠাণ্ডা জল বর্ণ করতে লাগল-_ এইরকম 
কখনো গরম কখনো ঠাণ্ডা জলে স্নান করে একটা জলযন্ত্রের মধ্যে গেলেম, তার 
উপর থেকে নীচে থেকে চার পাশ থেকে বাণের মতো জল গায়ে বিধতে থাকে। 
সেই বরফের মতো ঠাণ্ডা বরুণ-বাণ-বর্ণের মধ্যে খানিকক্ষণ থেকে আমার 
বুকের রক্ত পরস্ত যেন জমাট হয়ে গেল-_ রণে ভঙ্গ দিতে হল, হাপাতে হাপাতে 
বেরিয়ে এলেম। তার পরে এক জায়গায় "পুকুরের মতো আছে, আমি সাঁতার 
দিতে রাজি আছি কি না জিজ্ঞাসা করলে! আমি সাঁতার দিলেম না, আমার সঙ্গী 
সাঁতার দিলেন। তার সাঁতার দেওয়া (দখে তারা বলাবলি করতে লাগল, “দেখো 
দেখো, এরা কী অভ্তুত রকম করে সীতার দেয়, ঠিক কুকুরের মতো।” এতক্ষণে 
স্নান শেষ হল। আমি দেখলেম টাকিশ-বাখে স্নান করা আর শরীরটাকে ধোপার 
বাড়ি দেওয়া এক কথা।” 

কাদন্ধবরী রবির এ-সব চিঠি পড়ে নিজের মনেই হেসে কুটোপাটি হতে 
থাকেন। 

১৫৬ 


১০ 
বসন্তবিলাপ 


জোড়ার্সাকোর তেতলার বারান্দার আড্ডায় সেদিন সংস্কৃত নাটক পাঠ 
করছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। বসন্ত উৎসবের বণনা পড়তে পড়তে তার মনে 
হল কী সুন্দর ছিল সেকালের বসন্ত উৎসব, যেন হৃদয়ের হোরিখেলা। তিনি 
সবাইকে বলেন, দেখো আমরা এমন প্রাণ খুলে আবির মাখতে পারি না 
কেন? দিশি রীতির এই রঙের উৎসবকে কি ফিরিয়ে আনা যায় না? 

কাদন্বরীও উৎসাহে মেতে উঠলেন, কেন পারব না, আমাদের উঠোনেই 
বসন্ত উৎসব করলে হয়, কিংবা পাশের বৈঠকখানা বাডির আঙিনায়। 

তা হলে গুণোদাদাকে খবর পাঠানো হোক, স্ব্ণ বললেন, দু'বাড়ির 
ভাইবোনেরা মিলে দারুণ মজার বসম্তখেলা হবে। 

এ-সব ব্যাপারে গুণেন্দ্রনাথের বরাবর খুব উৎসাহ। দু'বাড়ির 
ছেলেমেয়েদের নিয়ে আগেও তিনি হিন্দুমেলা বা নবনাটকের আয়োজনে 
মেতে উঠেছেন। যদিও এরমধ্যে বৈঠকখানা বাড়ির ভাগ নিয়ে বিধবা ভাই- 
বউ ত্রিপুরাসুন্দরীর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছেন দেবেন ঠাকুর। নিঃসন্তান 
গুণেনকে। তাতে দ্বারকানাথের সম্পত্তির অনেকটা অংশই গুণেনের ভাগে 
পড়ত। দেবেন ঠাকুর সেই আশঙ্কায় সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে দাবি করলেন 
বিধবার দত্তক নেওয়ার অধিকার নেই। রায় দেবেনের পক্ষে গেল, ফলে 
ছোটভাই নগেনের ভাগের সম্পত্তির অনেকটাই অর্জন করলেন তিনি। গুণেন 
বঞ্চিত হলেন, ত্রিপুরাসুন্দরী ক্ষুব হয়ে থাকলেন। তবু সে-সব গায়ে না মেখে 
গুণেন্দ্র এবারেও মহানন্দে বসতবাড়ির ভাইবোনেদের সঙ্গে উৎসবে ঝাপিয়ে 
পড়লেন। 


১৫৭ 


ধর্ম নিয়ে দু'বাড়ির বিভেদ হলেও ছেলেমেয়েদের মনের টান রয়ে গেছে। 
৬ নম্বরের ব্রান্ম বিয়েতে ৫ নম্বরের হিন্দু আত্মীয়রা আসেন না, আবার ৫ 
নম্বরের বিয়েতে ৬ নম্বর বাড়ির আসেন না। কিন্তু প্রতিটি বিয়ে উপলক্ষে 
থিয়েটার বা গানের আসর বসানো হয়, যেখানে ৫ এবং ৬ মিলেমিশে আনন্দ 
করে। এইসব আয়োজনে গুণেন খুব উৎসাহী। গোপাল উড়ের যাত্রা দেখে 
উৎসাহিত হয়ে গুণেন আর জ্যোতি মিলে বাড়িতে জোড়ার্সাকো নাট্যশালা 
তৈরি করেছেন। নবনাটক সেখানেই অভিনীত হয়েছিল, বসস্ত উৎসবের 
নাচগানও সেই মঞ্চে। আপন ওদাে সকলকে জড়িয়ে নিয়ে উৎসবে মেতে 
উঠতে গুণেনের জুড়ি নেই। 

সুতরাং এক বসন্তসন্ধ্যায় রঙিন আলোয় আর আবিরে বৈঠকখানা-বাড়ির 
বাগান হয়ে উঠল নন্দনকানন। পিচকারিতে রংখেলাও বাদ রইল না। 

বসম্ত উৎসবে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও আমন্ত্রিত। অক্ষয় ও শরৎকুমারী এমন 
সমাবেশে পুলকিত হয়ে নিজেরা পরস্পর রং মাখাচ্ছেন। 

কাদন্বরী সেজেছেন সেকালিনীর মতো। বেলফুলের মালা জড়ানো কবরীতে 
পিন করা জর্জেটের ওড়না, হাতে মাধবীলতার কঙ্কণ, গলায় মাধবীমালা, 
কানেও ঝুমকোর মতো একগুচ্ছ মাধবীফুল। তাকে দেখে জ্যোতিও মুগ্ধ হয়ে 
দু'হাত বাড়িয়ে ডাক দিলেন, অয়ি মাধবিকা.কুসুমনন্দিতা! 

কাদন্বরীও হাত বাড়িয়ে জ্যোতির সাদা জামায় আবির ছড়িয়ে দিয়ে 
বললেন, ওহে আবিরলাঞ্িত যুবা, এসো আমরা বসস্তের আবাহন করি। 

কন্দর্পনিন্দিত জ্যোতিরিন্দ্র ও অপরূপা কাদম্বরীর এই কৌতুকনাট্য সকলেই 
মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকেন, তারা যেন এই লৌকিকস্তর থেকে উরে কোনও 
মায়াজাল রচনা করেছেন বাগানে। 

একটু পরেই আবার সে-দৃশ্য ভেঙেআর-একটি দৃশ্যের জন্ম হয়। যেন 
নাটকের পালাবদলের মতো এক-এক ট্রকরো কথা, সংলাপ, ভঙ্গি, দৃশ্য 
ছড়িয়ে পড়তে থাকে বসন্তের বাগানে। 

একসময় বিহারীলাল অঞ্জলিভরা আবির নিয়ে এগিয়ে আসেন কাদন্বরীর 
দিকে। আঙুলে করে গুঁড়ো গুঁড়ো লাল, সবুজ, গোলাপি বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে 
দিতে থাকেন কাদন্বরীর মাথায়, গায়ে, সারা শরীরে। কাদন্বরীও কিশোরীর 
উচ্ছাসে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে ভিজতে থাকেন সেই আবিরবধ্ণে। 

ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই কাদন্বরীর চোখ পড়ে রূপার দিকে, এক গোরাসাহেব 
১৫৮ 


রূপাকে আচ্ছা করে আবির মাখাচ্ছে আর রূপা বেহায়ার মতো খিলখিল 
হাসিতে লুটিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গেই তো রূপার খুব মাখামাখি শোনা যাচ্ছে! 
কাদম্বরীর মেজাজ খারাপ হয়ে যায় রূপার বেহায়াপনায়। 

রূপা সাহেব যুবকটির হাত ধরে টানতে টানতে কাদন্বরীর কাছে নিয়ে 
আসে, দেখো নতুনবোঠান, তোমাকে দেখে পরি ভেবেছে হরিসাহেব, 
তোমাকে বলছে এঞ্জেল। আমি আলাপ করতে ধরে এনেছি। 

কাদন্বরী তার হাত ধরে দূরে টেনে নিয়ে এসে বলেন, তোর কি কোনওদিন 
বোধবুদ্ধি হবে না রূপা? কোথাকার একটা ফিরিঙ্গি সাহেবকে হাত ধরে 
টানছিস, পরপুরুষের গায়ে হাত দিতে নেই জানিস না? আর আমি কি অচেনা 
লোকের সঙ্গে কথা বলি কোনওদিন? 

রূপা কাদো কাদো হয়ে বলে, বা রে, তুমি যে বিহারীবাবুর সঙ্গে আবির 
খেলছ, তার বেলা? হরিসাহেব তো জ্যোতিদাদার বন্ধু, তিনিই নেমন্তন্ন 
করেছেন, তার হাত ধরলে কী হয়? 

রূপার সাহস দেখে স্তম্ভিত কাদন্বরী বললেন, শোন রূপা, আমি কোনওদিন 
পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলে না, কারণ তাতে বাড়ির মধাদা নষ্ট হয়। আমি শুধু 
বিশেষ দু'চারজনের সঙ্গেই কথা বলি যাঁরা সজ্জন, প্রতিভাবান এবং আমার 
স্বামীর বিশেষ বন্ধু। তোর এতবড় সাহস যে আমার সঙ্গে নিজের তুলনা করিস? 

রূপা গৌজ হয়ে বলে, কিন্তু, হরিসাহেব আমার বন্ধু। আসলে ওর নাম 
হ্যারি শেফার্ড। আমি ওই নামে ডাকি আর ওর সঙ্গে গল্প করতে আমার ভাল 
লাগে। কত অন্যরকম গল্প বলে। শুধু মেয়েমহলে আটকে থাকতে আমার 
ভাল লাগে না। থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়। 

ওর সঙ্গে তোর আলাপ হল কী করে? রাগত স্বরে জানতে চান কাদন্বরী। 
রাগলে তাকে আরও সুন্দর দেখায়। কাদম্বরী বোঝেন, হরিসাহেব হা করে 
তাকিয়ে আছে তার দিকে, অন্যরাও দেখছে। রূপার ওপর আরও রাগ হয়। 

রূপকুমারী বলে, আলাপ তো তোমাদের বিদ্বজ্জন সভায়। ওকে আমার 
ভাল লাগে। রাগ কোরো না, নতুন বোঠান, পায়ে পড়ি রাগ কোরো না। 

দাড়া তোর ব্যবস্থা করছি, ক্রুদ্ধ কাদন্বরী রূপার হাত ধরতে যান, তার 
মাধবীকঙ্কণ খুলে গড়ে মাটিতে। সেই ফাঁকে তার হাতের নাগাল ছাড়িয়ে 
দৌড়ে পালিয়ে যায় রূপা। 


১৫৯ 


হ্যারি দূরের গাছতলায় গিয়ে বসেছে, রূপা তার পাশে বসে পড়ে বলে, 
ধুর, কিছু ভাল লাগে না আমার। সবাই সবসময় যেন আটকে রাখতে চায়। 
এটা করবে না, ওটা করবে না, ওখানে যাবে না, ওর সঙ্গে মিশবে না। আমার 
নিজের কি কোনও ইচ্ছে থাকতে নেহ্য 

হ্যারি ওর কীধে হাত রেখে বলেন, তোমার অস্থিরতা আমি বুঝতে পারি। 
একসময় আমাদের দেশের মেয়েদেরও এরকম আটকে রাখা হত, কিন্তু এখন 
সব পালটে গেছে। এখন মহিলারা ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলন করতে 
রাস্তায় নেমেছে। ইউরোপের মেয়েরা অনেক লড়াই করে স্বাধীন হয়েছে। 

কতটা স্বাধীন? রূপা জানতে চায়, ওরা একা একা জাহাজে চেপে বিদেশ 
যেতে পারে £ যেখানে ইচ্ছে যেতে পারে £ আমার খুব ইচ্ছে করে সারা দুনিয়া 
ঘুরে বেড়াই। 
সিরিয়াসলি ভাবছে। মেয়েরাও খুব উৎসাহিত। 

রূপা নিজের আবিরমাখা চুলের গুচ্ছ নিয়ে খেলা করতে করতে বলে, 
তোমাদের দেশের মেয়েরা এত লড়াকু, তা হলে কোনও মেয়ে বুঝি কিছু 
লেখেনি? 

না না, মহিলারা না বললে স্ত্রীস্বাধীনতার প্রয়োজনটা কোনওদিন খেয়াল 
করতামই না আমরা পুরুষেরা । রূপার জিজ্ঞাসু মুখের দিকে তাকিয়ে হ্যারি 
জানালেন, আরও একশো বছর আগেই মারি উলস্টোনক্রাফট নামে একজন 
মহিলা মেয়েদের অধিকার নিয়ে একটা সাংঘাতিক বই লিখেছিলেন, তিনিই 
প্রশ্ন তোলেন, পুরুষের মনোমতো পুতুল হয়ে মেয়েদের বেঁচে থাকতে হবে 
কেন? মেয়েরা সহযোগী হয়ে পুরুষকে ভালবাসবে কিন্তু তার শাসনদণ্ড 
মেনে নেবে কেন? এ-সব প্রশ্ন তুলে তাকে অবশ্য অনেক নিষাতন সহ্য 
করতে হয়েছিল তখন। এখন তার বই মাথায় তুলে নিয়েছে স্যাফ্রোজিস্টরা। 

কী, কী বললে? রূপা বুঝতে পারে না কথাটা। হ্যারি হেসে রূপার থুতনি 
নেড়ে দিয়ে বলেন, স্যাফ্রোজিস্ট মানে যে মেয়েরা ভোটাধিকারের লড়াই 
করছে রাস্তায় নেমে। বুঝেছ? 

ইস, আমিও যদি ওদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে লড়াই করতে পারতাম! রূপা 
বলে, ব্ব্দিদিকে বলতে হবে এ-সব গল্প। স্বণদিদি রাজি হলে আমরা দুজনে 
মিলে স্যাফ্রোজিস্ট দলে নাম লেখাতে পারি। 


৯৬০ 


আমার সঙ্গে যাবে? রূপার চোখে চোখ রেখে হঠাৎ গা স্বরে জানতে 
চান হ্যারি। চলো দূরে কোথাও চলে যাই, যেখানে কোনও বাধানিষেধ নেই, 
যাবে? 

রূপা উত্তেজনায় হ্যারির হাত চেপে ধরে, যেতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে জানো! 
কিন্তু জানতে পারলে সবাই হা হী করে উঠবে। নতুনবউঠানকে না বলে আমি 
যেতে পারব না। 

হ্যারি দুষ্ট হেসে বলেন, তা হলে আর তোমার স্বাধীন হওয়া হল না। এই 
বিরাট পৃথিবী তোমাকে ডাকছে। আর তুমি তুচ্ছ টৌকাঠে আটকে আছ। 

না না, স্বাধীন আমাকে হতেই হবে। চৌকাঠে আটকে আমার জীবন কেটে 
যাবে তা হবে না। রূপার গলায় প্রত্যয় ফোটে। 

তুমি পারবে না, হ্যারি হাসেন। রূপা রেগে ওঠে, কেন পারব না, বলো 
কী করতে হবে? 

আমাকে চুম্বন করতে পারবে? হ্যারির ঠোটে রহস্যময় হাসি। 

এই প্রস্তাবে রূপার সরলতা কেঁপে ওঠে, কিন্তু তার সঙ্গে স্বাধীনতার কী 
সম্পর্ক? 

আমাদের দেশে ডেটিং না করলে কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হয় না। হ্যারি বলেন, 
ডেটিংয়ের একটা প্রধান অংশ চুম্বন। তুমি যদি আমাকে চুম্বন না করো তা হলে 
তুমি আমাকে ভালবাসো কি না কী করে বুঝব£ তোমাকে নিয়ে এ-বাড়ির 
উঠোন থেকে পালাতে হলে আগে এই চুম্বন পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। 

ঃ, রাপা লজ্জায় ভোরের আকাশের মতো লাল হয়ে যায়। হ্যারি নিজের 

দু হাতের মধ্যে রূপার মুখটি তুলে ধরে, দুটি ঠোট পরস্পরের দিকে ঝুঁকে 
পড়তে থাকে। তখনই দূর থেকে কে যেন রূপার নাম ধরে ডেকে ওঠে, 
চকিতে হ্যারির স্পর্শ ছাড়িয়ে উঠে দাড়ায় রূপা। চুম্বনটি অর্ধসমাপ্ত থেকে 
যায়। 


সরলা গানের জন্য রূপাকে ডাকাডাকি করছিল। ওদিকে জ্যোতি ঠাকুর তখন 
গলা খুলে গান শুরু করেছেন, প্রতিভা, সরলা ইত্যাদি বালিকারাও রংখেলা 
ফেলে যোগ দিয়েছে গানের কোরাসে। গানবাজনার আসর জমাতে রঙে 

চুপচুপে গুণেন্দ্র তবল। বাজাতে বসে গেলেন। 
সব্ণকুমারী যত-না রং খেলছেন তার চেয়ে বেশি দুদচোখ ভরে দেখছেন সব। 
১৬১ 


যেন সেকালের বসন্ত উৎসবের একটা টুকরো হঠাৎ খসে পড়েছে জোড়ার্সীকোর 
বাগানে। দেখতে দেখতেই তার মাথায় আসে একটি গীতিনাট্যের পরিকল্পনা। 

কিছুদিনের মধ্যেই “বসন্ত উৎসব" গীতিনাট্যটি লিখেও ফেললেন স্ব্। 
শুরু করলেন। সংগীতের মহাহিল্লোলে মুখরিত হয়ে উঠল সারা বাড়ি। 
সবার মনে মনে ভাসছে সুর। বালিকা সরলা সারাদিন গুনগুন করছে মায়ের 
লেখা গান, “চন্দ্রশুন্য তারাশুন্য মেঘান্ধ নিশীথ চেয়ে/দুর্ভেদ্য অন্ধকারে হৃদয় 
রয়েছে ছেয়ে?। 

নাটকে গানটি গাইলেন অবশ্য কাদন্বরী। তার বড় বড় চোখে, ঢলঢল 
খোলা চুলের রাশিতে এই শোকসংগীত যেন অপার্থিব সুরের মায়ায় ভাসিয়ে 
দিল সবাইকে। 

রূপার গানের গলাটিও সুন্দর হয়েছে, তাকে কোরাসে গলা মেলানোর 
জন্য ডাক দিলেন জ্যোতি ঠাকুর। কিন্তু কাদন্বরী লক্ষ করেছেন, মহড়ায় ঘনিষ্ঠ 
দু'-এক জন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে হরিসাহেবও এসে বসে থাকেন। বাঙালিদের 
গানবাজনায় তার খুব আগ্রহ। বাউলদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বাল সংগীত 
শিখেছেন কিছু এখন আবার ঠাকুরবাড়ির গানে অন্যরকম মজা পাচ্ছেন 
কিন্তু রূপার সঙ্গে ফুসফুস কথা বলা দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায় কাদন্বরীর, 
কী করে যে সামলাবেন এই দস্যি মেয়েকে! একচুল এদিক ওদিক হলে 
তো বাড়ির মেয়েমহল তাকেই কথা শোনাবে। এমনকী বিলেত থেকেও 
জ্ঞানদানন্দিনী চিঠিপত্রে সব খোঁজখবর নেন, রূপার চালচলন সম্বন্ধে ওখান 
থেকেও তার নজরদারি অব্যাহত। 


রূপাকে নিয়ে স্বণণ একদিন এলেন আযানেট এক্রয়েডের কাছে। কিছুদিন হল 
কলকাতায় আছেন আযানেট, এখানকার মেয়েদের শিক্ষিত করতে তিনি 
বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন। এ বাযাপারে তার প্রেরণা মেরি কার্পেন্টার, যিনি 
এর আগে দু'তিনবার ভারতে আসা-বাওয়া করে ব্রাহ্দসমাজের সাহায্যে 
মেয়েদের স্কুল শুরু করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আযানেট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে 
প্রার্মুই বন্ধুস্থানীয় ব্রা্দদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন, এবারেও সবাইকে ডাক 
পাঠিয়েছেন। 


১৬২ 


ব্রাম্মসমাজের নেতা কেশব সেনকে নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে আানেটের। 
সমস্যাটা শুরু হয়েছিল দু'বছর আগে, যখন নারীশিক্ষা নিয়ে আ্ানেট 
এক্রয়েডের সঙ্গে তর্ক বাধিয়েছিলেন কেশব। তখন উদারপঙ্থী ব্রাহ্মদের 
অনেকেরই ভুরু কুঁচকেছিল। 

ইউরোপে থাকতেই ব্রাহ্ম মনোমোহন ঘোষের সঙ্গে বন্ধুত্ব আনেটের। 
মনোমোহন ও তার স্ত্রী কিছুটা বিলিতি কেতায় অভ্যন্ত বলেই হয়তো 
বন্ধুত্রটা তাড়াতাড়িই গাঢ় হয়ে উঠেছে। নারীশিক্ষায় ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগের 
কথা লন্ডনে বসেই জেনেছিলেন আযানেট। সেখানে ব্রাহ্দনেতা কেশবের 
সঙ্গে আলাপ করে তাকে নারীস্বাধীনতার প্রবক্তা বলেই মনে হয়েছিল 
আানেটের। 

কিন্তু কলকাতায় এসে দেখলেন শিক্ষানীতির প্রশ্নে কেশবের সঙ্গে একমত 
হওয়া সম্ভব না। রক্ষণশীল কেশবের ধারণা, শিক্ষার নামে অঙ্ক ও বিজ্ঞান 
শিখিয়ে বাঙালিনিদের মেমসাহেব তৈরি করার চেষ্টা চলছে, তাদের এ-সবের 
কোনও প্রয়োজন নেই। মেয়েদের এমন কিছুই শেখানো উচিত নয় যাতে 
তারা ঘরকন্না ফেলে অন্যদিকে মন দেয়। মেয়েদের স্কুলে তিনি শুধু সাহিত্য 
ও কলাশাস্ত্ পাঠের ব্যবস্থা করেছেন। 

আযানেট এক্রয়েড এটা একেবারেই মানতে পারেন না। তিনি মনোমোহন 
ঘোষের বাড়িতে একটি সভা ডেকেছেন। তিনি সভার কাছে প্রথমেই জানতে 
চান, আপনারা কি সত্যি ফিমেল এডুকেশন চান, তা হলে কেশববাবুর 
অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন। 

শিবনাথ শাস্ত্রী সেখানে উপস্থিত, তার মতে কেশবচন্দ্র রক্ষণশীল হয়ে 
পড়েছেন। এখন মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার সময়। ইউরোপের মহিলারা যা 
পারে আমাদের মেয়েরাও পারবে। 

মনোমোহন ঘোষ, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি প্রমুখ কয়েকজন উদার বাঙালি 
ভদ্রলোকও বিজ্ঞান শেখানোর ব্যাপারে মিস এক্রয়েডের সঙ্গে একমত 
হলেন। 

ঠাকুরবাড়ির স্বণকুমারীকে তিনি ডেকে এনেছেন এই সভায়। আযানেট তার 
দিকে তাকিয়ে বলেন, শুধু পুরুষেরাই সবকিছু ঠিক করে দেবে তা হতে পারে 
না। তুমি বলো, (তামার কী মত? 

এর আগেও বেশ কয়েকবার আনেটের আমন্ত্রণে এসেছেন স্বপ্ন, সে 


১৬৩ 


অবশ্য সাহিত্যবাসরে। মাঝে মাঝেই মেয়েদের নিয়ে আসর বসান আযানেট। 
মনোমোহনের বাড়িতেই আসর বসে কারণ আানেট সেখানেই আতিথ্য 
নিয়েছেন। এ ব্যাপারে গৃহিণীও তাকে খুব সাহায্য করেন। 

আযানেটের প্রশ্নে স্ব বললেন, আমরা ছেলেবেলা থেকেই বাবামশায়ের 
কাছে বিজ্ঞানের পাঠ নিয়েছি। বাড়ি থাকলে তিনি মাঝে মাঝেই ছেলেমেয়েদের 
আকাশের নক্ষত্র চেনান, বিজ্ঞানের পাঠ দেন। সেজন্য সাহিত্য ও বিজ্ঞান 
দুটি দিকেই আমার অন্তরের টান। আমার মতে মেয়েদের অবশ্যই গণিত 
ও বিজ্ঞানের পাঠ দেওয়া উচিত। বিজ্ঞানমনস্কতা না এলে মেয়েদের মনের 
কুসংস্কার কাটবে না। 

আযানেট স্বণনকে জড়িয়ে ধরেন। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, কেশববাবুর এসে 
দেখে যাওয়া উচিত বাঙালি মেয়েরা কী বলছে! 

আমন্ত্রিতদের মধ্যে হ্যারি শেফার্ডও বসে ছিলেন, আ্যানেটের নানা 
কাজের সঙ্গী তিনি। রূপকুমারী তার পাশে বসেছে দেখে অনেকেই ভুরু 
কুঁচকে তাকাচ্ছেন। স্বণ সেটা লক্ষ করে রূপাকে ডেকে বললেন, আমার 
পাশে এসে বোস না রূপা। 

হ্যারি হঠাৎ বলে ওঠেন, আপনারা বাঙালি মেয়েদের এডুবেশন দিতে 
চান, বিজ্ঞান পড়াতে চান, অথচ পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে দেন না, এটা 
কীরকম? 

উপস্থিত সকলেই একটু বিব্রত হলেন। বিরক্তও। শিবনাথ বললেন, আমরা 
মেয়েদের বাঙালিয়ানা বজায় রেখেই পশ্চিমি শিক্ষা দিতে চাই, বাইরের 
অনাত্মীয় পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা না করলেও শিক্ষিত হওয়া যায় হ্যারি। 
করে? আ্যানেট হ্যারিকে সমর্থন করেন, আমাদের দেশের মেয়েরা স্বচ্ছন্দ 
মেলামেশা করে বলেই সমকক্ষতার দাবি করতে পারছে। স্বর্ণ, তুমি এত 
প্রগতিশীল হয়েও এখনও যে বাইরে বেরোলে ভেইল ব্যবহার করো এটার 
কী প্রয়োজন £ 

স্বর্ণকুমারী শাড়ির সঙ্গে একটা আলাদা কাপড়ের ঘোমটা লাগিয়েছেন 
মাথায়, তার ওপর একটা ছোট্ট টুপি। তিনি এই প্রশ্নে বিরক্ত হন, এ আমাদের 
দেশাচার আ্যানেট, ঘোমটা পরা-না-পরার সঙ্গে প্রগতির কোনও সম্পর্ক নেই। 
আর আমাদের মেয়েরা অনেক যুগের পর বাইরে বেরচ্ছে, তাদের একটু 
১৬৪ 


বেচাল দেখলে লোকে ছি ছি করে, পুরুষের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে একটু 
সাবধানে চলাই ভাল। 

হ্যারির রাগ হয় রঁপাকে তার পাশ থেকে উঠিয়ে নেওয়া হল বলে। 
বলেন, ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা খুব অগ্রসর, অথচ আমি শুনেছি তারা বাইরের 
পুরুষদের সঙ্গে কথা বলেন না। তার মানে তো এখনও তারা পরদাপ্রথা 
বাঁচিয়ে রাখছেন। কেন আমরা পুরুষেরা কি খুব খারাপ লোক? 

রাগে স্বর্ণর ফরসা গালদুটি লাল হয়ে ওঠে। অগ্নিদৃষ্টিতে রূপার দিকে 
তাকান তিনি। তারপর বলেন, আমি মনে করি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে নয়, 
আমাদের স্ত্রীস্বাধীনতা আসবে সম্মতির পথে। হঠাৎ করে ঘোমটা খুলে 
সমাজকে আঘাত দিলেই স্ত্রীন্বাধীনতা স্বর্গ থেকে খসে পড়বে না। 


এ-সব আলোচনার মধ্য দিয়েই সেদিনের সভায় বিক্ষুব্ধ ব্রান্মরা আযানেট 
এক্রয়েডের উদ্যোগে নতুন মহিলা বিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের 
উদ্যোগেই তৈরি হল হিন্দ্রু মহিলা বিদ্যালয়, যেখানে পরিণত মেয়েদের কলা 
ও বিজ্ঞান শেখানো শুরু হল। আানেট অনেকদিন পরস্ত এই স্কুলের দায়িত্বে 
ছিলেন। আযানেটের বিয়ের পর নানা কারণে এই স্কুলটি বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় 
নামে কিছুদিন চলার পর বেখুন কলেজের সঙ্গে মিশে যায়। কিন্তু কেশবের 
সঙ্গে তখন থেকেই প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। 

ব্রান্দসমাজের ভেতরে আর-একটি বিষয় নিয়েও গোলমাল বেধে গেছে, 
আর তার মূলেও আছেন কেশবনন্দ্র। ব্রান্মরাই অনেকদিন মেয়েদের বিয়ের 
কিন্তু তাদের নেতা কেশব সেনের চোদ্দো বছরের কিশোরী কন্যা সুনীতি 
কোচবিহারের মহারাজা দীপেন্দ্রনারায়ণের প্রেমে পড়লেন। কেশব সেই 
বিয়েতে সম্মতি দিতেই ব্রান্দমাজে শোরগোল শুরু হল। ব্রাহ্ম তরুণদের 
চোখে কেশবের ভাবমূর্তি ছোট হয়ে গেল, তার কাছে এরকম ভগ্ডামি তারা 
আশা করেনি। 

কেশবের যুক্তি হল ওরা এখন শুধু বিয়েটাই করবে, একসঙ্গে বসবাস 
করবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর। দীপেন্দ্রনারায়ণ বিয়ের পরপরই দীর্ঘদিনের 
জন্য বিদেশ ভ্রমণে যাবেন, আর সুনীতি থাকবেন বাপের বাড়িতে। কিন্তু 
এই যুক্তিতে বিদ্রোহ আটকানো গেল না। কেশব মেয়ের সাধাসাধিতে 


১৬৫ 


নাবালিকা বয়সে সুনীতির বিয়ে দিলেন, আর ব্রাহ্মসমাজ ভেঙে দু" টুকরো 
হয়ে গেল। 

এই বিয়ে নিয়ে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাও উত্তেজিত। কেশব সেনের 
পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বহুদিনের। ব্রাহ্মধন্ন গ্রহণ করায় কেশবের 
বাবা তাকে ত্যাগ করেছিলেন। উচ্চবর্ণের হিন্দু যুবকদের কেউ কেউ ব্রা্ম হয়ে 
যাচ্ছিলেন বলে সেইসময় হিন্দুসমাজে অশাস্তি ছিলই। কেশব ঠিক করলেন 
গৃহত্যাগ করবেন। মহষি দেবেন ঠাকুর তার আদর্শ, তিনিই হয়ে উঠলেন 
আক্ষরিক অর্থে তার আশ্রয়দাতা । কেশব সন্ত্রীক ঠাকুরবাড়িতে আশ্রয় নিলেন 
কিছুদিনের জন্য। জ্যোতি, রবি, ব্বর্ণকুমারীরা তখন বালক বালিকা, কেশবের 
চেয়েও তাদের বেশি ভাব হল তার স্ত্রীর সঙ্গে। একসঙ্গে বসবাসের পাট 
মিটে গেলেও তাদের যোগাযোগটা থেকে গিয়েছে। এমনকী দেবেনের সঙ্গে 
কেশবের মনোমালিন্য ও বিচ্ছেদের পরেও পারস্পরিক আগ্রহটা কমেনি। 

তেতলার ঘরে কাদন্বরীকে ত্বর্ণ বলছিলেন, সুনীতির বিয়ে নিয়ে কী হইচই 
না হচ্ছে বউঠান, কেশবদাদার ওপর সবাই রেগে যাচ্ছেন সুনীতির জন্য। 

কাদন্বরী তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে বিছানাম বসে কালো ভেলভেটের ওপর 
জরির নকশা তুলছিলেন, ছুঁচে সুতো পরাতে পরাতে চোখ তুলে বললেন, 
করে নিজে প্রেম করল রাজকুমারের সঙ্গে! আবার বাবাকে দিয়ে সেই সম্পর্ক 
মানিয়েও নিল। 

স্বর্ণ বলেন, শুধু মানিয়ে? মেয়ের আবদার মানতে গিয়ে বাবা এমন নাকানি 
চোবানি খাচ্ছেন নিজের বন্ধুবান্ধবদের কাছে, ভাবা যায়! কোনও বাঙালি 
মেয়ের ভাগ্যে এমন পিতৃন্সেহ আগে কখনও জোটেনি। নিজের পছন্দে বিয়ে 
করার মজাটা আমরা পাইনি, সুনীতি কল্তর দেখাল। 

আমিও করব, নিজের পছন্দমতো নিয়ে, হঠাৎ পাশ থেকে বলে ওঠে 
রূপা। সে কখন এসে বসেছে ওঁদের পেছনে লক্ষ করেননি স্বর্ণ বা কাদম্বরী। 
রূপার কথা শুনে চমকে উঠে কাদন্বরী তাকে ধমক দেন, তুই বেশি পাকা 
হয়ে গেছিস না রূপা! 

বা রে, রূপা অভিমান করে ঠোট ফোলায়, এই তো তোমরা কেমন 
সুনীতির প্রেমের বিয়ের তারিফ করছিলে, আমি করলেই দোষ 

তোর কি অমন ন্লেহশীল বাবা আছে? কাদন্বরী বললেন, তুই কিছু বেঞফাস 


১৬৬ 


কাজ করলে সবাই আমাকেই দুষবে। তোর জন্য এত কথা শুনতে হয়, আমি 
ভয়ে কাটা হয়ে থাকি। রূপা, তুই কি আমাকে আরও বিপদে ফেলবি? 

রূপা কাদন্বরীর কোলে মুখ গুঁজে বলতে থাকে, আমার এ-সব থোড় বড়ি 
খাড়া জীবন ভাল লাগে না নতুনবউঠান। আমি মুক্তি চাই, বিরাট পৃথিবীতে 
আমি পাখির মতো উড়ে বেড়াতে চাই। 

স্বর্ণ এবার বিরক্ত হয়ে বলেন, সে তো সবাই চায় রূপা। অমন স্বপ্ন সবাই 
দেখে, তাই বলে বাস্তবে সেটা করা যায় না। বাচ্চাদের মতো কথা বলছিস, 
আর কবে তোর বুদ্ধি হবে? 

রূপা বলে, চাইলে স্বপ্নকে সফল করা যায়, তোমরা তেমন করে চাও 
না তাই। চলো না আমরা তিনজনে পাহাড় সমুদ্র দেখতে বেরিয়ে পড়ি, শুধু 
আমরা তিনজন, আর কেউ না। 

কাদন্বরী হাসতে থাকেন। রূপা তার সেলাই ধরে টানে, কার জন্য সেলাই 
করছ? জ্যোতিদাদার জন্য আর কত নকশা তুলবে? যত সুন্দর সুন্দর জামা 
জুতো করে দেবে তত তাকে দেখে পাগল হবে স্টেজের নটারা। তখন তো 
তুমি কাদতে বসবে! 

হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায় পরিবেশ। কাদম্বরীর থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে 
স্বণ রূপাকে ধমক লাগান, নতুনবউঠানের প্রশ্রয়ে তুই যা নয় তাই বলছিস 
রূপা, দেখ তাকেই আঘাত দিয়ে বসেছিস! তোর কি কোনওদিন আকেল 
হবে না? 

কাদন্বরী হাত তুলে থামতে বলেন স্বণকে, ও তো ভুল কিছু বলেনি 
ঠাকুরঝি। যে-কথা তোমরা উচ্চারণ করো না, ও বোকা বলে সেটাই বলে 
ফেলেছে। সত্যিই আজকাল আমি কান্নাকাটি করি, তোমার নতুনদাকে ঘিরে 
এখন অনেক অন্সরী কিন্নরীর মেলা। তবে এটা তার জন্য নয়। রবির জন্য 
একটা নকশাতোলা জুতো সেলাই করছি, দূরে চলে গেছে বলে তার কথা 
বড্ড মনে পড়ে। 

স্বর্ণ বলেন, এটা তুমি নতুনদার ওপর অন্যায় রাগ করছ নতুনবউঠান। 
তিনি রূপবান গুণবান পুরুষ, অভিজাত রমণীরাই তাকে দেখে মুগ্ধ হন তো 
পাঁচর্পেচি বারাঙ্গনা নটারা তো পাগল হবেই। তাতে নতুনদার কী দোষ হল। 
তিনি কি নাটক কর।নো বন্ধ করে দেবেন? 

তা কেন? কাদন্বরী বলেন, নাটক করাতে হলে বারাঙ্গনাদের দিয়েই 


১৬৭ 


অভিনয় করাতে হবে এমন তো কোনও কথা নেই £ তাদের বাদ দিয়ে এতদিন 
নাটক হয়েছে, এখন কেন হবে না। 

এ তো তুমি রক্ষণশীল দলের মতো কথা বলছ বউঠান। স্বণ বললেন, 
মাইকেল মধুসুদন দত্তের উৎসাহে বেঙ্গল থিয়েটারে যখন প্রথম “শমিষ্ঠা” 
নাটকে মহিলাদের অভিনয় শুরু হল, লোকে রে রে করে উঠেছিল। এমনকী 
বেঙ্গল থিয়েটারের অন্যতম উদ্যোক্তা বিদ্যাসাগরও মেয়েদের স্টেজে টেনে 
আনা মানতে পারলেন না, প্রতিবাদে সরে গেলেন। এখনও এ নিয়ে তক 
চলছে। কিন্তু মেয়েদের অভিনয়ও চলছে। তারা তো আকটিং করতে পারে 
সেটা প্রমাণ করেছে, তবে সেটা খারাপ বলব কোন যুক্তিতে? 

কাদন্বরী মানেন না. তিনি বললেন, খারাপ এজন্য যে মহিলা দিয়ে অভিনয় 
করাতে হলে খারাপ মেয়েদের আনতে হচ্ছে, তাতে আমাদের পুরুষদের 
চরিত্র নষ্ট হচ্ছে। এটা কি ভেবে দেখার দরকার নেই স্বণ ঠাকুরঝি? 

বা রে, স্বর্ণ বলেন, তোমার ঘরের লোকটি নষ্ট হয়ে যাবে বলে তুমি ভয় 
পাচ্ছ, আর সেজন্য ওই পতিতা মেয়েগুলোর উদ্ধারের এমন সুযোগ নষ্ট 
হবেঃ নাটকের মধ্যেই তো ওদের মুক্তির সম্ভাবনা। আমরা যখন বাড়িতে 
নাটক করি, তাতেও তো চরিত্র নষ্ট হতে পারে, সেটা তো ভাবছ না? 
লাগে না, সেটাও কি তোমার কাছে বলতে পারব না ঠাকুরঝি? স্বর্ণর কাছে 
সমধ্ধন না পেয়ে কাদশ্বরী ভেঙে পড়েন একটু। 

স্বর্ণ কথা ঘোরাতে চান, যখন মেজদাদার কাছে ছিলাম, বোম্বাইতে 
হ্যামলেট ও ওথেলোর মারাঠি অভিনয় দেখে খুব ভাল লাগেছিল, বেশ 
দেশজ ছাপ, ওথেলোর মারাঠি চেহারার সঙ্গে ডেসডিমোনার নাকে নথও 
বেশ মানিয়ে গেছিল, কিন্তু মেয়েদ্রের পার্ট করেছিল পুরুষরাই। ওদের 
মেয়েরা আমাদের থেকে অনেক বিষয়ে এগিয়ে, কিন্ত এ ব্যাপারে বঙ্গরঙ্গমঞ্চ 
যে ওদের টেক্কা দিচ্ছে এটা ভাবতেই ভাল লাগে। 

যাক গে, কাদশ্বরী গুছিয়ে বসে বলেন. নতুন কী লিখেছ এবার শোনাও 
দেখি ঠাকুরঝি। রূপাও তার গায়ে %। এলিয়ে জমিয়ে গল্প শুনতে বসল। 
মেয়েদের ছোট ছোট সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার অনুরণনে ভরপুর হয়ে উঠল 
অন্দরের এই সাহিত্যবাসর। 


১৬৮ 


১২ 
জ্ঞানদানন্দিনীর বিলেতবাস 


ব্রাইটনে প্রথম খ্রিসমাসের সন্ধ্যাটা বেশ আনন্দে কাটল জ্ঞানদার। অনেকদিন 
বাড়িছাড়া। কাছের লোকেরা কেউ নেই। তবু দীর্ঘ রোগভোগ ও সন্তানশোকের 
কালো দিনগুলো পেরিয়ে অনেকদিন পর ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে 
হাসলেন জ্ঞানদা। যাঁর চিকিৎসায় সেরে উঠলেন সেই ডক্টর জোসেফ 
তিনি। অতিথিদের মধ্যে আর আছেন পাশের বাড়ির মিসেস ডনকিনস, 
বিলেতবাসী জ্ঞানেন্দ্র ঠাকুর ও তার মেয়েরা। বিলেতের প্রবাস জীবনে এঁরা 
কয়েকজনই তার কাছের মানুষ। 
সমুদ্রতীরে নিরালা একটি জায়গায় সার সার কতগুলো বাড়ির নাম মেদিনা 
ভিলা, তারই একটিতে বাচ্চাদের নিয়ে সংসার পেতেছেন জ্ঞানদানন্দিনী। ভিলা 
অবশ্য নামেই, ছোট ছোট বাড়ি, সামনের বাগানে দু”-চারটি গাছগাছালি। 
দেশের তুলনায় ঘরগুলো ছোট ছোট, ছাদ নিচু, চারদিকে জানলা বন্ধ করে 
রাখা শীতের ভয়ে। একটু বাতাস আসার ফাক নেই, শুধু জানলাগুলো কাচের 
বলে আলো আসতে বাধা নেই। নিজস্ব গৃহিণীপনায় ছোট ছোট ঘরগুলোকেই 
চমৎকার বিলিতি কায়দায় সাজিয়ে নিয়েছেন জ্ঞানদা। 
তবে এসব সাজানো-গোছানো তো বাইরের ঠাট বজায় রাখার জন্য। 
মন ভাল রাখতেও এ-সব নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন জ্ঞানদা। কিন্তু আসলে 
তিনি মোটেই ভাল নেই। তিনটি শিশুকে নিয়ে বিদেশ বিভূইয়ে একা বসবাস 
করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছেন। উপরস্ত তিনি এখন অন্তঃসত্বা। জ্ঞানদার মাঝে 
মাঝে রাগ হয় সত্যেনের ওপর, এরকমভাবে কেউ নিবাসনে পাঠায় ? মাঝে 
মাঝে তার কান্না পায়, কেন যে সত্যেনের কথা শুনে এখানে চলে এলেন! 
১৬৯ 


সত্যেন ভাবুক মানুষ, সংসার সম্বন্ধে তার কোনও কাগুজ্ঞান নেই। বউ যে 
এখানে অথই জলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, সে বোধটাও তার নেই। 

ভরসা বলতে রামা চাকর আর দু'-একজন প্রতিবেশিনী মেমসাহেব। 
ব্রাইটনে আসার আগে আরও দু'-চারবার বাড়ি বদল করতে হয়েছে তাকে। 
জাহাজ থেকে নেমে প্রথমে উঠেছিলেন প্রসন্নকুমার ঠাকুরের ত্যাজ্যছেলে 
জ্ঞানেন্দ্রর বাড়িতে। জ্ঞানেন্দ্র খ্রিস্টান হয়ে রেভারেন্ড কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 
মেয়েকে বিয়ে করে বাপের বিরাগভাজন হয়েছেন। সেই থেকে বিলেতেই 
বাসা বেঁধেছেন সপরিবারে । জাহাজ থেকে বাচ্চাকাচ্চাসহ জ্ঞানদাকে একা 
নামতে দেখে তিনিও চমকে উঠে ভেবেছিলেন, এটা সত্যেন কী করল! 
করলেন। জ্ঞানেন্দ্রর দুই তরুণী মেয়ে সতু আর বালা মাঝে মাঝেই জ্ঞানদার 
কাছে চলে আসেন, ওঁকে নিয়ে পাড়া বেড়াতে বেরোন। জ্ঞানদাও ওঁদের 
আসার পথ চেয়ে বসে থাকেন। 
পড়াশোনা অসুখ-বিসুখ সামলাতেই এসে অবধি নাজেহাল হয়ে পড়ছেন 
তিনি। তার ওপর কিছুদিনের মধ্যেই তীব্র শ্বীত এসে পড়ল। 

জানলা দিয়ে প্রথম বরফ পড়া দেখে জ্ঞানদা দারুণ উত্তেজিত। সব 
লোকজন রাস্তায় নেমে পড়ে বরফ গায়ে মাখছে। আনন্দে তিনিও ছুটে বাইরে 
বেরিয়ে পড়লেন, গায়ে তখন শুধু একটা পাতলা সিল্কের শাড়ি। বাড়িওলি 
বারণ করলেও না শুনে তিনি আনন্দে বরফ কুড়োতে লাগলেন। তারপর রাত 
থেকে ধুম জ্বর, গা ব্যথা। ক্রমশ জ্বর বাড়তে লাগল আর হাত ফুলে লাল হয়ে 
গেল। রামা চাকর ডাক্তার ডেকে আনন্বেও খুব একটা উন্নতি হল না। হাতে 
ঘা হয়ে বিছানায় শুয়ে কাতরাতে লাগলেন জ্ঞানদা। 

বাচ্চাদের কান্না শুনে একদিন পাশের বাড়ির মিস ডনকিনস দেখতে 
এলেন। জ্ঞানদার বিপন্ন দশা দেখে অবাক ডনকিনস জিজ্কেস করেন, তুমি 
একা একা বাচ্চাদের নিয়ে এদেশে এলে কেন? 
আদবকায়দা শেখার জন্য। বাচ্চাদের এখানকার স্কুলে পড়াতে চাই আমরা। 

তাই বলে এভাবে একা একা অচেনা দেশে বাস করা যায়? তুমি তো ভাল 


১৭০ 


করে ইংলিশ বলতেও পারছ না! গরমজামা না পরে কীভাবে বরফের মধ্যে 
নেমে গেলে? পুয়োর লেডি! 

ডনকিনসের মায়া হয় এই ভারতীয় মহিলার জন্য। যে নিজেকে বাঁচাতে 
জানে না, সে বাচ্চাদের বাঁচাবে কী করে? তিনি হাল ধরতে এগিয়ে না এলে 
সে-যাত্রা জ্ঞানদা বাঁচতেন কি না সন্দেহ। ড. জোসেফ লিস্টার নামে এক 
মেধাবী চিকিৎসককে ডেকে আনলেন ডনকিনস, যিনি তখন অ্যান্টিসেপটিক 
আবিষ্কারের জন্য বিলেতে খুব সমাদৃত। 

লিস্টার এসে জ্ঞানদার অবস্থা দেখে আতকে উঠলেন। ফ্রস্টবাইট থেকে 
ঘা হয়ে সেপটিকের দিকে যাচ্ছে। প্রবল জ্বর, রোগিণী প্রলাপ বকছে। 
ঘটনাচক্রে লিস্টার ইতিমধ্যে ফেনল অর্থাৎ কাবলিক আসিডের মধ্যে খুঁজে 
পেয়েছেন বিশল্যকরণী আ্যান্টিসেপটিক। জ্ঞানদাকে পেয়ে নিজের ওষুধগুলি 
পরীক্ষানিরীক্ষার আরও একটা সুযোগ পেয়ে গেলেন। তিনি মন দিয়ে জ্ঞানদার 
শরীরের ঘা খুঁটিয়ে দেখেন। 

পরপুরুষের প্রথম স্পর্শে জ্ঞানদা কিন্তু ঘোরের মধ্যেও শিউরে ওঠেন। 
হলই বা ডাক্তার, পুরুষ তো বটে। সুদশশন মাঝবয়সি এই ডাক্তারকে জ্ঞানদার 
বেশ পছন্দও হয়। ঠাকুরবাড়িতে নেহাত বিপর্যয় না হলে মেয়ে-বউদের জন্য 
সাহেব ডাক্তার ডাকা হয় না, জ্ঞানদার সেই অভিজ্ঞতা নেই। তবে লিস্টারের 
চিকিৎসায় কাজ হল, অল্প অল্প করে সেরে উঠতে লাগলেন জ্ঞানদা। এরকম 
গভীর অসুখের সময় সত্যেন পাশে নেই, আপনজন কেউ নেই। একটা চিঠি 
লিখলে একমাস পরে পৌঁছয়। জ্ঞানদার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। 

লিস্টার জানতে চান, ব্রেভ লেডি, তুমি কাদছ কেন? তুমি যেরকম একা 
একা এখানে এসে ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংসার করছ, আমি কোনও ইংরেজ 
মহিলার মধ্যেও এমন দুঃসাহস দেখিনি। তুমি সেরে উঠবে। 

জ্ঞানদার মনে হয় লিস্টার যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা দেবদূত। যা কখনও 
ভাবেননি এমন কাণ্ড করে বসেন তিনি, লিস্টারের হাত চেপে ধরে বলেন, 
সেভ মি, ইউ আর মাই এঞ্জেল! 

ওহ নো! লিস্টার হেসে বলেন, আই আযম আ ডক্টর। ইউ থ্যাঙ্ক মিসেস 
ডনকিনস ফর ব্রিঙ্গিং মি হিয়ার। 

জ্ঞানদা মিসেস ডনকিনসের দিকে তাকিয়ে বলেন, উনি না থাকলে তো 
আমি বিদেশ বিভূইয়ে কবে মরে যেতাম। 


৯৭১ 


ডনকিনস জ্ঞানদার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, নো গানাদা, তুমি কখনও 
মৃত্যুর কথা বলবে না। ব্রাইটনে এসে একজন ইন্ডিয়ান লেডি বিনা চিকিৎসায় মরে 
গেলে আমাদের লজ্জায় মুখ ঢাকতে হবে। আমরা ইংরেজ মেয়েরা পরস্পরকে 
সাহায্য করেই বেঁচে থাকি। ইউ আর লাকি যে ডস্টর লিস্টার এসে গেছেন। 

জ্ঞানদা বিড়বিড় করে বলেন, এঞ্জেল! এঞ্জেল! প্লিজ সেভ মি। 

লিস্টার বললেন, মিসেস টেগোর, তোমার ফ্রস্টবাইট ইনফেকটেড হয়ে 
গেছে, তাই অন্য ডক্টর সারাতে পারেননি। আর আমি এতদিন ধরে গবেষণা 
করছি কী করে উতন্ড ডিস-ইনফেকটেড করা যায় তাই নিয়েই। ফলে আমি যে 
ওষুধ দেব, অন্য ডক্টর তা দিতে পারতেন না। ইউ আর রিয়েলি লাকি। 

ডনকিনস বলেন, ডক্টর, তুমি যে ওর ওপর এক্সপেরিমেন্ট করছ নিজের 
ইচ্ছেমতো, এইসব ড্রাগ তো এখনও আ্যাপ্রভড নয়, কোনও ইংরেজ মহিলার 
ওপর এই এক্সপেরিমেন্ট করার পারমিশন সহজে পাবে না। এতে কোনও 
রিস্ক নেই তো! 

লিস্টার চটে যান, তোমাদের যদি আমার ওপর ট্রাস্ট না থাকে, আমি চলে 
যাচ্ছি। তোমার কোনও ধারণা নেই আমি রোজ এই পদ্ধতিতে কত রোগীর 
চিকিৎসা করি। আ্যান্টিসেপটিক নিয়ে আমার আবিষ্কার ত্যাপ্রভঙ তো বটেই, 
অলরেডি মাচ ডিসকাসড। উন্ড-ড্রেসিংয়ে কাবলিক আযাসিড ব্যবহার করে 
আমি আমপুটেশন পেশেন্টদের ডেথরেট কত কমিয়ে দিয়েছি তুমি জানো? 
জানো আমার নামে এ বছরের যুগান্তকারী একটি আবিষ্কার লিস্টারিন 
মাউথওয়াশের নাম রাখা হয়েছে? আমার নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার নাম 
রাখা হয়েছে লিস্টারিয়াঃ তোমার ট্রাস্ট না থাকে, রুটিন ড্রাগ লিখে দিচ্ছি, 
দেখো মিসেস টেগোরকে বাঁচাতে পারো কি না। কিন্তু ইউ হ্যাভ নো রাইট টু 
ইনসাল্ট মি। আমি চললাম। রি 

লিস্টারকে রাগ করতে দেখে জ্ঞানদা ভয় পেয়ে যান, দুবল শরীরে উঠে 
বসে লিস্টারের হাত আঁকড়ে ধরেন, ডোন্ট লিভ মি এঞ্জেল! তুমি চলে গেলে 
আমি আর বাঁচব না। দেখো এই দ্ুবল বিদেশিনিকে ফেলে তুমি চলে যাবে? 
তুমি যে ওষুধ দেবে, তাই খাব। যা বলবে করব। প্লিজ ডোন্ট ডেসার্ট মি। 

ডনকিনসও তাড়াতাড়ি বলেন, আমি তা বলিনি ডক্টর, প্লিজ ডোন্ট 
মিসানডারস্ট্যান্ড মি। আমি ভয় পাচ্ছি গানাডার কিছু হলে ওর বাড়ির লোকেরা 
আমাকে দুষবে। বাট আই ট্রাস্ট ইউ সেজন্যেই তো ডেকে এনেছি। 


১৭৭ 


লিস্টার কিছুটা নরম হন। এদিকে তার ইন্ডিয়ান পেশেন্ট বিছানায় শুয়ে 
পড়েছেন আবার, হঠাৎ উত্তেজনার ধকল সামলাতে চেষ্টা করছেন আর 
বিড়বিড় করে বলছেন, ডোন্ট লিভ মি, প্লিজ ডোন্ট লিভ মি এঞ্জেল। 

বিছানায় মিশে থাকা শীর্ণ বিদেশিনির ইথারিয়াল সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে 
জাগিয়ে তোলার জন্য ডাক পাঠাচ্ছে তাকে। লিস্টার আলতো করে জ্ঞানদার 
গালে টোকা দিয়ে বলেন, মাই ইন্ডিয়ান প্রিন্সেস, আমি তোমাকে সারিয়ে না 
তুলে কোথাও যাব না। রোজ সকালে এসে তোমাকে দেখে যাব আমি। 

লিস্টারের আঙুলগুলি নিজের গালে চেপে ধরে পরম নিশ্চিন্তে চোখ 
বোজেন জ্ঞানদা, তার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে। 
মেয়েরা। সত্যেনের এরকম হঠকারিতার ফল ভূগতে হচ্ছে বেচারি জ্ঞানদাকে, 
সকলেই এজন্য সত্যেনের ওপর বিরক্ত। 

মিসেস ডনকিনসের এ ব্যাপারে প্রখর মতামত। তিনি বলেন, গানাডা, 
কিছু মনে কোরো না, পুরুষরা এমনিতেই দায়িত্বজ্ঞানহীন। আর তোমার 
স্বামীটি তো দেখছি ইরেসপন্সিবলের চুড়ামণি। 

জ্ঞানদার স্বামীর ওপর প্রবল অভিমান, তবু মিসেস ডনকিনসের মুখে 
পতিনিন্দা তার ভাল লাগে না। তাড়াতাড়ি বলেন, না না মিসেস ডনকিনস, 
তিনি খুব কেয়ারিং। আমাকে স্বাবলম্বী করার জন্যই একা একা পাঠিয়ে 
দিয়েছেন, এজন্য আমাদের কত বিরোধিতা সহ্য করতে হয়েছে জানো! 

তা হোক, ডনকিনস বলেন, তুমি জানো না গানাড়া, পুরুষেরা বউকে 
টেকেন ফর গ্রান্টেড ধরে নেয়, মানুষ বলে মনে করে না। তুমি জানো, 
আমাদের ফেমিনিস্ট মেয়েরা ১৮৪০ সাল থেকে ভোটাধিকারের জন্য লড়াই 
করছে, এখনও পর্ধস্ত আমরা সেই দাবি আদায় করতে পারিনি। দেশটা কি 
শুধু ছেলেরা চালায়? আমরা মুখের কাছে খাবার জোগান না দিলে, সাজিয়ে 
গুছিয়ে অফিসে না পাঠালে, হোম ম্যানেজমেন্ট না করলে ওরা সব অচল 
হয়ে যাবে। তবু ওরা আমাদের নাগরিক অধিকার দেবে নাঃ 

জ্ঞানদা বলেন, আমাদের দেশে তো ছেলেরাও ভোট দেয় না, ইংরেজ 
শাসকদের বেছে নেওয়ার কোনও সুযোগ দেওয়া হয় না আমাদের। তোমরা 
স্বাধীন দেশের নাগরিক তাই এ-সব ভাবতে পারছ। 

১৭৩ 


তোমাকেও ভাবতে হবে গানাডা, ডনকিনস উত্তেজিত হন, অনেকরকম 
পলিটিক্স আছে, তার মধ্যে ওল্ডেস্ট পলিটিক্স হল নারী-পুরুষে। বছর দুয়েক 
আগে জন স্টুয়ার্ট মিলের “দি সাবজেকশন অফ উইমেন" বইটা বেরিয়ে 
আমাদের দেশে তো হুলুস্থুলু পড়ে গেছে। মেয়েদের কথায় ওরা কান দেয়নি 
কিন্তু এখন মেয়েদের পক্ষ নিয়ে একজন পুরুষ এরকম ধারালো যুক্তি 
দেওয়ায় পুরুষেরা খুব বেকায়দায় পড়ে গেছে আর মেয়েরা উজ্জীবিত। আমি 
তোমাকে পড়তে দেব। 
সত্বেও আমার মধ্যে স্ত্রীস্বাধীনতার প্রকাশ দেখতে চান, সেটা যে আমাদের 
সমাজে কত কঠিন কাজ তোমাকে বোঝাতে পারব না। আমাদের মধ্যে নারী- 
পুরুষে কোনও পলিটিক্স নেই। 

ডনকিনস বিরক্ত হন, তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ না গানাডা, এটা 
তোমার বা আমার একার স্বাধীনতার বিষয় না, একসঙ্গে সব মেয়েরা যেদিন 
রাষ্ট্রে ভোটাধিকার পাবে, পরিবারে পুণ মানুষের মধাদা পাবে, পুরুষের 
সমকক্ষ হবে, সেদিন বলা যাবে স্ত্রীস্বাধীনতা এসেছে। তোমরা যখন 
্ত্রীস্বাধীনতা নিয়ে লড়াই করছ, মিলের লেখা তোমাকে অবশ)ই পড়তে হবে 
আর তোমার স্বামীকেও পড়াতে হবে। _ 

পরদিন ডক্টর লিস্টার জ্ঞানদাকে দেখতে এসে খুশি হয়ে উঠলেন, বাঃ, আজ 
তোমাকে দেখে সত্যি প্রিন্সেস মনে হচ্ছে। তুমি তো প্রায় সেরেই গেছ। 

জ্ঞানদাও লিস্টারের পথ চেয়ে বসে ছিলেন যেন, সত্যি বলছ ডক্টর? আমি 
সত্যি সেরে উঠব? 

না না, আমাকে ডক্টুর বলে ডাকলে তো সারবে না, লিস্টার মজা করে 
বলেন, কই আজ আমাকে এঞ্জেল বলে ডাকলে না তো! 

ওষুধে কাজ হয়েছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কাজ করেছে ডক্টুরের 
উপস্থিতির টনিক। জ্ঞানদা দ্রুত সরে উঠতে থাকেন। 

কিন্তু একদিন রাতে তার হঠাৎ বাথা উঠল। এখনও সময় হয়নি, তবু 
ব্যথায় ছটফট করতে করতে তার জল ভাঙল। রামা চাকর পাশের বাড়ি 
থেকে ডনকিনসকে ডেকে নিয়ে এল। ডনকিনস অত রাতে ডক্টর ডাকবেন 
কোথেকে, কোনওরকমে এক প্রতিবেশিনী মিড-ওয়াইফ দাইকে ডেকে 
আনলেন। 


১৭৪ 


কিন্তু শেষপর্বস্ত জ্ঞানদার বাচ্চাটাকে বাঁচানো গেল না। অসুখের ফলে 
তার বাচ্চাটি ছিল রুগৃণ ও অপরিণত। জন্মের পর জ্ঞানদার কোলেই সে মারা 
গেল। সেদিন জ্ঞানদার হাপুস কান্নার সময়ে ডনকিনস ছাড়া পাশে কেউ ছিল 
না। 

প্রবাদ আছে বিপদ কখনও একা আসে না। এর কিছুদিন পরেই রামা 
চাকরের সঙ্গে সমুদ্রতীরে রোদের মধ্যে ছুটোছুটি করে জ্বর বাধাল ছোটছেলে 
চোবি, চিকিৎসার বিশেষ সুযোগ পাওয়া গেল না, দুদিনের জ্বরে সে মারা 
গেল। একসঙ্গে দুই সন্তানের মৃত্যুশোকে পাথর হয়ে নির্জন ঘরে একা একা 
বসে রইলেন জ্ঞানদা। 
কেঁদে ফেললেন। মার কান্না দেখে ছোট বিবি ও সুরেন মাকে জড়িয়ে ধরে। 
লিস্টার বিবিকে কোলে নিয়ে বলেন, সুইটি পাই, হোয়াই ডোন্ট ইউ সিং আ 
সঙ! শুনি কী গান শিখেছ স্কুলে, তোমার মায়ের মন ভাল হয়ে যাবে। 

সত্যিই বিবির রিনরিনে সুরেলা গলায় ঘরের বাতাসে খুশির ছোয়া লাগে। 
বিবির হাত ধরে নাচতে থাকেন লিস্টার। 
এ পিটি যে তোমার বাচ্চাটিকে বাঁচানো গেল না। ইংলন্ডে কোন বাচ্চাদের 
জন্মের সময়ে মারা যাবার রেট বেশি জানো, শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবে, যারা 
হসপিটালে সার্জেনের হাতে জন্মায়। তুলনায় যারা মিড-ওয়াইফের হাতে হয় 
তাদের বেঁচে থাকার রেট বেশি। 

সেকী, জ্ঞানদা সত্যি অবাক হন, মিড-ওয়াইফরা তো আধুনিক বিজ্ঞানের 
কিছুই জানে না? আমি তো ভাবছিলাম ডক্টর ডাকতে পারলে আমার বাচ্চাটা 
বেঁচে যেত, দাইয়ের হাতে বলেই মারা গেছে। 

না প্রিন্সেস, জোসেফ বলেন, সার্জেনদের হাত ধোয়ার অভ্যেস নেই। 
অনেক সময়েই হসপিটালের একজন রোগীর ঘায়ে ওষুধ লাগিয়ে হাত 
না ধুয়েই আর একজনের বাচ্চা ডেলিভারি করতে চলে যায়। এ থেকেই 
ইনফেকশন। কিন্তু মিড-ওয়াইফদের বারবার হাত ধোয়ার বাতিক আছে, তাই 
ওদের হাতে মরে কম। তোমার ক্ষেত্রে দাইয়ের বোধহয় কোনও দোষ ছিল 
না, তোমার অসুখের ধকল বাচ্চাটা নিতে পারেনি। লেট আস প্রে ফর হিজ 
পিসফুল আফটার লাইফ। 


১৭৫ 


কিছুক্ষণ নীরবতার পর লিস্টার জ্ঞানদার দিকে একটা সুন্দর রঙিন গিফট 
চকলেট এনেছি, লেট আস সেলিব্রেট ইয়োর গুড হেলথ । ওয়াইন পান 
স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল। 

একটি রক্তাক্ত হৃদয় সেইমুহূর্তে আর-একটি হৃদয়ের কাছে কিছুক্ষণের 
নীড় খুঁজে পেল। দুটি রক্তিম ওয়াইন গ্লাস আকাশে পরস্পরকে চুম্বন করল। 
ঘিরে বড়দিনের পার্টি সাজালেন জ্ঞানদা। 


আরও কয়েকমাস পরে দু”-তিনবার জাহাজ বদল করে আলেকজান্দ্রিয়া, 
প্যারিস, লন্ডন হয়ে ব্রাইটন পৌঁছলেন রবি ও সত্যেন। সময় লাগল প্রায় 
দিন কুড়ি। মেদিনা ভিলায় পৌঁছে দীর্ঘদিন পরে প্রিয়মুখ দেখার আশায় কড়া 
নাড়লেন সত্য্ন্দ্র, কিন্তু বাড়ির দরজা খুললেন ইংরেজ ল্যান্ডলেডি। 

রবি ও সত্যেন বাড়ির ভেতরে ঢুকতে অবশ্য বেশ মজা হল। জ্ঞানদা 
ছেলেমেয়েদের নিয়ে সেজেগুজে অপেক্ষা করছিলেন। বিবি ও সুরেন 
ইতিমধ্যে স্কুলে যাচ্ছে, কলকাতার স্মৃতি কিছুটা ফিকে হযে এসেছে। 
কয়েকদিন ধরেই তারা শুনছে “পাপা আসছে, পাপা আসছে।? 

বিবির ধারণা ছিল তাদের “পাপা” তার স্কুলের বন্ধুদের পাপাদের মতোই 
হ্যাটকোট পরা সাহেব মানুষ। কিন্তু সত্যেনকে দেখে তার সেই ধারণায় ধাক্কা 
লাগল প্রথমেই। সত্যেন ফুটফুটে পরির মতো বিবিকে কোলে নেওয়ার জন্য 
হাত বাড়াতেই সে ছুটে পালিয়ে গেল। 
পাপা! হি ইজ নট হোয়াইট! 

সত্যেন বুঝলেন বিলেতের সব শিক্ষাই ভাল নয়, এখানকার চাপা বর্নভেদ 
শিশুর অবোধ মনের গভীরে ঢুকে পড়েছে। এই অন্ধকার তাড়ানোই হবে 
তার প্রথম কাজ। মেয়ের সঙ্গে ভাব করতে অনেক সময় ব্যয় হল। 

আমার বিলিতি বউও কি পালটে শেছে? কালো বরকে আদর করবে 
তো? সত্যেন মজা করে জানতে চান জ্ঞানদার দিকে তাকিয়ে। 

জ্ঞানদা তখন যত্ব করে ডিনার সাজাচ্ছেন। বিলেতে কায়দাকানুন কতটা 
শিখেছেন দেখিয়ে চমকে দিতে হবে না সত্যেনকে! কটাক্ষ করে তিনি 
১৭৬ 


স্বামীকে বললেন, খুব তো একা একা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এখন আবার 
ঠেস দেওয়া হচ্ছে! মরেই যেতাম, নেহাত ডক্টর লিস্টার মরতে দিলেন না, 
তাই। এখন কত সাহেব ইলোপ করার জন্য সাধাসাধি করছে তা জানো? 

কে তোমাকে ইলোপ করতে চায় একটু শুনি, সত্যেন মজা পেয়ে জানতে 
চান, সেই তোমার ডক্টর লিস্টার নাকি! 

আহা, তার তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই! জ্ঞানদা ব্লাশ করেন। সত্যেন 
অবশ্য বউয়ের গালের সেই ঈষৎ লালিমা লক্ষ করেন না। 

ধন্যি মেয়ে তুমি মেজোবউঠান, রবি চারদিকে তাকিয়ে বলেন, কোথায় 
লোকলশকরে ভরা কলকাতার বাড়ি আর কোথায় এই নিরালা ভিলায় একলা 
থাকা, তুমি বলেই পারলে। আমাকে এমন একা ছেড়ে দিলে কবে পালিয়ে 
যেতৃম। এত কষ্ট কেন করলে বলো তো? 

বা রে, ছেলেমেয়েদের বিলিতি কেতা শেখাতে হবে না? জ্ঞানদা বললেন, 
তা ছাড়া তোমার মেজদাদা আমাকে মেমসাহেবি কায়দাকানুন শেখাতে 
চেয়েছিলেন, ঘরের কোণের বাঙালি বউ তার পছন্দ নয়। এখানে এসে না 
থাকলে এতসব শিখব কী করে? 

দেখি এখন কী শিখলে ঃ জ্ঞানদার কাধে হাত রেখে সত্যেন বলেন, 
তোমাদের এখানে পাঠিয়ে দিয়ে আমি যে এতদিন একা একা থাকলাম, সেই 
কষ্টট। উসুল করে নিতে হবে না এবার! 

আমার ল্যান্ডলেডিটি বেশ ভাল, জ্ঞানদা জানান, তিনি আমাকে 
অনেককিছু শিখিয়েছেন। এখানে বাড়িঘরে কোনও ধুলো থাকা চলবে না, 
সব ঝকঝকে করে সাজিয়ে রাখা চাই। কিন্তু আমাদের দেশের মতো জল 
ব্যবহার করা যায় না, গৃহিণীর পকেটে একটি বড় ন্যাপকিন থাকে, সেই 
সব-পরিষ্কারক ন্যাতা দিয়ে টেবিল চেয়ার আসবাব থেকে খাবার প্লেট প্যস্ত 
সবই পরিষ্কার হয়, তারপর আবার ময়লা সমেত সেটা ঢুকে যায় গৃহিণীর 
পকেটে। আমাকে উনি বলেছেন সবসময়ে কোটের পকেটে ন্যাপকিন গুজে 
রাখাই গৃহপরিচ্ছন্নতার মুল মন্ত্র। চলবে ফিরবে আর যেখানে ধুলো দেখবে 
ন্যাপকিনে মুছে ফেলবে। 

রবি হা হা করে হেসে ওঠেন, মেজোবউঠান, তুমি কি সেই সবশোধক 
ন্যাপকিনে পরিষ্কার করা প্লেটেই আমাদের বিলিতি ডিনার দিচ্ছ নাকি? 

পাগল! জ্ঞানদা হেসে ওঠেন, আমি রামা চাকরকে দিয়ে আচ্ছা করে 

১৭৭ 


গরমজল দিয়ে সব ধোয়ামোছা করাই। জল না দিলে আমার কিছুই পরিষ্কার 
হয় না। 

তবে আর কী শিখলে বউঠান, জল না দিয়ে পরিষ্কার করাই তো এখানকার 
ম্যাজিক! রবি ঠাট্টা করেন, তুমি তো সেই বাঙালি বউ রয়ে গেলে। 

সত্যেন বলেন, রবি জানিস তো, এখানে স্দিকাশি হলে সাহেবরা 
ন্যাপকিনে নাক ঝাড়েন, ন্যাপকিনেই কফথুতু ফেলেন, আবার সেটা পকেটে 
ঢুকিয়ে রাখেন পরেরবারের জন্য। 

ছিঃ! রবির গা শিউরে ওঠে ঘেন্নায়। বলেন, আমাদের দেশের মতো এরা 
বাড়িতে পিকদান রাখলেই পারে, তাতে পকেট নোংরা হয় না। 

জ্ঞানদা মাথা ঝাকিয়ে হেসে বললেন, না না রবি, ওদের চোখে পিকদান 
খুব ন্যাস্টি দৃশ্য। অমন নোংরা জিনিস ওরা ঘরে রাখবে না, পকেটের 
ন্যাপকিন তো দৃশ্যমান নয়। এখানে চোখের পরিচ্ছন্নতা সবার আগে। এরা 
খেয়ে উঠে কুলকুচো করে না কারণ মুখ থেকে জল পড়া দেখতে খারাপ। 
সাহেবদের শোকবস্ত্রও সুদৃশ্য করে তৈরি। 

ডিনার টেবিলে বসে খাওয়া শুরু করে রবি বলেন, দেখে শুনে যা বুঝছি 
মেজোবউঠান, এদের ঘরে শ্রী আছে কিন্তু পরিচ্ছন্নতা নেই। এরা সুশ্রী কিন্ত 
নোংরা। এই শেখার জন্য আমাদের প্রবাসে আসতে হল! 

না রবি, সত্যেন প্রতিবাদ করেন, এদের অনেক ভাল স্বভাব আছে, সেই 
গুণগুলো আয়ত্ত করার জন্যই আমরা এখানে এসেছি। ওদের ভালর সঙ্গে আমাদের 
ভালটা মিশিয়ে নিতে পারলেই আমাদের পূর্ণার্গ পরিশীলন হবে। জ্ঞানদার দিকে 
তাকিয়ে তিনি বলেন, তবে তোমার বিলিতি ডিনারটা বেশ এনজয় করছি। 

রবি ফোড়ন কাটেন, হ্যা, বেশ আলুনি আর আঝালি। বউঠান, তুমি 
এ-সব আলুসেদ্ধর সুপ আর পাউরুটি রান্না করতে করতে আসল রান্নাগুলো 
যেনু ভুলে যেয়ো না। 

রোস্ট. চিকেনটা আমি রেঁধেছি, বাকি সব ল্যান্ডলেডির কিচেন থেকে, 
জ্ঞানদা বললেন, শোনো রবিঠাকুরপো, তোমার ভয় নেই, আমি এ-সব 
বিশেষ রাধছি না। খাবার সাপ্লাইয়ের দায়িত্ব বাড়িওলির। তার কল্যাণেই 
রোজ আমাদের প্রকৃত ইংলিশ ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার জুটবে। 

ওরে বাবা, রবি আতকে ওঠেন, তা হলে তো আমাকে শিগগির পালাতে 
হবে বউঠান। 


১৭৮ 


পালাব বললেই হল! সত্যেন ধমকে ওঠেন, চারদিকে ঘুরে দেখ রবি কত 
বঙ্গযুবক এই ইংরেজ বাড়িওলির সঙ্গ পেয়ে ধন্যবোধ করছে। কোট হ্যাট 
গাউন পরা জলজ্যান্ত বিবিসাহেবদের এত কাছে আসার সৌভাগ্যে পাগল 
হয়ে যাচ্ছে। 

সে তো জাহাজেই নমুনা পেয়েছি মেজদাদা। রবি হেসে বলেন, জানো 
বউঠান, জাহাজে কয়েকটি ভারী মজার ইঙ্গবঙ্গ যুবক ছিল। তারা জাহাজের 
ইংরেজ চাকরদের হুকুম করার বদলে স্যার বলে ডাকেন। নামার সময়ে ইংরেজ 
গার্ড এসে সাহায্য করলে বঙ্গযুবারা আন্রাদে গলে পড়েন। সাহেবগার্ডের 
একটি সেলামের বদলে এক শিলিং বখশিস দিয়ে ধন্য হন। আমার এক 
সহ্যাত্রীর কাছে শুনেছি ল্যান্ডলেডির সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা। 
কার্পেট পাতা, ছবি টাঙানো, ফুলভরা ফুলদানি সাজানো, পিয়ানো শোভিত 
ভাড়া ঘরে ঢুকেই তো প্রথমে ঘাবড়ে গেলেন, এত দামি ঘরে থাকবেন কী 
করে? তিনি তখনও জানেন না যে বিলেতের সব ঘর এরকম, বরং কোনও 
মাদুরপাতা চৌকি দেওয়া ঘরই দুশ্প্রাপ্য। তার ওপর যখন ইংরেজ বাড়িওলি 
এসে বিনীত স্বরে গুড মনিং বললেন, তখন তো তার দিশাহারা অবস্থা। 

জ্ঞানদা হেসে গড়িয়ে পড়েন, তারপর তার সেই বাড়িওলির সঙ্গে ভাব হল 
কি না? এখানে তো ল্যান্ডলেডির কেয়ারেই জীবন সঁপে দিতে হয়। 

রবি হাসতে হাসতে জানান, ক্রমশ ল্যান্ডলেডির সঙ্গে তার এতই আলাপ 
জমে উঠল যে এখন তার মেয়ের সঙ্গে ফ্লার্ট করা পধস্ত এগিয়ে গেছেন 
তিনি। 

সকলের সমবেত হাসির মধুর উত্তাপের মধ্য দিয়ে সেদিনের মতো ডিনার 
শেব হল। 

পরদিন থেকে ব্রাইটনের জীবন টিমে তালে গড়িয়ে চলল। সকাল সাড়ে 
আটটা নাগাদ ঘুম থেকে ওঠা, তারপর স্নান। রবি রোজ ঠান্ডা জলে আপাদমাথা 
ভিজয়ে ন্নান করেন, এখানকার রীতি মতো শুধু গরমজলে গা মুছে নেওয়া তার 
পোষায় না। ল্যান্ডলেডি ব্রেকফাস্ট পাঠান নস্টায়। টোস্ট ওমলেট দুধ পরিজের 
ইংলিশ ব্রেকফাস্টের পর কিছুক্ষণ নিজের নিজের কাজ, পড়াশোনা, সুরেন বিবির 
সঙ্গে খেলাধুলার পর বেলা দেড়টায় লাঞ্চ। দিন শুরু বলতে গেলে নস্টার আগে 
হয় না, আবার চারটের মধ্যে আলো মরে আসে। রবির মনে হয়, এখানকার 
দিনগুলো যেন দশটা পাঁচটার অফিসবাবু। আর রাতগুলো ঘোড়ায় চেপে আসে 


১৭৯ 


আর পায়ে হেটে ফেরে, যেন ফেরার ইচ্ছেটাই কম। বিকেলে একবার কেক 
বিস্কিট সহযোগে চা পাওয়া যায় তারপর রাত আটটায় এলাহি ডিনার। 

ব্রাইটনের সমুদ্রতীর তখন খুব উপভোগ্য। অক্টোবরে শীত তেমন পড়েনি, 
ব্রেকফাস্টের পর বেলা দশটা-এগারোটা নাগাদ প্রায়দিনই ওঁরা সি-বিচে চলে 
আসেন। ঝকঝকে রোদে সাহেবমেমরা মহানন্দে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে 
পড়েছে। কগৃণ আর বৃদ্ধদের হুইলচেয়ারে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে বাড়ির লোকেরা। 
মেয়েদের নানারকম সাজপোশাক দেখে রবির তাক লেগে যায়। কী সহজ 
স্বচ্ছন্দ এই সাগরপারের মেয়েগুলি! রবির মনে পড়ে যায় ঘরে ফেলে আসা 
প্রিয়মুখটি। আহা আমার নতুনবউঠান যদি এমন স্বাধীন আনন্দে সাগরপাড়ে 
ঘুরে বেড়াতে পারতেন! 

সুরেন আর বিবির ছুটোছুটির সঙ্গে জ্ঞানদা পেরে ওঠেন না, রামা চাকর 
যত তাদের পেছনে দৌড়য় তত তারা রবির গায়ে এসে ঝাপিয়ে পড়ে। রবি 
ওদের নিয়ে ঝিনুক কুড়োতে শুরু করেন। রংবেরঙের ছাতার নীচে শুয়ে-বসে 
আছে স্বল্পবাস সুন্দরীরা, ইতালীয় ভিখারি তাদের সামনে অর্গান বাজিয়ে 
ভিক্ষা চাইছে। রবি মজা পেয়ে বলেন, দেখো বউঠান, ওই ভিখারিবা কেবল 

জ্ঞানদা বললেন, মনে হচ্ছে ওরা সৌন্দেক্র ভিখারি, টাকাপয়সা না হলেও 
চলবে। তবে ওদের আর কী দোষ, তুমিও তো ঘুরেফিরে ওদের দিকেই 
তাকিয়ে আছ রবিঠাকুরপো ! 

বউঠান, তোমার কাজলটানা ভারতীয় নয়নেও যে সুইমস্যুট পরা 
গোরাসাহেবদের রূপ ধরা পড়ছে না এমন কথা তো বলতে পারছি না। 

কী যে বলো, ছি! অমন রূপ দেখলে আমার চোখ জ্বালা করে। ঝাঝিয়ে 
ওঠেন জ্ঞানদা, ওইরকম উলঙ্গপনার চেয়ে পোশাকের সৌন্দর্য অনেক বেশি, 
এটা যে এরা কবে বুঝবে। ভারতীয় রুচি অনেক পরিশীলিত। 

রবি হাসেন, তা হলে তো এখানে এসে তুমি আরও বেশি বেশি বাঙালিনি 
হয়ে যাচ্ছ, কোথায় তোমাকে বিলিতি কালচার শেখাতে আনা হল, আর 
তুমি দিনকে দিন আরও কট্টর ইংরেজাবদ্বেষী হয়ে যাচ্ছ! আমি তো কল্পনা 
করেছিলাম এখানে এসে কেতাদুরস্ত গাউন শোভিত হ্যাট পরিহিত মিসেস 
টেগোরকে মিট করব, আর সেই তুমি কিনা বাংলার বালুচরী পরে ব্রাইটনের 
সমুদ্রতীরে রোদ পোয়াচ্ছ 


১৮০ 


মিষ্টি হেসে জ্ঞানদা বলেন, আমার এই ভাল, দেখছ না সবাই ঘুরে ঘুরে 
কেমন আমাকেই দেখছে! আমার গায়ে আমার দেশের পতাকা লাগানো 
আছে। 

আজকাল মাঝে মধ্যেই ডিনার বা বল ডান্স বা ইভনিং পার্টির নেমন্তন্ন 
থাকছে। ইংরেজ সমাজে ওঁদের মেশামেশির পালা শুরু হল একটি সান্ধ্য 
নিমন্ত্রণে। এতদিন জ্ঞানদা একা ছিলেন, এখন তার স্বামী যোগ দেওয়ায় 
প্রতিবেশী ইংরেজদের আনাগোনা, আমন্ত্রণ নিমন্ত্রণ শুরু হয়েছে। 
সেদিন। ঘরে ঢুকেই হোস্ট ও হোস্টেসকে অভিবাদন জানানোর পালা। 
তারপর বাকিদের সঙ্গে আলাপ। ঘরে জায়গা কম তাই সবার বস/র চেয়ার 
নেই। মহিলারা কৌচে বসে গল্প শুরু করলেও পুরুষরা অধিকাংশ দাড়িয়ে 
দাড়িয়ে কথাবার্তা বলছেন। নতুনদের সঙ্গে আলাপ শুরু ওয়েদার টক দিয়ে। 

এ-সব আসরে পোশাক আসাকের ফ্যাশন খুব গুরুত্বপূর্ন। পুরুষদের 
সান্ধ্য পোশাকের শাট হতে হবে ধবধবে সাদা, তার ওপর বুক খোলা কালো 
ওয়েস্টকোটের ওপর থেকে সাদা শার্টের কলার উকি দেবে। গলায় সাদা 
নেকটাই। সবার ওপরে সামনে কোমর পর্যন্ত কাটা টেল কোট। রবি ও সত্যেন 
ইংরেজদের স্টাইলে টেল কোট পরে গেলেও জ্ঞানদা শাড়িই পরলেন। তার 
মেরুন বালুচরী ও পশমিনা শাল নিয়ে ইংরেজ মহিলারা উচ্ছৃসিত হয়ে নানা 
প্রশ্ন শুরু করলেন। মিসেস মারলোর মতে সেলাই করা গাউনের চেয়ে 
জ্ঞানদার ভীজে ভীজে বিন্যস্ত শাড়ি আরও লালিত্যময়। 
ছোয়া লাগে। লিস্টার তাকে নাচে আহান করলে জ্ঞানদা সত্যেনের দিকে 
তাকান। 

সত্যেন সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, যাও না জ্ঞানদা, ডক্টর লিস্টার তোমাকে 
পার্টনার হতে ডাকছেন, ইটস আ অনার! 

জ্ঞানদা ও লিস্টারের নৃত্যরত জুটিকে বেশ মানিয়েছে। সত্যেনের মনে 
কি একটু খোঁচা লাগছে! তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকেন, মনে মনে 
পরেও যদি পুরুষ হিসেবে জ্ঞেনুর চোখে তিনি আকর্ষণীয় থাকেন, তবেই 
তার পৌরুষের জিত। 


১৮১ 


কবে এলেন ব্রাইটনে? লিস্টারকে জিজ্ঞেস করেন জ্ঞানদা। জোসেফ 
লিস্টার স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় চিকিৎসা এবং অধ্যাপনা করেন, মাঝে 
মাঝে ব্রাইটনে আসেন, যেমন কিছুদিন ছিলেন জ্ঞানদার অসুখের সময়ে। 
চিকিৎসা করি কিন্তু তোমাকে সারিয়ে তুলে যেরকম আনন্দ পেয়েছি, সেটা 
স্পেশাল। 

আপনি ব্রাইটনে থেকে যাচ্ছেন না কেন? জ্ঞানদা আবদার করেন বালিকার 
মতো, তা হলে অসুখ করলেই আপনার দেখা পাওয়া যেত। আপনাকে 
দেখলেই আমার শরীর মন সব ভাল হয়ে যায়। 

তাকি হয় প্রিন্সেস, তুমি যেমন একটা নিদিষ্ট জীবনে বাধা, আমিও তেমনি, 
লিস্টার হেসে বলেন, ওখানেই আমার স্ত্রী আগনেস, ওখানে আমার কাজ, 
আমার রোগীরা। ওখানে কাজ করেই আমার সম্মান স্বীকৃতি সব। সে-সব 
ছেড়ে কি আসা যায়? তুমিই কি পারবে তোমার স্বামী ছেড়ে দেশ ছেড়ে অন্য 
কোথাও সেটল করতে? কেন করবেই বা! 

আপনি স্ত্রীকে খুব ভালবাসেন? জ্ঞানদা জানতে চান। 

লিস্টার বলেন, আ্গনেস আমার সব কাজের সঙ্গিনী, আ।র ঘরের 
গৃহিণী, আমার ল্যাবের আ্যাসিস্টান্ট। 

উনিও কি আপনার মতো ডক্টর? জ্ঞানদা অবাক হন। বিলেতেও মহিলা 
ডক্টর খুব বেশি দেখা যায় না এখনও। 

উনি মেডিক্যাল সায়েন্সের ছাত্রী, আমার গুরুকন্যা। লিস্টার জানান, 
আাগনেস ভাল ফরাসি জানে, ওর অনুবাদ করা লুই পাস্তরের থিয়োরি 
পড়েই জাম্ন ইনফেকশনের ব্যাপারে আমার চোখ খুলে যায়। 

বাঃ, জ্ঞানদা সত্যি খুশি হন, স্বামী স্ত্রীর এরকম জুটি তো আদরশশ। আমাদের 
দেশে এরকম যে কবে হবে তাই ভাবছি। আর কোনওদিন দেখা হবে কি না 
জানি না, তোমাদের কথা আমার সবসময়ে মনে থাকবে। 

দেখা হোক বা না হোক, লিস্টার গাঢস্বরে বলেন, আমার প্রিন্সেস 
যেখানেই থাক, যেন সবসময়ে ভাল থাকে। কোনও দুঃখ যেন তোমার হাসি 
মুছে দিতে না পারে। 

রবির সঙ্গে আলাপ করতে এগিয়ে আসে এক সুন্দরী বিলেতবালা আর 
সবার চোখ ঘুরে আসে সেইদিকে। এখানে রূপের পুজা হয় সাড়ম্বরে, 


১৮ 


রূপসির চারপাশে স্তাবকেরা ঘুরঘুর করে একটু হুকুম তামিল করার জন্য। 
রূপ এখানে লুকিয়ে থাকতে পারে না। মিস মিলি রবির সঙ্গে কথা বলছেন 
আর তখনই কত ইংরেজ যুবক ত্বাকে নাচের সঙ্গী হতে ডাক দিচ্ছেন। 

এরপর শুরু হল গানবাজনার আসর। গৃহকর্তা এক সুসজ্জিতা মেমসাহেবকে 
অনুরোধ করতেই তিনি পিয়ানো বাজাতে বসলেন আর পিয়ানোর রিডের 
ওঠানামার সঙ্গে তার দশ আঙুলের আংটি ঝিকমিকিয়ে উঠতে লাগল। যেন 
পিয়ানো বাজানোর জন্যেই তিনি আুলগুলি সাজিয়েছেন। কিছু পরেই 
রবির বিপদ ঘনিয়ে এল। তাকে গান গাওয়ার অনুরোধ করে বসলেন বাড়ির 
গৃহিণী। রবি জানেন এরা ভারতীয় গানের কদর বোঝে না, এদের সামনে 
গান গাওয়ার কোনও মানে হয় না। তবু চারদিক থেকে অনুরোধ আসতে 
থাকায় তিনি এড়াতে পারলেন না। 

কিন্তু রবি গাইতে শুরু করতেই ক্রমশ সমবেত ইংরেজ নারীপুরুষদের 
ঠোটের কোনায় হাসি ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কোনও কোনও মহিলা হাসি 
চাপতে না পেরে নিচু হয়ে রুমাল কুড়ানোর ছলে হেসে নিলেন। কেউ আবার 
বান্ধবীর পিঠে মুখ লুকিয়ে হাসলেন। যাঁরা হাসি চাপতে সক্ষম হলেন তাদের 
চোখে চোখে যেন টেলিগ্রাফ চলতে লাগল। পিয়ানোবাদিকা মহিলার মুখে 
তাচ্ছিল্যের ভাব দেখে রবির গায়ের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছিল। এমনকী মিলির 
মুখেও হাসি লেগে আছে দেখে রবি যেন মরমে মরে যাচ্ছিলেন। গান গেয়ে 
এমন অপদস্থ আর কখনও হননি। কোনওরকমে গান শেষ করে রবির 
মুখচোখ লাল হয়ে উঠল। 

ঘরে মৃদু প্রশংসাধ্বনি উঠলেও অত হাসির পর রবি আর সেটাকে 
বিশ্বাসযোগ্য মনে করলেন না। ঘরের আবহাওয়ায় তার অসুস্থ লাগছি। 
মিলি এগিয়ে এসে গানের মানে জিজ্ঞেস করলে রবি “প্রেমের কথা আর 
বোলো না" অনুবাদ করে বোঝাতে চাইলেন। তাতে কেউ মন্তব্য করলেন 
(তোমাদের দেশে প্রেমের স্বাধীনতা আছে নাকি? 

জ্ঞানদা রবির এরকম হেনস্থা আর সহ্য করতে পারছিলেন না। তার 
হাত ধরে টেনে নৈশভোজের ঘরে নিয়ে গেলেন। এখানে সবাই একসঙ্গে 
খেতে যাচ্ছে না, তা হলে পার্টির রস বিদ্মিত হয়। জোড়ায় জোড়ায় হাত ধরে 
কয়েকজন পালা করে খাবারঘরে যাচ্ছে। 

জ্ঞানদা ফিসফিস করে রবিকে বললেন, এরা নিজেদের কালচারের বাইরে 


১৮৩ 


সবকিছু নিয়ে হাসাহাসি করে, আসলে এরাই অশিক্ষিত। তোমার অপূর্ব 
গানটির মম বুঝতেই পারল না, আজ তুমি খুব ভাল গেয়েছ রবি। 

মেজোবউঠানের সাস্তবনায় রবির চোখ চিকচিক করে ওঠে। বলেন, এরা 
যে রাজার জাত বউঠান, রাজদণ্ডের জোরে অন্যের সভ্যতাকে উপহাস করার 
স্পর্ধা রাখে। তবে মেজোবউঠান, আমি ভাবছি আমি ওদের গান আয়ত্ত 
করেই একদিন ওদের অপমানের জবাব দেব। 

সত্যি রবি, জ্ঞানদা বলেন, এই যে বিলিতি মেয়েরা আমাদের গান শুনে 
হাসাহাসি করছিল, এরা প্রকৃতপক্ষে কিছুই জানে না। আমাদের দেশে যেমন 
ছেলেবেলা থেকে মেয়েদের ঘরকন্না শিখিয়ে আর লেখাপড়া না শিখিয়ে 
বিয়ের জন্য প্রস্তত করা হয়, এখানেও তেমন মেয়েদের পালিশ চলে বিয়ের 
বাজারে বিকোবার জন্য। বিয়ের জন্য যতটুকু লেখাপড়া দরকার ততটুকুই 
শেখানো হয়। একটু গান, একটু পিয়ানো, একটু সেলাই, একটু ভাল করে 
নাচা, একটু-আধটু ফরাসি ভাষা জানলেই বিয়ের বাজারের জন্য তৈরি। 

রবি হেসে বলেন, তার মানে আমাদের মেয়েরা দিশি পুতুল আর 
এখানকার গোরিমেমরা বিলিতি পুতুল, তুমি বলছ এটুকুই তফাত! আমাদের 
মেয়েরা আর এদের মেয়েরা দুই-ই দোকানে বিক্রি হবার জন্য তোর! তা হলে 
আর সাতসমুদ্র পাড়ি দিয়ে কী শিখতে এলে মেজোবউঠান £ 

এখানে এসে এইটুকু তো শিখলাম, জ্ঞানদা বলেন, না এলে ভাবতাম 
এদেশের মেয়েরা কত-না স্বাধীন, কত-না শিক্ষিত। 

হ্যা বউঠান, রবি বলেন, যা দেখছি, এখানেও পুরুষেরাই হর্তাকতা, 
স্ত্রীরা তাদের অনুগত। স্ত্রীকে আদেশ করা, স্ত্রীর মনে লাগাম লাগিয়ে 
নিজের ইচ্ছেমতো চালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টাকে এখানকার স্বামীরাও তাদের 
ভগবানদত্ত অধিকার মনে করেন। তবে বূড়লোকদের ফ্যাশনি মেয়েদের চেয়ে 
সাধারণ গেরস্থ্ঘরের মহিলাদের আমার বেশি ভাল লাগে। তাদের অনেক 
কাজ করতে হয় ঘরে-বাইরে। গৃহিণীপনা তাক লাগিয়ে দেয়। লেখাপড়া 
বেশি না শিখলেও এদেশের মেয়েদের বুদ্ধি পরিষ্কার। অনেক বিষয় জানেন। 
কথাবাতায় জ্ঞনলাভ করা যায়। এঁরা চার দেওয়ালে বদ্ধ নন। বন্ধুবান্ধব 
আত্মীয়দের সভায় কোনও বিষয়ে স্পষ্ট মতামত জানাতে পারেন। 

জ্ঞানদা ডেসার্টের দুটি প্লেট হাতে নিয়ে এসে একটি রবিকে দিতে দিতে 
বললেন, আমার ভাল লাগে এদের পারিবারিক সম্পর্কটা। সারাদিন পর কর্ত 
১৮৪ 


বাড়ি ফিরলে আগুনের চারধারে জড়ো হয়ে বসে পুরো পরিবার খোলামেলা 
কথাবাতা, গানবাজনা হয়। কী সুন্দর। 

রুপোর চামচ দিয়ে ক্যারামেল পুডিং মুখে তুলতে তুলতে রবি বলেন, 
এখানে নারীপুরুষের সম্পর্কটাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয় না বলেই 
তা এত খোলামেলা ডানা মেলেছে। আপিস থেকে বাড়ি ফিরে যেমন 
পোশাকি কাপড়জামা ছেড়ে হাফ ছেড়ে বসে লোকে, তেমনি আনুষ্ঠানিক 
ব্যবহারের খোলস ছেড়ে মন খুলে আপনজনের সঙ্গে কথা বলতে চায়। 
তখনও কেন বউয়ের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলতে হবে, পাছে পাশের 
ঘর থেকে শ্বশুর-ভাশুর শুনে ফেলেন! স্ত্রীর গলা বা হাসি শোনা গেলে 
কেন মহাভারত উলটে যাবে! এজন্য বিলিতি বাঙালিরা দেশে ফিরে খুঁতখুঁত 
করে যে আমাদের কোনও হোম নেই, বিলেতেই যথার্থ হোম আছে। কারণ 
বিলেতের পরিবারে একটা স্বাধীন উচ্ছাসের ছোয়া পাওয়া যায়। সারাদিনের 
পরে বাপ মা ভাই বোন স্ত্রী সম্তান মিলে বাড়ির মধ্যে অগ্নিকুণ্ডের চারধারে 
আনন্দের উৎস তৈরি হয়। 

হ্যারে রবি, সত্যেন এসে যোগ দেন ওদের আলাপে, এদেশে এরা কী 
পরিবারের ভেতর কী বাইরে, নারীপুরুষের মেলামেশাটাকে খুব গুরুত্ব দেয়। 
সেজন্য এখানকার মেয়েরা স্বাধীন না হয়েও নিজেদের প্রাণের স্ফৃর্তি মেলে 
ধরতে পারে। স্বামীকে সবার সামনে শাসন করতেও পারে আবার চুমুও খায় 
নিঃসংকোচে। 

রবি ও জ্ঞানদার খাওয়া শেষ হয়েছে তাই সত্যেন খাবার ঘরে এসেছেন। 
সবাই একসঙ্গে খেতে চলে আসা ঠিক হবে না বলেই এই ব্যবস্থা। কিন্তু তাকে 
পেয়ে ওদের পারিবারিক আড্ডা যেন জমে উঠল। 

এরকম সান্ধ্য চা-সভা, নৈশভোজ, নাচের আসর, বল, লন পার্টি লেগেই 
থাকে রবিদের জীবনে। এ যেন এক অন্য জীবন, কোথায় কলকাতার গানে 
কবিতায় ভরপুর সৃষ্টির উন্মাদনা আর কোথায় এখানে সভাশোভন হয়ে ওঠার 
প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা! রবির হতাশ লাগে মাঝে মাঝেই। 

অলস দিনেরবেলায় এবাড়ি-ওবাড়ি ভিজিট পালটা ভিজিট করাও 
এখানকার প্রথা। রবি লক্ষ করেছেন, বড়ঘরের মহিলাদের সামাজিক 
আলাপচারিতে একরকম দক্ষতা আছে, অনেক অতিথি থাকলে গৃহিণী 
তার বাক্য ও হাসির অমৃত সকলকে সমানভাবে বিলিয়ে দিতে জানেন। 

১৮৫ 


বিশেষ কারও সঙ্গে বেশি বেশি গল্প করা চলবে না, তাতে অন্যেরা ক্ষুণ্ন 
হবেন। 

জ্ঞানদার সঙ্গে দু'-একটি ভিজিটে গিয়ে রবি দেখলেন, গিন্নিরা একজনের 
মুখের দিকে তাকিয়ে একটা কথা বলেন, তারপরেই সকলের দিকে তাকিয়ে 
হাসেন আবার পরের কথাটা অন্য একজনকে বলেন, বলতে বলতে হয়তো 
সকলের দিকে চোখ ঘুরিয়ে আনেন। 

আসরের মধ্যমণি গৃহিণী মিসেস জনসন একজনকে বললেন. লাভলি 
মর্নিং, ইজনট ইট! তারপর সে কোনও উত্তর দেওয়ার আগেই আর-একজনের 
দিকে তাকিয়ে ছুড়ে দিলেন, কালরাতের সংগীতশালায় ম্যাডাম নীলসন গান 
করছিলেন, ইট ওয়াজ এক্সুইজিট! 

অন্য সব মহিলারা তার কথার পিঠে এক-একটা করে বিশেষণ জুড়ে দিতে 
লাগলেন পরম উৎসাহে, কেউ বললেন চার্িং, কেউ বললেন সুপাব। 

আর-একজন বাকি ছিলেন, তিনি বললেন, ইজনট ইট! 

রবি ফিসফিস করে জ্ঞানদাকে বলেন, দেখো বউঠান, কথাগুলো যেন 
তাসের আসরের তাস চালার মতো করে সবার দিকে গড়িয়ে দেওয়া। এমন 
তাড়াতাড়ি এত দক্ষতার সঙ্গে কথা ঘুরছে যে বোঝা যায় এদের হ!তে অনেক 
তাস গোছানো আছে। 

জ্ঞানদা চোখ ঘুরিয়ে বলেন, কিংবা কথার লড়াই। সকালবেলা উঠে মুগ্ডর 
ভাজা। 

মিসেস ডনকিনস জ্ঞানদার সঙ্গে গল্প করতে এগিয়ে আসেন, জানতে চান, 
মিসেস টেগোর, তোমাদের দেশে কি এরকম সোশাল ভিজিট হয় যেখানে 
নারীপুরুষ সবাই থাকেন? তোমরা সেখানে কী কথা বলো? 

আমাদের বাড়িতে হয়, জ্ঞানদা ভ্রানান, কিন্তু সাধারণভাবে অভিজাত 
হিন্দু পরিবারে এরকম চল নেই। আমাদের মেয়েরা এখনও সকলের সামনে 
বেরোয় না। 

হাউ হরিবল, ডনকিনস বলেন, তোমরা এখনও পরদার আড়ালে 
মনুষ্যেতর জীবনযাপন করছ। দিস শুড বি চেঞ্জড। 

জ্ঞানদা বলেন, আমাকে দেখে তোমার কি মনে হয়, মনুষ্যেতর জীব? 
আমি যেরকম একা একা বাচ্চাদের নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে এতদূর এসেছি, 


৯৮৬ 


ডনকিনস জ্ঞানদার হাত ধরে বলেন, ওঃ গানডা ডার্লিং ডোন্ট টেক ইট 
পারসোনালি। আমি জানি তুমি ব্যতিক্রম, তোমার মতো সাহসী মহিলা আমি 
খুব কম দেখেছি। আই আযাডোর ইউ। 


এর কিছুদিন পর সত্যেন জ্ঞানদা ও রবি ছেলেমেয়েদের নিয়ে লন্ডন যাত্রা 
করলেন। সেখান থেকে ট্রেন্টব্রিজ ওয়েলস, ডেভনশায়ার ঘুরে রবি লন্ডনে 
একটি পরিবারের সঙ্গে থাকতে শুরু করলেন। এত ঘোরাঘুরির মধ্যেও রাতে 
লেখেন রবি। চিঠি হয়তো একদিনেই শেষ হয় না, কাটাকুটিও হয় অনেক। 
কিন্তু রবি তাকে প্রতিদিন চিঠি লেখেন, প্রতিরাত। 


“ইংলন্ডে আসবার আগে আমি নিবোধের মতো আশা করেছিলেম যে, এই ক্ষুদ্র 
মুখরিত। সৌভাগ্যক্রমে তাতে আমি নিরাশ হয়েছি। মেয়েরা বেশভূষায় লিপ্ত, 
পুরুষেরা কাজকম্ন করছে, সংসার যেমন চলে থাকে তেমনি চলছে, কেবল 
রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে কোলাহল শোনা যায়। মেয়েরা জিজ্ঞাসা 
করে থাকে, তুমি নাচে গিয়েছিলে কি না, কনসর্ট কেমন লাগল, থিয়েটারে 
একজন নৃতন আযাক্টর এসেছে, কাল অমুক জায়গায় ব্যান্ড হবে ইত্যাদি। 
পুরুষেরা বলবে, আফগান যুদ্ধের বিষয় তুমি কী বিবেচনা কর, 1/810815 9 
1.0779কে লন্ডনীয়েরা খুব সমাদর করেছিল, আজ দিন বেশ ভালো, কালকের 
দিন বড়ো মিজরেব্ল্‌ ছিল। এ-দেশের মেয়েরা পিয়ানো বাজায়, গান গায়, 
আগুনের ধারে আগুন পোয়ায়, সোফায় ঠেসান দিয়ে নভেল পড়ে, ভিজিটরদের 
সঙ্গে আলাপচারি করে ও আবশ্যক বা অনাবশ্যক মতে যুবকদের সঙ্গে ফ্লাট 
করে। এদেশের চির-আইবুড়ো মেয়েরা কাজের লোক। টেমৃপারেন্স মীটিং, 
ওয়ার্কিং মেন্স্‌ সোসাইটি প্রভৃতি যত প্রকার অনুষ্ঠানের কোলাহল আছে, 
সমুদয়ের মধ্যে তাদের কণ্ঠ আছে। পুরুষদের মতো তাদের আপিসে যেতে হয় 
না, মেয়েদের মতো ছেলেপিলে মানুষ করতে হয় না, এদিকে হয়তো এত বয়স 
হয়েছে যে “বল” এ গিয়ে নাচা বা ফ্লার্ট করে সময় কাটানো সংগত হয় না, তাই 
তারা অনেক কাজ করতে পারেন, তাতে উপকারও হয়তো আছে। 


১৮৭ 


এখানে দ্বারে দ্বারে মদের দোকান। আমি রাস্তায় বেরোলে জুতোর দোকান, 
দরজির দোকান, মাংসের দোকান, খেলনার দোকান পদে পদে দেখতে পাই 
কিন্তু বইয়ের দোকান প্রায় দেখতে পাই নে। আমাদের একটি কবিতার বই 
কেনবার আবশ্যক হয়েছিল, কিন্তু কাছাকাছির মধ্যে বইয়ের দোকান না দেখে 
একজন খেলনাওয়ালাকে সেই বই আনিয়ে দিতে হুকূম করতে হয়েছিল-_ 
আমি আগে জানতেম, এ দেশে একটা কসাইয়ের দোকান যেমন প্রচুররূপে 
দরকারি, বইয়ের দোকানও তেমনি। 

ইংলন্ডে এলে সকলের চেয়ে চোখে পড়ে লোকের ব্যস্ততা। রাস্তা দিয়ে যারা 
চলে তাদের মুখ দেখতে মজা আছে-__- বগলে ছাতি নিয়ে হুস হুস করে চলেছে, 
পাশের লোকদের উপর ভ্রক্ষেপ নেই, মুখে যেন মহা উদ্বেগ, সময় তাদের 
ফাঁকি দিয়ে না পালায় এই তাদের প্রাণপণ চেষ্টা। সমস্ত লন্ডনময় রেলোয়ে। 
প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর এক-একটা ট্রেন যাচ্ছে। লন্ডন থেকে ব্রাইটনে আসবার 
সময় দেখি প্রতি মুহূর্তে উপর দিয়ে একটা, নীচে দিয়ে একটা, পাশ দিয়ে একটা, 
এমন চারি দিক থেকে হুস হাস করে ট্রেন ছুটেছে। সে ট্রেনগুলোর চেহারা 
লন্ডনের লোকদেরই মতো, এদিক থেকে ওদিক থেকে মহা ব্যস্তভাবে হাসফাস 
করতে করতে চলেছে। দেশ তো এই এক রত্তি, দু-পা চললেই ভয় হয় পাছে 
সমুদ্ধে গিয়ে পড়ি, এখানে এত ট্রেন যে কেন ভেবে পাই নে। আমরা একবার 
লন্ডনে যাবার সময় দৈবাৎ ট্রেন মিস করেছিলেম, কিন্তু তার জন্যে বাড়ি ফিরে 
আসতে হয়নি, তার আধ ঘণ্টা পরেই আর-এক ট্রেন এসে হাজির। 


জোড়াসাকোর তেতলার ঘরে তখন একাকিনী কাদন্বরী বিছানায় এলোচুল 
ছড়িয়ে শুয়ে আছেন। চারদিকে ছড়ানো চিঠি কাগজ পানের বাটা। মাঝে 
মাঝে চিঠি তুলে নিয়ে পড়ছেন আবার উদাস হয়ে কী ভাবছেন। কোনও চিঠি 
এসেছে লন্ডন থেকে, কোনওটা ডেভনশায়ার। 

রবি লিখেছেন-__ 


“.. ক্রমে ক্রমে এখানকার দুই-এক জন (লোকের সঙ্গে আমার আলাপ হতে চলল। 
একটা মজা দেখছি, এখানকার লোকেরা আমাকে নিতান্ত অবুঝের মতো মনে করে। 
একদিন 1).__এর ভাইয়ের সঙ্গে রাস্তায় বেরিয়েছিলেম। একটা দোকানের সম্মুখে 
কতকগুলো ফোটোগ্রাফ ছিল, সে আমাকে সেইখানে নিয়ে গিয়ে ফোটোগ্রাফের 


১৮৮ 


ব্যাখ্যান আরম্ভ করে দিলে-_ আমাকে বুঝিয়ে দিলে যে, একরকম যন্ত্র দিয়ে এ 
ছবিগুলো তৈরি হয়, মানুষে হাতে করে আঁকে না। আমার চার দিকে লোক দীড়িয়ে 
গেল। একটা ঘড়ির দোকানের সামনে নিয়ে, ঘড়িটা যে খুব আশ্চর্য যন্ত্র তাই আমার 
মনে সংস্কার জন্মাবার জন্যে চেষ্টা করতে লাগল। একটা ঈভনিং পার্টিতে মিস__ 
আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি এর পুৰে পিয়ানোর শব্দ শুনেছি কি না। 
এ-দেশের অনেক লোক হয়তো পরলোকের একটা ম্যাপ এঁকে দিতে পারে কিন্তু 
ভারতবধের সম্বন্ধে যদি একবিন্দুও খবর জানে। ইংলন্ড থেকে কোনো দেশের 
যে কিছু তফাত আছে তা তারা কল্পনাও করতে পারে না। ভারতবর্ষের কথা দূরে 
থাক্‌-_ সাধারণ লোকেরা কত বিষয় জানে না তার ঠিক নেই।” 


কোনও চিঠিতে ফ্যান্সি-বল পার্টির চমৎকার বণ্ননা পড়ে রূপকথার সিন্ডারেলার 
কথা মনে পড়ে যায় কাদন্বরীর-_ 


“আমরা সেদিন ফ্যান্সি-বলে অণ্াৎ ছদ্মবেশী নাচে গিয়েছিলেম__ কত মেয়ে 
পুরুষ নানারকম সেজেগুজে সেখানে নাচতে গিয়েছিল। প্রকাণ্ড ঘর, গ্যাসের 
আলোয় আলোকাকীর্ণ, চার দিকে ব্যান্ড বাজছে__ ছ-সাত শ" সুন্দরী, সুপুরুষ। 
ঘরে ন স্থানং তিল ধারয়েৎ__ চাদের হাট তো তাকেই বলে। এক-একটা ঘরে 
জোড়া পাগলের মতো। এক-একটা ঘরে এমন সত্তর আশি জন যুগলমৃত্তি; এমন 
ঘেঁষার্ঘেষি যে কে কার ঘাড়ে পড়ে তার ঠিক নেই। একটা ঘরে শ্যাম্পেনের 
কুরুক্ষেত্র পড়ে গিয়েছে, মদ্যমাংসের ছড়াছড়ি, সেখানে লোকারণ্য; এক-একটা 
মেয়ের নাচের বিরাম নেই, দু-তিন ঘণ্টা ধরে ক্রমাগত তার পা চলছে। একজন 
মেম তুষার-কুমারী সেজে গিয়েছিলেন, তার সমস্তই শুভ্র, সবাঙ্গে পুঁতির সঙ্জা, 
আলোতে ঝকমক করছে। একজন মুসলমানিনী সেজেছিলেন; একটা লাল 
ফুলো ইজের, উপরে একটা রেশমের পেশোয়াজ, মাথায় টুপির মতো-_ এ 
কাপড়ে তাকে বেশ মানিয়ে গিয়েছিল। একজন সেজেছিলেন আমাদের দিশি 
মেয়ে, একটা শাড়ি আর একটা কীচুলি তার প্রধান সজ্জা, তার উপরে একটা 
চাদর, তাতে ইংরেজি কাপড়ের চেয়ে তাকে ঢের ভালো দেখাচ্ছিল। একজন 
সেজেছিলেন বিলিতি দাসী। আমি বাংলার জমিদার সেজেছিলেম, জরি দেওয়া 
মখমলের কাপড়, জরি দেওয়া মখমলের পাগড়ি প্রভৃতি পরেছিলেম।" 


১৮৯ 


বই-মালিনী 


রবি বিলেতে চলে যাওয়ার পর আন্নার আর কিছুতে মন লাগে না। 
রকমসকম দেখে আত্মারাম পাগ্ুরং কিছুদিনের জন্য মেয়েকে কলকাতায় 
নিয়ে এলেন। বন্ধু মনোমোহন ঘোষের বাড়িতে উঠেছেন তারা। তারপর 
একদিন জোড়ার্সাকোর বাড়িতে এলেন মহষি ও তার পরিবারের সঙ্গে দেখা 
করতে। পাণুরং বসলেন বৈঠকখানায় দেবেন ঠাকুরের কাছে আর আন্না চলে 
গেলেন বাড়ির ভেতরে মেয়েমহলে। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলকে আপন করে নিতে তার জুড়ি নেই। অন্দরে 
তেতলার ঘরে সহজভঙ্গিতে কাদম্বরীর গলা জড়িয়ে খাটে আধ-শোওয়া 
হয়ে গল্প করতে থাকেন আন্না। রবির ঘর কোনটা, রবি সারাদিন কী করে? 
কোথায় তার লেখার টেবিল, কী খেতে ভালবাসে-__ এ-সব অজস্র প্রশ্নে 
তিনি পাগল করে দেন কাদনম্বরীকে। 

কাদম্বরী তার চাপার কলির মতো আডুলে আন্নার গোলাপি থুতনি তুলে 
ধরে জানতে চান, আন্না তুমি মরেছ, রবি তোমার সব চুরি করেছে মনে 
হচ্ছে! 

আন্না লজ্জা পান, মুখ ঘুরিয়ে বলেন, আহা, সে তো জানে শুধু নতুনবউঠান 
আর নতুনবউঠান। তুমিই তার মাথা খেয়েছ। তোমাকে আমি খুব ঈধা করি। 

কাদশ্বরী ছাড়েন না, নিজের অস্বস্তি গোপন করে আন্নাকে বলেন, ও-সব 
বলে পাশ কাটানো যাবে না, সত্যি বলো, তুমি রবিকে ভালবাসো 

লজ্জায় আন্নার মুখ নুয়ে পড়ে কাদন্বরীর বুকে। বলেন, আমি আগে 
কখনও এত কাছ থেকে কোনও কবিকে দেখিনি ! তাকে ভাল না বেসে পারা 
যায় না! 


৯৪১০ 


আন্নার চোখে রবির এক নতুন চেহারার ছায়া দেখেন কাদন্বরী, সে আর 
তার সেই কিশোর উপাসক নয়, সে যে কোন অজান্তে এক রমণীমোহন 
পুরুষ হয়ে উঠেছে কাদন্বরী জানতেও পারেননি। মনের কোণে কোথায় ঈষৎ 
খচখচ করে, এতদিনকার একান্তই তার আঁচলে বাঁধা পোষা প্রাণীটি এখন 
করে কাপতে দেখে কাদন্বরী উদাস হয়ে যান একটু। কাদন্বরীর ছায়া কি কারও 
চোখের মণিতে ছায়া ফেলে? 

পাণ্ডুরং মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পারছেন বলেই কলকাতায় এসেছেন। 
রবি চলে যাওয়ার পর থেকেই আন্না খুব উদাস। রবি যাওয়ার সময়ে যেন 
আন্নার হৃদয়টিকেও সঙ্গে নিয়ে গেছেন। এদিকে এত যুবক তার কৃপাপ্রাধী, 
কিন্তু তাদের কাউকেই ঠিক মনে ধরেনি এই চঞ্চলা কন্যার।.পাণুরং দেবেন 
ঠাকুরের সঙ্গে একথা-সেকথার পর জানতে চান রবির বিয়ের কথা কিছু 
ভাবছেন কি না মহধি। দেবেন্দ্র পাণ্তরংকে যত্বআত্তি করলেও রবির বিয়ের 
কথায় সায় দিতে পারেন না। রবি এখন বিলেতে পড়তে গেছে। আগে সে- 
সব সম্পূর্ণ হোক, কাজ শুরু করুক, তারপর ভাবা যাবে। তা ছাড়া এই মরাঠি 
ভদ্রলোকের মনের ইচ্ছে অনুমান করলেও কোনওদিনই তাতে রাজি হতে 
পারবেন না দেবেন্দ্। একে কন্যা বাঙালিনি নয় তার ওপর বয়সে রবির চেয়ে 
প্রায় পাঁচ-ছ; বছরের বড়। গুজরাতি মরাঠিদের মধ্যে এমন অসম-বয়সি বিয়ে 
হলেও বাঙালিদের মধ্যে চল নেই। দেবেন ঠাকুর নানা কথায় বিয়ের প্রসঙ্গটি 
লঘু করে দেন। পাণুরং বুদ্ধিমান পুরুষ, বুঝতে পারেন এখানে বিয়ের সম্ভাবনা 
কম। বিষণ্ণ মনে আন্নাকে নিয়ে তিনি ঠাকুরবাড়ি থেকে বিদায় নেন। 

আন্নার ছেড়ে যাওয়া বিষাদ যেন কাদন্বরীর ওপর ভর করে। তেতলার 
একলা ঘরে কখনও বিছানায় কখনও মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে তার দিনরাত 
যেন আর কাটতে চায় না। এখন আর ছাদের আসর বসে না। রবি চলে 
গেছে, অক্ষয় বা বিহারীলাল আর আসেন না। আসবেন কার কাছে? জ্যোতি 
এখন নাটক নিয়ে এমন মেতেছেন যে ঘরে আসার সময়ই হয় না। যখন ঘরে 
থাকেন, তখনও নতুন নাটক লেখায় ব্যস্ত। “অশ্রমতী” মঞ্চস্থ হচ্ছে হইচই 
করে। জ্যোতি সারাদিন রিহার্সালেই পড়ে থাকেন। নায়িকাকে পার্ট শেখানোর 
দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। এখানেই কাদন্বরীর ব্যথা। 

ব্যথা আছে জ্যোতির বুকেও। বিনোদিনী বেঙ্গল থিয়েটার ছেড়ে চলে 


১৪১ 


গেছেন, সুতরাং অশ্রুমতীর নায়িকার ভূমিকায় তাকে পাওয়া গেল না। সুকুমারী 
বা বনবিহারিণীকে অনেক শিখিয়েও যেন বিনোদিনীর মতো হয় না। জ্যোতি 
ছুটে ছুটে কিশোরী বিনোদিনীর অভিনয় দেখতে যান ন্যাশনাল থিয়েটারে। কী 
তার অভিনয়! “বিষবৃক্ষে” কুন্দনন্দিনী, “সধবার একাদশী”তে কাঞ্চন, “পলাশীর 
যুদ্ধে” ব্রিটানিয়া এবং “মেঘনাদ বধে” একসঙ্গে সাতটি চরিত্রে পার্ট করে সাড়া 
ফেলে দিয়েছেন। গিরিশ ঘোষের সাহচর্ষে এবং নিজের এঁকাস্তিক নিষ্ঠায় 
অন্যসব নায়িকাদের ছাপিয়ে ইতিমধ্যেই আগুনের শিখার মতো স্টেজ জ্বালিয়ে 
দিচ্ছেন বিনোদিনী। জ্যোতি বারবার তাকে অনুনয় করেন অশ্রমতীর নায়িকা 
হওয়ার জন্য, কিন্তু বিনোদিনী ফিরিয়ে দেন। গিরিশ ঘোষকে ছেড়ে বেঙ্গল 
থিয়েটারে ফিরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। তবে কি বিনোদিনী গিরিশের 
প্রেমে পড়েছে? জ্যোতির মনটা ঈধায় চিনচিন করে ওঠে। 

রূপা আর কাদম্ববী বসে বসে কখনও রবির চিঠি পড়েন, কখনও 
থিয়েটারের রিভিউ। সেদিন বিনোদিনীর রূপগুণের ব্যাখ্যান পড়তে পড়তে 
হঠাৎ কাদন্বরী দেখলেন রূপা কিছুই শুনছে না, হা করে তাকিয়ে আছে তার 
মুখের দিকে। 

কাদন্বরী পত্রিকা নামিয়ে রেখে বালিশে গা এলিয়ে বলেন, এই রূপা, কী 
দেখছিস রে অমন হা করে? রি 

রূপা বলে, তোমাকে দেখছি। দেখছি আর অবাক হয়ে ভাবছি এমন অপৃব 
রূপ তোমার, এমন শরীরের গড়ন, যেন হঠাৎ আসা আলোর মতো চোখ 
ধাধিয়ে দেয়। তবু কেন জ্যোতিদাদার ঘরে মন টেকে না! 

তুই যেন জানিস না, তিনি এখন বিনোদিনী, সুকুমারী, বনবিহারিণীদের 
রূপে মজেছেন! কাদন্বরী ঝামটা মেরে বলেন, আমার দিকে চাইবার তার 
সময় কোথায়? তবে আমাকে নিয়ে তুই বেশি বেশি আদিখ্যেতা করিস, 
সত্যি যদি অমন রূপসি হতাম ত। হলে কি একা ঘরে পচে মরি? 

ওমা, আমি কেন খামোখা মিথ্যে বলব নতুনবউঠান, রূপাও ঝংকার দেয়, 
তোমার বব যদি এখন আগুন দেখে পতঙ্গের মতো ঝাপ দেন, তাতে তোমার 
কমলহিরের মতো রূপ তো আর মিথ্যে হয়ে যায় না। 

তা হলে আমাকে ফেলে তিনি সেখানে ছুটে যান কেন? সেই বারাঙ্গনা 
নটীরা কি রূপে রুচিতে শিক্ষায় আমাকে ছাপিয়ে গেছে? সে কি বিহারীলালের 
কবিতা পড়ে? 


১৯৯ 


শোনো বউঠান, রূপা জোর গলায় বলে, স্টেজের নটীরা সেজেগুজে 
সবার সামনে তাদের রূপ মেলে ধরছে, কিন্তু তারা কেউ তোমার চেয়ে 
রূপসি'এ আমি বিশ্বাস করি না। 

কাদন্ববী আয়নার সামনে গিয়ে দাড়ান, গায়ের কাপড় ফেলে দিয়ে 
নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন তারও মনে হয়, রূপা সত্যি বলছে। নিজের 
'লাবণ্য উচ্ছাসে তার নিজেরই ঘোর লাগে যেন। কিন্তু বিনোদিনী, সে কেমন 
দেখতে? জানতেই হবে কাদন্বরীকে। অধীর হয়ে ওঠেন তিনি, বলেন, 
সাহস পাননি বাবামশায়ের ভয়ে। চল তুই আর আমি লুকিয়ে বিনোদিনীকে 
দেখে আসি একদিন। 

যাবে, সত্যি যাবে বউঠান? রূপাও উত্তেজিত হয়ে ওঠে নিষিদ্ধের স্বাদ 
নেওয়ার এমন লোভনীয় প্রস্তাবে। 

প্রথমে মালিনীকে নিয়ে তুই বরং দেখে আয়, কাদন্বরী দ্বিধা করেন, 
আমি গিয়ে জানতে পারলে তো বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে বাকি রাখবে 
সকলে। এমনিতেই বাঁজা বলে উঠতে বসতে খোঁটা দেয়, তার ওপর এখন 
স্বামীসোহাগ কমে গিয়েছে ভেবে সবাই যেন আরও তেড়ে আসছে। যেতে 
ইচ্ছে করে, কিন্তু ভয় পাচ্ছি রে। 

কাদন্বরীকে জড়িয়ে ধরে রূপা বলে, না বউঠান, তা হবে না। চলো না, 
এমন ব্যবস্থা করব লুকিয়ে যাওয়ার, কেউ জানতে পারলে তো! 

কী ব্যবস্থা করবি শুনি? কাদন্বরী আশার আলোর খোঁজে মরিয়া যেন। তুই 
কী করে করবি? খবরদার হ্যারিসাহেবকে এর মধ্যে টেনে আনিস না যেন! 

না না, বউঠান, ওই যে তুমি বললে মালিনীর কথা, আমি ওকেই ডেকে আনছি। 
ওই সব ব্যবস্থা করে দেবে। আমরা তিনজনেই গোপনে দেখে আসি চলো। 

ধুর যত সব অসম্ভবের আশা, কাদন্বরী প্রসঙ্গ পালটাতে চান ভয় পেয়ে। 
কিন্তু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মালিনী এসে হাজির। সব শুনে সে এক অজ্ভুত 
কথা বলে বসল-_ নতুনবউঠান জানো, ভবিষ্যতে তোমাকে নিয়ে যে গল্পটা 
লেখা হবে, মালিনী রহস্য করে বলে, তার লাইনগুলো এখনই তোমাকে 
শোনাতে পারি, যদি শুনতে চাও তো। 

সে আবার কী রে মালিনী, ভবিষাতের লেখা আবার কী, কাদন্বরী বলেন, 
তুই কি নিজেই আজকাল আফিম খেয়ে গল্পটল্প লিখছিস নাকি? 


১৯৯৩ 


আমি কেন লিখব, তোমার প্রিয়জনদের মধ্যেই কেউ হয়তো লিখবে, 
আমি চোখ বুজে বসলেই সে লেখার অক্ষরগুলো অন্ধকারের মধ্যে 
জ্বলজ্বল করে চোখের সামনে ভেসে উঠছে, শুনবে, শোনোই না একটু-__ 
“গিরিবালার সৌন্দ অকস্মাৎ আলোকরশ্ির ন্যায়, বিস্ময়ের ন্যায়, নিদ্রাভঙ্গে 
নাই__ সে কেবল নির্জনে প্রতিদিন আপনার মধ্যে আপনি সঞ্চিত হইয়া 
শেষকালে আপনাকে আর ধারণ করিয়া রাখিতে পারিতেছে না। স্বামী আছে 
কিন্তু স্বামী তার আয়ত্তের মধ্যে নাই। গিরিবালা বাল্যকাল হইতে যৌবনে 
এমন পূর্ণ বিকশিত হইয়া উঠিয়াও কেমন করিয়া তাহার স্বামীর চক্ষু এড়াইয়া 
গেছে। 

বরঞ্চ বাল্যকালে সে তাহার স্বামীর আদর পাইয়াছিল।... গোপীনাথ 
যাহাকে দাসখত লিখিয়া দিয়াছে তাহার নাম লবঙ্গ__ সে থিয়েটারে অভিনয় 
করে-_ সে স্টেজের উপর চমৎকার মুছা যাইতে পারে__ সে যখন সানুনাসিক 
কৃত্রিম কাদুনির স্বরে হাপাইয়া হাপাইয়া টানিয়া টানিয়া আধ-আধ উচ্চারণে 
'প্রাণনাথ' 'প্রাণেশ্বর” করিয়া ডাক ছাড়িতে থাকে তখন পাতলা ধুতির উপর 
ওয়েস্টকোট পরা, ফুলমোজামণ্ডিত দর্শকমণগ্ডলী “এক্সেলেন্ট' “এক্সেলেন্ট' 
করিয়া উচ্ছসিত হইয়া ওঠে।' ৃ 

কাদশ্বরী উসখুস করে আর থাকতে না পেরে এক ধমক দিয়ে থামিয়ে 
দেন, যাঃ, কীসব গাঁজাখুরি গল্প বলছিস মালিনী, তোদের নতুনদাদা কি 
ওরকম ছাপোষা পোশাক পরেন, না কি আমার নাম গিরিবালা? কেন এ-সব 
গিরিবালা গোপীনাথ লবঙ্গদের গল্প আমাকে শোনাচ্ছিস? 

তুমি চিনতে পারলে না নতুনবউঠান, মালিনী বলে, ওটা তো তোমারই 
গল্প। দেখছ না সবটাই তোমার জীবুনের আদলে লেখা! 

সে তো তুই ইনিয়ে বিনিয়ে লিখেছিস, কাদন্বরী ফুঁসে ওঠেন, তোকে এত 
বিশ্বাস করি মালিনী, তুই কী করে পারলি আমাকে নিয়ে এমন কেচ্ছার গল্প 
ফাদতে? আমার যন্ত্রণা তোর কাছে হাসির খোরাক হল? ছিঃ! 

মালিনী কাদন্বরীর পায়ে মাথা রেখে বলে, নতুনবউঠান বিশ্বাস করো, 
আমি এ-সব মনে মনে ভাবিনি। আমি চোখ বুজলে অনেক অস্তুত সব ব্যাপার 
ঘটে, না-লেখা অক্ষরগুলো নেচে বেড়ায়, আমি পড়তে পারি। আজ তোমার 
সামনে বসতেই আমার মাথায় হুড়মুড় করে এ-সব লাইনগুলো আসছে। এ 


১৯৯৪ 


গল্প আমি লিখিনি, বিশ্বাস করো, এ ভাষায় আমি ভাবতেই পারি না। কে 
লিখবে কখন লিখবে আমি জানি না। কিন্তু জানি এ লেখা সতিযি। 

যা যা, তুই আমার চোখের সামনে থেকে যা তো মালিনী, কাদম্বরী ওকে 
আর সইতে পারেন না, যত সব ভূতুড়ে কাণ্ড। রূপাকে বলেন, তুই রবির 
চিঠিগুলো আরেকবার পড়ে শোনা তো রূপা। 

আর কতবার শুনবে নতুনবউঠান, রূপা যেন মজা পায়, পড়ে পড়ে 
আমারই তো মুখস্থ হয়ে গেল। 

তবু পড়, কাদন্বরী বলেন, আমার ভাল লাগে, সেই যে মিস্টার আর 
মিসেস বেকার সারাক্ষণ ঝগড়া করেন, সেই চিঠিটা পড় না, বেশ মজা হবে। 
রূপা বিছানার ওপর তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে পড়তে থাকে-_ 


“আমি দিনকতক আমার শিক্ষকের পরিবারের মধ্যে বাস করেছিলুম। সে 
বড়ো অদ্তুত পরিবার। মিস্টার ব-_ মধ্যবিত্ত লোক। তিনি লাটিন ও গ্রীক 
খুব ভালোরকম জানেন। তার ছেলেপিলে কেউ নেই; তিনি, তার স্ত্রী, আমি, 
আর একজন দাসী, এই চারজন মাত্র একটি বাড়িতে থাকতুম। কর্তা আধবুড়ো 
রান্নাঘরের পাশে একটি ছোট্ট জানলাওয়ালা দরজা-বন্ধ অন্ধকার ঘরে 
থাকেন। একে তো সুষযকিরণ সে ঘরে সহজেই প্রবেশ করতে পারে না, তাতে 
জানলার উপরে একটা পর্দা ফেলা, চার দিকে পুরোনো ছেঁড়া ধুলোমাখা 
প্রবেশ করলে একরকম বদ্ধ হাওয়ায় হাপিয়ে উঠতে হয়। এই ঘরটা হচ্ছে 
তার স্টাডি, এইখানে তিনি পড়েন ও পড়ান। তার মুখ সবদাই বিরক্ত। আট 
বুটজুতো পরতে বিলম্ব হচ্ছে, বুটজুতোর উপর চটে ওঠেন; যেতে যেতে 
দেয়ালের পেরেকে তার পকেট আটকে যায়, রেগে ভুরু কুঁকড়ে ঠোট নাড়তে 
থাকেন। তিনি যেমন খুঁতখুঁতে মানুষ, তার পক্ষে তেমনি খুঁতখুঁতের কারণ 
প্রতি পদে জোটে। আসতে যেতে হুঁচট খান, অনেক টানাটানিতে তার দেরাজ 
খোলে না, যদি বা খোলে তবু যে-জিনিস খুঁজছিলেন তা পান না। এক-এক 
দিন সকালে তার স্টাডিতে এসে দেখি, তিনি অকারণে বসে বসে ভ্রকুটি করে 
উ আঁ করছেন, ঘরে একটি লোক নেই। কিন্তু ব_ আসলে ভালোমানুষ-__ 
তিনি খুঁতখুঁতে বটে, রাগী নন; খিটুখিটু করেন, কিন্তু ঝগড়া করেন না। নিদেন 


৯০৯৫ 


তিনি মানুষের উপর রাগ প্রকাশ করেন না, টাইনি বলে তার একটা কুকুর 
আছে তার উপরেই তার আক্রোশ। সে একটু নড়লে চড়লে তাকে ধমকাতে 
থাকেন, আর দিনরাত তাকে লাথিয়ে লাথিয়ে একাকার করেন। তাকে 
আমি প্রায় হাসতে দেখি নি। তার কাপড়চোপড় ছেঁড়া অপরিষ্কার। মানুষটা 
এইরকম। তিনি এককালে পাদরি ছিলেন; আমি নিশ্চয় বলতে পারি, প্রতি 
এত কাজের ভিড়, এত লোককে পড়াতে হত যে, এক-এক দিন তিনি ডিনার 
খেতে অবকাশ পেতেন না। এক-এক দিন তিনি বিছানা থেকে উঠে অবধি 
রাত্রি এগারোটা পর্যস্ত কাজে ব্যস্ত থাকতেন। এমন অবস্থায় খিটখিটে হয়ে 
ওঠা কিছু আশ্চর্য নয়। গৃহিণী খুব ভালোমানুষ, রাগী উদ্ধত নন, এককালে 
বোধ হয় ভালো দেখতে ছিলেন, যত বয়স-তার চেয়ে তাকে বড়ো দেখায়, 
চোখে চশমা, সাজগোজের বড়ো আড়ম্বর নেই। নিজে রাধেন, বাড়ির কাজকণ্ন 
করেন, ছেলেপিলে নেই, সুতরাং কাজকম্ন বড়ো বেশি নয়। আমাকে খুব যত 
করতেন। খুব অল্প দিনেতেই বোঝা যায় যে, দম্পতির মধ্যে বড়ো ভালোবাসা 
নেই, কিন্তু তাই বলে যে দুজনের মধ্যে খুব বিরোধ ঘটে তাও নয, অনেকটা 
নিঃশব্দে সংসার চলে যাচ্ছে। মিসেস ব__ কখনো স্বামীর স্টাডিতে যান না; 
সমস্ত দিনের মধ্যে খাবার সময় ছাড়া দুজনের মধ্যে দেখাশুনা হয় না, খাবার 
সময়ে দুজনে চুপচাপ বসে থাকেন। খেতে খেতে আমার সঙ্গে গল্প করেন, 
কিন্তু দুজনে পরস্পর গল্প করেন না। ব-_র আলুর দরকার হয়েছে, তিনি 
চাপা গলায় মিসেসকে বললেন, 450176 0০9090০০১* (11০5০ কথাটা বললেন 
না কিংবা শোনা গেল না)। মিসেস ব-_ বলে উঠলেন ৭ 9 %061 ৬০1০ ৪ 
|11016 1101৩ 19011061 ব-_ বললেন 014 5৪১ 01995; মিসেস ব__ বললেন 
“ 010 1)00179810; ব-_ বললেন 18570 19110 0111119”। এইখানেই দুই 
পক্ষ চুপ করে রইলেন। মাঝে থেকে আমি অত্যন্ত অপ্রস্তূতে পড়ে যেতেম। 
ব-_, ব-_কে ধমকাচ্ছেন, অপরাধের মধ্যে তিনি মাংসের সঙ্গে একটু বেশি 
আলু নিয়েছিলেন। আমাকে দেখে মিসেস ক্ষান্ত হলেন, মিস্টার সাহস পেয়ে 
শোধ তোলবার জন্যে দ্বিগুণ করে আলু নিতে লাগলেন, মিসেস তার দিকে 
নিরুপায় মর্মভেদী কটাক্ষপাত করলেন। দুই পক্ষই দুই পক্ষকে যথারীতি ডিয়ার 
ডার্লিং বলে ভুলেও সম্বোধন করেন না, কিংবা কারও ক্রিশ্চান নাম ধরে 
১৯৬ 


ডাকেন না, পরস্পর পরস্পরকে মিস্টার ব__ ও মিসেস ব__ বলে ডাকেন। 
আমার সঙ্গে মিসেস হয়তো বেশ কথাবার্তা কচ্ছেন, এমন সময় মিস্টার 
এলেন, অমনি সমস্ত চুপচাপ। দুই পক্ষেই এইরকম। একদিন মিসেস আমাকে 
পিয়ানো শোনাচ্ছেন, এমন সময় মিস্টার এসে উপস্থিত; বললেন, “৬112 
21০ 99] 0115 (0 5009?; মিসেস বললেন, এ 0110081) /০]190 50100 0011 
পিয়ানো থামল। তার পরে আমি যখন পিয়ানো শুনতে চাইতেম মিসেস 
বলতেন, 11781101710 17791) যখন বাড়িতে না থাকবেন তখন শোনাব,, আমি 
ভারি অপ্রস্ততে পড়ে যেতুম। দুজনে এইরকম অমিল অথচ সংসার বেশ 
চলে যাচ্ছে। মিসেস রাধছেন বাড়ছেন, কাজকর্ন করছেন, মিস্টার রোজগার 
করে টাকা এনে দিচ্ছেন; দুজনে কখনো প্রকৃত ঝগড়া হয় না, কেবল কখনো 
কখনো দুই-এক বার দুই-একটা কথা-কাটাকাটি হয়, তা এত মুদুন্ধরে যে 
পাশের ঘরের লোকের কানে পরন্ত পৌঁছয় না। যা হোক আমি সেখানে 
দিনকতক থেকে বিব্রত হয়ে সে অশান্তির মধ্যে থেকে চলে এসে বেঁচেছি।, 


শেষ পর্যন্ত রূপা আর মালিনী মিলে কাদম্বরীকে রাজি করিয়েই ফেলল। 
বিনোদিনীকে স্বচক্ষে দেখার জন্য কাদম্বরীও ছটফট করছিলেন সেই 
“সরোজিনী" নাটকের সময় থেকে। কৌতুহল আর যেন বাধ মানছে না। 

এক সন্ধ্যায় নিষিদ্ধ কাজের গোপন উত্তেজনায় দুরু দুরু বুকে আটপৌরে 
ধনেখালি শাড়ির ছদ্মবেশে ঘোমটায় মাথা ঢেকে রূপা আর কাদন্বরী বেরিয়ে 
পড়লেন ন্যাশনাল থিয়েটারের উদ্দেশে আডভেঞ্চারে। 

“অবশেষে একদিন সন্ধ্যাবেলায় সুধোকে লইয়া (গিরিবালা) গোপনে 
থিয়েটার দেখিতে গেল। নিষিদ্ধ কাজের উত্তেজনা বেশি। তাহার হৃৎপিণ্ডের 
মধ্যে যে-এক মৃদু কম্পন উপস্থিত হইয়াছিল সেই কম্পনাবেগে এই আলোকময়, 
লোকময়, বাদ্যসংগীত-মুখরিত, দৃশ্যপটশোভিত রঙ্গভূমি তাহার চক্ষে দ্বিগুণ 
অপরূপতা ধারণ করিল।... সেদিন মানভঞ্জন অপেরা অভিনয় হইতেছে... 
রাধার দুর্জয় মান হইয়াছে; সে মানসাগরে কৃষ্ণ আর কিছুতেই থই পাইতেছে 
না-__ কত অনুনয় বিনয় সাধাসাধি কীদাকীদি, কিছুতেই কিছু হয় না। তখন 
গবভরে গিরিবালার বক্ষ ফুলিতে লাগিল। কৃষ্ণের এই লাঞ্কনায় সে যেন মনে 
মনে রাধা হইয়া নিজের অসীম প্রতাপ নিজে অনুভব করিতে লাগিল। কেহ 
তাহাকে কখনো এমন করিয়া সাধে নাই: সে অবহেলিত অবমানিত পরিত্যক্ত 


৯৯৭ 


স্ত্রী, কিন্ত তবু সে এক অপুর্ব মোহে স্থির করিল যে, এমন করিয়া কাদাইবার 
ক্ষমতা তাহারও আছে।... অবশেষে যবনিকাপতন হইল, গ্যাসের আলো ল্লান 
হইয়া আসিল, দরশকগণ প্রস্থানের উপক্রম করিল; গিরিবালা মন্ত্রমুদ্ধের মতো 
বসিয়া রহিল। এখান হইতে উঠিয়া যে বাড়ি যাইতে হইবে এ কথা তাহার মনে 
ছিল না।... এখন হইতে সে প্রতি সপ্তাহেই থিয়েটারে যাইতে আরম্ভ করিল। 

প্রতি সপ্তাহে না হলেও কাদন্বরী তার দুঃসাহসী সঙ্গিনীদের নিয়ে আরও 
দু'-চারবার ন্যাশনালে গোপন আযাডভেঞ্চার করলেন। ঠাকুরবাড়ির কেউ এই 
থিয়েটার-কাণ্ড টের পেল না সত্যিই। 

তারা মেতেছিলেন অশ্রমতী নিয়ে। এত শোরগোল পড়ে গেছে আর 
বাড়ির মেয়েরা দেখতে পাবে না! ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় একদিন অভিনয়ের 
ব্যবস্থা হল। কিন্তু তাতে সকলের মন ভরলেও থিয়েটারের আবহাওয়া 
পুরোপুরি উপভোগ করা গেল না যেন। কিছুদিনের মধ্যেই গুণেন ঠাকুরের 
আদেশে ১৮৭৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পুরো বেঙ্গল থিয়েটার ভাড়া নেওয়া 
হল শুধু ঠাকুর পরিবারের জন্য। আগে দু'-একজন লুকিয়ে চুরিয়ে দেখে 
থাকতেও পারেন কিন্তু অভিজাত মেয়েদের সেই প্রথম সাড়ম্বরে থিয়েটারে 
পদার্পণ। হলের বেঞ্চ সরিয়ে বাড়ি থেকে আনা কাপের্ট, আরামচেয়ার ও 
নানা আসবাবে হল সেজে উঠল। ফুলের মালা, আলবোলা, মেয়েদের চিকের 
ব্যবস্থাও বাদ গেল না। ৫ এবং ৬ নং বাড়ির সকলেই এদিন মহা উৎসাহে 
থিয়েটার দেখতে গেলেন। কাদন্বরীও। 

সেদিন নায়িকা হয়েছেন সুকুমারী। অন্যরা মুগ্ধ বিস্ময়ে নাটক উপভোগ 
করলেন কিন্তু কাদশ্বরী আনমনা। তিনি ন্যাশনালে দেখে আসা বিনোদিনীর 
রূপমাধুষের স্মৃতিতে ঈধাতুর বিষপ্নতায় ডুবে রইলেন। জ্যোতির মুখে 
বিনোদিনীর প্রশংসাই তো সবচেয়ে বেশি-শুনতে হয় তাকে! 


আন্না তড়খড় ভগ্ন মন নিয়ে বোম্বাই ফিরে গেছেন। রবির প্রতি তীত্র অভিমানে 
তাকে চিঠি লেখেন না, কিন্তু কাদন্বরীকে দু'-একটা চিঠি পাঠিয়ে নিজের কথা 
জানান। রবির দেওয়া নলিনী নামটি অবশ্য তার সবক্ষণের সঙ্গী। আনাবাই 
নলিনী নাম নিয়ে তিনি পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করেন। 

মনখারাপের মধ্যেও আনা বুঝতে পারছিলেন রবি অধরাই রয়ে যাবেন। 
কাদম্বরী চিঠিতে জানতে পারেন, আন্নার জীবনে এক নতুন পুরুষের 


১৯৯৮ 


কথা। দু'জনের প্রথম দেখা ডবলিন শহরে, প্রায় প্রথম সাক্ষাতেই প্রেম। 
লিটলডেল তখন বরোদা কলেজের উপাধ্যক্ষ । তরুণ স্কটিশ অধ্যাপক হ্যারল্ড 
লিটলডেলের সঙ্গে নভেম্বরের এক শীতসন্ধ্যায় বিয়ে হয়ে গেল আন্নার। 

আন্না হয়তো এই ভাল করল, কাদন্বরী হাতের তাস ফেলে বললেন। রূপা 
আর স্বর্ণকুমারীর সঙ্গে বিছানার ওপর মাদুর পেতে গোল হয়ে বসে তাস 
খেলছেন তখন। 

একথা বলছ কেন? স্বপ্ন জানতে চান, ভাল খারাপ কীসে মাপছ 
নতুনবউঠান? রবির সঙ্গে বিয়ে হলেই বা কী খারাপ হত? 

সে তো বাবামশায় রাজি হলেন না, কাদম্বরী বলেন। আর রবি কি তা 
চায়? চাইলে তো কিছু বলত আন্নাকে। আর আমি ভাবছিলাম, এ বাড়ির 
ছেলেরা তো অন্য নারীর রূপের মোহে স্ত্রীকে ভূলে যেতে পারে চট করে, 
তার চেয়ে ওর সাহেব বর ভাল। 

এ তোমার অভিমানের কথা বউঠান, স্বর্ণ যেন মানতে চান না জ্যোতির 
প্রতি কাদন্বরীর চাপা ক্ষোভের কারণটা। ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের চরিত্র খুব 
বলিষ্ঠ। এদের মতো সংবেদনা আর কোন বাড়িতে পাবে? 

রূপা আর ক্ষোভ চেপে রাখতে পারে না, স্ব্ণদিদি তুমি সব জানো না। 
রোজ কত সেজেগুজে অপেক্ষা করে নতুনবউঠান, আর নতুন দাদা ঘরে 
এলেও টাকাপয়সা নিয়ে পোশাক পালটে আতর লাগিয়ে আবার চলে যান, 
বউঠানের দিকে তাকানোর দু" মুহূর্ত ফুরসত নেই যেন। 
ওঁর পথ আটকে বললাম, যেতে দেব না, আজ সন্ধেটা আমার সঙ্গে থাকো। 

তিনি বললেন, ছাড়ো বউ, আমাকে যেতেই হবে। 

আমি আঁকড়ে ধরে বললাম, দেখি কেমন করে যাও! 

তিনি বললেন, জেদ কোরো না। 

আমি বললাম, করব। 

তিনি নিচ্ুরভাবে আমার হাতটা ছাড়িয়ে দিলেন। ঠেলা লেগে আমি পড়ে 
গেলাম। তিনি চলে গেলেন। ওই কি আমার সেই স্বামী, যিনি লোকনিন্দা 
উপেক্ষা করে দিনের পর দিন আমাকে নিয়ে ঘোড়ায় চেপে ময়দানে ঘুরেছেন, 
কত কাব্যপাঠ করে শুনিয়েছেন, গান শুনিয়েছেন? আমি যেন সেই স্বামীকে 
চিনতে পারি না। 


৯৯৯ 


বই-মালিনী বইয়ের ঝাপি নিয়ে দরজায় এসে দীড়ায়, বলে আজ তোমার 
ঘরে ঢুকব, না, ঢুকব না নতুনবউঠান £ 

মেঘলা আকাশের মতো টলটলে চোখ তুলে তাকান কাদন্বরী। মালিনী 
এসেছিস, আয়, তোর কথাই ভাবছিলাম। তোর সেই গিরিবালার তারপর কী 
হল সেদিন শোনা হয়নি। 

তুমি তো সেদিন রাগ করে তাড়িয়ে দিলে আমাকে, মালিনীর স্বর একটু 
অভিমানী শোনায়। 

তা হোক, তুই শোনা মালিনী, কাদন্বরী কৌতুহলী, আমি সেদিন থেকে 
মাঝে মাঝেই ভাবি গিরিবালার কী হল! 

“তখন রাত্রি দশটা। বাড়ির আর সকলে আহারাদি সমাধা করিয়া ঘুমাইতে 
গিয়াছে। এমন সময় আতর মাখিয়া, উড়ানি উড়াইয়া, হঠাৎ গোপীনাথ 
আসিয়া উপস্থিত হইল-_ সুধো অনেকখানি জিভ কাটিয়া সাত হাত ঘোমটা 
টানিয়া উর্ধশ্বাসে পলায়ন করিল। 

গিরিবালা ভাবিল, তাহার দিন আসিয়াছে। সে মুখ তুলিয়া চাহিল না। 
সে রাধিকার মতো গুরুমানভরে অটল হইয়া বসিয়া রহিল। কিন্তু দৃশ্যপট 
উঠিল না;... সংগীতহীন নীরসকণ্ঠে গোপপীনাথ বলিল, “একবায় চাবিটা দাও 
দেখি।”... গিরিবালা সমস্ত মান বিসর্জন দিয়া উঠিয়া পড়িল। স্বামীর হাত 
ধরিয়া বলিল, “চাবি দিব এখন, তুমি ঘরে চল।”... 

গোপীনাথ কহিল, “আমি বেশি দেরি করতে পারিব না, তুমি চাবি 
দাও।'... 
চাহিয়া, দাড়াইয়া রহিল। ব্যথ্ধমনোরথ গোপীনাথ রাগে গরগর করিতে করিতে 
আসিয়া বলিল, “চাবি দাও বলিতেছি,নহিলে ভালো হইবে না। 

গিরিবালা উত্তরমাত্র দিল না। তখন গোপী তাহাকে চাপিয়া ধরিল এবং 
তাহার হাত হইতে বাজুবন্ধ, গলা হইতে কণ্ঠী, অঙ্গুলি হইতে আংটি ছিনিয়া 
লইয়া তাহাকে লাথি মারিয়া চলিয়া গেল।; 

এই পর্যস্ত শুনেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন কাদন্বরী। ওরে একটু থাম তুই 
মালিনী, গিরিবালার কষ্ট আমি আর সইতে পারছি না। 

রূপা কাদন্বরীকে জড়িয়ে ধরে সাস্ত্বনা দিতে চায়। কাদন্বরীও পরম আশ্রয়ের 
মতো তার কাধে মাথা রাখেন। 


২০০ 


স্বর্ণ বলে ওঠেন, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না মালিনী, তুই কী 
একটা আবাঢে গল্প ফেঁদে বসলি আর নতুনবউঠান এমন কান্নাকাটি শুরু করে 
দিলেন! এ তো তোর বটতলার গল্প নয়, ভাষার কৌশল বেশ ভাল, বর্ননাও 
চমৎকার। এ গল্প কে লিখেছে? 

আমি জানি না স্বর্ণ দিদি, মালিনীর অকপট স্বীকারোক্তি। নতুনবউঠানের 
সামনে এলেই আজকাল আমার মাথায় এই গল্পের লাইনগুলো কিলবিল 
করে। 

সেকী রে, স্বর্ণ অবাক হন, তুই এমন চোখ বুজে গড়গড়িয়ে কী বলে 
যাচ্ছিস, আরেকটু শোনা তো! 

শোনো, আমি ছবির মতো দেখতে পাচ্ছি, মালিনী উত্তেজনায় উঠে দাড়ায়, 
গোপীনাথ থিয়েটারে গিয়ে গোলমাল পাকাচ্ছে, স্টেজের ওপর ফুলের তোড়া 
ছুড়ে দিচ্ছে, লবঙ্গ লবঙ্গ বলে টেঁচাচ্ছে। উপায় না দেখে থিয়েটারের মালিকরা 
গোপীনাথকে হল থেকে বের করে দিল। সেই রাগে থিয়েটারের দলকে 
শিক্ষা দেবার জন্য লবঙ্গকে নিয়ে পরদিন বোটে চড়ে পালিয়ে গেল গো্পী। 

ওমা, কী কাণ্ড, রূপাও উত্তেজিত, তারপর কী হল, আমার আর তর 
সইছে না মালিনীদিদি। 

স্বর্ণ বিরক্ত হন, আঃ রূপা তুই থাম তো। মালিনী এভাবে নিজের ভাষায় 
বলিস না। ওই সাহিত্যের ভাষায় বল। 

“থিয়েটারওয়ালারা হঠাৎ অকুলপাথারে পড়িয়া গেল। কিছুদিন লবঙ্গের 
জন্য অপেক্ষা করিয়া অবশেষে এক নতুন অভিনেত্রীকে মনোরমার অংশ 
অভ্যাস করাইয়া লইল; তাহাতে তাহাদের অভিনয়ের সময় পিছাইয়া গেল। 

কিন্তু বিশেষ ক্ষতি হইল না। অভিনয়স্থলে লোক আর ধরে না। শতশত 
লোক দ্বার হইতে ফিরিয়া যায়। কাগজেও প্রশংসার সীমা নাই। 

সে প্রশংসা দূরদেশে গোপীনাথের কানে গেল। সে আর থাকিতে পারিল 
না। বিদ্বেষে ও কৌতুহলে পূ হইয়া সে অভিনয় দেখিতে আসিল। 

মনোরমা যতক্ষণ মলিন দাসীবেশে ঘোমটা টানিয়া ছিল ততক্ষণ 
গোপীনাথ নিস্তব্ধ হইয়া দেখিতেছিল। কিন্তু যখন সে আভরণে ঝলমল 
করিয়া, রক্তাম্বর পরিয়া, মাথার ঘোমটা ঘুচাইয়া, রূপের তরঙ্গ তুলিয়া 
বাসরঘরে দাড়াইল এবং এক অনিবচনীয় গবে গৌরবে শ্রীবা বঙ্কিম করিয়া 
সমস্ত দর্শকমগ্লীর প্রতি এবং বিশেষ করিয়া সম্মুখবতী গোপীনাথের প্রতি 


২০৯ 


চকিত বিদ্যুতের ন্যায় অবজ্ঞাবজ্ঞপূর্ণ তীক্ষ কটাক্ষ নিক্ষেপ করিল-_ যখন 
সমস্ত দশকমগ্লীর চিত্ত উদ্বেলিত হইয়া প্রশংসার করতালিতে নাট্যস্থলী 
সুদীর্ঘকাল কম্পান্বিত করিয়া তুলিতে লাগিল-_- তখন গোপীনাথ সহসা 
উঠিয়া দ্াড়াইয়া “গিরিবালা” “গিরিবালা” করিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। 
ছুটিয়া স্টেজের উপর লাফ দিয়া উঠিবার চেষ্টা করিল-_ বাদকগণ তাহাকে 
ধরিয়া ফেলিল। 

এই অকলম্মাৎ রসভঙ্গে মম্নান্তিক ক্রুদ্ধ হইয়া দর্শকগণ ইংরাজিতে বাংলায় 
“দূর করে দাও “বের করে দাও বলিয়া চিৎকার করিতে লাগিল। 

গোপীনাথ পাগলের মতো ভগ্নকণ্ঠে চিৎকার করিতে লাগিল, “আমি ওকে 
খুন করব, ওকে খুন করব।' 

পুলিশ আসিয়া গোপীনাথকে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেল। সমস্ত 
কলকাতা শহরের দর্শক দুই চক্ষু ভরিয়া গিরিবালার অভিনয় দেখিতে লাগিল, 
কেবল গোপীনাথ সেখানে স্থান পাইল না।' 

মালিনী চুপ করতেই হাততালি দিয়ে ওঠেন স্বর্ণকুমারী। এমন অপুৰ ভাষা, 
এমন রসবোধ, আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি। বল না মালিনী কে লিখেছেন, 
কোথা থেকে মুখস্থ করলি এই লেখা? 

কাদন্বরী কেমন ঘোরের মধ্যে বলেন, গ্িরিবালা জিতে গেল! সত্যি এমন 
করে শোধ নেওয়া যায়! কী আশ্চ্য! 

রূপা হাততালি দিয়ে বলে, কী মজা, চাইলে তুমিও তো এমন পারো 
নতুন বউঠান। 

চুপ কর, যা মুখে আসে তাই বলিস, রূপাকে ধমক দিয়ে অন্যমনস্ক 
নিজের চেহারায়। 

কার লেখা বল না, অধীর হয়ে ওঠেন স্বণ, কেন হেঁয়ালি করছিস মালিনী। 
সে লেখকের আর কি কোনও লেখা আছে, এটাই বা কোথায় পেলি? 

আমি জানি না দিদি, সত্যি বলছি, মালিনী বলে, আমার মাথায় মাঝে 
মাঝে কী যেন ভর করে, এগুলো বোধহয় এখনও লেখা হয়নি, কিন্তু কোথাও 
লেখা চলছে। গল্পটা আর নাম পড়তে পারছি, “মানভঞ্জন”; কিন্তু লেখকের 
নামের জায়গাটা খালি, আমার মাথাটা কেমন ঘুরছে দিদি। আমি যাই। 


২০২ 


এই থিয়েটার-পরবের রেশ কাটতে না কাটতেই এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল বাড়িতে। 
শীতের দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর উর্মিলাকে নিয়ে কাদন্বরী শুয়েছিলেন 
বিছানায়। কখন চোখ লেগে গেছে টের পাননি। 

উম্িলা পালক্ক থেকে নেমে খেলতে খেলতে কখন ছাদের বাঁকা সিঁড়ির 
দিকে চলে গেছে, তারপর নামতে গিয়ে গড়িয়ে পড়েছে সিঁড়ির নীচে। তার 
কান্নায় ঘুম ভেঙে কাদন্বরী যখন ছুটে এলেন, ততক্ষণে ব্রেন কনকাশন হয়ে 
নিথর উদম্নিলার শরীর। 

উম্নিলার দেহ কোলে নিয়ে মুছা গেলেন কাদন্বরী। দাসীরা ছুটে গিয়ে যখন 
লেখার টেবিলে সাধনায় মগ্ন স্ব্কুমারীর কাছে খবর পৌঁছে দিল, সংবাদের 
আকস্মিক আঘাতে তিনিও অজ্ঞান হয়ে গেলেন। 

সারা বাড়িতে কালো ছায়া নেমে এল। বালক-বালিকাদের যে যার ঘরে 
আটকে রাখা হয়েছে, স্বণর ছেলেমেয়েদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সতীশ 
পণ্ডিতের ঘরে। মৃত্যুর নিষ্ঠুর রূপ যেন তারা জানতে না পারে। ওদের বলা 
হল, উদম্নিলা কোথায় বেড়াতে গেছে। 
ঘিরে। সৌদামিনীর চিন্তা, জানকীনাথ বিদেশে, এই অবস্থায় এতবড় আঘাত 
কী করে সামলাবেন স্বণ£ঃ কোনায় বসে থাকা অশ্রমতী কাদনম্বরীর দিকে 
তাকিয়ে তিনি বলে ফেললেন, দাসদাসীদের এত পয়সা দিয়ে রাখা হয়েছে, 
বাচ্চারা তো তাদের কাছেই ভাল থাকে বাপু, নজর রাখতে না পারলে এত 
আদিখ্যেতার দরকার কী ছিল? 

কথাটা কাদন্বরীর বুকে শেলের মতো বেঁধে। তিনি বলেন, উমিলা কি 
আমার সন্তান নয়ঃ পেটে ধরিনি বলে এতবড় নিষ্ঠুর কথাটা বলতে পারলে 
বড়ঠাকুরঝি? 

তা হলেও নতৃনবউ, নীপময়ী বললেন, তোমার আরেকটু সাবধান হওয়া 
উচিত ছিল। খোলা সিঁড়ির সামনে বাচ্চা নিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লে, একবার 
দাসীদের ডাকা যেত না? 

কাদন্বরী কাদতে কাদতে স্বণর সামনে এসে কাধ ধরে নাড়িয়ে বলেন, 
তুমিও কি আমাকে দোষ দিচ্ছ স্বর্ণ ঠাকুরঝি? সত্যি বলো, আমার জানা 
দরকার তুমি কী ভাবছ। 

স্ব উত্তর দেন না, কাদতে থাকেন, কাদতেই থাকেন। সৌদামিনী 


২০৩ 


কাদন্বরীকে বলেন, ওকে বিরক্ত কোরো না, একটু কাদতে দাও। সন্তানের 
অপঘাত মৃত্যুর চেয়ে বড় শোক হয় না। 

সৌদামিনীর কথায় অবাক হয়ে যান কাদম্বরী, তিনিও যে সদ্য তার 
একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন, তার সেই যন্ত্রণার কথা কেউ অনুভবই করছে 
না যেন? এরা কী নিষ্ঠুর অনুভূতিহীন! স্বর্ণ কোনও জবাব দিচ্ছে না কেন? 
সেও কি আমাকে দোষ দিচ্ছে? 

পেছন থেকে কে যেন বলে ওঠে, নিজের পেটের মেয়ে হলে কি এমনি 
ঘুমিয়ে পড়তে পারতে ঠাকরুন£ মায়ের চেয়ে কি কোনওদিন মাসির দরদ 
বেশি হয়, না হতে পারে? 

হায়, হায়! এ-কথা শোনার আগে তার মৃত্যু হল না কেন? আর কী মানে 
আছে বেঁচে থাকার? স্বর্ণর নীরবতা তাকে সবচেয়ে আঘাত করছে। মেঝেতে 
লুটিয়ে পড়ে আছাড়ি পিছাড়ি কাদতে থাকেন সম্তানহীনা অপমানিতা 
কাদন্বরী। 

রূপা কোথা থেকে ছুটে এসে কোলে তুলে নেয় কাদন্বরীর লুটিয়ে পড়া 
মাথা। তাকে জড়িয়ে তুলে ধরে ঘরে নিয়ে যেতে যেতে সবার দিকে তাকিয়ে 
সে চিৎকার করে, তোমরা কি মানুষ? একেই নতুনবউঠান ঘৃত্যুশোকে যন্ত্রণা 
পাচ্ছেন, তার ওপর তোমরা বাক্যবাণে বিধছ? ছিঃ! 

রূপার দুঃসাহসে বাড়ির মেয়েরা স্তম্ভিত পাথর হয়ে দাড়িয়ে থাকেন। 
তার কাধে ভর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাটতে থাকেন অশ্রমতী কাদন্বরী, 
পেছনের লম্বা বারান্দা জুড়ে তার গঙ্গাজলি ডুরে শাড়ির আচল লুটিয়ে চলে, 
যেন এক নদীর মতন। 


১৪ 


লুসি ও বিনোদিনী 


রবিকে ইংলন্ডে আনা হয়েছে ব্যারিস্টারি বা আই সি এস পরীক্ষার জন্য। 
কিন্তু মেজোবউঠানের ন্নেহচ্ছায়ায়, ঘরের আরামে রবির “ভগ্রহৃদয়” কাব্যটি 
এগিয়ে চললেও পড়াশোনা যে খুব বেশি এগোচ্ছে না সেটা কিছুদিনের 
মধ্যেই লক্ষ করলেন সত্যেন। সুতরাং বন্ধু তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে 
তাকে লন্ডনে পাঠানো হল। প্রথমে কিছুদিন রিজেন্ট পার্কের সামনে একটি 
ভাড়া বাড়িতে একা থাকার প্র্যাকটিস করতে হল তাকে। লোকজন কেউ 
দেখা করতে এলে রবির মনে হয় তাদের জোর করে ধরে রাখবেন, এই 
শীতে নির্জন ঘরে তার প্রাণ যেন হাপিয়ে ওঠে। 

মাঝে মাঝেই সত্যেন আসেন। কোনওদিন সত্যেন, তারক ও রবি 
হয়তো দল বেঁধে যোগ দিলেন ইন্ডিয়ান আসোসিয়েশনের সভায়। আবার 
কোনওদিন ব্রিটিশ গণতন্ত্রের কাঠামোকে কাছ থেকে দেখার জন্য তারা 
ব্রিটিশ পালামেন্টের গ্রীষ্ম অধিবেশন দেখতে গেলেন। পরপর কর্পদিন গিয়ে 
কিন্তু হতাশ হলেন রবি। 

ঘরে ফিরে সত্যেন ও তারককে বলেই ফেললেন তার নিরাশার কথা. 
পার্লামেন্টের অভ্রভেদী চুড়া, প্রকাণ্ড বাড়ি, হা করা ঘরগুলো দেখলে খুব 
তাক লেগে যায়; কিন্তু ভেতরে গেলে তেমন ভক্তি হয় না। ইংরেজদের 
গণতন্ত্র ও বিচক্ষণতা সম্বন্ধে আমার যতটা উঁচু ধারণা ছিল, ততই এরা হতাশ 
করল। 

সত্যেন নিজেও বেশ হতাশ, ইংরেজরা যে এমন অসভ্যের মতো চেঁচামেচি 
করবে এ আমার দুঃস্বপ্নের অতীত ছিল। 

রবি যোগ করলেন, এরা তো অনা কাউকে কথা বলতেই দিচ্ছে না. 

২০৫ 


বক্তাকে কতভাবে যে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তা ভাবা যায় না, কেউ 
হাততালি দিচ্ছে, কেউ হিসস হিসস শব্দ করে, এত অসংযত! 

তারক একটু লঘু করার চেষ্টা করেন, আসলে তোমরা বুঝতে পারছ না, 
এটাই রাজনীতির আসল চেহারা, কেউ কাউকে বলতে দেব না, কেউ কাউকে 
বিনা যুদ্ধে একচুল জমি ছাড়ব না। 

তা হলে ভদ্রতা, সৌজন্যের বড় বড় কথাগুলো সব ইংরেজদের ভণ্ডামি, 
রবি তবু ফুঁসে ওঠেন। সেদিন যে আইরিশ মেম্বার ভারতের প্রেস আ্যাক্ট- 
এর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছিলেন, কেউ তার কথা মন দিয়ে শুনলই না! 
অথচ ভারতবাসীর করের টাকাতেই ওদের এত রমরমা। ভারতের কোনও 
রিপ্রেজেন্টেটিভ থাকবে নাই বা কেন? 

রবি যা খেপেছে এবার না রাজদ্রোহী হয়ে ওঠে। তারক বলেন, তার চেয়ে 
তাড়াতাড়ি ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে এ-সব তর্ক তোলার চেষ্টা করো। 

তবে হ্যা, রবি বলেন, কিছু যে শেখার মতো পাইনি তা বলব না, 
গ্লযাডস্টোনের বাগ্মিতায় আমি অভিভূত। তিনি মঞ্চে ওঠামাত্রেই সমস্ত ঘর 
একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল, গলার স্বর শুনতে পেয়ে সারে ঘুরে বেড়ানো 
মেন্বারেরা এসে বসতে লাগলেন, দ্ু'দিকের বেঞ্%চি ভরতি হয়ে গেল, তখন 
যেন পুরণ উৎসের মতো প্ল্যাডস্টোনের ভাষণ উৎসারিত হতে লাগল। তিনি 
তেজের সঙ্গে বলেন কিন্তু চিৎকার করেন না, যা বলেন আন্তরিক বিশ্বাস থেকে 
বলেন। আর অন্যদিকে, আইরিশ মেলোডির সুরে মজে থাকার পাশাপাশি 

ওঁরা সেদিন তারক পালিতের বাড়িতে উঠেছেন। হঠাৎ বালা এসে রবির 
হাত ধরে টানতে থাকেন পিয়ানোর দিকে। 

পেছন থেকে সতু বলে ওঠেন, অনেক রাজনীতি হয়েছে, এবার তোমার 
একটা আইরিশ মেলোডি শোনাও রবি। আমার বিলেতি বান্ধবীরাও তোমার 
গলার খুব প্রশংসা করেছে। 

সেই ভাল, স্কচের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে তারক বললেন, রবির গান 
শোনা যাক এবার, বালা সতুর ইংরেজ বান্ধবীরাও যখন ভাল বলছে! 

রবির গান শেষ হতেই বালা যোগ করেন, রবির গলার এই টেনর ইংরেজ 
মেয়েদের মুগ্ধ করেছে। শুধু তাই নয়, রবি, তোমার চেহারার প্রশংসাতেও 
পঞ্চমুখ তারা। 


২০৬ 


সতু বলেন, রবি তো লজ্জায় মেয়েদের মুখের দিকে তাকাতেই পারে না। 
এখানে পার্টি হলে সবাই একটু আধটু ফ্লার্ট করে, তুমি কেন করতে পারছ না 
রবি! তোমাকে মেয়েরা এত পছন্দ করে! 

রবি লাজুক হেসে বললেন, আমার চোখ সেই যে বাঙালি মেয়ের 
কালোহরিণ চোখে বাঁধা পড়েছে, তার থেকে আর মুক্তি পেলাম না। বিলিতি 
নীলনয়নাদের দেখে আমার পুষিবেড়াল পুষিবেড়াল মনে হয়। 


কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য দু'জন নীলনয়না পুষিবেড়ালের সঙ্গে সরস বন্ধুে 
দাম্পত্য ঝগড়ায় বিপর্যস্ত রবি আশ্রয় নিলেন লুসি স্কটদের পরিবারে । বিলেতের 
এই পরিবারটি হয়ে উঠল তার আপনজনের মতো। বিশেষত মাতৃন্সেহবঞ্ষিত 
রবিকে মিসেস স্কট তার অসীম স্নেহের বন্ধনে বেঁধে ফেললেন। 

রবি কাদন্বরীকে চিঠিতে লিখতে থাকেন, “এখন আমি ক-র পরিবারের 
মধ্যে বাস করি। তিনি, তীর স্ত্রী, তাদের চার মেয়ে, দুই ছেলে, তিন দাসী, 
আমি ও টেবি বলে এক কুকুর নিয়ে এই বাড়ির জনসংখ্যা। মিস্টার ক 
একজন ডাক্তার। তার মাথার চুল ও দাড়ি প্রায় সমস্ত পাকা। বেশ বলিষ্ঠ সুস্রী 
দেখতে। অমায়িক স্বভাব, অমায়িক মুখশ্রী। মিসেস ক আমাকে আন্তরিক 
যত্ব করেন। শীতের সময় আমি গরম কাপড় না পরলে তার কাছে ভংসনা 
খাই। খাবার সময় যদি তার মনে হয় আমি কম খেয়েছি, তা হলে যতক্ষণ না 
তার মনের মতো খাই ততক্ষণ পীড়াপীড়ি করেন। বিলেতে লোকে কাশিকে 
ভয় করে; দৈবাৎ যদি আমি দিনের মধ্যে দু'বার কেশেছি তা হলেই তিনি 
জোর করে আমার স্নান বন্ধ করান, আমাকে দশরকম ওষুধ গেলান, শুতে 
যাবার আগে আমার পায়ে খানিকটা গরম জল ঢালবার বন্দোবস্ত করেন, 
তবে ছাড়েন।' 

রবিকে গরম জলের সেক দিতে এসে লুসি ও জেসি নানারকম খুনসুটি 
শুরু করে দেয়, তাদের চঞ্চলতায় রবির সংকোচ কেটে যাচ্ছে। তিনিও বেশ 
ওদের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে ওঠেন। 

লুসি হেসে হেসে বলে, জানো রবি, একজন ইন্ডিয়ান অতিথি আসবে 
শুনে আমরা ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে মাসির কাছে চলে গিয়েছিলাম! 

কেন, রবিও মজা পেয়ে জানতে চান, আমি কি ভূত না রাক্ষস? 


না না, জেসি এবার বলে, আমরা ভেবেছিলাম কোথাকার কোন জংলি 
আসছে, বড় বড় নখ, গায়ে গন্ধী। 
কানে গলায় ভারী ভারী সব গয়না, হাসতে হাসতে লুসি বলল। 

ও তোমরা ইন্ডিয়ান বলতে রেড ইন্ডিয়ান.ভেবেছিলে, রবি লুসি-জেসির 
কথা শুনে মজা করে বলেন, দাড়াও না, একদিন ওরকম সেজে দেখাব 
তোমাদের। আবার মাসির বাড়ি পালাতে হবে। 

ইসস, ভয় দেখাবে! লুসি বলে, দেখি কে কাকে ভয় দেখায়! পায়ে সেক 
দিয়ে দিচ্ছি, আরাম করে শুয়ে আছেন বাবু, আবার ভয় দেখাবেন! 

রবি বলেন, তখন তো পালিয়ে গিয়েছিলে, এখন কী মনে হচ্ছে দেখে? 

লঁসি বলে, বলব না। বুঝে নাও। 


রাতে খুব সুন্দর সুন্দর সব স্বপ্ন দেখলেন রবি। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল। 
বাইরের ঘরের সোফায় এসে বসেছিলেন। এ বাড়ির সকালটা কীভাবে শুরু 
হয়, কে জানে। সব চুপচাপ। সবাই ঘুমোচ্ছে। 

একটু পরে বড়মেয়েটি নেমে এল নীচে। ফায়ারপ্লেসের আগুন উসকে 
দিয়ে সে বলে, গুড মনিং রবি। ঘুম ঠিরু হয়েছিল? 

এটাই কথাবাতা শুরু করার দস্তুর, রবিও তাকে বলেন গুড মনিং। 

মেয়েটি দ্রুতপায়ে রান্নাঘরে গিয়ে রাঁধুনিকে ব্রেকফাস্টের ব্যাপারে কিছু 
নিদেশ দেয়। আবার ফিরে এসে অগ্নিকুণ্ডে দু'-চারটে কয়লা গুঁজে দিয়ে 
সোফায় বসে। 

এমন সময় সিঁড়িতে দুদ্দাড় শব্দ। শীতে হি হি করে কাপতে কাপতে মিস্টার স্কট 
নামলেন। ফায়ারপ্লেসের কাছে গিষ্বে হাত পা সেকতে সেকতেই গুড মনিং-এর 
পাট সেরে ফেললেন। তারপর খবরের কাগজ নিয়ে বসলেন খাবার টেবিলে। 

রবিকে দু-একটা খবর পড়ে শোনাতে শোনাতে কফিপব শুরু হয়ে যায়। 
লুসি ও জেসি নেমে এসে বাবার গালে চুমু দিয়ে সকাল শুরু করে। 

মিস্টার স্কট বললেন, এই যে লুসি জেসি, আজ আবার ফাইন হল 
তোমাদের। আমার পরে ঘুম থেকে উঠেছ, দাও, দাও চার আনা ফাইন। 

দেব, বাবা, দেব। ঠিক দিয়ে দেব। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে লুসি বলে। 
জেসিও বাবাকে একট আদর করে যায়। 
২০৮ 


স্কট রবিকে সাক্ষী মেনে বলেন, দেখো রবি, এরা কথা রাখছে না। এদের 
সঙ্গে আমার চুক্তি আছে, ওরা আমার আগে উঠলে আমি পাঁচ সিকে পুরস্কার 
দেব আর আমি আগে উঠলে ওরা দেবে চার আনা ফাইন। ওদের কাছে 
আমার অনেক পাওনা হয়েছে, এরকম ডেট অব অনার ফাঁকি দেওয়া কি 
ভত্রতা? 

সব শেষে ব্রেকফাস্ট টেবিলে যোগ দিলেন মিসেস স্কট। সাড়ে নস্টার 
মধ্যে জলখাবার পরব শেষ। একটু হাসিঠাট্টার পরেই মেয়েদের তাগাদা 
দেন স্কট আন্টি। সবাই কাজে লেগে পড়ো। হাতে দস্তানা পরে আন্টি নিজে 
দাসীদের নিয়ে একতলা থেকে চারতলা পর্ষস্ত ঝাড়মোছ করান। রান্নাঘরে 
গিয়ে রুটিওলা, তরকারিওলা, মাংসওলার বিল দেখে পাওনা মেটান। কর্তার 
সঙ্গে পরামশ করেন। রান্নার তদারক করেন। বড় মেয়েটিও তার সঙ্গে সঙ্গে 
ঘোরে। 

মেজোমেয়ে জেসির কাজ হল দাসীরা ঘর ঝাট দেওয়ার পর একটা ঝাড়ন 
নিয়ে ড্রয়িংরুমের ধুলো সাফ করা। লুসি তখন সেলাই নিয়ে বসে। বালিশের 
ওয়াড় বা মোজা রিপু করা, চিঠিপত্র লেখা এ-সব তার কাজ। লুসি কিন্তু 
গানবাজনাও করে, বাড়িতে সে একমাত্র গাইয়ে-বাজিয়ে। গানের আসরে 
আজকাল রবিও সোৎসাহে যোগ দিচ্ছেন। 


লুসির খেয়ালে হঠাৎ এব.টি নতুন খেলা শুরু হল কিছুদিন। প্ল্যানচেট-চর্চা। 
এক-একদিন সন্ধ্যায় টেবিল চালা হত। কয়েকজন মিলে চেয়ারে বসে একটা 
টিপাইতে হাতে হাত লাগিয়ে রাখতেন আর টিপাই উন্মন্তের মতো সারাঘরে 
ঘুরে বেড়াত। শেষে যাতে হাত দেন তাই নড়তে শুরু করে। একবার 
খেলাচ্ছলে ওরা মিস্টার স্কটের টুপির দিকে হাত বাড়াতেই স্কট আন্টি ছুটে 
এসে টুপি সরিয়ে নিলেন, স্কটসাহেবের কোনও জিনিসে শয়তানের স্পশ 
লাগুক সেটা তিনি হতে দেবেন না কিছুতেই। 

এরমধ্যে রবি ভরতি হয়েছেন লন্ডনে ইউনিভার্সিটি কলেজে ইংলিশ পড়ার 
জন্য। এখানে রবির সহপাঠী তারকের ছেলে লোকেন। বয়স কম হলেও 
অদ্ভুতভাবে তেরো বছরের লোকেনের সঙ্গে আঠারো বছরের রবির বন্ধুত্ব 
খুব জমে উঠল অচিরেই। লুসিকে বাংলা শেখাতে গিয়ে রবি যখন শব্দের 
ব্যুৎপত্তি নিয়ে হোচট খাচ্ছেন, তখনও তার সাহায্যকারী লোকেন পালিত। 


২০৯ 


রবির সন্দেহ হয় শুধু লুসি নয়, জেসিও যেন তার প্রতি একটু বেশিই 
মনোযোগী। বাগানের গাছের ফাঁকে, ছাদের দক্ষিণমুখো ঘরে, পিয়ানোর 
রিডের ওঠা-নামায়, প্ল্যানচেটের আঙুল ছোঁয়ায় কী যে মধুর রহস্য পল্লবিত 
হয়ে ওঠে, রবি সবটা যেন বুঝতে পারেন না। 

ইংলিশ ক্লাসের ফাকে রবি তার সমস্যার কথা বলেন লোকেনকে। লুসি 
যেন কী একটা কথা বলতে চায়, কিন্তু কী বলতে চায় রবি বোঝেন না। 
আবার জেসিও কত রহস্য করে লুসিকে লুকিয়ে। 

লোকেন তাকে বলে, বুঝতে পারছ না, ওরা দু'জনেই তোমার প্রেমে 
পড়েছে। 
না।কীযেকরি! 

কী আবার করবে, লোকেন অনেক পরিণত, প্রেম করো। ফ্লাট করো। 
ওরা তোমার সুরের ভক্ত, চেহারায় মুগ্ধ। 

রবি সাহস পান না। তার মনে পড়ে যায় ঘরের কোনার একটি রহস্যময় 
কালো চোখ। কালো আর নীল চোখের টানাপোডেনে হাবুডুবু খান তরুণ 
রবি। 

স্কটকন্যাদের সঙ্গে রবির মাখামাখি বন্ধুত্বের কাহিনি কিছুটা পল্লবিত হয়ে 
ক্রমে দেবেন ঠাকুরের কানেও এসে পৌঁছিল। তার ওপর ইংরেজ মেয়েদের 
স্বাধীন রূপ নিয়ে রবির মুগ্ধতা যেভাবে ভারতীতে “মুরোপ প্রবাসীর পত্র; 
নামে প্রকাশিত হচ্ছিল, তাতে দেশে বেশ শোরগোল পড়ে গেল। কয়েকজন 
তো জোর তর্ক বাঁধিয়ে দিলেন এ নিয়ে। 

মহর্ষি রবিকে নির্দেশ দিলেন দেশে ফিরতে। কিছুদিন এলোমেলো বিলেত 
ভ্রমণের পরে সবে যখন ইংলিশ ক্লাসের শিক্ষক মি. মরলির পড়ানোয় 
আকর্ষিত হয়েছেন রবি, তখনই তার দেশে ফেরার ডাক এল। 

স্কট আন্টি রবির হাত ধরে কেঁদে ফেললেন বিদায়কালে। রবির মনেও 
শেষ কদিন চলল অসহ্য টানাটানি। মালতীপুঁথির খাতা নানারকম আঁকিবুকি 


“ফুরালো দুদিন/কেহ নাহি জানে এই দুইটি দিবসে-_ 
কি বিপ্লব বাধিয়াছে একটি হৃদয়ে। 


২১০ 


দুইটি দিবস/চিরজীবনের স্রোত দিয়াছে ফিরায়ে-_ 

এই দুই দিবসের পদচিহৃগুলি/শত বরষের শিরে রহিবে অঙ্কিত। 

* যত অশ্র বরষেছি এই দুই দিন/যত হাসি হাসিয়াছি এই দুই দিন * 
এই দুই দিবসের হাসি অশ্রু মিলি/ 

হৃদয়ে স্থাপিবে চির * হাসি অশ্রু। * বসন্ত বরষা ।' 


নিজের বেদনা চেপে রেখে, ব্যারিস্টার বা আই সি এস হওয়ার চেষ্টায় 
জলাঞ্জলি দিয়ে, দুই নীলনয়নার হৃদয়ে দাগা দিয়ে ১৮৮০ সালের বসন্তকালে 
দেশে ফিরে এলেন রবি। পথে ফ্রান্স ভ্রমণ করে একইসঙ্গে বাচ্চাদের নিয়ে 
ঘরে ফিরলেন সত্যেন জ্ঞানদাও। 


বাবু কলকাতার এক আশ্চ নক্ষত্র বিনোদিনী। বারাঙ্গনার মেয়ে পুঁটি কী এক 
অসাধারণ জাদুমন্ত্রে নজেকে পালটে নিয়েছে। তার রেয়াজি কণ্ঠের গানে, চমকদার 
রূপে আর অভিনয়ের মুনশিয়ানায় রাতের পর রাত জমে ওঠে আলোকিত 
নগরমঞ্চ। শহরের অভিজাত পুরুষেরা তার পায়ে লুটোপুটি খায়। অভিনয় শেষে 
দেয় তো কারও হাত প্রণামের ছলে হাটু বেয়ে তার উরু ছুঁতে আসে। 

বিনোদিনী অবশ্য সবাইকে পাত্তা দেন না। বাছা বাছা বাবুরাই তার প্রসাদ 
পায়। ধনীঘরের এক যুবক এখন তার প্রেমিক, যদিও সে ছেলেটির বাড়ি 
থেকে বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। 

কিন্তু সবার ওপরে গিরিশচন্দ্র। তিনিই বিনোদিনীর ঈশ্বর। বিনোদিনীর 
বাড়িতে আজকাল প্রায়ই জমাটি আসর বসাচ্ছেন গিরিশ। অমৃতলাল বসু, 
অমৃতলাল মিত্রেরাও আসেন। কোনওদিন গিরিশ কিটসের কবিতা পাঠ করে 
শোনান তো আর-একদিন শেকসপিয়রের নাটক, কোনওদিন কাব্যালোচনা 
তো কোনওদিন আবার বিলেতের অভিনেত্রীদের কথা। মিসেস সিডেনস-এর 
লেডি ম্যাকবেথ চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের কথা প্রায়ই বলেন গিরিশ। 
বিনোদিনী চাতকের মতো শুষে সব রসগ্রহণ করেন। নিজেকে গিরিশের 
মনোমতো করে তুলতে তার চেষ্টার অস্ত নেই। 
হঠাৎই এদিন সেখানে উপস্থিত হলেন জ্যোতি। 


২৯৯ 


গিরিশ বলে ওঠেন, এ কাকে টেনে এনেছিস বিনোদ? এই খারাপ পাড়ায় 
নটীর ঘরে জ্যোতিঠাকুরের উদয় হল, লোকে যে আমাকেই দুষবে! 

কেন গিরিশবাবু, আপনি এলে আমারই বা আসতে দোষ কোথায়? 
জ্যোতি বলেন। নটার কাছে নাট্যকারকে তো আসতেই হবে। 

জ্যোতি, তুমি বড়ঘরের ছেলে, গিরিশ তবু বললেন, তুমি এখানে এলে 
সমাজে অনেক কথা হবে। আমার কথা আলাদা, আমি সারাদিন নেশা করি, 
থিয়েটারের নেশায় যা খুশি করি, আমাকে নিয়ে কেউ কিছু বলে না, বললেও 
যায় আসে না। 

আমি আপনাকে আমার নতুন নাটক শোনাতে চাই, জ্যোতি গিরিশকে 
বলেন, আপনি অনুমতি না দিলে বিনোদিনী তো তাতে অভিনয় করতে 
পারবে না। 

বিনোদিনীর হিরের নাকচাবি ঠিকরে ওঠে। এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন 
তিনি, এখন বলে ওঠেন, আমি তো এখন ন্যাশনালে ছাড়া অন্য কোথাও 
থিয়েটার করব না, সরোজিনী করেছিলাম। জ্যোতিঠাকুরবাবু, এখন আপনার 
নাটক কী করে করি বলুন তো? 

জ্যোতির হৃদয় সে মুহূর্তে যেন থেমে গেল, পৃথিবী দুলে উঠল। সরোজিনী! 
সরোজিনী! উঃ কী নিষ্ঠুর তুমি! বিনোদিনীর গা থেকে ভেসে আসা আতরের 
যে গন্ধ জ্যোতিকে পাগল করে সেই গন্ধে এখন তার দম বন্ধ হয়ে আসে। 

গিরিশ কেঠো গলায় শ্লেষের সঙ্গে জ্যোতিকে বললেন, ও, আসল কথা 
এটাই, আমাকে নাটক শোনাতে চাওয়াটা একটা বাহানা, আসলে তুমি চাও 
বিনোদিনীকে! 

উপস্থিত দু'-একজন হেসে হেসে বলেন, বিনোদিনীকে কে না চায় মশায়, 
ঠাকুর একা আর কী দোষ করলেন? 

এ-সব হেঁজির্পেজি লোকের ফোড়ন কাটায় জ্যোতির মানে লাগে, অথচ 
সত্যিই তো বিনোদিনীর টানে চুম্বকের মতো ছুটে এসেছেন তিনি। ওর হাসি, 
ওর গন্ধ, ওর নাকচাবির ইশারা ওঁকে পাগল করে দেয় যে উন্মাদনা কোনও 
ঘরনির কাছেই পাওয়া সম্ভব না, যা এমনকী কাদম্বরীও দিতে পারে না। 

একটু বিরক্ত হয়েই জ্যোতি বললেন, দেখুন গিরিশবাবু, এতে দোষ 
কীসের? বিনোদিনী ভাল অভিনেত্রী, আমি যদি তাকে আমার নাটকের 
হিরোইন করতে চাই, আপনার গায়ে লাগবে কেন? 
৯ 


গিরিশের এক ফচকে চেলা বলে ওঠে, রোজ সন্ধ্যায় জ্যোতিঠাকুর 
ন্যাশনালে আসেন বিনোদিনীকে দেখতে! রোজ! 

তাতে কী হল? জ্যোতি ফুঁসে ওঠেন। 

আহা রাগ করছেন কেন, বিনোদিনী জ্যোতির হাত ধরে অনুনয় করেন, 
ঠান্ডা হয়ে একটু বসুন দেখি! 

জ্যোতি তার দিকে তাকিয়ে বলেন, তোমার কাছে আসতে এত পাথরে 
ঠোক্ধর খেতে হয় কেন সরোজিনী? 

আহা, ওটা কি আমার নাম নাকি? বিনোদিনী লজ্জা পান। আমি তো কত 
চরিত্র করেছি, যখন যে পার্ট করি সেটাই আমাকে সারাক্ষণ খেলার সঙ্গীর 
মতো ঘিরে রাখে, তখন আর অন্য পার্ট মনে থাকে না। 
যতদিন-না আমার নতুন নাটকের হিরোইন হবে। ওই “জ্বল জ্বল চিতা” গানের 
সঙ্গে আগুনের দৃশ্যে তোমার রূপ যে দেখেছে সে কোনওদিন ভুলতে পারবে 
না। 

সরোজিনী নিয়ে দর্শকেরা পাগল হয়ে গেছিল ঠিকই, বিনোদিনী বলেন, 
কিন্তু ঠাকুর, আগেও অমন হয়েছে। আমরা যখন গ্রেট ন্যাশনাল থেকে সারা 
ভারত ঘুরে ঘ্বুরে “নীলদর্পণ” করছিলাম, কী হয়েছিল জানো! ক্রমে সেই 
দৃশ্যটা এল, রোগসাহেব ক্ষেত্রমণিকে পীড়ন করছে আর ক্ষেত্রমণি নিজের 
ধর্মরক্ষার জন্য চিৎকার করে বলছে, ও সাহেব, তুমি মোর বাবা, মুই তোর. 
মেয়ে। ছেড়ে দে, আমায় ছেড়ে দে। তারপর তোরাপ এসে সাহেবের গলা 
টিপে ধরে হাটুর গঁতো কিল চড় মারছে, অমনি সাহেব দর্শকরা হইচই 
শুরু করে দিল। কতগুলো লালমুখো গোরা তরোয়াল খুলে স্টেজের ওপর 
ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেকী হুড়োহুড়ি চিৎকার! 

জ্যোতি বলেন, জানি বিনোদ, সেই অভিনয় দেখেই তো আমি তোমাকে 
সরোজিনীর পার্ট দেব ঠিক করলাম। কিন্তু সরোজিনীর উন্মাদনা আরও বেশি 
ছিল। অন্যদের দিকে তাকিয়ে আবার বলেন, আপনারা দেখেননি, সরোজিনী 
এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে ওই নাটকটি গ্রামেগঞ্জে যাত্রাপালা হয়েও ছড়িয়ে 
পড়েছে। 

গিরিশের একটু গায়ে লাগে, বলেন, আপনি সরোজিনী ভুলতে পারছেন 
না, মেঘনাদ বধের সাতটি চরিত্রে ওকে দেখেননি? বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনীতে? 


২১৩ 


মৃণালিনীতে ওর অভিনয় দেখে বঙ্কিম বলেছেন, আমি মনোরমার ছবি 
লিখেছিলাম, কখনও প্রত্যক্ষ চলেফিরে বেড়াতে দেখব আশা করিনি। এখন 
বিনোদিনীর অভিনয়ে যেন জ্যান্ত মনোরমাকে দেখছি। 

চেলা বলে, আর সধবার একাদশীর কাঞ্চন? 

আরেক চেলা বলে, ব্রিটানিয়া, পলাশীর যুদ্ধে? 

অমৃতলাল বসু বললেন, সরোজিনীতে খুব ভাল পার্ট করেছিল বিনোদিনী 
সত্যি, কিন্ত গিরিশ যখন নায়ক সাজে, তার উলটোদিকে নায়িকা বিনোদিনীকে 
যেমন মানায়, তেমনটা আর কিছুতে না। 

জ্যোতির বিমধষ লাগে, এখানে যেন গিরিশের রাজ্যপাট। গিরিশের কবল 
থেকে না ছাড়াতে পারলে এভাবে বিনোদিনীকে রাজি করানো যাবে না। 

জ্যোতি ঘুরেফিরে আসেন বিনোদিনীর কাছে। বিনোদিনীও খুশি হন তাকে 
দেখলে, নিজের লেখা কবিতার খসড়া শোনান। জ্যোতিঠাকুর প্রশংসা করলে 
বসিয়ে বিনোদিনী গান গেয়ে ওঠেন, 


“চাই না চাই না চাই নারে তোর ওজন করা ভালবাসা 
সিন্ধুসম ভালবাসা বিন্দুতে কি যায় পিপাসা 
ভালবাসা পাকা সোনা, ভালবাসায় খাদ মেশে না 
ভালবাসা বেচাকেনা ভরাডুবি করে আশা।” 


জ্যোতি আকুল হয়ে বলে ওঠেন, এমন গান তুমি কাকে নিয়ে বেঁধেছ 
সরোজিনী? কে তোমাকে এমন দাগা দ্রিলঃ আমাকে বলো, আমি তোমার 
সব কষ্ট বুক পেতে নেব বলেই তো বারবার ছুটে আসি। 

বিনোদ রহস্যময় হাসি হেসে আর-একটা গান ধরেন। 

জ্যোতি যখন তাকে নিজের লেখা গান বা নাটক শোনান, বিনোদিনী 
তখন মুগ্ধ শ্রোতা। কিন্তু তার মনের বেণের নিভৃত জায়গাটায় কিছুতেই 
যেন পৌঁছতে পারেন না জ্যোতি। সেখানে বিনোদ তাকে ঢুকতে দেয় না 
কেন? কে বসে আছে সেখানে? গিরিশ না অন্য কেউ? নিজের কন্দর্পকাস্তি 
রূপ এবং আশ্চর্য প্রতিভাকে ব্যর্থ মনে হয় জ্যোতির। ভগ্রহৃদয় নিয়ে বারবার 
বিনোদিনীর কাছ থেকে ফিরে আসেন তিনি। 


২৯৪ 


ফিরে আসেন কাদন্বরীর কাছে। কিন্তু ফিরে এসেও সুখ কোথায়? কাদন্বরী 
তো বারবার জ্যোতিকেই কাঠগড়ায় তোলে। কেঁদেকেটে অস্থির করে তোলে 
বিনোদিনীর সঙ্গে কল্পিত প্রণয়ের অভিযোগে। 
ও দু'একটি বন্ধুবান্ধব। সেদিন ওঁদের গানবাজনার মুড, জ্যোতি পাগলের 
মতো সুর তৈরি করছেন আর অক্ষয় কথা বসাচ্ছেন। বন্ধুরা বাহবা দিচ্ছেন 
সুরে সুর মিলিয়ে। 

কাদন্ধরী আজ আসরের মধ্যমণি। জ্যোতি সুর দিচ্ছেন তার দিকে তাকিয়ে, 
উৎসবে মেতেছে। কাদন্বরীর বড় ভাল লাগে। বহুদিন পরে আবার এমন 
সন্ধ্যার মতো। আজ আবার যেন তিনি ত্রিমুণ্তী হেকেটি। 

আকাশ কালো করে ঝড় এল, বৃষ্টি এল, পালের মতো উড়তে লাগল 
কাদশ্বরীর শাড়ি, তবু কারও ভ্রক্ষেপ নেই। নীল মেঘডন্বরু শাড়ির ঘোমটায় মাথা 
ঢেকে নিলেন হেকেটি আর দুই ঘোরলাগা পুরুষ গান তৈরি করে চললেন। 

বাহ্যজ্ঞানহীন তুরীয় অবস্থায় জ্যোতি ও অক্ষয় একের পর এক কত গান যে 
তৈরি করলেন সেদিন! গানগুলি ইন্দ্র, শচী ও দেবদেবীদের নিয়ে নানারকম 
প্রেমের, রাগ অনুরাগের গান। চন্দননগরে পৌঁছে সেগুলি নিয়ে বসলেন দুই 
বন্ধু, ঘষামাজা করে তৈরি হল “মানময়ী” নামে একটি গীতিনাট্য। 

নাটক তৈরি হতেই জ্যোতির আর-একরকম ছটফটানি, এবার থিয়েটার 
নামাতে হবে। জোড়ার্সাকোর বাড়িতে এই গীতিনাট্যের তোড়জোড়ের মধ্যেই 
ফিরে এলেন রবি, সত্যেন ও জ্ঞানদা। বাড়ির গানবাজনার এই চিরপরিচিত 
ক্োতে ফিরতে পেরে রবির মন নেচে ওঠে। গুনগুন করে মানময়ীর গানের 
সুর ভাজতে ভীজতেই রবি লিখে ফেললেন একটি নতুন গান। 

রবির গলা শুনে কাদন্বরী বলেন, রবি কেমন পালটে গেছ, তোমার গলাও 
কেমন বিলিতি বিলিতি ঠেকছে। 

আহা, এ-কথা শোনার জন্য কি ফিরে এলাম বউঠান, রবি মজা করে 
বলেন, সেখানে তোমার কথা ভেবে ভেবে রাতে ঘুম হত না, কত বিলিতি 
বালিকার ফুলশর অগ্রাহ্য করে তোমার কাছে ফিরে এলাম, আর তুমি এমন 
পরপর ভাব করছ! 


২৯৫ 


আযাই রবি, একদম বাজে কথা, কাদশ্বরী ঠোট ফুলিয়ে বলেন, আমার কথা 
তোমার মনেই ছিল না। কত বালিকাকে ফুলশরে বধ করেছ তুমিই জানো, 
তবে আন্না যে এখানে এসে তোমার জন্য চোখের জল ফেলেছে, সে তো 
আমি নিজের চোখেই দেখেছি। 

রবি কাদম্বরীর হাত ধরে একপাক ঘুরে যান নাচের ভঙ্গিতে, গেয়ে ওঠেন, 
আয় তবে সহচরী-_ 

জ্যোতি উচ্ছৃসিত হয়ে বলেন, বাঃ বেশ তো গানটা, নতুন লিখলি রবি? 
লাগিয়ে দে আমাদের নাটকে। 

এবার স্বর্ণকুমারীও বলে উঠলেন, না রবি, তোর গলা একটু পালটেছে 
ঠিকই, নতুনবউঠান ভূল কিছু বলেননি। কেমন যেন বিদেশি বিদেশি লাগছে, 
ভালই লাগছে। 

অক্ষয় বললেন, বিলিতি সুরের প্রভাবে গলা একটু পালটেছে ঠিক, তার 
ওপর ওর এখন বয়ঃসন্ধি পেরোনো কণ্ঠ। রবির গলায় আইরিশ মেলোডির 
ছোঁয়া লেগেছে। 

রবি আপাদমস্তক শিউরে ওঠেন কী এক অজানা ভাললাগায়, একদিন 
ছিল যখন অক্ষয়ের কণ্ঠে আইরিশ মেলোডির ওইসব কবিতার আবৃত্তি শুনে 
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন। বিলেতে গিয়ে সুরগুলি শিখে এসে অক্ষয়কে 
কবে শোনাবেন, তাই ভাবতেন কিশোর রবি। শিখেছেনও, কিন্তু সব সুর যে 
ভাল লেগেছে তা নয়। কিছু সুর মিষ্টি, সরল, করুণ। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের 
প্রাচীন কবিসভার বীণ ছোটবেলায় যেভাবে বেজে উঠত, বিলেতে যেন 
তেমনভাবে বাজল না। বরং তিনি অন্য অনেক সুর শিখেছেন। লুসির সঙ্গে 
সুরের খেলায় মেতেছিলেন এই সেদিন, এখন যেন পিয়ানোর ছেঁড়া তার 
বেজে ওঠে বুকে। চোখের জল লুকোন্তে জানলার কাছে গিয়ে দাড়ান তিনি। 

জ্রানদা অন্য কথা বলেন, প্রথমে নিজেদের মধ্যেই মানময়ীর অভিনয় 
হোক না। কে কী পার্ট করবে সব ঠিক করা যাক। 

আমি সুরাটে গিয়ে কাজে যোগ দেওয়ার আগেই তা হলে অভিনয় হোক, 
সত্যেন বললেন। এতদিন দূরে ছিলাম, একটু গানবাজনা অভিনয়ের স্বাদ 
নিয়ে কাজে ফিরতে চাই। 

ঘরে বসেই ঠিক হয়ে গেল, জ্যোতি করবেন ইন্দ্রের পার্ট, রবি মদন। 

আর শচী সাজবেন কে£ কাদন্বরী পরম উৎসাহে জানতে চান। 
২১৬ 


বহুদিন বিদেশে থেকে জ্ঞানদার মন থেকে নতুনবউয়ের ওপর অসস্তোষ 
কিছুটা কমেছে। মেয়েটা কেমন শীর্ণ হয়ে গেছে, চোখের তলায় জমে আছে 
বার মেঘ। 

তুমিই তো শচী সাজতে পারো নতুনবউ, জ্ঞানদা বললেন, সাজলে গুজলে 
নতুনের সঙ্গে তোমায় বেশ মানাবে। 

এমনিতে বুঝি মানায় না? কাদন্বরী সঙ্গে সঙ্গে ধরে নেন জ্ঞানদার গোপন 
ইশারাটি। ঠিক কীরকম হলে মানাবে বলো তো? 

আহা, মেজোবউঠান ওভাবে কিছু বলেননি, জ্যোতি তাড়াতাড়ি বলেন, 
তোমরা আবার শুরু করে দিয়ো না, দোহাই নতুনবউ। 
হাত রাখে। কানে ফিসফিস করে উচ্চারণ করে নিজের লেখা একটি কবিতা, 


“হয়তো জান না, দেবি, অদৃশ্য বাধন দিয়া 
নিয়মিত পথে এক ফিরাইছ মোর হিয়া 
গেছি দূরে গেছি কাছে, সেই আকধণ আছে 
পথভ্রষ্ট হই নাক তাহারি অটল বলে।” 


বৈশাখে বাড়ির আঙিন'য় মহা ধুমধাম করে মানময়ীর অভিনয় হল। 
কাদন্বরী সবস্ব পণ করে অভিনয় করলেন, মানময়ী শচীর চোখের জলে 
মিশিয়ে দিলেন নিজের চেপে রাখা অশ্রজলরাশি। 

সবাই নাটকের অভিনয়ের প্রশংসায় মাতোয়ারা, বিশেষত কাদন্বরীর 
অভিনয় সবাইকে অবাক করেছে। সকলে যখন ধন্য ধন্য করছে তখন 
জ্যোতিকে আড়ালে টেনে নিয়ে তার আঙরাখার সোনার বোতাম ধরে 
চেয়েও ভাল অভিনয় করে? 

উঃ, নতুনবউ, তোমার মাথার ঠিক নেই! জ্যোতি ছিটকে যান, যে অধরা 
আগুনকে ভূলে থাকতে চাইছেন তিনি আবার তাকেই কেন টেনে আনে 
কাদন্বরী! 

নাটকের মানময়ীর মানভঞ্জন হয়, কিন্তু বাস্তবের মানময়ী নিজের পরম 
সাফল্যের দিনেও চোখভরা অশ্রু নিয়ে দাড়িয়ে থাকেন চিত্রার্পিত। 

২১৭ 


৯৫ 


শ্রীমতী হে 


রবির প্রেরণা কাদন্বরী, কাদন্বরী জ্যোতির জন্য উতলা, জ্যোতি বিনোদিনীর 
জন্য। মাঝে মাঝে জ্যোতি ভাবেন, বিনোদিনী কি তার জীবনের ফেম ফেটাল! 
কী অনিবাধ আকর্ণে সব ওলটপালট করে দিচ্ছে সে। প্রিয়তমা নতুনবউকেও 
আর তত প্রিয় মনে হয় না, অথচ বিনোদিনী ধরা দেয় না। কাদন্বরীকেই বা 
সামলাবেন কীভাবে, সে যে তিল তিল করে ধবংস করছে নিজেকে। 

কাদম্বরী ভাবছেন, জ্যোতি কার্তিকের মোহান্ধ পোকার নতো আগুনে 
ঝাপ দিচ্ছেন, কী করে তাকে সরিয়ে আনবেন ওই নটীর আগ্নিশিখা থেকে। 
কী করে বাচাবেন নিজেকে? 

রবি বুঝতে পারেন দু'জনকেই। জ্যোতিদাদার কাছে বিনোদিনী এখন 
দেবী মিউজ, সরোজিনীর পর থেকেই তাকে নিয়ে পাগলা হয়ে আছেন কিন্তু 
রবির মিউজ নতুনবউঠান। এমন এক আশ্চর্য নারী, টাদনি রাতের আলোর 
জলে ভাসতে হবেঃ তার কথা ভাবতে ভাবতে পাতার পর পাতা কবিতা 
লিখে চলেন রবি। “ভগ্নহৃদয়” কাব্যটি শেষ হতে চলল এবার, প্রথম সর্গ শুরু 
হয়েছিল বিলেত যাওয়ার আগে। 

সবনাশিনী সেই বিনোদিনীর থেকে অনেক দূরে শান্তিনিকেতনে চলে 
এলেন ওঁরা, রবি জ্যোতি ও কাদন্বরী। সবুজের সেই অবারিত আঙিনায় 
কাদন্ধরীকে ঘিরে দুই অসাধারণ যুবকের মনে দু'রকম ঘূণি পাকিয়ে ওঠে। 

একগুচ্ছ বকুলফুল কুড়িয়ে এনেছেন কাদন্বরী, ফুল নাড়াচাড়া করতে করতে 
আদুরে গলায় বলেন, এই ফুলগুলো যেমন শুকিয়ে যাবে, আমিও একদিন 
শুকনো বকুলের মালার মতো তোমাদের ঘরের কোনায় পড়ে থাকব। 


৯৮ 


রবির কানে কথাগুলো মনে হয় হেকেটিদেবীর বেদনাসংগীত। এই প্যাথস 
থেকে জন্ম নেয় তার নতুন কবিতা। 

জ্যোতির মনে হয়, এই রে, কাদন্ধরী আবার এ-সব প্রলাপ শুরু করেছে। 
কলকাতার জনমোহিনী জীবন থেকে, নাট্যরঙ্গ থেকে দূরে সরে এসেছেন 
তিনি, স্ত্রীর মনখারাপ সারিয়ে তুলবেন বলে। এখানে এসেও কি ওর মন 
ভাল হবে নাঃ 

তিনি বলেন, নতুনবউ, তুমি কি শান্তিনিকেতনের এই উদাত্ত পরিবেশেও 
কোনও আনন্দ খুঁজে পাচ্ছ না? 

আমি কি আর নতুন আছি? তোমার চোখে আমি তো এখন পুরাতন, 
কাদম্বরীর অভিমান যায় না, আরও কত নতুন এসে গেছে তোমার জীবনে! 

রবির চমক লাগে, কে যেন বাতাসে ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে__ "হেথা 
হতে যাও পুরাতন”, কে বলল, কে! 

না গো, হেকেটিদেবী, রবিও রহস্য করেন, তুমি বুঝি সত্যি বুঝতে পারছ 
না এ-বই কার চরণকমলে অধ্য দিতে চাই? 


“চরণে দিনু গো আনি-__ এ ভগ্রহৃদয়খানি 
চরণ রঞ্জিবে তব হৃদিশোণিতধারা' 


কিন্তু সে কার চরণকমলে? কাদন্বরী বুঝেও বোঝেন না যেন। 

সেই তার, রবি বলেন, বিলেতে গিয়েও যার ছায়া ঘাড় থেকে নামাতে 
পারিনি, যেখানে যাই, যার ছায়া পিছু ধাওয়া করে! 

তা হলে এবার সে তোমার ঘাড় মটকাবে, কাদন্বরী হাসতে হাসতে 
বললেন। হাসি যেন রবির সারা গায়ে জুইফুলের মতো ঝরে পড়ল। 

রবি অস্ফুটে উচ্চারণ করেন, “আঁধার হৃদয়মাঝে দেবীর প্রতিমা-পারা।' 


প্রথম বেরোল ভারতী-তে, তারপর “ভগ্রহৃদয়' বই হয়ে বেরোল ১৮৮১-র 
জুন মাস নাগাদ। তখন থেকেই শুরু "শ্রীমতী হে-কে' নিয়ে নানা জল্পনা। 
“অলীকবাবু” নাটকে একবার হেমাঙ্গিনী সেজেছিলেন কাদন্বরী, আবার 

জ্ঞানদাও বলতে ছাড়েন না, বই হাতে নিয়ে তার প্রথম কথা, শেষে 


১৯ 


কাদম্বরীকে উৎসর্গ করতে হল রবি, এমন আড়াল করে কবিরা তো স্বপ্নের 
নারীকে উৎসর্ম করে জানতাম! 

রবির মনখারাপ হয়, মেজোবউঠানের সব ভাল, শুধু কেন যে 
নতুনবউঠানকে দেখতে পারেন না! দু'জনের মধ্যে যেন অদৃশ্য রেষারেষি। 
মুখে অবশ্য বলেন, তুমি কী করে জানলে কাকে উৎসর্গ করেছি, কবিদের 
সব কথা প্রকাশ হয়ে গেলেই বিপদ। তবে নতুনবউঠান যে আমার অনেক 
কবিতার মিউজ, এ-কথা অস্বীকার করব না। আমার কাছে তিনি যত না 
রক্তমাংসের মানুষ, তার চেয়ে বেশি একটি আইডিয়া। 

কী জানি বাপু, জ্ঞানদা স্পষ্টতই বিরক্ত হন, কী যে আহামরি দেখেছ ওর 
মধ্যে? ভেবেছিলাম বিলেত ঘুরে এলে ওর ভূতটা ঘাড় থেকে নামবে, এখনও 
তোমার ছেলেমানুষি গেল না। 

ফিরে আসার পর জ্ঞানদার মহলে অনেক নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। তার 
ছেলেমেয়েরা খোদ বিলিতি কাটিংয়ের পোশাক পরে। ধুমধাম করে কেক 
বিবি লোরেটোয়। রামা চাকরের সঙ্গে রোজ বিকেলে বেড়তে যায় সুরেন 
বিবিরা। অন্য বাচ্চাদের কাছে এটা রীতিমতো ঈর্ধার বিষয়। ঠাকুরবাড়িতে 
ছোটরা কেউই এত মনোযোগ পায় না, সেখানে জ্ঞানদার আদরযত্বে সুরেন 
বিবির বিচরণ যেন রাজপুত্র রাজকন্যার মতো। 

জ্ঞানদা নিয়ম করেছেন, প্রতিদিন বাড়ির একজন করে বাচ্চা ওদের সঙ্গে 
হাওয়া খেতে যাবে। ছোটরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করে কবে তার পালা। 
আগ্রহ বা সময় কোনওটাই নেই। দাসীর হেফাজতে এবং গুরুমশায়ের কড়া 
শাসনে দিন কাটে। যেদিন তার বেড়াতে যাওয়ার পালা, সেজেগুজে বেরতে 
গিয়েই বাধা। গুরুমশায় দেখে ফেলে যেতে দিলেন না, তার অশ্রুভারাক্রাস্ত 
চোখের সামনে দিয়ে সুরেন বিবিরা বেরিয়ে গেল, উড়ে গেল তার বাইরে 
বেরোনোর স্ব্ন। 

বালিকাদের মধ্যে বিবি, সরলা ও প্রতিভার গলায় খুব সুর। রবি মহা 
উৎসাহে বাড়ির গানবাজনায় ছোটদেরও টেনে আনছেন। সাবাদিন ঘরের 
বাতাসে দিশি-বিলিতি সুরের উচ্ছল আমেজে শুরু হয়ে যায় মাঘোৎসবের 
প্রস্তুতি। আগে দায়িত্ব নিতেন দ্বিজেন, সত্যেন বা জ্যোতি। এবার রবিই 


"২২০ 


গানবাজনার দায়িত্বে, নতুন নতুন ব্রহ্মসংগীত লিখছেন, ওস্তাদদের বন্দিশ 
থেকে সুর নিয়ে ভেঙে নতুন সুর তৈরি করছেন, শেখাচ্ছেন। প্রতিবার 
মাঘোৎসবের দিন গানের বই বেরোয়, এবার আগেই আদি ব্রাহ্দসমাজ 
প্রেস থেকে বিশ-পঁচিশটি প্রুফ তুলে গানগুলি হাতে হাতে ছড়িয়ে দিলেন 
রেওয়াজের জন্য। আগেকার গানের চেয়ে রবির গানে নানা সুর, নানা ভাবের 
খেলায় আনন্দ যেন অনেক বেশি। কিছু বুঝুক না বুঝুক, বাচ্চাদের মনেও 
যেন সেই আনন্দের ছোয়া লাগে। 

জ্যোতি তো বলেই ফেললেন, আমাদের গানে উপনিষদের গাস্ভীের 
ভাবটা বেশি ছিল, শ্রীমান রবির আমলে ব্রন্মসংগীত যেন পূর্ণতা পেল। 

কিন্তু পিয়ানোর মধ্যে ওস্তাদি গানগুলিকে ফেলে, যথেচ্ছ মন্থন করে 
জ্যোতি যে সুর নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছিলেন সেইসময়, রবি ছিলেন তার 
সে-কাজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী । এইসব এক্সপেরিমেন্ট ব্রহ্মনংগীতে ব্যবহার করা 
হয়নি কিন্তু বিদ্বজ্জন সমাগম উপলক্ষে লেখা ও অভিনীত “বাল্মীকিপ্রতিভা, 
নৃত্যনাট্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল সুরবিপ্লব। অপেরা নয়, রবির ভাষায় সেটা 
ছিল “সুরে-নাটিকা?। 

বাল্মীকির ভূমিকায় রবি স্বয়ং অসাধারণ অভিনয় করলেন, তবে সবাইকে 
মুগ্ধ করে দিল সরস্বতীর সাজে হেমেনের বালিকাকন্যা প্রতিভা। গানে, 
সুরে, অভিনয়ে রবির এমন মুনশিয়ানা এই প্রথম বাইরের অতিথিদের কাছে 
প্রতিষ্ঠিত হল। বঙ্কিমচন্দ্র অভিনয় দেখে উচ্ছৃসিত হয়ে উঠলেন দেবেনবাবুর 
ছোট ছেলের প্রতিভায়। 

এ-সবের মধ্যে দিন কাটছিল আনন্দেই। কিন্তু রবির ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যেন- 
জ্ঞানদা তখনও ভাবছেন। জ্ঞানদার ইচ্ছে রবি আবার বিলেত যাক। এখানে 
কাদম্বরীর মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ে থাকার চেয়ে অনেক বড় একটা পৃথিবী 
আছে। রবি সেখানে গিয়ে নিজের অসমাপ্ত পড়া সম্পূণ করুক। সত্যেনেরও 
তাই ইচ্ছে। তারকনাথ মহধিকে সেই অনুরোধ জানান, রবি এবার বিলেত 
গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করুক। 

রবির ইচ্ছেও সেরকম। পড়া শেষ না করে ফিরে আসায় স্বজনবন্ধুরা 
কেউই খুশি হননি। যখন সবে তার পড়ায় মন বসেছিল, তখনই বাবা ডাক 
পাঠালেন। অসমাপ্ত কাজ সমাধা করতে তিনিও মহধির কাছে বিলেত 
যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। প্রতিমাসে বিলেত থেকে তাকে একটি করে চিঠি 


২২৯ 


লিখবেন, এই শর্তে দেবেন্দ্রনাথ অনুমতি দিলেন। কিন্তু রবির যাওয়া হল না। 
তার কারণ কাদম্বরী। 


যাওয়া শুরু করেছেন। কাদন্বরী কিছুদিন কান্নাকাটির পর একদিন ডাক 
পাঠালেন মালিনীকে। 

বইয়ের বোঝা নামিয়ে মালিনী মেঝেতে বসে পড়ে। নতুনবউঠান, তোমার 
ঘরে একটা অন্যরকম গন্ধ আছে, এলেই কেমন উদাস উদাস লাগে। 

অধীর কাদন্বরী কাজের কথায় আসেন, চল মালিনী, একদিন নাটক দেখতে 
যাই। বিনোদিনী নাকি গিরিশ ঘোষের একটা নতুন থিয়েটার করছে! 

দেখবে, বউঠান? মালিনী সতর্ক হয়, দেখো আবার ধরা পড়ে যাব না 
তো৷। এখন আবার বাড়িতে মেজোবউঠান আছেন, সবদিকে তার নজর। 

পড়লে পড়ব, কাদন্বরী মরিয়া, তুই টিকিট কাটার ব্যবস্থা কর। সেবারের 
মতো, আমি, তুই আর রূপা। 

রূপাও উৎসাহী, ছটফট করে বলে, নতুনবউঠান, রবিদাদাকে চুপিচুপি 
সঙ্গে যেতে বলো না! বেশ মজা হবে। 

কাদন্বরী ভাবেন, মন্দ না কথাটা। কিন্তু রবি যদি রাজি না হয়! কিংবা রাজি 
হবেই বা না কেন, সে তো শকুস্তল'র মুগ্ধ হরিণশিশুর মতো আমার পায়ে 
পায়ে ঘোরে! 

আয়নার সামনে দীড়িয়ে খোঁপায় বেলফুলের মালা জড়াচ্ছিলেন কাদন্বরী। 
আনমনে বললেন, সে বলা যায়, কিন্তু রবিকে তো সবাই চিনে ফেলবে, আর 
জল্পনা করবে ওর সঙ্গে ঘোমটা ঢাকা মহিলাটি কে? 

সে যার যা খুশি ভাবুক না, রূপা পরোয়া করে না। তোমার মুখ তো কেউ 
দেখতে পাবে না! রি 

কাদন্ধরী অতটা বেপরোয়া হতে পারেন না, বলেন, না না সে ঝুঁকি নেওয়া 
যায় না। ধরা পড়ে গেলে রবির খুব বিড়ম্বনা হবে। লোকে সন্দেহ করবে 
আমাকেই। 

সেই নাটক দেখতে যাওয়াই কাল হল কাদন্বরীর। মানময়ীর অভিনয়ের 
পর সকলের বাহবা পেয়ে তার ধারণা হয়েছিল কোনও নটার থেকে অভিনয়ে 
তার নৈপুণ্য কোনও অংশে কম নয়। তারা পতিতা হয়ে যতটা উত্তরণ ঘটাতে 


২ 


পারে তার চেয়ে অনেকগুণ ডানা মেলতে পারে কাদম্বরীর শিক্ষিত রুচির 
অভিনয়। 

কিন্তু সেদিন তাকে স্তম্ভিত করে দিল বিনোদিনী। মঞ্চে তার অনায়াস 
চলাফেরা যেন সম্াজ্জীর মতো। রূপের মাজাঘষা মহিমায়, কণ্ঠের নিয়ন্ত্রিত 
স্বরক্ষেপণে, গিরিশের পরিমার্জনায় এবং দশ কদের ঘনঘন করতালিতে তার 
জ্যোতিষ্নয়ী উপস্থিতি। কাদন্বরীর মনে হল ওই মঞ্চে উঠে দাড়ালে তিনিও 
এমন মোহগ্রস্ত করে দিতে পারেন দর্শকদের। তখন সেই বিপুল জনতার 
“এনকোর' ধবনিতে ভাসমান তাদের প্রিয়নায়িকাকে দেখে জ্যোতিরিন্দ্র কী 
করবেন? ভালবাসবেন তো? নাকি তার ঈধা হবে, হবে চণ্ডালের মতো 
রাগ! 
ঢাকা নিজের শরীরটাকে বিনোদিনীর পাশে নেহাতই তুচ্ছ মনে হয়। 

তখনই তিনি জ্যোতিকে দেখতে পেলেন। সামনের সারিতে বসেছিলেন, 
পেছন থেকে বুঝতে পারেননি কাদন্বরী। এখন উঠে দাড়িয়ে মঞ্চে বিনোদিনীর 
দিকে ফুলের মালা ছুড়ে দিয়ে সাধু সাধু বলে চেঁচিয়ে উঠতেই কাদন্বরীর 
চোখে অন্ধকার নেমে আসে। রূপার কাধে অবশ দেহে এলিয়ে পড়েন 
তিনি। কোনওরকমে একটু সুস্থ বোধ করতেই রূপা ও মালিনী বেরিয়ে পড়ল 
কাদন্বরীকে নিয়ে। 
আফিমের গুলি বার করে অনেকগুলি খেয়ে নিলেন। রবি রাতের দিকে 
কী একটা নতুন গান শোনাবেন বলে ঘরে ঢুকে দেখলেন ছিন্নলতার মতো 
মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন নতুনবউঠান, ঠোটের দু'পাশে গ্যাজলা। 
কাদন্ধববীকে। এই ভয়ংকর আঘাত রবিকে এলোমেলো করে দিল। বিপন্ন 
বিষণ্ন নতুনবউঠানকে খাদের কিনারায় ফেলে রেখে রবি কিছুতেই বিলেত 
চলে যেতে পারলেন না। 

বিপর্যয় সামলাতে জ্যোতি কাদন্বরীকে নিয়ে গেলেন পশ্চিমের পাহাড়ে। 
নতুনবউঠানের ছেড়ে যাওয়া তেতলার ফাকাঘরে বসে রবি তখন কবিতায় 
তীর হতে-__ 


২৩ 


চিঠি লিখছিলেন নতুনবউঠানকে, “আমার বড় ইচ্ছা ছিল যে, তুমি বলবে-__ 
“অমুক জায়গায় আমি একটি সুন্দর উপত্যকা দেখলুম; সেখেনে একটি নির্বার 
বোয়ে যাচ্ছিল, জায়গাটা দেখেই মনে হল, আহা ভা (ভানু) যদি এখানে 
থাকত তা হলে তার বড় ভাল লাগত।' 


এদিকে ভগ্রহদয় পাঠকমহলে আলোড়ন তুলল, রবিকে নিয়ে তরুণদল 
বাংলার শেলি বলে নাচানাচি শুরু করলেন। তার বড় চুল, তার পোশাক, 
চশমা সবকিছুই হয়ে উঠল অনুকরণযোগ্য ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। 

ত্রিপুরার দূত এসে খবর দিলেন, রবির কাব্যটি মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের 
খুব পছন্দ হয়েছে, তিনি অভিবাদন জানাচ্ছেন। কিন্তু রবির আর-এক বন্ধু 
প্রিয়নাথ সেনের একেবারেই ভাষ্গী লাগেনি এই কাব্য। বিহারীলালের অবশ্য 
পছন্দ হল। সময়ে অসময়ে প্রায়ই বিহারীলালের কাছে চলে আসেন রবি। 
প্রায় রোজই দেখেন, পঞঙ্খের কাজ করা মেঝের ওপর উপুড় হয়ে কবিতা 
লিখছেন বিহারীলাল, লিখতে লিখতেই রবিকে দেখে খুশি হয়ে ডেকে নেন। 
অগ্রজ-অনুজ দুই কবির সারা দুপুর কেটে যায় কবিতার ছন্দ নিয়ে তর্কে। 

কাদন্বরী ফিরে আসার পর ঠাকুরবাড়িতে আবার শুরু হল “বসন্ত উৎসব 
অভিনয়ের উদ্‌যোগ। এবার নায়িকা লীলা সাজবেন কাদন্বরী, আর যে 
সন্ন্যাসিনীর কৃপায় লীলা তার প্রেমিককে ফিরে পেল, তার ভূমিকায় লেখিকা 
স্বর্ণকুমারী স্বয়ং নায়ক জ্যোতিরিন্দ্র। রবি প্রতিনায়ক হয়ে টিনের তলোয়ার 
ঘুরিয়ে খুব যুদ্ধ করলেন। 

অভিনয়ের দিন ঢালা বাগেশ্্রী রাগিণীতে কাদন্বরী যখন গাইছিলেন-__ 
“চন্দ্রশূন্য তারাশুন্য মেঘান্ধ নিশীথ চেয়ে/দুর্ভেদ্য অন্ধকারে হৃদয় রয়েছে 
ছেয়ে'__ তার পিঠভরা খোলা চুলে, বড় বড় চোখে শোকাতুরা লীলার 
কল্পিত মূর্তি যেন জীবন্ত হয়ে উঠর্লা 

রবি, জ্যোতি, স্বণকুমারীরা বতই কাদম্বরীকে আনন্দে রাখার চেষ্টা করুন, 
বাড়ির মেয়েমহল কিন্তু কাদশ্বরীকে ছেড়ে কথা বলল না। তরকারির আসরে 
এসে বসতে না বসতেই শুরু হয়ে যায় টীকা টিপ্ননী। 

কেউ বললেন, কী গো নতুনবউ, এত নাটুকেপনা কেন? দুঃখকষ্ট তো 
সবার আছে, আমরা তো বাপু অমন করে বিষ খাইনি? 
২২৪ 


আমাদের মধ্যে! মাঝখান থেকে কর্তাদের যত ঝুটঝামেলা পোয়াতে হচ্ছে, 
বাইরে জ্যোতিঠাকুরকে নিয়ে কত কানাকানি। নিজের বরকে এমন বদনাম 
করে মুখ দেখাচ্ছ কী করে? 

এত বিষ এদের জিভে, কালো হয়ে যায় কাদম্বরীর মুখ। সত্যি তার মরে 
যাওয়াই ছিল ভাল, কেন যে রবি বাঁচিয়ে তুলল! চোখ দিয়ে টপটপ ঝরে 
পড়ে রূপোলি বেদনা। 

জ্ঞানদাও অসস্তুষ্ট তার ওপর। এমনি করে বাড়ির লোকের বদনাম করা 
তিনি মেনে নিতে পারেন না। কাদন্ববীকে আঘাত দিয়ে বললেন, এখন কেঁদে 
কী হবে নতুনবউ? তুমি নিজের মুখ পুড়িয়েছ, আমাদেরও। এই কথা চাপা 
দিতে কত টাকা খরচ হয়েছে জানো? আর নতুনের মুখের দিকে তো তাকানো 
যাচ্ছে না, এত ভালবেসে এই প্রতিদান পেল সে! 

রূপা আর চুপ থাকতে পারে না, বলে, মেজোবউঠান, তোমরা কেউ ওর 
দুঃখটা বুঝছ না, কেউ কি সাধ করে এমন করে? ওঁকে একটু সামলাতে দাও 
না। 

জ্ঞানদা কুষ্টন্বরে বলেন, তুই চুপ কর রূপা, সব ব্যাপারে কথা বলিস না। 
চ্যালেঞ্জ নেওয়াটাই তো বেঁচে থাকা। আমি বিলেতে অসুস্থ বাচ্চাগুলোকে 
নিয়ে রুগৃণ শরীরে একা একা কীভাবে দিন কাটিয়েছি, তুমি ভাবতেও পারবে 
না। আফিম খাওয়াটা ভীরুতা। নিজে জ্বলছ, নতুনকেও জ্বালাচ্ছ। আমি প্রথম 
থেকেই জানতাম, তুমি পারবে না। নতুনের মতো পুরুষকে বেঁধে রাখতে 
পারে না তোমার মতো মেয়েরা। 

আমি কীরকম£ জলভরা চোখে ফুঁসে ওঠেন কাদন্বরী। সব বুঝলাম 
মেজদি, কিন্তু আমি যেভাবে দিনের পর দিন নিজের স্বামীকে আগুনের দিকে 
ধাবমান পতঙ্গের মতো বাজারের নটার দিকে ছুটে যেতে দেখেও হাসিমুখে 
সহ্য করেছি, সেটা কি তুমি পারতে? 

এ তোমার মিথ্যে সন্দেহ নতুনবউ। জ্যোতির রূপগুণে নটীরা সবাই 
মাতোয়ারা, কিন্তু জ্যোতি তোমার প্রতি কোনও অবহেলা করেনি। আজও সে 
তোমাকে নিয়ে বেড়াতে যায়, তোমাকে নায়িকা সাজিয়ে গীতিনাট্য করে। 

ও-সব লোকদেখানো, কাদশ্বরী খুব নিচু গলায় বলেন, ও আর আমাকে 
ভালবাসে না। আমি আমার সেই জীবনসঙ্গীকে চিনতে পারি না আর। 


২২৫ 


সৌদামিনী এখন অন্দরের কত্রী। জলচৌকিতে বসে রুপোর পিকদানে 
পিক ফেলে বলেন, শোনো বাছা, একটা মিঠেপান মুখে দাও দেখি! 

হঠাৎ পানের প্রস্তাবে কাদন্বরী তার দিকে তাকান। সৌদামিনী একটি পান 
এগিয়ে দিয়ে বললেন, শোনো, পুরুষেরা একটু বারমুখি হতে পারে, কিন্তু 
তুমি যদি সন্দেহবাতিক দেখাও, তা হলে জ্যোতি আর ঘরে ফিরতেই চাইবে 
না। ঠান্ডা মাথায় একটু কায়দা করে চলো, দেখবে সংকট কেটে যাবে। 

পেছন থেকে মুখ লুকিয়ে কে যেন বলে ওঠে, বাঁজা বউয়ের আবার 
বায়নাক্কা কত! স্বামী তো ওইজন্যেই মুখ ফেরাচ্ছে। কোলভরে একটা ছেলে 
আনতে পারলে দেখতাম, বর ঘরে ফেরে কিনা! 

আযাই, কে বললে গো? রূপা আবার ঝামটে ওঠে, আড়াল থেকে যা নয় 
তাই বলবে? যাদের খাচ্ছ পরছ, তাদেরই কথা শোনাও! 

ও বাবা, এ যে নতুনবউ কালকেউটের ছানা পুষেছে! আবার পেছন থেকে 
কে বলে ওঠে। ঠাকুরবাড়ির অসংখ্য আশ্রিত মহিলাদের মধ্যে অনেকেই 
এই আসরে তরকারি নিয়ে বসে। তাদেরই কেউ কেউ টিপ্লনী কাটছে পেছন 
থেকে। 

এক বয়স্কা বিধবা সামনাসামনিই বলে ফেললেন মনেত্র কথা, নতুনবউ, 
কিছু মনে কোরো না, তুমি বাপু একটু অপয়া আছ। উদ্মিলাটা তোমার কাছে 
ছিল, পড়ে গেল আর তোমার ঘুমই ভাঙল না; নিজের কোলেও ছেলেপুলে 
এল না; দোষ আছে, চুপচাপ থাকো। বেশ তো ছিলে ফুরুৎ ফুরুৎ গানবাজনা 
নিয়ে, এখন আবার এ-সব আফিম খেয়ে নাটক করা কেন? 

তীব্র শোকের বিদ্যুৎ প্রবাহে মাথা টলে ওঠে কাদন্বরীর। উম্নিলার কথা মনে 
পড়ে জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। জ্ঞানদা তাড়াতাড়ি ধরে বসান তাকে। রূপাকে 
বলেন ওঁকে ঘরে নিয়ে যেতে। যেতে যেতেই রূপার ঘাড়ে মাথা রেখে 
কাদন্বরী পাগলিনীর মতো গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠেন "মানময়ী”র একটি গানের 
কলি-_ “সজনী লো সজনী, কেন কেন এ পোড়া প্রাণ গেল না£?.../এনে দে 
এনে দে বিষ, আর যে লো পারি না।, 

কাদন্বরী এরপর আর জোড়ার্সীকোর বাড়িতে থাকতে চাইলেন না, জ্যোতি 
ও রবির সঙ্গে চন্দননগরের গঙ্গাতীরের একটি বাগান-বাড়িতে এসে উঠলেন। 
কয়েকবছর আগেও এখানে এসে মুগ্ধ হয়েছিলেন ওঁরা, ঠাকুরবাড়ির 
কোলাহল থেকে দূরে গঙ্গার কোলে সেই বাড়ি যেন এক স্বপ্নরাজ্য। 

২২৬ 


ঘাটে বাঁধা থাকে একটা ডিডি নৌকো। অক্ষয় এলে ডিঙি চড়ে মাঝনদীতে 
গিয়েও গানবাজনার পালা শুরু হয়ে যায়। দিনের পর দিন কেটে যায় অলস 
মায়ায়; সন্ধ্যা কাটে নদীর ঘাসে বসে গান গেয়ে; এমনকী কোনও কোনওদিন 
রাত হয়ে যায়, তবু গঙ্গার তীর থেকে নড়তে চান না কাদন্বরী। 

এখানে এসে জ্যোতিকেও অনেক কাছে পেয়েছেন, যদিও প্রায়দিনই 
কলকাতায় যাওয়া-আসা করেন জ্যোতি। 


কিছুদিন পর বাড়ি পালটে মোরান সাহেবের বাংলোয়। সেও গঙ্গার ধারে। 
কাদন্বরীর বিক্ষিপ্ত মনের ওপর দিয়ে গঙ্গার বাতাস যেন স্সেহের স্পশ দিয়ে 
ছুঁয়ে যায়। রবিও সতর্ক থাকেন যাতে বউঠানের মনে কোনও মেদ না জমে। 
অবসর। 

সেখান থেকে কলকাতায় সদর স্ত্রিটের একটি ভাড়া বাড়িতে । ১৮৮১-৮২ 
কাদশ্বরী জোড়ার্সাকোয় ফিরতে চান না। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের গঞ্জনা থেকে 
দূরে, তেতলার ঘরের নিঃসীম একাকিত্ব এড়িয়ে সদর স্ট্রিটের বাড়িটাই গুছিয়ে 
নেন তিনি। জ্যোতি সবসময়ে বাড়ি না এলেও রবি তো আছেই। রবি লেখার 
টেবিলে বসলে তার জন্য মৌসাম্বির শরবত এনে দেন কাদন্বরী, কখনও বা 
কেটে যায় দেওর বউদির। 

এক-একদিন.বই-মালিনী এসে হাজির হয় আশ্চর্য সব গল্পের ঝুলি নিয়ে। 
তাকে দেখলেই কাদম্বরী আজকাল আগের মতন জাদুগক্স শুনতে চান, তার 
যেন জাদুগল্পের নেশা ধরে গেছে। কিন্তু আগের মতো মালিনীর চোখের 
সামনে সবসময় ওরকম ম্যাজিক খেলে না। 

কোনওদিন সে বলে, তার চেয়ে আগের মতো নতুন নতুন বই দেখাই 
চি পরল পরল ক বিল 

কাদন্বরীর মনে লাগে না, ও-সব নতুন বইয়ের খবর তো রবির কাছে, 
জ্যোতির কাছেই শোনা যায়, সক পুরচারিণী 
নন। মালিনী ছাড়াও তার বই জোগাড়ের অন্য পথ আছে। মালিনী কাছে 
এলেই তার বুক দৃুরুদুরু করে, না জানি কী রহস্যময় কাহিনি শোনা যাবে, 


২২৭ 


যা প্রতিধবনির মতো তার জীবনের গুঢ় গোপনকে মনে করিয়ে দেয়, যা 
প্রতিবিষ্বের মতো সামনে এসে দাড়ায়! 

বল না মালিনী, কাদম্বরী রোজ অনুনয় করেন, তেমন আশ্চর্য একটা গল্প, 
যা ছাপা হয়নি অথচ কোন অজানা ইথার তরঙ্গে লেখা হয়েছে। 

একদিন মালিনী এল হাতে লেখা কয়েকটি ভূর্জপত্র নিয়ে, উত্তাসিত মুখে 
বলল, এবার তোমাকে অবাক করে দেব নতুনবউঠান। ঠোটে কৌতুক ছড়িয়ে 
সেই পুঁথির পাতা থেকে পড়ে শোনাতে থাকে সে-_ 


অনেকদিন কোনও গান রচনা করা হয়নি, সেই জ্বরের ঘোরে রবি একটা 
গান বাঁধবার চেষ্টা করল। একটি দুটি লাইন ঠিক এসে গেল, তৃতীয় লাইনটা 
ভাবতে গিয়ে গুলিয়ে গেল প্রথম লাইনটা। কিছুতেই মনে পড়ে না। সেটা 
হাতড়াতে গিয়ে আবার তৃতীয় লাইনটা হারিয়ে যায়। 

কপালে একটা হাতের ছোয়া লাগতে চমকে উঠল রবি। ঘাড় ঘুরিয়ে 
দেখল, শিয়রের কাছে দাড়িয়ে আছেন কাদন্বরী। উরিখুরি চুল, চোখ দু'টি 
ছলছলে, শরীরে একটা আটপৌরে হলুদ শাড়ি জড়ানো। 

দুজনে পরস্পরের চোখের দিকে চেয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। এর মধ্যে রবি 
উত্তর দিয়েছেন, রবি বুঝতে পেরেছিল, ওঁর রাগ পড়েনি। তারপর কাদ্বরী 
অসুখে শয্যাশায়িনী হলেন, মনোর মা আর নিস্তারিণী দাসী তার ঘরে বসে 
থাকে, রবি সকাল-বিকেল দেখে এসেছে, অন্তরঙ্গ কোনও কথা হয়নি। 
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ জমিদারির কাজে গিয়েছেন শিলাইদহে, জোড়ার্সাকো থেকে 
দ্রু'জন কর্মচারী এসে রয়েছে এ বাড়িতে। 

রবি অস্ফুট স্বরে বলল, নতুনবউঠ্ুন! 

কাদন্বরী বললেন, রবি। তোমার অসুখ হয়েছে, আমাকে খবর দাওনি? 

রবি কাদন্বরীর ডান হাতখানি ধরল। সে হাত খুব উঞ্ণ। কাদন্বরীর মুখ 
দেখলেও টের পাওয়া যায় জ্বরের ঝাঝ। 

রবি বলল, তোমারও তো বেশ জর, তুমি উঠে এলে কেন? 

কাদন্বরী বললেন, মেয়েমানুষের জ্বর হলে কিছু হয় না। সরকার মশাইকে 
জানাচ্ছি, নীলু ডাক্তারকে ডেকে আনুক তোমার জন্য। এত জ্বর, তোমার 
কপালে জলপটি দেওয়া হয়নি__ 
২৮ 


রবি বলল, এখুনি ডাক্তার ডাকার দরকার নেই। মোটে একদিনের জ্বর, 
আমার এমনই ঠিক হয়ে যাবে। 

কাদন্বরী বললেন, তুমি চুপটি করে শুয়ে পড়ো। এক্ষুনি আসছি। 

রুপোর বাটিতে ঠান্ডা জল আর পরিষ্কার একটুকরো কাপড় নিয়ে একটু 
পরেই ফিরে এলেন কাদন্বরী। একপাশে বসে রবির কপালে জলপষ্টি দিলেন 
যত্ব করে। 

রবি বলল, এ তোমার ভারী অন্যায়, নতুনবউঠান। তোমার এখন শুয়ে 
থাকার কথা। তুমি জলপ্রি নাওনি কেন £ 

কাদন্বরী বললেন, তোমার এই মাথায় কত কী চিন্তা করতে হয়। বেশি 
গরম হলে ক্ষতি হতে পারে। আমাদের মাথার আর কী দাম আছে! 

রবি বলল, চিন্তা সব মানুষই করে। তবে তোমার মনের মধ্যে কী যে চলে, 
তার আমি কোনও হদিশ পাই না। 

কাদন্বরী হেসে বললেন, হদিশ করার সময় কোথায় তোমার? 

রবি বলল, আমি দোষ করেছি। পথভ্রান্ত হয়েছিলাম, কিন্তু সেই দোষ কি 
একেবারে ক্ষমার অযোগ্য? 

কাদশ্বরী বললেন, ক্ষমার প্রশ্ন আসেই না, রবি। তুমি কি সবক্ষণ বাড়িতে 
বসে থাকবে নাকি আমার জন্য? আমি বুঝি তা বুঝি না? 

রবি বলল, একটা লাভ হল কি জান, নতুনবউঠান, এই কয়েক মাস 
অন্যদের কাছে ঘুরে ঘুরে আমার উপলব্ধি হল, তোমার কাছাকাছি থাকতেই 
আমার সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে। 

দু'দিন বাদে রবির জ্বর ছাড়ল। কাদন্বরীর ছাড়ল তার পরেরদিন। আবার 
শনিবারে দু'জনেরই একসঙ্গে জ্বর এল। নীলমাধব ডাক্তার দু'জনকেই ওষুধ 
দিলেন। সেই ওষুধে জ্বর ছাড়ে, আবার আসে। এই পালা জ্বর ক্রমে গা-সহ্য 
হয়ে গেল। 

জ্বর যখন থাকে না তখন রবি লিখতে বসে যায়, কাদশ্বরী ঘর গুছোতে 
শুরু করেন। সন্ধের পর দু'জনে মুখোমুখি বসে গল্প করে কিংবা গান গায়। 
রবি তার সদ্য লেখা কবিতাটা পড়ে শোনায়। কাদন্বরী রবির সব লেখার 
প্রথম পাঠিকা কিংবা শ্রোতা।' 


সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই রবির কানে আসে কী একটা পাঠের শব্দ। কে 


২২২৪) 


পড়ছে, এটা তো বউঠানের গলা না! কৌতুহলী হয়ে দ্রুত বারান্দা পার হয়ে 
বউঠানের ঘরে ঢুকে পড়েন তিনি। 

রবি ঘরে ঢুকতেই মালিনী পুঁথিপত্র গুটিয়ে উঠে পড়তে যায়। রবি তার 
আগেই জানতে চান, কী বই পড়া হচ্ছিল মালিনী? তাতে যেন আমার নাম 
শুনলাম! 

রবির হঠাৎ আবির্ভাবে মালিনীর চোখের ঘোর কেটে গেল, কে যেন ধাক্কা 
দিয়ে তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। রবিবাবু এ-সব শুনলে যে তাকে পাগল 
ভাববেন! 

মালিনী পুঁথিটি ঝুলিতে পুরে ফেলতে চায়, কিন্তু রবি তরিৎগতিতে প্রায় 
ছোঁ মেরে সেটা হাতে তুলে নিলেন। তিনজনের অবাক দৃষ্টির সামনে রবির 
হাত লেগে ভূর্জপত্রের পৃষ্ঠাগুলি ঝুরঝুর করে গুঁড়ো হয়ে বাতাসে মিলিয়ে 
গেল। 


২৩০ 


১৬ 


বিনোদিনী 


ঠাকুরবাড়ির বাঁধাধরা গগ্ডিতে জ্ঞানদা ক্রমশই হাপিয়ে উঠছিলেন। 
ছেলেমেয়েকে নিয়ে কিছুদিন তিনি সিমলা পাহাড়ে বাসা বাধলেন। তার 
ধারণা হয়েছে, কলকাতার বিশেষত জোড়ার্সাকো বাড়ি থেকে যত দূরে থাকা 
যায় ততই ভাল। সিমলার স্কুলেই ভরতি হল বিবি ও সুরেন কিন্তু তাদের 
আসল শিক্ষা ঘরের মধ্যে, মায়ের কাছে। 

জ্ঞানদা নিজের প্রিয় কাব্যসাহিত্য পড়ে শোনান ছেলেমেয়েকে। তার পছন্দ 
“দি ক্রক'। আবার ভারতী পত্রিকা থেকেও পড়ে পড়ে শোনান নতুন লেখা। 
সুরেন বিবির প্রতিদিনের আর-একটি কাজ হল সমবয়সি ভাইবোনদের 
আঁকাব্বাকা অক্ষরে চিঠি লেখা । এভাবেই ব্যাকরণের গতেবীধা নিয়ম এড়িয়ে 
তাদের শিক্ষা শুরু হয় প্রাণের স্পর্শে, সাহিত্যের উত্তেজনায়। 

জ্ঞানদার আর-একটি প্রিয় কবিতা টমাস মুরের 'লাল্লারুখ'। মুরের কবিতা 
ঠাকুরবাড়িতে খুব চর্চা হত, আইরিশ মেলোডির কারণেই। সত্যেন পাঠিয়ে 
দিয়েছেন হান্স আন্ডারসন আর গ্রিমভাইদের রূপকথা, সুরেন বিবি রাতদিন 
কাড়াকাড়ি করে বইদুটি নিয়ে। বড়দের পছন্দের সব উত্তরাধিকার ছড়িয়ে 
পড়তে লাগল সুদূর সিমলায় বসে থাকা ছোট ছোট দুটি বালক-বালিকার 
তন্ত্রীতে। 

কিছুদিন পর ছেলেমেয়ে নিয়ে একা একা পাহাড়ে থাকার চেয়ে কলকাতায় 
নেমে আসাই সুবিধেজনক মনে হল জ্ঞানদার। অবশ্য ঠাকুরবাড়িতে নয়, 
আলাদা বাড়ি ভাড়া করে ওঁরা উঠে এলেন ভবানীপুরের বির্জিতলাও পাড়ায়। 
মস্ত দোতলা বাড়ি, বিলিতি স্টাইলে মাঝখানে বড় হলঘর, তার চারপাশে 


২৩১ 


চারটে ঘর, গাড়ি-বারান্দার ওপরে আরও একখানা । এখন এরকম বাড়িতে 
থাকতেই আরাম পান জ্ঞানদা। 

ইংল্যান্ডে বাস করার ফলে তার অভ্যেসগুলি পালটে গেছে। সুরেন 
বিবিরা ম্যাট-ন্যাপকিন সাজানো ডাইনিং টেবিলে না বসলে খেতে পারে 
না। ঠাকুরবাড়ির সনাতন পরিবেশে তাদের অসুবিধে হচ্ছিল। তা ছাড়া 
কূটকচালি-ভরা মেয়েমহলের দমবন্ধ করা পরিবেশ এখন আর জ্ঞানদার 
সহ্য হয় না। ছেলেমেয়েরা ওখানে বেড়ে উঠক সেটা তিনি কখনওই চান 
না। 

জ্ঞানদার বাড়িই হয়ে উঠল রবি-জ্যোতির ঘরোয়া আড্ডার নতুন ঠিকানা। 
ভারতীর মিটিং থেকে পিয়ানো বাজিয়ে গান রচনার আসর-_- সবকিছুই 
এখন এই বাড়িতে। এখানেই জড়ো হন অক্ষয়, প্রিয়নাথ, বিহারীলালের 
মতো বন্ধুজন। এই আড্ডার নিয়মিত সদস্য স্বর্ণকূমারী ও জানকীনাথ। 
স্বর্ণকুমারীকে ঠাকুরবাড়িতে রেখে জানকীনাথ বিলেত গিয়েছিলেন পড়তে, 
কিন্তু উ্নিলার মৃত্যুর খবরে তিনি দেশে ফিরে আসেন। কখনও কখনও 
সৌদামিনী বা বর্কুমারীও এসে হাজির হন। বাদ শুধু একজন, সদর স্ট্রিটের 
বাড়ির নতুনবউ। জ্ঞানদার বাড়িতে তার আমন্ত্রণ থাকে ন।। জ্ঞানদা নিজেই 
এ-সব গানবাজনা কবিতার আসরের মধ্যমণি হয়ে থাকতে ভালবাসেন, 
সেখানে কোনও প্রতিদ্বন্দিনীকে তিনি ডেকে আনতে চান না। তিনি সবাইকে 
উৎসাহ দেবেন, তার প্রেরণায় সবাই নাটক বা গীতিনাট্যে মেতে উঠবে, তার 
সঙ্গেই রবি-জ্যোতিরা সাহিত্য আলোচনা করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। 
এইজন্য তিল তিল করে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন জ্ঞানদা। 

স্বর্ণ যে দাদাদের সঙ্গে প্রকাশ্য সভায়' গিয়ে কবিতা পড়ছে বা কাদন্বরী 
যে ডিঙিনৌকোয় চড়ে জ্যোতির বন্ধুদের গান শুনিয়ে মুগ্ধ করছে, এ-সবের 
সুযোগ কে করে দিয়েছে? চোদ্দো-পনেরো বছর আগের সেই সময়ে তিনি 
জোর করে অন্ধকারের চৌকাঠ ভেঙে না বেরলে এতদিনেও ওরা আলোর 
মুখ দেখত না। জোড়ার্সাকোর চারদেওয়ালে বন্দি হয়ে থোড়-বড়ি-খাড়া 
নিয়েই জীবন কাটাতে হত। 

তা ছাড়া ঠাকুরবাড়িতে একমাত্র এই কাদন্বরীর কাছেই তাকে কয়েকবার 
হার মানতে হয়েছে। তার সামনেই নতুনবউকে নিয়ে ছাদের আসরে জ্যোতি, 
রবি, অক্ষয়, বিহারীলালদের আদিখ্যেতা তিনি ভূলে যাননি। 


২৩২ 


এখন জ্যোতির যে ঘরে মন টেকে না, তাতে তিনি আশ্চর্য নন মোটেই। 
জ্যোতির মতো সৃষ্টিশীল প্রতিভা চিরদিন ওই বউকে নিয়ে মেতে থাকতে 
পারবে না, এ বিশ্বাস তার ছিলই। তার ওপর এখন কাদন্বরী যেরকম 
ঘ্যানঘ্যানে হয়ে গেছে, জ্যোতি আর কত সইবে? 

গানবাজনার শেষে জ্যোতির মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না, 
মেজোবউঠানের কাছে রাতে থেকে যান। জ্ঞানদাও তাকে নিজের কাছে 
টেনে নেন স্নেহে, শুশ্রীষায়, ভালবাসায়। এই দেবরটির প্রতি তার অস্ভুত টান 
এখনও অট্ুট। 

সদর স্ট্রিটের বাড়িটা দামি দামি ফানিচার কিনে সাজিয়ে তুলেছেন জ্যোতি, 
তাতে আবার লেগেছে কাদন্বরীর রুচির ছোৌয়া। তবু সেই বাড়িটাকে মাঝে 
মাঝে একঘেয়ে মনে হয় জ্যোতির। গান কবিতা সাজসজ্জার আড়ন্বরের 
মধ্যেও পুরনো দাম্পত্য যেন হাপিয়ে ওঠে নতুন প্রাণের অভাবে। 

জ্ঞানদার বাড়ির উদার সন্নেহময় বাতাসে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচা যায়। শুধু 
মেজোবউঠান নন, তার ছেলেমেয়েরাও জ্যোতিকে স্নেহের বন্ধনে আটকে 
রাখে। আহা কাদন্ববীর কোলে যদি একটি কচি উপহার দিতে পারতেন! 
জ্যোতি নিজেকেই দোষ দেন। হতাশায় বাড়ি ফেরেন না, রবি সতর্ক করেন, 
জ্যোতিদাদা, নতুনবউঠান কিন্তু রাগ করবেন, সে আমি সামলাতে পারব 
না। 

জ্যোতি রবিকে বলেন, সে আমি কাল গিয়ে সামলে নেব। তুই সদর স্ট্রিটে 
ফিরে আজ রাতে বউঠানকে পাহারা দে রবি। 

কেন একদিন একা থাকলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হবে তার? জ্ঞানদা 
ডাইনিং টেবল সাজাতে সাজাতে বলেন, আমি গাড়োয়ানকে দিয়ে খবর 
পাঠিয়ে দিচ্ছি, রবি তুমিও আজ থেকে যাও। 

বিবি এসে রবির হাত ধরে টানাটানি করতে থাকে, যেয়ো না রবিকা, 
আজ আমরা সেই বিলেতের মতো গান করব সবাই মিলে। 

বালিকা বিবির স্নেহকাঙাল মুখের দিকে তাকিয়ে টানাপোড়েনে পড়ে যান 
রবি, তবু সেই নিঃসঙ্গ অভিমানিনী নতুনবউঠানের মুখ মনে করে শেষে সদর 
স্ক্রিটের দিকেই পা বাড়ালেন। 

পরদিন সালে ঘুম ভাঙতেই জ্যোতির মনে পড়ল বিনোদিনীর মুখ। 
এই সকালে তার মানসীপ্রতিমার ধ্যানে কাদন্বরী ঢুকে পড়তে পারছেন না 


২৩৩ 


বলেই জ্যোতির ঘুম পাড়িয়ে রাখা প্রেম চনমন করে উঠল। তিনি ঠিক করে 
ফেললেন, অনেকদিন যাওয়া হয়নি, আজ বিনোদিনীর খোজ নিয়ে তবেই 
বাড়ি ফিরবেন। 

বিলিতি কায়দায় জ্ঞানদার ব্রেকফাস্ট ঘণ্টি বেজে উঠল, অর্থাৎ টেবলে 
খাবার রেডি। এমনিতে বিলেতের সব চালচলন মানতে পারেন না জ্ঞানদা, 
কিন্তু যেগুলি ভাল তা তিনি গ্রহণ করেছেন। ওদের গুছিয়ে সংসার করার 
কায়দাকানুনগুলি বেশ ভাল, এই যেমন টেবিলে বসে একসঙ্গে খানাপিনার 
ব্যাপারটা। বাঙালি বাড়িতে কর্তার খাবার আগে সাজিয়ে দিতে হবে তীর 
হয়ে গেলে তারপর। এতে সময় অনেক নষ্ট হয় আর গৃহিণীর পরিশ্রমও 
বেশি। একটা নিদিষ্ট সময়ে খাওয়ার পাট চুকে গেলে টেবিল পরিষ্কার করে 
গিন্নিরাও পড়াশোনা বা পছন্দসই অন্য কাজে মন দিতে পারেন। 

সবচেয়ে বড় কথা, সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার মজাই আলাদা। 
নিজেদের কথাবার্তা হাসিঠাট্টার মধ্যে যে খোলামেলা মেলামেশা হয়, সেটাই 
পারিবারিক সম্পর্কের আসল অমৃতধারা। 

জ্যোতি টেবিলে পৌঁছে দেখলেন, বিবি সুরেন জ্ঞানদারা সবাই আগেই 
এসে গেছেন। কিন্তু কেউ খাওয়া শুরু-ুরেনি, তার জন্য অপেক্ষা করছে। 
জলখাবারের মেনু অবশ্য বিশুদ্ধ মতে, গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ঠাকুরবাড়ির 
বিখ্যাত মাছের কচুরি দেখে জ্যোতি বুঝতে পারেন জমিয়ে খিদে পেয়েছে। 
সেই সঙ্গে আবার হাতছানি দিচ্ছে বরফকুচি দেওয়া ফলের রস আর চিনেমাটির 
বাটিতে সাজানো কাজু-কিশমিশ দেওয়া মোহনভোগ। 

জ্ঞানদা জানতে চান, এখনি বাড়ি ফিরবে নাকি জ্যোতি£ এসেছ, দ্ব' 
তিনদিন থেকে একটু জিরিয়ে যাও না। 

জ্যোতি হেসে উড়িয়ে দেন, কী যে বলো মেজোবউঠান, আমি তো প্রায় 
রোজই আসি। দিনের বেলা কি আমার কোনও কাজকর্ম নেই? 

তা হলে কাজ সেরে ফিরে এসো, দুপুরে ইলিশ রান্না হবে। জ্ঞানদা যেন 
বালক দেওরকে লোভ দেখান। 

জ্যোতি হেসে বলেন, আর আমার বউ যে গৌসাঘরে খিল দেবে. তোমার 
তাতে খুব মজা হবে, না? কেন যে তোমার এখনও এত রাগ সে বেচারার 
ওপর! 


২৩৪ 


আমার রাগ করতে বয়ে গেছে, জ্ঞানদা ফৌস করে ওঠেন, সে কি আমার 
ঘরের লোক যে রাগ কবব?ঃ 

আর আমি? জ্যোতি জানতে চান, আমাকে যে আটকে রাখতে চাও 
তোমার কারাগারে, সে কোন অপরাধে দেবী? 

আহা, জ্ঞানদা অভিমানী গলায় বলেন, জানো না যেন, তোমাকে 
ভালবাসি বলেই ধরে রাখতে চাই। তোমার মেজদাদা কোন সুদূরে পড়ে 
থাকেন, আমার কি ভাল লাগে একা একা শুধু বিবি-সুরেনকে নিয়ে সংসার 
সামলাতে! তুমি থাকলে আমাদের বাড়িতে খুশির হিল্লোল বয়ে যায়। বিবি 
সুরেনরাও কত খুশি হয়, তুমি বোঝো না! 

কালপরশুই আবার আসব বউঠান, জ্যোতি জ্ঞানদার হাতের ওপরে হাত 
রেখে মিনতি করেন, আজ ছুটি দাও। 

কোন রাজ্যজয় করতে যাবে শুনি? জ্বানদা কৌতুহলী হন, এখনি বাড়ি 
যাবে না নিশ্চয়ই! 

বিনোদিনীর সঙ্গে দেখা করতে হবে একটু, জ্যোতি মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে 
বলেন, আমার পরের নাটকে ওকে নায়িকা করতে চাই। 

জ্ঞানদা তীল্ষমচোখে জ্যোতিকে দেখেন, চিবুক ধরে তার মুখটা নিজের 
দিকে ঘুরিয়ে বলেন, একটা সত্যি কথা বলবে নতুনঠাকুরপো, কাদন্বরীর 
সন্দেহ কি সত্যি? তুমি কি সত্যি বিনোদিনীর প্রেমে পড়েছ? 

জ্যোতি জ্ঞানদার সামনে থেকে সরে যান জানলার কাছে, কী করে বোঝাব 
মেজোবউঠান, কখনও কখনও নাট্যকারের কাছে নায়িকা তার লেখার প্রেরণা 
হয়ে ওঠে তুমি কি জান না তা? প্রেরণাকে প্রেম নাম দিলে বড্ড স্থুল শোনায়, 
জিনিসটাকে এত নীচে নামিয়ে এনো না, দোহাই তোমাদের। 

জ্ঞানদার ভয় হয় জ্যোতি বোধহয় ভাবছেন তিনিও কাদম্বরীর মতো 
মোটাদাগের চিন্তায় নামিয়ে আনছেন বিনোদিনীকে। কিন্তু তিনি তো কাদন্বরী 
নন, তাড়াতাড়ি বলেন, না নতুনঠাকুরপো, সে ভয় কোরো না, বিনোদিনী 
যদি তোমার প্রেরণা হয়, আমি কখনও তাকে মোটা দাগে বিচার করব না। 
আটকেও রাখব না। যাও তুমি তোমার মিউজের কাছে। 

বিনোদিনীর বাড়ি পৌঁছে জ্যোতি দেখলেন পরিবেশ থমথমে । বিনোদিনীর 
মুখে সংকটের ছায়া। গিরিশ মাথার চুল ছিড়ছেন। অমৃতলাল চুপচাপ বসে 
আছেন। 


২৩৫ 


বিনোদিনীর এক ধনী প্রেমিক ছিল, সম্প্রতি সে লুকিয়ে বিয়ে করেছে। 
সেজন্য বিনোদিনীর খুবই মন খারাপ, জ্যোতি জানেন। কিন্তু সেজন্য সবাই 
এত গম্ভীর থাকবেন তা তো স্ম্ভব নয়। তবে কী হল? 

জ্যোতি সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, কী হয়েছে বিনোদিনী? 
কারও অসুখ করেছে£ 

না জ্যোতিবাবু, ভেজা গলায় বিনোদিনী বলেন, আমার স্বপ্ন বুঝি অধরা 
থেকে গেল। আমি ন্যাশনাল থেকে প্রায় বিতাড়িত হয়েছি। গিরিশবাবু এখন 
একটি নতুন থিয়েটার তৈরি করতে চান, কিন্তু টাকার অভাবে সে-চেষ্টা 
থমকে যাচ্ছে। 

শিরিশবাবু ন্যাশনাল ছেড়ে নতুন থিয়েটার করবেন, জ্যোতি উল্লসিত হন, 
এ তো৷ দারুণ খবর। 

গিরিশ বলেন, ওহে ঠাকুরবাবু, ন্যাশনাল থিয়েটারে তো আর ভদ্রলোকে 
থাকতে পারছে না। মালিক কথায় কথায় সবাইকে অপমান করছেন। 
বিনোদিনী পনেরো দিন বেনারস বেড়াতে গেছিল বলে ওর টাকা কেটেছে। 
বিনোদ তাই রাগ করে ন্যাশনাল ছেড়ে দিল। আমিও বেবিয়ে এসে নাটক 
করছি। এখন নতুন থিয়েটার তৈরি করতে চাই। আপনার তো অনেক 
টাকাপয়সা, প্রতিপত্তি। দেখুন না কিছু-করতে পারেন কি না। 

জ্যোতি উদগ্রীব হয়ে জানতে চান, কী করতে হবে বলুন। বিনোদিনীর 
চোখের জল মোছার জন্য তিনি সবকিছুই করতে পারেন। 

টাকা চাই, অনেক টাকা, গিরিশ বলেন, পারবেন কিছু করতে £ আমার 
তো শখের থিয়েটার না, এ থেকেই রুটিরুজি চালাতে হবে। 

জ্যোতি নিজেকে ধিক্কার দেন মনে মনে। অনেক টাকা তিনি কোথা থেকে 
দেবেন, কিছু জোগাড় করা যে্তে পারে মাত্র। বাবামশায় তো কখনওই 
থিয়েটারের পেছনে এত টাকা ওড়াতে দেবেন না, তার নিজের অবস্থাও 
ফেলেন, কিছু তো দিতেই পারি, আরও কিছু জোগাড় করা যায়। হাল ছেড়ে 
বসে থাকলে তো হবে না। 

বিনোদিনী এগিয়ে এসে জ্যোতির হাত ধরে বলেন, সত্যি কিছু করা 
যাবে? আমাদের নতুন থিয়েটার গড়ে দিলে আমি চিরদিন আপনার কেনা 
হয়ে থাকব জ্যোতিঠাকুর। 


২৩৬ 


জ্যোতির গা ভাললাগায় শিরশির করে ওঠে। এতদিন ওই প্রেমিকের জন্য 
বিনোদিনী তাকে কাছে ঘেঁসতে দেয়নি, আজ এত কাছে এসে দাড়িয়েছে, এই 
মুহুর্তটা যদি চিরস্থায়ী করে রাখা যেত! 

কিন্তু সেই মুহূর্তেই ঘরে ঢোকেন এক অল্পবয়সি যুবক, দামি বিলিতি মদের 
গন্ধে তার গা ভুরভুূর করছে, অঙ্গে মহামূল্য আউ্রাখা, গলায় লম্বা সোনার 
চেন, পাঁচ আঙুলে হিরে-পান্নার আংটি। ঢুকতে ঢুকতেই আগের কথার রেশ 
টেনে বলেন, কী বিনোদিনী, আমাকে ফেলে অন্য কোনও মহাপুরুষের কেনা 
হয়ে থাকবে তুমি? 
গুরমুখবাবু আপনি বসুন, ওরকম টালমাটাল করবেন না। 

গিরিশ গুরমুখকে আপ্যায়ন করতে চান, বড়লোকের ছেলে, সাহায্য 
লাগতে পারে। বলেন, আহা বিনোদ, ওঁকে ওরকম করে বোলো না, উনি 
থিয়েটার ভালবাসেন, ওঁকে একটু আদরযত্ব করো। 

গিরিশ নিজেও আর ন্যাশনালে থাকতে চান না। মালিক প্রতাপচাদ 
এতদিন শিল্পীদের অবহেলা করলেও তার কথা শুনতেন। ক্ষুব্ধ শিল্পীরা 
গিরিশের কথায় মালিকের অন্যায় মেনে নিয়েও কাজ করছিল। কিন্তু ইদানীং 
প্রতাপ যেন গিরিশকেও গুরুত্ব দিতে চান না, ন্যাশনালের বাণিজ্যিক রমরমা 
যে গিরিশ আর বিনোদিনীর জন্যেই, তা আর মানতে চাইছেন না তিনি। এই 
অবস্থায় গিরিশ চাইছেন নতুন করে শুরু করতে। ইতিমধ্যেই ন্যাশনাল ছেড়ে 
ক্যালকাটা স্টার কোম্পানি নামে একটা নাট্যদল গড়েছেন তিনি। অমৃতলাল 
মিত্র, নীলমাধব চক্রবতী, অঘোরনাথ পাঠক, বিনোদিনী, ক্ষেত্রমণি, কাদন্বিনী, 
গঙ্গামণিরাও যোগ দিয়েছেন নতুন এই দলে। পুরনো “সীতাহরণ” নাটকটি 
নতুন দলের ব্যানারে অভিনয় শুরু হয়েছে, তবে নির্দিষ্ট কোনও স্টেজ না 
থাকায় আজ এখানে কাল ওখানে হচ্ছে। এভাবে বেশিদিন চলবে না, তাই 
গিরিশ মরিয়া হয়ে উঠেছেন একটি পুর্ণাঙ্গ থিয়েটার মঞ্চ গড়তে, আর তার 
জন্য বড়লোক বাবু ধরা দরকার। বিনোদিনীকে সুকৌশলে টোপ হিসেবে 
এগিয়ে দিচ্ছেন তিনি। 

বিনোদিনী কাছে গেলে গুরমুখ বলেন, না না, গিরিশবাবু, একটু ভুল 
বললেন, আমি থিয়েটার ফিয়েটার ভালবাসি না, ভালবাসি শুধু বিনোদিনীকে। 
তার হাত ধরে টেনে ডাকেন, এসো বিনোদ, আমার বুকে এসো। 

২৩৭ 


বিরক্ত বিনোদিনী হাত ছাড়িয়ে নেন, "থিয়েটার ফিয়েটার” কথাটা শুনে 
তার গা জ্বলে যাচ্ছে। কিছুদিন ধরেই সদ্য গোঁফ গজানো এই যুবকটি তাকে 
টানাটানি করছে, কিন্তু বিনোদের মনে আগের প্রেমিকের প্রতি ভালবাসা 
ছিল, তাই পান্তা দেননি। 

গিরিশও বিরক্ত হন, তা হলে তুমি এখন এসো গুরমুখ, আমরা থিয়েটার 
নিয়ে একটু সিরিয়াস আলোচনা করছি। 

জ্যোতি আর সহ্য করতে পারেন না, আঠারো-উনিশ বছরের ছেলের 
মাতাল হয়ে এ কী বেহায়াপনা! উঠে দীড়িয়ে বলেন, আপনি নিজে থেকে 
যাবেন না গলা ধাকা দেব? 

আরে, এ যে দেখি ঠাকুরবাড়ির জ্যোতিরিন্দ্র! অন্ধকারে টাদের উদয়! 
গুরমুখ জ্বালা ধরানো হাসি হাসেন, এনার কাছেই কি নিজেকে বিকিয়ে 
দিচ্ছিলে বিনোদ? এই তোমাদের সিরিয়াস আলোচনা £ 

বিনোদিনী নিজেকে স্পষ্ট করতে চান, গুরুমুখবাবু শুনুন, আপনি ভুল 
বুঝছেন। আমরা ন্যাশনাল ছেড়ে দিয়েছি। নতুন থিয়েটার গড়ব, তার জন্য 
টাকা চাই। কী করে টাকা জোগাড় হবে, আমরা তা নিয়েই মিটিং করছি। 
আমি ওঁর কেনা হয়ে থাকব। রি 

কত টাকা চাই বলো? গুরমুখের এবার বীরত্ব জেগে ওঠে, টাকা দিয়ে 
পৃথিবীতে যা-কিছু কেনা যায়, সবই তিনি কিনতে পারেন। উল্লসিত মুখে 
বলেন, বিনোদিনী, যত টাকা তোমাদের থিয়েটার তৈরি করতে লাগবে, 
আমি পুরো টাকাই ফেলে দেব। 

জ্যোতির হৃদয়ে যেন শেল বেঁধে, অথচ তিনি অসহায়, গুরমুখের মতো 
করে বলার ক্ষমতা তাঁর নেই। «. 

দেবে তুমি? বিনোদিনীর গলায় এবার মধু ঝরে পড়ে, কিন্তু গুরমুখবাবু 
তুমি তো জানও না কত টাকা? আমাদের কিন্তু অনেক অনেক টাকা 
লাগবে। 

তোমার জন্য যা লাগে তাই ঢালব সুন্দরী, গুরমুখ দস্ভভরে বলেন, আমি 
থিয়েটার ফিয়েটার জানি না, আমি তোমার শখের জন্য টাকা দেব। 

এবার গিরিশ আসরে নামেন। গুরমুখ তুমি এমনি এমনি এত টাকা দেবে? 
থিয়েটারের শেয়ার চাও না? অবশ্য তুমি না চাইলেও আমরা দেব। একাজ 


২৩৮ 


বর্দি করতে পার, বাংলার থিয়েটারের ইতিহাসে তোমার নাম অক্ষয় হয়ে 
থাকবে। 

হাঃ, দু'দিনের জীবন, কীসের শেয়ার! কে চায় অমরত্ব! গুরমুখ হা হা 
করে হেসে ওঠেন। আমি শুধু বিনোদিনীকে চাই। 

জ্যোতি বাধা দিয়ে বলে, ওঠেন, আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? এ 
কি মেছোবাজারের দরদাম চলছে? আপনি টাকা দিয়ে থিয়েটারকে বীচাচ্ছেন 
না বিনোদিনীকে কিনতে চাইছেন? 

এতক্ষণে আমার মনের কথাটা বলে দিয়েছেন ঠাকুরবাবু, গুরমুখ লাফিয়ে 
ওঠেন, আমার কাছে রথ দেখা আর কলা বেচা দুই-ই এক। এ হল রূপের 
হাটের বিকিকিনি। 

ছিঃ বিনোদিনী, এ-সব তোমরা সহ্য করছ কী করে? লোকটাকে এখনও 
গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছ না কেন? জ্যোতি ধিক্কার দিয়ে ওঠেন। 

গিরিশ তাকে বাধা দেন, আঃ জ্যোতিবাবু, ও যদি সত্যিই টাকা দেয় 
আর তাতে নতুন থিয়েটার তৈরি হয়, আমরা যে-কোনও শর্তে রাজি হব। 
আমাদের কথাবার্তা বলতে দাও, আগে উত্তেজনা ছড়িয়ো